ভূগোল

লক্ষ্মীপুর জেলা

বাংলাদেশ ৬৪টি জেলাতে বিভক্ত। বেশীরভাগ জেলাই স্বাধীনতার আগে থেকে ছিল, কিছু জেলা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গঠিত, আবার কিছু জেলা একটি মূল জেলাকে দুভাগে ভাগ করে তৈরি হয়েছে মূলত প্রশাসনিক সুবিধের কারণে। প্রতিটি জেলাই একে অন্যের থেকে যেমন ভূমিরূপে আলাদা, তেমনি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও স্বতন্ত্র। প্রতিটি জেলার এই নিজস্বতাই আজ বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে। সেরকমই একটি জেলা হল লক্ষ্মীপুর জেলা (Lakshmipur)।

বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বে অবস্থিত চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্গত একটি জেলা লক্ষ্মীপুর। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে লক্ষ্মীপুর ছিল লবণ ও বস্ত্র শিল্পে সমৃদ্ধ। সমগ্র বাংলাদেশে লক্ষ্মীপুর জেলা বিখ্যাত সুপুরির রাজধানী হিসেবে। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ নৌ বন্দর এই জেলাতেই অবস্থিত। লক্ষ্মীপুর জেলার আরেক নাম ‘সয়াল্যান্ড বা সয়াবিনের লক্ষ্মীপুর’। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও লক্ষ্মীপুর জেলার নাম উঠে আসে। ১৯৭১ সালের ৬ জুলাই লক্ষ্মীপুর শহরের রহমতখালি সেতুর কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের অতর্কিত হামলায় প্রায় বাহাত্তরজন পাকসেনা নিহত হয়েছিল। লক্ষ্মীপুরের ইতিহাস ঘাঁটলে পাওয়া যায় বৃটিশ আমল থেকে শুরু করে এখানে সংগঠিত হওয়া রাজনৈতিক, সামাজিক আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে কথা৷

এই জেলার উত্তরে চাঁদপুর জেলা, পূর্বে ও দক্ষিণে নোয়াখালি জেলা এবং পশ্চিমে ভোলা জেলা, মেঘনা নদী ও বরিশাল জেলা লক্ষ্মীপুরকে ঘিরে রেখেছে। লক্ষ্মীপুর শহর রহমতখালি নদীর তীরে অবস্থিত।

লক্ষ্মীপুর জেলার প্রধান নদী হল মেঘনা। এছাড়া ডাকাতিয়া, কাটাখালি, রহমতখালী, ভুলুয়া ও জরিরদোনা এই জেলার আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নদী। মেঘনা নদী লক্ষ্মীপুর জেলাকে বৃহত্তর বরিশাল জেলা থেকে আলাদা করেছে। এই জেলায় মোট ১১৮ বর্গকিলোমিটার নদীপথ রয়েছে। এই জেলার সীমান্তে প্রবাহিত ডাকাতিয়া নদীটির পাশ্ববর্তী দেশ ভারত। এই জেলার পশ্চিমাঞ্চল মেঘনা নদী দ্বারা বিধৌত। চাঁদপুর জেলার দক্ষিণ পূর্ব দিক থেকে এই নদী লক্ষ্মীপুরে প্রবেশ করেছে। প্রতি বছর বর্ষায় মেঘনা নদীর জল বহুল পরিমানে বৃদ্ধি পেয়ে প্লাবন সৃষ্টি করে।

আয়তনের বিচারে লক্ষ্মীপুর সমগ্র বাংলাদেশে ছেচল্লিশতম বৃহত্তম জেলা। লক্ষ্মীপুর জেলার মোট আয়তন ১,৫৩৪.৭ বর্গ কিলোমিটার। ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জনসংখ্যার বিচারে লক্ষ্মীপুর জেলা সমগ্র বাংলাদেশে সাঁইত্রিশতম জনবহুল জেলা। লোকসংখ্যা প্রায় ১৭,২৯,১৮৮৷

এই জেলার নাম লক্ষ্মীপুর কীভাবে হল সে প্রসঙ্গে বিভিন্ন জনশ্রুতি আছে। শোনা যায় একসময়ে বাঞ্চানগর ও সমসেরাবাদ মৌজার পশ্চিমে ‘লক্ষ্মীপুর’ নামে একটি মৌজা ছিল যা থেকে এই অঞ্চলের নাম লক্ষ্মীপুর হয়েছে। আবার কোন কোন ঐতিহাসিকদের মতে সপ্তদশ শতাব্দীতে লক্ষ্মীদহ পরগনা থেকে লক্ষ্মীপুর নামটি এসেছে। কারও মতে আবার দালাল বাজারের জমিদার রাজা গৌর কিশোর রায় চৌধুরীর বংশের প্রথম পুরুষের নাম ছিল লক্ষ্মী নারায়ণ রায় এবং রাজা গৌর কিশোরের স্ত্রীর নাম লক্ষ্মীপ্রিয়া। মনে করা হয় এঁদের নাম থেকেই লক্ষ্মীপুর জেলার নামকরণ করা হয়েছে। আবার অন্য একটি মতে সম্রাট শাজাহানের পুত্র শাহ সুজা ১৬২০ সালের ৬ মে ঢাকা থেকে আরাকানে পালানোর সময়ে ধাপা ও শ্রীপুর হয়ে ৯ মে লক্ষ্মীদাহ পরগনা থেকে ভুলুয়া দুর্গের ৮ মাইলের মধ্যে আসা সত্ত্বেও ভুলুয়া দুর্গ জয় করতে অসমর্থ হন। এই লক্ষ্মীদাহ পরগনা থেকে লক্ষ্মীপুর নামটি এসেছে বলে কেউ কেউ মনে করেন।

‘লক্ষ্মী’ অর্থে ধন-সম্পদ ও সৌভাগ্যের দেবী বোঝায়।অন্যদিকে ‘পুর’ বলতে শহর বা নগর বোঝায়। সেই হিসাবে লক্ষ্মীপুর এর সাধারণ অর্থ দাঁড়ায় সম্পদ সমৃদ্ধ শহর বা সৌভাগ্যের নগরী। নামের সঙ্গে মিল রেখে সত্যিই এই জেলা আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ। দেশের মোট উৎপাদনের ৮৫ শতাংশ সয়াবিন উৎপাদিত হয় এই জেলায়। ২০১৬ সালে জেলার ব্র্যান্ড হিসেবে সয়াবিনকে চিহ্নিত করে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসন লক্ষ্মীপুর জেলাকে ‘সয়াল্যান্ড’ উপাধি দেয়।
ইতিহাস বলে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে লক্ষ্মীপুর ভুলুয়া রাজ্যের অধীন ছিল। ষোড়শ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এই এলাকায় প্রচুর পরিমাণে লবণ উৎপন্ন হত এবং সেই লবণ বাইরে রপ্তানি হত। লবণের কারণে এখানে লবণও বিপ্লব ঘটে।

১৯৭৬ সালে প্রথম লক্ষ্মীপুর পৌরসভা স্থাপিত হয়। পরে রায়পুর, রামগঞ্জ, রামগতি ও লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা নিয়ে পৌরসভার বিস্তৃতি ঘটে। ১৯৭৯ সালের ১৯ জুলাই লক্ষ্মীপুর মহকুমা গঠিত হয় এবং একই এলাকা নিয়ে ১৯৮৪ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারী গঠিত হয় এই জেলা।

এই জেলার আবহাওয়া চাষবাসের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ার কারণে কৃষি এই জেলার মুখ্য জীবিকা৷ এই জেলার প্রায় ৭৩ শতাংশ মানুষ কৃষির সাথে যুক্ত। এই অঞ্চলে ধানের চাষ সর্বাধিক হলেও সয়াবিন উৎপাদনের বেশীরভাগই উৎপন্ন হয় লক্ষ্মীপুরের নদী চর সংলগ্ন লবণাক্ত বেলে এবং দোআঁশ মাটিতে।

