মদনমোহন মালব্য

মদনমোহন মালব্য

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক বিশিষ্ট নেতা এবং কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন মদনমোহন মালব্য (Madan Mohan Malaviya)। ভারতের একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ হিসেবেও তাঁর যথেষ্ট পরিচিতি রয়েছে। চার বার তিনি কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন। বারাণসীতে কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় তথা অধুনা বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন তিনিই। এশিয়ার বৃহত্তম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পেয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি। ১৯১৯ সাল থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে আসীন ছিলেন মদনমোহন মালব্য। মহাত্মা গান্ধী তাঁকে ‘মহামান্য’ উপাধিতে ভূষিত করেছেন। ১৯৩৪ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করে হিন্দু মহাসভার সদস্যপদ গ্রহণ করেন তিনি। ১৯০৯ সালে এলাহাবাদে প্রথম প্রকাশিত ‘দ্য লিডার’ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি, এর পাশাপাশি ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ পত্রিকার চেয়ারম্যান পদেও বেশ কিছুদিন কাজ করেছেন তিনি। ২০১৪ সালে ভারত সরকার মহামান্য মদনমোহন মালব্যকে মরণোত্তর ‘ভারতরত্ন’ সম্মানে ভূষিত করে।  

১৮৬১ সালের ২৫ ডিসেম্বর উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে মদনমোহন মালব্যের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম পণ্ডিত ব্রিজনাথ এবং মায়ের নাম মুনা দেবী। তাঁদের আরও পাঁচটি সন্তান ছিল। মদনমোহনের পূর্বজরা মধ্যপ্রদেশের মালব অঞ্চলের বিখ্যাত সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন। তাই তাঁদের প্রকৃত পদবী ‘চতুর্বেদী’র বদলে তাঁরা ‘মালব্য’ পদবিতেই পরিচিত হন। তাঁর বাবা ব্রিজনাথ নিজেও একজন সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন যিনি নিয়মিত ভাগবত পুরাণ পাঠ করতেন।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পণ্ডিত হরদেবের ধর্ম জ্ঞানোপদেশ সংস্কৃত পাঠশালায় ভর্তি হন মদনমোহন মালব্য এবং পরে সেখান থেকে বিদ্যাবর্ধিনী সভার একটি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ শেষ করে এলাহাবাদ জেলা স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন মদনমোহন। এই সময় থেকেই ‘মকরন্দ’ ছদ্মনামে কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন তিনি আর তাঁর লেখাগুলি প্রকাশ পেতো বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। ১৮৭৯ সালে মুয়ার সেন্ট্রাল কলেজ তথা অধুনা এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন মদনমোহন এবং তারপরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক উত্তীর্ণ হন তিনি। তাঁর পারিবারিক অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে এই সময় তিনি একটি মাসিক বৃত্তি পেতেন হ্যারিসন কলেজের অধ্যক্ষের পক্ষ থেকে। পরিবারের এই অর্থসঙ্কটের জন্য সংস্কৃত বিষয়ে স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশোনা করা সম্পূর্ণ হয় নি তাঁর।

১৮৮৪ সালে মদনমোহন মালব্য এলাহাবাদের গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে শিক্ষকতা করতে শুরু করেন। তাঁর বাবা চাইতেন পারিবারিক রীতি মেনে তিনিও ভাগবত পুরাণ পাঠের কাজেই যোগ দেবেন। ১৮৮৭ সালের জুলাই মাসে শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিয়ে রামপাল সিং-এর ‘দ্য হিন্দুস্তান’ নামের একটি জাতীয়তাবাদী সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কাজে যোগ দেন মদনমোহন । আড়াই বছর সেখানে কাজ করার পরে আইন পড়তে শুরু করেন তিনি এবং আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন সম্পূর্ণ হলে ১৮৯১ সালে এলাহাবাদ জেলা আদালতে একজন আইনজীবি হিসেবে কাজ করতে থাকেন তিনি। পরে ১৮৯৩ সালে এলাহাবাদ উচ্চ আদালতে পদোন্নতি ঘটে তাঁর। এছাড়াও এলাহাবাদ থেকে প্রকাশিত ‘দি ইণ্ডিয়ান ওপিনিয়ন’ নামে একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার সহ-সম্পাদনার কাজও করেছেন তিনি। ১৮৮৬ সালের ডিসেম্বর মাসে মদনমোহন মালব্য কলকাতায় দাদাভাই নওরোজির সভাপতিত্বে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন যেখানে তিনি ভারতীয়দের প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেন। ১৯০৯, ১৯১৩, ১৯১৯ ও ১৯৩২ সালে পরপর চারবার মদনমোহন মালব্য ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। একজন নরমপন্থী নেতা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন তিনি। ১৯১৬ সালে লক্ষ্ণৌ চুক্তি অনুসারে মুসলমানদের জন্য পৃথক আইনসভার প্রস্তাব উঠলে তার সোচ্চারে বিরোধিতা করেছিলেন মদনমোহন মালব্য।

