বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে যেসব মানুষদের কথা উঠে আসে তাঁদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন লতিফুর রহমান (Latifur Rahman)। তিনি কর্মজীবনের শুরু করেছিলেন আইনজীবী হিসেবে। প্রথমে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং পরবর্তীকালে নিজের যোগ্যতায় সর্ব্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের দশম প্রধান বিচারপতি। তবে আইনজীবী হিসেবে অবসরের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আইনজীবী থেকে দেশের সর্ব্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে অধিষ্ঠানের জন্য যে যোগ্যতার প্রয়োজন হয় নিঃসন্দেহে লতিফুর রহমানের মধ্যে তার অভাব ছিল না। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনই কেবল নয়, তিনি আত্মজীবনীমূলক একটি গ্রন্থও রচনা করেছিলেন।
১৯৩৬ সালের ১ মার্চ ব্রিটিশ শাসনাধীন অবিভক্ত ভারতবর্ষের যশোরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে লতিফুর রহমানের জন্ম হয়। তাঁর পিতা খান বাহাদুর লুৎফুর রহমান নিজেও একজন পেশাদার আইনজীবী ছিলেন। যশোর জেলার একজন প্রথিতযশা আইনজীবী হিসেবে লুৎফুর রহমানের নামডাক ছিল। লতিফুরের মামা নুরুল হুদা আবার ছিলেন হাইকোর্টের বিচারক। অতএব ছোটবেলা থেকেই আইন চর্চার আবহে বড় হয়ে উঠেছিলেন লতিফুর। আইন সম্পর্কে আগ্রহ যে নিজের পরিবার থেকেই তাঁর ভিতরে সঞ্চারিত হয়েছিল সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
লতিফুর রহমানের প্রাথমিক শিক্ষা যশোর জেলা স্কুল থেকে শুরু হয়েছিল। খুব সফলভাবে সেই স্কুলের গন্ডি পেরোবার পর তিনি প্রবেশ করেছিলেন ঢাকা কলেজে। উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৫৫ সালে অনার্স-সহ ইংরেজিতে বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৬ সালে সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ইংরেজিতে স্নাতকোত্তরও পাশ করেন তিনি। তবে লতিফুরের বংশে যে আইনের চর্চার প্রচলন ছিল তা তাঁকে আইন অধ্যয়নের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। লতিফুর সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই এলএলবি নিয়ে পড়াশুনা করে সফলভাবে সেই ডিগ্রি লাভে সক্ষম হন।
লতিফুর আইন নিয়ে পড়াশোনা করলেও কিন্তু আইনজীবী হিসেবে নিজের পেশাদার জীবন শুরু করেননি। তিনি কর্মজীবনের শুরুতে প্রথমে কায়েদ-এ-আজম কলেজ যা বর্তমানে শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ নামে খ্যাত এবং তারপরে জগন্নাথ কলেজে একজন লেকচারার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
বেশ কিছুদিন শিক্ষকতা করবার পরে ১৯৬০ সালে ঢাকা হাইকোর্টের সদস্যপদ লাভ করে আইনজীবী হিসেবে জীবন শুরু করেন লতিফুর। তিনি সেসময় খ্যাতনামা মানুষদেরও সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। লতিফুর তখন বাংলাদেশের প্রথম অ্যাটর্নি জেনারেল এম এইচ খন্দকারের একজন শিক্ষানবিশ ছিলেন। ১৯৭৯ সালে হাইকোর্টের অস্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন লতিফুর রহমান। ১৯৮১ সালে তাঁর সেই বিচারকের পদ স্থায়ী হয়। বছর দশেক খুবই দক্ষতার সঙ্গে হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে কাজ করবার পর ১৯৯১ সালের ১৫ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি। আপিল বিভাগের হয়ে কাজে নিজের অসামান্য মেধা ও দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন লতিফুর। এমনই যোগ্য করে তুলেছিলেন নিজেকে, যে, অবশেষে ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি বাংলাদেশের দশম প্রধান বিচারপতি হিসেবে লতিফুর রহমান গুরুদায়িত্ব পেয়েছিলেন। সেই সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। সেই শাহাবুদ্দিন আহমেদই লতিফুরকে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন।
অবশ্য খুব বেশিদিন লতিফুর রহমান প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেননি। নিযুক্ত হওয়ার পরের বছরই অর্থাৎ ২০০১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন লতিফুর।
প্রধান বিচারপতি হিসেবে অবসর গ্রহণের পরই কিন্তু লতিফুর রহমানের কর্মজীবন শেষ হয়ে যায়নি। ২০০১ সালের ১৫ জুলাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন লতিফুর রহমান, কারণ তিনি আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে অবসর গ্রহণকারী শেষ প্রধান বিচারপতি ছিলেন। মূলত দেশে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন লতিফুরের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এসেছিল। ১০ অক্টোবর বিচারপতি লতিফুর রহমান নতুন প্রধানমন্ত্রীত্বের ভার খালেদা জিয়ার হাতে তুলে দেন। অবশ্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা কয়েক দফায় লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমালোচনা করেছিলেন। যদিও খালেদা জিয়া পরবর্তীকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে লতিফুর রহমানের নিরপেক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।
২০১১ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের জন্য একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন লতিফুর। সেই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া উভয়েই যোগদান করেছিলেন।
আইনচর্চা এবং প্রশাসনের কাজ দক্ষতার সঙ্গে তো পালন করেইছিলেন, সেইসঙ্গে লতিফুর নিজের ব্যক্তিগত জীবন এবং কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টিকে সাবলীল ভাষায় লিপিবদ্ধ করে গেছেন। তাঁর লেখা সেই গ্রন্থটির নাম হল, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দিনগুলি ও আমার কথা’। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের বিশদ বর্ণনা এই বইটির মধ্যে পাওয়া যাবে।
বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতা এবং নিউমোনিয়ায় ভুগছিলেন লতিফুর। ২০১৭ সালে স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে লতিফুর রহমানকে ঢাকার সমরিতা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। অবশেষে ২০১৭ সালেরই ৬ জুন মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ছ’টায় ৮১ বছর বয়সে এই প্রতিভাবান ব্যক্তি লতিফুর রহমানের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুতে সুপ্রিম কোর্ট মঙ্গলবারের অধিবেশন স্থগিত করে দিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনেই লতিফুরের নামাজ-এ-জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান