সববাংলায়

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনযাপন

বিভাগঃ ,

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় মহা পন্ডিত ছিলেন। বিদ্যাসাগরের দ্বারা বিধবা বিবাহ প্রচলন, স্ত্রী শিক্ষার প্রসারসহ শিক্ষায় তাঁর অবদান ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে আমরা ছোটবেলায় অনেক রচনা লিখেছি। অথচ বিদ্যাসাগরের জীবনযাপন কেমন ছিল সেই বিষয়ে তেমন জানা হয়ে ওঠেনি আমাদের। সাংসারিক জীবনের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিই বা কেমন ছিল সেই বিষয়ও আমাদের অনেকের অজানা।  এখানে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবন যাপন সম্পর্কিত কিছু ঘটনা তুলে ধরব।     

বিদ্যাসাগরের পোশাক পরিচ্ছদ : ইংরাজিতে একটি কথার চল আছে – “you are what you wear”। চিরকালই অভিজাত বা উচ্চপদস্থ বা ধনী বোঝাতে মানুষ দামী পোশাক পরিচ্ছদকেই বুঝে এসেছে, এই অত্যাধুনিক বর্তমান সমাজও তার ব্যতিক্রম নয়। এই “পোশাক দিয়ে যায় চেনা”  ধারণার গালে সপাটে থাপ্পড় আমাদের প্রিয় বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগর অন্য লোককে দেওয়ার সময় ভাল জামাকাপড় বা খাবার কিনলেও নিজের বেলায় থান ধুতি, মোটা চাদড় ও সামান্য খাবারেই সন্তুষ্ট থাকতেন। তিনি কোনদিনই উচ্চপদস্থ লোকেদের পোশাক-আদব-কায়দা অনুকরণ করেননি। এই নিয়েই একটি ঘটনার কথা শোনাই।

লেখাটির অডিও শুনতে এখানে ক্লিক করুন

একবার বিদ্যালয় পরিদর্শন করতে হুগলী জেলার কোন এক গন্ডগ্রামে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন বিদ্যাসাগর। এর বহু আগেই অবশ্য তাঁর নাম গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল। বিশেষ করে মহিলারা তাঁকে স্বচক্ষে দেখার জন্য লালায়িত। সকাল দশটা বাজতে না বাজতেই স্কুলের কাছাকাছি ঘরগুলিতে গ্রামের মেয়েরা ভিড় জমাতে শুরু করল।  জানলার পাশে, দরজার পাশে, ছাদের উপর এমনকি যাঁরা একটু বয়স্কা তাঁরা রাস্তার উপরে এসে ভিড় জমালেন। বিদ্যসাগর আসবেন আসবেন করে অনেক দেরি হয়ে গেল, গরম উপেক্ষা করেও সকলে অপেক্ষায় রইল। এমন সময় হঠাৎ চারিদিকে আওয়াজ উঠল “বিদ্যাসাগর আসছেন”। স্কুলের ছাত্ররা ক্লাসে শান্ত হয়ে বসে পড়ল, শিক্ষক মশায়রা বিদ্যাসাগরকে অভ্যার্থনা জানানোর জন্য বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে। মহিলারাও যে যেখানে ছিল সেখানে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল তাঁকে একবার দেখার জন্য। বিদ্যাসাগর এলেন, সামনে দিয়ে চলেও গেলেন কিন্তু মহিলারা কেউ তাঁকে দেখতে পেল না। কেউ বিশ্বাসই করলেন না যে বিদ্যাসাগর এলেন। কেন কেউ বিদ্যাসাগরকে দেখতে পেল না? কেনই বা তাঁরা বিশ্বাস করলেন না যে বিদ্যাসাগর এলেন? এক বৃদ্ধা সাহস করে এগিয়ে এসে আগন্তুক দলটির সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন “হ্যাঁ গা, বিদ্দেসাগর কই? তিনি কি এলেন না?” তখন দলের একজন এগিয়ে এসে বললেন “এই যে, ইনি বিদ্যাসাগর মহাশয়”। বৃদ্ধা খানিকক্ষণ অবাক হয়ে দেখে বললেন “ আ আমার পোড়া কপাল! এই মোটা চাদর গায়ে উড়ে বেয়ারা দেখবার জন্য রোদে ভাজা ভাজা হলুম! না আছে গাড়ি, না আছে ঘড়ি, না আছে চোগা চাপকান!”

অথচ এই “উড়ে বেয়াড়া”টিই সেই সময় অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় দুশ বছর আগে প্রতি মাসে প্রায় হাজার টাকার কাছাকাছি  বিভিন্ন মানুষকে শুধু ভাতা ও সাহায্য স্বরূপ দান করতেন। তিনি যে পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতেন তার বিন্দুমাত্র আভাস তাঁর পোশাক পরিচ্ছদে পাওয়া যেত না। এমনই সাদাসিধে ছিলেন আমাদের বিদ্যাসাগর।   

বিদ্যাসাগরের নতুন উপাধি : তাঁর কাছে অর্থ, উপাধি, প্রতিপত্তি এসব যে কোন গুরুত্ব রাখত না তারই আরেক কাহিনী শোনাই। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রাজদরবারে নতুন উপাধি পেয়েছেন। এই উপাধি পাওয়ার খবর গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। যাঁরা তাঁকে পছন্দ করতেন ভঁরা খুশি হলেন, যাঁরা তাঁকে অপছন্দ করতেন তাঁদের মুখভার হল। বিদ্যাসাগরের কোনো কিছুতেই যায় আসে না। তিনি সদাই উদাসীন। তাঁর উপাধি পাওয়ার খবর শুনে এক বৃদ্ধ খুশি হয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলেন। বিদ্যাসাগর তাঁকে বসিয়ে আপ্যায়ন করলেন।

বৃদ্ধ ব্যক্তিটি জিগ্যেস করলেন বিদ্যাসাগরকে, ‘আপনার নতুন উপাধিটা কী?’
বিদ্যাসাগর বললেন, ‘সি.আই.ই।’
বৃদ্ধ বললেন, ‘তাতে কী হল ?’
বিদ্যাসাগর হেসে বললেন, ‘তাতে ছাই হল।’
বৃদ্ধ গম্ভীর মুখে তখন বললেন, ‘সাধু, সাধু! রাজার মুখে সবই শোভা পায়, সবই শোভা পায়।’

আসলে মহারাণী ভিক্টোরিয়ার থেকে Companion of the Indian Empire এর মতো পেলেও বিদ্যাসাগরের কাছে তা তুচ্ছ এক ব্যাপার ছিল। এমনই মাটির মানুষ (অন্য শব্দ?? ) আমাদের বিদ্যাসাগর।

বিদ্যাসাগরের বাড়িতে ডাকাতি : বিপদের সময়েও কীরকম নির্লিপ্ত থাকতেন আমাদের বিদ্যাসাগর সেই বিষয়ে এক কাহিনী শোনাই। এই কাহিনী তাঁর বাড়িতে ডাকাতি নিয়ে।

বিদ্যাসাগর মহাশয় গ্রামে গেলে আশেপাশের সহায়সম্বলহীন মানুষদের জন্য অনেক কিছু নিয়ে যেতেন ও তাদের সেই সব দান করতেন। এই সব শুনে এক ডাকাতদল ঠিক করে বিদ্যাসাগরের অনেক টাকা তাই তিনি থাকাকালীন বীরসিংহের বাড়িতে তারা ডাকাতি করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী চল্লিশ পঞ্চাশজন ডাকাত মাঝ রাতে সদর দরজা ভেঙ্গে ডাকাতি করতে আসে। ওদিকে ডাকাতের আওয়াজ পেয়ে বিদ্যাসাগর ও তাঁর পরিবারের সকলে পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গিয়ে প্রাণ রক্ষা করেন। ডাকাত দল তাঁদের অনেক খুঁজেও না পেয়ে শেষে থালা বাসন যা ছিল সেসব নিয়েই পালায়। বিদ্যাসাগর মহাশয় রাতেই ঘাটাল থানায় খবর পাঠালেন। সকালে পুলিশ ইনস্পেক্টর এসে দেখা দিলেন। সে যুগেও এনাদের উপরি কামাইয়ের ব্যাপারটা ছিল – কিন্তু এখানে সেসব কিছু না পাওয়ায় দারোগার মাথা গরম হল। বৃদ্ধ ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় কিছু দিতে পারবেন না বলে দিয়ে বাজারে গেলেন নিত্য ব্যবহার্য থালা বাসন কিনতে। আর বৃদ্ধের বড় ছেলে অর্থাৎ আমাদের বিদ্যাসাগর নিজের ভাই ও পাড়াপড়শি জুটিয়ে কবাডী খেলতে শুরু করে দিলেন। সংসারের এই বিপদের দিনেও এরকম নিশ্চিন্তভাব বোধ হয় তিনিই দেখাতে পারেন। তবে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের এরকম নিশ্চিন্তভাব দেখে দারোগা সাহেব আরোও চটে গিয়ে বললেন ‘এ বামুনের (ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়)এত কি জোর যে আমার মুখের উপর জবাব দেয় যে এক পয়সাও দেব না!’ আর অজ্ঞাতনামা ওই বড় ছেলের দিকে ইশারা করে বললেন ‘এও অতি আশ্চর্য্যের বিষয়, ঐ ছোঁড়াটা (বিদ্যাসাগর) কি রকমের লোক, কাল ডাকাতি হয়েছে আর আজ বাড়ির সামনে কবাডী খেলছে!’ নিকটবর্তী গ্রামের ফাঁড়িদার তখন জানায় ‘হুজুর উনি সামান্য লোক নন, উনি বাড়ি এলে জাহানাবাদের ডেপুটি বাবু এসে এনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজেকে কৃতার্থ মনে করে। শোনা যায় বড়লাট ও ছোট লাটের সঙ্গেও এনার বন্ধুত্ব আছে’।

এই ঘটনার পরে বিদ্যাসাগর মহাশয় কলকাতায় গিয়ে যখন  ছোটলাট হালিডে সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যান, তখন প্রসঙ্গক্রমে বীরসিংহের বাড়ির  ডাকাত পড়ার কথা উঠল। ছোটলাট সমস্ত ঘটনা শুনে অবাক হয়ে বললেন, “আপনার বাড়িতে ডাকাত পড়ল, আর আপনি তাদেরকে বাধা না দিয়ে সবাইকে নিয়ে পিছন দরজা দিয়ে পালিয়ে গেলেন ? এ ত ভয়ানক কাপুরুষতা !” বিদ্যাসাগর মহাশয় বললেন :- “আপনারা তো বেশ মজার লোক, প্রাণ লইয়া পলাইয়াছিলাম তাতে বলিলেন ‘কাপুরুষ’ আর ৪০/৫০ জন দস্যুর সম্মুখে একা প্রাণ দিলে, বলিতেন ‘তাইত লোকটা বড় আহাম্মক এত লোকের সামনে একা এগিয়ে মিথ্যা মিথ্যা প্রাণটা দিল! আপনাদের মনের মত কাজ করা কঠিন, এগুলেও দোষ, পেছুলেও দোষ।” সুযোগ পেয়ে এই রসিকতাটুকু করতে ছাড়েননি বিদ্যাসাগর। বাড়িতে ডাকাতির পর এরকম নির্লিপ্ত থাকতে অথবা সেই নিয়ে রসিকতা করতে বোধহয় বিদ্যাসাগরের মত মহামানবই পারেন।

বিদ্যাসাগরের অর্থব্যয়নীতি : বিদ্যাসাগর মহাশয়কে যারা কখনও দেখেনি, এমন কেউ যদি কখনও তাঁকে তাঁর প্রতিদিনের কার্য্যকলাপের মধ্যে দেখত, তাহলে নিশ্চয়ই তাঁকে কঞ্জুস লোক বলে মনে করত। কোথাও যেতে হলে তিনি সহজে গাড়ি বা পাল্কি ভাড়া করতেন না। তিনি সর্ব্বদাই তাঁর সবল চরণ দুটির উপযুক্ত ব্যবহার করতেন। একবার কোথাও যাওয়ার সময়ে শিয়ালদহ ষ্টেশনে গিয়ে ট্রেন না পাওয়ায় ফিরে আসতে হয়। যেতে আসতে পাঁচ আনা করে দশ আনা গাড়ি ভাড়া লাগে। ঘরে ফিরে এসে গাড়ি ভাড়া দেওয়ার সময়ে দুঃখ করে বললেন, “এই দশ আনা মিথ্যা মিথ্যা গেল।” কাছেই তাঁর ছেলে নারায়ণ ও অন্যরা ছিলেন ; তাঁরা বিদ্যাসাগর মহাশয়ের এই কথায় হেসে উঠলেন। হাসতে দেখে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “হাসিতেছ কেন ?” একজন বললেন, “এমন কত দশ আনা যাইতেছে”। তিনি বলিলেন : “এইরূপ অপব্যয়?” “কেন কত লোক আপনাকে প্রবঞ্চনা করিয়া কত টাকা লইয়া যাইতেছে।” তাঁর সেই সরস মুখভঙ্গিমায় তিনি উত্তর দিলেন, “তাহাকেই বুঝি অপব্যয় বলে? সে ত একজনকে হাতে তুলিয়া দিলাম, আর কিছু না হউক যে পাইল সে উপকার বোধ করিল ত? আর এ যে ‘ন দেবায় ন ধর্মায়’। যে ব্যক্তি পাইল, সে তাহার পারিশ্রমিক বলিয়া লইল, আর আমি দিলাম বটে, কিন্তু আমার কোন উপকারে আসিল না”। তখন কেউ একজন মন্তব্য করল “আপনার অর্থব্যয়নীতি এত উচ্চ তাহা বুঝিতাম না”।

আসলে অপব্যয় তিনি কখনই পছন্দ করতেন না। এরকমই কিছু সাধারণ ঘটনার কথা শুনে নেব যা তিনি রোজকার জীবন যাপনে পালন করতেন।

সেই যুগে “Recycle” :বিদ্যাসাগর কোথাও কোন জিনিস কিনে আনলে মোড়কের কাগজ ও দড়িগুলি যত্ন নিয়ে রেখে দিতেন।

তিনি একদিকে বন্যার জলের ন্যায় অর্থ ব্যয় করতেন, কিন্তু অপর দিকে এক বিন্দু দড়ি বা এক টুকরো কাগজ কুড়িয়ে রাখিতেন। এই সব জিনিস ঐভাবে সংগ্রহ করতে দেখে তাঁর নাতিরা হাসত। এক দিন রাতে বিদ্যাসাগর মহাশয় শুয়ে পড়ার পর এক নাতি নিতান্ত প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে চুপি চুপি আলমারির উপর থেকে সেই তুলে রাখা দ’ড়ি আনতে গেল। আলমারির উপর হাত দিতে না দিতে বিদ্যাসাগর মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন, “ওখানে কে রে?” কোন উত্তর নাই, বালক ভয়ে জড়সড়! দ্বিতীয় বার জিজ্ঞাসা করলে উত্তর এল, “আমি যতি” “অন্ধকারে কি করছিস্ ?” “একটু দড়ি নেব।” “এত রাত্রিতে কেন?” পরে প্রয়োজনের গুরুত্ব বুঝে বললেন, “থাম, আমি দিচ্ছি।… যখন বুড়ো দড়িগুলো কুড়িয়ে রাখে তখন ভাব, দাদামশাই কি বোকা, কেবল ছেঁড়া দড়ি, আর ছেঁড়া কাগজ কুড়িয়ে মরে ! – এখন চুপি চুপি সেই ছেঁড়া দড়ি সরাতে এসেছো? বলি, বুড়ো কুড়িয়ে না রাখলে, এখন এত রাত্রে দড়ি কোথায় পেতে বলত?”

কোন চিঠিপত্র এলে তার খালি অংশ কেটে টেবিলের এক পাশে রেখে দিতেন। প্রয়োজন মত ছোট চিঠি লেখা বা অন্যান্য কাজে এই কাগজগুলি ব্যবহার করতেন।

একদিন এক পরিচারিকা বাটনা বাটার পর শিলধোয়া হলুদের জল ফেলে দেওয়া মাত্র সস্নেহে বলে উঠলেন “বলি ও কি হলো? হলুদের জলটা ফেলে দিলে?” সেই পরিচারিকা অবাক হয়ে বিদ্যাসাগরের দিকে তাকিয়ে বলল “দাদামশাই এর কত টাকা যাচ্চে, সে  দিকে নজর নাই, আর এই হলুদের জলটুকুতে চোখ পড়েছে”। তিনি বললেন, “দেখ হলুদের জলটুকু তরকারিতে দিলে কাজে লাগতো তো, আমি  তো আর টাকা জলে ফেলে দিই না, লোককে দিই। ও জলটুকু নষ্ট হবে কেন?