১৯১১ সালে শিক্ষাবিস্তার ও সমাজসেবার জন্য আইনজীবির পেশা চিরকালের জন্য ত্যাগ করেন মদনমোহন মালব্য। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন চৌরিচৌরার ঘটনায় ১৭৭ জন স্বাধীনতা সংগ্রামীর ফাঁসির নির্দেশ হলে তিনি আদালতে তাঁদের হয়ে সওয়াল করে তাঁদের মুক্তির ব্যবস্থা করেন। ১৯১২ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের ইম্পিরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। ১৯২৮ সালে মতিলাল নেহরু, জওহরলাল নেহরু এবং অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে সাইমন কমিশনের তীব্র বিরোধিতা করেন মদনমোহন মালব্য। ১৯৩০ সালে তিনিই প্রথম গোলটেবিল বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৩২ সালের ২৫ মে আইন অমান্য আন্দোলন চলার সময় অন্যান্য ৪৫০ জন কংগ্রেস কর্মীর সঙ্গে তাঁকেও গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ পুলিশ। ভারতের স্বাধীনতার আগে মদনমোহন মালব্যই একমাত্র নেতা যিনি চার বার কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৩২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ড. ভীমরাও রামজী আম্বেদকর এবং মদনমোহন মালব্যের মধ্যে স্বাক্ষরিত পুনা চুক্তিতে স্থির হয় যে প্রাদেশিক আইনসভাগুলিতে হিন্দুদের অনগ্রসর শ্রেণিগুলির জন্য আসন সংরক্ষিত থাকবে এবং তার জন্য পৃথক আইনসভা গঠিত হবে না। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র‍্যামসে ম্যাকডোনাল্ড  সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারার মাধ্যমে অনগ্রসর শ্রেণিগুলিকে ৭১টি আসন দিয়েছিলেন, তার বদলে এই শ্রেণিগুলি আইনসভায় ১৪৮টি আসন পায়।

সাংবাদিক হিসেবে বহু পত্র-পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। প্রথমে হিন্দি দৈনিক ‘দ্য হিন্দুস্তান’-এ রামপাল সিং-এর অনুরোধে কাজ শুরু করেন তিনি, পরে যুক্ত হন ‘দি ইণ্ডিয়ান ওপিনিয়ান’ পত্রিকার সঙ্গে। পরবর্তীকালে নিজের সম্পাদনায় মদনমোহন মালব্য প্রকাশ করতে শুরু করেন ‘অভ্যুদয়’ নামে একটি নতুন পত্রিকা। ১৯০৭ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত এই হিন্দি দৈনিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন তিনি। পত্র-পত্রিকার পাতায় ‘মকরন্দ’ ছদ্মনামে লেখালিখি করতেন তিনি। এই ছদ্মনামে তাঁর লেখা শায়েরগুলি ‘হরিশ্চন্দ্র চন্দ্রিকা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তাছাড়া হিন্দি ভাষায় ‘প্রদীপ’ পত্রিকাতেও তাঁর বেশ কিছু লেখা ছাপা হয়েছিল। ১৯১০ সালে নিজের সম্পাদনায় তিনি আরেকটি পত্রিকা প্রকাশ করেন ‘মর্যাদা’ নামে। মদনমোহন মালব্য যে ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ পত্রিকার চেয়ারম্যান ছিলেন সেই পত্রিকাকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে বিশিষ্ট শিল্পপতি ঘনশ্যামদাস বিড়লা সেকালে পঞ্চাশ হাজার টাকা দান করেছিলেন। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁরই সম্পাদনায় ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘সনাতন ধর্ম’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা। এখানে মনে রাখতে হবে, মুখ্যত অ্যানি বেসান্ত এবং মদনমোহন মালব্যের যৌথ উদ্যোগেই ১৯১৬ সালে বারাণসীতে গড়ে ওঠে কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় যা পরে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত হয়। অ্যানি বেসান্ত যে সেন্ট্রাল হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার সদস্যরা সকলেই সর্বসম্মতিক্রমে এই কলেজকে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ১৯১৯ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে আসীন ছিলেন মদনমোহন মালব্য।

১৯৩৩ সালে তাঁরই সভাপতিত্বে গড়ে ওঠে ‘হরিজন সেবক সংঘ’। সেই সময় অস্পৃশ্য নিম্নবর্ণের মানুষদের মন্দিরে প্রবেশে নানা বাধা ছিল। সমস্ত সামাজিক বাধা নিষেধ উপেক্ষা করে দলিত, অস্পৃশ্যদের উন্নতিকল্পে কাজ করেছেন মদনমোহন মালব্য। এর ফলে শ্রীগৌড় ব্রাহ্মণদের দ্বারা বহিষ্কৃতও হয়েছিলেন তিনি। রথযাত্রার দিন তাঁর নেতৃত্বে কলারাম মন্দিরে হিন্দু দলিতরা প্রবেশ করেন প্রথম এবং সেই দিনই গোদাবরী নদীতে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে স্নান সম্পন্ন করেন তাঁরা। ভারতীয়দের জন্য প্রথম স্কাউটিং-এর ব্যবস্থা চালু করেছিলেন মদনমোহন মালব্য এবং তিনিই ছিলেন এর মুখ্য স্কাউট। ১৯১৩ সালে এই উদ্দেশ্যে তিনি গড়ে তোলেন ‘সারা ভারত সেবা সমিতি’।

তাঁর হাত ধরেই হরিদ্বারের পবিত্র গঙ্গারতি শুরু হয় এবং সেই গঙ্গার ঘাটের কাছে একটি দ্বীপও তাঁর নামেই নামাঙ্কিত ‘মালব্য দ্বীপ’ নামে। জব্বলপুর শহরের একটি স্থানের নাম তাঁর নামেই নামাঙ্কিত হয়েছে মালব্য চক হিসেবে। তাঁর নামেই জয়পুরে গড়ে উঠেছে মালব্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি। ১৯৬১ সালে মদনমোহন মালব্যের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ভারতের ডাক বিভাগ একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে। এই বছরই বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথের সামনে মদনমোহন মালব্যের একটি পূর্ণাবয়ব মূর্তি উন্মোচন করেন ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান

১৯৪৬ সালের ১২ নভেম্বর মদনমোহন মালব্যের মৃত্যু হয়। ২০১৪ সালে ভারত সরকার তাঁকে মরণোত্তর ‘ভারতরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করে।

আপনার মতামত জানান