কৃষিকাজ ছাড়া জীবনধারনের জন্য এখানকার মানুষ মাছ চাষ করেন। মেঘনা নদীতে চাষ হওয়া রূপালি ইলিশ দেশের বড় অংশের চাহিদা মেটায় । ইলিশ ছাড়াও এই জেলায় রয়েছে নোনা ও মিঠা জলের মাছ যার মধ্যে চিংড়ি, খোলসে, বাইন মৌরালা, পুঁটি ও চেলা মাছের পাশাপাশি রুই, মৃগেল, ট্যাংরা, মাগুর, কই, পাবদা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

এই জেলার উল্লেখযোগ্য ভ্রমণ স্থানের মধ্যে তিতা খাঁ জামে মসজিদ, দালাল বাজার জমিদার বাড়ী, নারকেল ও সুপারির বাগান, কামানখোলা জমিদার বাড়ী, জীনের মসজিদ, খোয়া সাগর দিঘী, ভোম রাজার দিঘী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন তথা ঐতিহাসিক মসজিদ হল তিতা খাঁ জামে মসজিদ। হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের সমাগম এই মসজিদে হয়৷ বাংলাদেশের বৃহত্তম ও এশিয়া মহাদেশের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ রায়পুর মৎস্য প্রজনন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র জেলার অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে উল্লেখযোগ্য৷

লক্ষ্মীপুরে সদর উপজেলার খোয়াসাগর দীঘি এই জেলার অন্যতম দ্রষ্টব্য। প্রায় দুশো বছর আগে দালাল বাজারের জমিদার ব্রজবল্লভ রায় আনুমানিক ১৭৫৫ সালে এই দীঘিটি খনন করেছিলেন৷ এছাড়া অপরূপ সৌন্দর্যের জন্য লক্ষ্মীপুরের মতিরহাট সৈকত এরইমধ্যে পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এমনই নানা সৌন্দর্যে ভরপুর এই জেলা ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে৷

এই জেলা বেশ কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের জন্মস্থান যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন শিক্ষাবিদ ও প্রাক্তন মন্ত্রী পরিষদ সদস্য অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরী, ক্রীড়া সংগঠক ও সাবেক সংসদ সদস্য জনাব হারুনুর রশিদ, সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন, মরহুম ছানা উল্যা নুরী ও সেলিনা হোসেন প্রমুখ। ইতিহাসবিদ ডঃ মফিজুল্যাহ কবির, প্রথম বাংলাদেশী এভারেষ্ট বিজয়ী নারী নিশাত মজুমদারের জন্মস্থানও এই জেলা৷ ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক কমরেড তোয়াহা এবং সানা উল্লাহ নূরী জন্মেছেন এই জেলাতেই৷ আবার দেশের জাতীয় পতাকা সর্ব প্রথম উড়িয়েছিলেন যিনি সেই আস আবদুর রবের জন্মভূমিও এই জেলা।

জেলা হিসেবে লক্ষ্মীপুরের ইতিহাস খুব বেশী প্রাচীন নয়। এছাড়া এই জেলার সংস্কৃতি চর্চার ইতিহাসও নতুন। সমুদ্রপথে আগত তুর্কী,মোগল,পাঠান,ফিরিঙ্গী এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে যারা বসতি স্থাপন করেছিলেন তাদের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে এই জেলার মানুষদের মধ্যে জারিত হয়ে এক মিশ্র সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে৷ জারি-সারি কীর্তন, যাত্রা ও কবিগানের প্রচলন যেমন এখানে দেখা যায় তেমন গৃহস্থবাড়ীতে পুঁথি পাঠের আসরও বসে এবং যাত্রাপালা নাটকও অনুষ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশের সর্ব বৃহৎ নৌ-বন্দর লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মজু চৌধুরীর হাটে অবস্থিত। বাঁশ ও বেতের কাজ, কাঠের কাজ, মুচি, সেলাই, কামার, কুমার বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির মেকানিক ইত্যাদি হস্তশিল্পে জেলাটি সমৃদ্ধি লাভ করেছে।

এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।