আজকের এই আধুনিক যুগে এসে আমরা “recycle – recycle” বলে চর্চা করছি। “consumption” কমানোর কথা বলছি – আর এই মহামানব দুশো বছর আগে এসে নিজের জীবন চর্চায় এসব পালন করে গেছেন। এমনই দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ছিলেন আমাদের বিদ্যাসাগর।        

কর্ম্মাটাঁড়ে বিদ্যাসাগর : আমরা সকলেই জানি বিদ্যাসাগর শেষ জীবনে সভ্য সমাজ ও প্রিয় জনদের প্রতি কিছুটা বিরূপ হয়ে কর্ম্মাটাঁড়ে গিয়ে থাকতেন (প্রসঙ্গত একমাত্র পুত্রকে ত্যাজ্য করার ঘটনা পড়তে পারেন এখানে ক্লিক করে )। এই জায়গাটি এখন ঝাড়খন্ডে অবস্থিত ও “বিদ্যাসাগর” নামে পরিচিত। মহামহোপাধ্যায় ডক্টর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৮৭৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লক্ষ্ণৌ যাওয়ার পথে কর্ম্মাটাঁড়ে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বাংলোতে একটা দিন ছিলেন। তাঁর অভিজ্ঞতার কিছু অংশ এখানে শোনা যাক –

“রৌদ্র উঠিতে-না-উঠিতেই একটা সাঁওতাল গোটা পাঁচ-ছয় ভুট্টা লইয়া উপস্থিত হইল। বলিল – ও বিদ্যেসাগর, আমার পাঁচ গণ্ডা পয়সা নইলে আজ ছেলেটার চিকিৎসা হইবে না; তুই আমার এই ভুট্টাকটা নিয়া আমায় পাঁচ গণ্ডা পয়সা দে।  বিদ্যাসাগর মহাশয় তৎক্ষণাৎ পাঁচ আনা পয়সা দিয়া সেই ভুট্টাকটা লইলেন ও নিজের হাতে তাকে তুলিয়া রাখিলেন । তারপর আর একজন সাঁওতাল, —তার বাজরায় অনেক ভুট্টা; সে বলিল — আমার আট গণ্ডা পয়সার দরকার। বিদ্যাসাগর মহাশয় আটগণ্ডা পয়সা দিয়াই তাহার বাজরাটি কিনিয়া লইলেন। আমি বলিলাম – বাঃ, এ ত বড় আশ্চর্য্য! খরিদ্দার দর করে না, দর করে যে বেচে। বিদ্যাসাগর মহাশয় একটু হাসিলেন, তারপর দেখি — যে যত ভুট্টা আনিতেছে, আর যে যত দাম চাহিতেছে, বিদ্যাসাগর মহাশয় সেই দামে সেই ভুট্টাগুলি কিনিতেছেন আর তাকে রাখিতেছেন। আটটার মধ্যে চারিদিকের তাক ভরিয়া গেল, অথচ ভুট্টা কেনার কামাই নাই ৷ আমি জিজ্ঞাসা করিলাম — এত ভুট্টা লইয়া আপনি কি করিবেন ? তিনি বলিলেন— দেখবি রে দেখবি।…

ভুট্টা কেনা চলিতে লাগিল। একটু অন্য কাজে গিয়াছি, আসিয়া দেখি — বিদ্যাসাগর নেই। সব ঘর খুঁজিলাম — নেই, রান্নাঘরে নেই, বাগান সব খুঁজিলাম নেই, শেষে বাগানের পিছন দিকে একটা আগড় আছে — সেটা খোলা; মনে করিলাম, এইখান দিয়া বাহির হইয়া গিয়াছেন; সেইখানে দাঁড়াইয়া রহিলাম । কিছুক্ষণ পরে দেখি, একটা আলপথে বিদ্যাসাগর মহাশয় হন্ হন্ করিয়া আসিতেছেন, দর্ দর্ করিয়া ঘাম পড়িতেছে, হাতে একটা পাথরের বাটি। আমাকে সেখানে দাঁড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন – তুই এখানে কেন? আমি – বলিলাম—আপনাকে খুঁজিতেছি, কোথায় গিয়াছিলেন? তিনি বলিলেন – ওরে খানিকক্ষণ আগে একটা সাঁওতালনী আসিয়াছিল; সে বলিল— বিদ্যেসাগর, আমার ছেলেটার নাক দিয়ে হু হু করে রক্ত পড়ছে, তুই এসে যদি তাকে বাঁচাস্। তাই আমি একটা হোমিওপ্যাথিক ওষুধ এই বাটি ক’রে নিয়ে গিছলাম । আশ্চর্য্য দেখিলাম — এক ডোজ ওষুধে তার রক্ত-পড়া বন্ধ হইয়া গেল ৷ ইহারা ত মেলা ওষুধ খায় না, এদের অল্প ওষুধেই উপকার হয়, কলিকাতার লোকের ওষুধ খেয়ে খেয়ে পেটে চড়া পড়িয়া গিয়াছে, মেলা ওষুধ না দিলে, তাদের উপকার হয় না । আমি জিজ্ঞাসা করিলাম – কতদূর গিয়াছিলেন ? তিনি বলিলেন— ওই যে গাঁ-টা দেখা যাচ্ছে, মাইল-দেড়েক হবে। আমি পূৰ্ব্ব হইতেই জানিতাম বিদ্যাসাগর মহাশয় খুব হাঁটিতে পারিতেন ।

বাংলায় আসিয়া চাহিয়া দেখি, বাংলার সম্মুখের উঠান সাঁওতালে ভরিয়া গিয়াছে—পুরুষ মেয়ে ছেলে বুড়ো – সব রকমের সাঁওতালই আছে । তারা দল বাঁধিয়া বসিয়া আছে, কোনো দলে পাঁচ জন, কোনো দলে আট জন, কোনো দলে দশ জন। প্রত্যেক দলের মাঝখানে কতকগুলা শুকনা পাতা ও কাঠ । বিদ্যাসাগরকে দেখিয়াই তাহারা বলিয়া উঠিল – ও বিদ্যেসাগর, আমাদের খাবার দে। বিদ্যাসাগর ভুট্টা পরিবেশন করিতে বসিলেন। তাহারা সেই শুক্‌না কাঠ ও পাতায় আগুন দেয়, তাহাতে ভুট্টা সেঁকে, আর খায়; ভারী ফুর্ত্তি। আবার চাহিয়া লয় — কেহ দুটা, কেহ তিনটা, কেহ চারটা ভুট্টা খাইয়া ফেলিল। তাকে রাশীকৃত ভুট্টা প্রায় ফুরাইয়া আসিল ! তাহারা উঠিয়া বলিল— খুব খাইয়েছিস্ বিদ্যেসাগর । ক্রমে চলিয়া যাইতে লাগিল । বিদ্যাসাগর রকে দাড়াইয়া দেখিতে লাগিলেন,  আমিও আশ্চৰ্য্য হইয়া দেখিতে লাগিলাম; ভাবিলাম এ রকম বোধ হয় আর দেখিতে পাইব না।”

সারা জীবন সভ্য সমাজের মানুষের ও আত্মীয় পরিজনের উপকারে নিজের জীবন উৎসর্গ করেও তাঁদের থেকে কোনও রকম ভালবাসা ভাললাগা পাননি। তাইই হয়ত মাঝে মাঝে ছুটে যেতেন তথাকথিত “অসভ্য” মানুষদের কাছে – যাদের সহজ সরল জীবন যাপন বিদ্যাসাগরকে সহজেই নিজেদের করে নিয়েছিল, আসলে তিনিও তো ব্যক্তিগতভাবে বেশি কিছু চাননি – তিনি শুধু চেয়েছিলেন সরল সাদাসিধে জীবন যেখানে লোভ, হিংসা, ক্রোধ থাকবে না, থাকবে শুধুই ভালবাসা।  


লেখক : সম্বিত শুক্লা
সম্বিত শুক্লার জন্ম পূর্ব বর্ধমান জেলার মানকর গ্রামে। মানকর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে বিদ্যালয়ের পড়াশোনা করেন ও ন্যাশানাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন। তিনি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় প্রায় দুই দশক ধরে কাজ করছেন। এর পাশাপাশি সববাংলায় এর মুখ্য কার্য নির্বাহক, প্রধান সম্পাদক ও টেকনিক্যাল বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। এছাড়াও লেখালিখি ও বিভিন্ন সামাজিক গঠনমূলক কাজে যুক্ত রয়েছেন।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1.  বিদ্যাসাগর, শ্রীচন্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃতীয় সংস্করণ, ১৯০৯
  2. বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গ, শ্রীব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading