সববাংলায়

মহাবীরাচার্য

গণিতশাস্ত্রে প্রাচীন ভারতের অবদান অনস্বীকার্য। কিংবদন্তি সব গণিতবিদদের একনিষ্ঠ সাধনা ও মেধা গণিতশাস্ত্রকে সমৃদ্ধ করেছে এবং দ্রুত অগ্রসর হতেও সাহায্য করেছে। সেই গণিতবিদদের তালিকায় অবশ্যই স্থান করে নেবেন নবম শতাব্দীর একজন জৈন গণিতজ্ঞ মহাবীরাচার্য (Mahaviracharya)। অবশ্য তিনি মহাবীর নামেও পরিচিত। বলা হয় তিনিই প্রথম গণিতবিদ যিনি গণিতকে জ্যোতির্বিদ্যা থেকে আলাদা করে নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে তার চর্চা করেছিলেন। আধুনিক বীজগণিতে আমরা যেসব পরিভাষা বা সমস্যা সমাধানের জন্য যেসব পদ্ধতির ব্যবহার করে থাকি তার অনেকগুলির নেপথ্যেই ছিলেন এই মহাবীরাচার্য। গণিতের উপর লিখিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থটি হল ‘গণিত-সার-সংগ্রহ’। গণিত বিষয়ে এক হাজারটিরও বেশি শ্লোক রচনা করেছিলেন তিনি। সমগ্র দক্ষিণ ভারতে এক সময় তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল।

মহাবীরাচার্য ছিলেন নবম শতাব্দীর মানুষ এবং ঐতিহাসিকেরা মনে করেন ৮০০ সালের কাছাকাছি কোনও সময়ে তাঁর জন্ম। কেউ আবার নির্দিষ্ট করে বলে থাকেন ৮১৫ সালে মহাবীরাচার্যের জন্ম হয়। যদিও তাঁর জন্মস্থান নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ গবেষকই মনে করেন তিনি দক্ষিণ ভারতের মহীশূরের কাছে জন্মেছিলেন। কেউ আবার নির্দিষ্টভাবে কর্ণাটকের গুলবর্গা শহরকে তাঁর জন্মস্থান বলেছেন। মনে করা হয়, জৈন ধর্মসংস্কারক মহাবীরের প্রতি সম্মান জানিয়ে  তাঁর নামই গ্রহণ করেছিলেন তিনি। মহাবীরাচার্যের ব্যক্তিগত জীবন বিষয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ তথ্য পাওয়া যায় না। কেবল একটি বিষয়ে জানা যায় যে, এই মহাবীরাচার্য রাষ্ট্রকূট বংশের রাজা অমোঘবর্ষের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। এই অমোঘবর্ষ তাঁর জীবনের শেষভাগে একজন জৈন সন্ন্যাসী হয়েছিলেন। তাঁর রাজধানী ছিল আধুনিক কর্ণাটকের মান্যখেতায়।

মহাবীরাচার্যের পূর্বজ গণিতবিদেরা কেবলমাত্র গণিত নিয়েই কিন্তু আলোচনা করেননি তাঁদের গণিতচর্চা জ্যোতির্বিদ্যার সঙ্গেও সংযুক্ত ছিল। এটি তাঁদের রচিত গ্রন্থগুলির দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মহাবীরাচার্যই হলেন প্রথম ভারতীয় গণিতবিদ যিনি গণিতচর্চার ক্ষেত্র থেকে জ্যোতির্বিদ্যাকে সরিয়ে দিয়েছিলেন এবং কেবলমাত্র গণিত নিয়েই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন।

মহাবীরাচার্যের লেখা গণিত গ্রন্থটির নাম ‘গণিত-সার-সংগ্রহ’। এই বইতে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ কিংবা ধর্মীয় জীবনে এবং রান্না থেকে শুরু করে ভালবাসা পর্যন্ত সমস্ত বিষয়েই গণিতের গুরুত্বের ওপর ভীষণ জোর দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, কামশাস্ত্র, অর্থশাস্ত্র, গান্ধর্ব শাস্ত্র ইত্যাদি সবেতেই গণিত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর্যভট্ট এবং ব্রহ্মগুপ্ত যে বিষয় নিয়ে তর্ক করেছিলেন, মহাবীরাচার্যও সেই বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলেন এবং সেগুলি আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর গ্রন্থে বীজগাণিতিক সমস্যার সমাধানের জন্য উপযুক্ত কৌশলগুলির বিকাশের উপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছিলেন তিনি। মোট যে নয়টি অধ্যায়ে এই গ্রন্থটি বিভক্ত সেগুলি হল: সংজ্ঞাধিকার, পরিক্রমাব্যবহার, কালস্বর্ণব্যবহার, প্রকীর্ণকব্যবহার, ত্রৈরাশিক, মিশ্রব্যবহার, ক্ষেত্রগণিত ব্যবহার, খাতব্যবহার এবং ছায়াব্যবহার। তাঁর এই গ্রন্থ দক্ষিণ ভারতের অন্যান্য গণিতবিদের কাছে অনুপ্রেরণাদায়ক ছিল। পাভুলুরি মাল্লানা তেলেগু ভাষায় এই বইয়ের যে অনুবাদ করেছিলেন, তার নাম ‘সার-সংগ্রহ-গণিতামু’। এই ‘গণিত-সার-সংগ্রহ’ সংকলনটিতে ২৪ ডিজিট পর্যন্ত সংখ্যার বর্ণনা রয়েছে। বইটি ১১৩০টিরও বেশি যাচাইকৃত নিয়ম ও উদাহরণ নিয়ে গঠিত।

এখন গণিতে মহাবীরাচার্যের অবদান সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। প্রথমত, ভারতীয় গণিতবিদদের মধ্যে তাঁকে অত্যন্ত সম্মান দেওয়া হয়, তার কারণ, তিনি সমবাহু ও সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ, রম্বস, বৃত্ত ও অর্ধবৃত্ত, এইসব ধারণাগুলির জন্য পরিভাষা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

তিনি উপবৃত্তের ক্ষেত্রফল ও পরিধির মান নির্ণয়ের সূত্র আবিষ্কার করেন যা প্রকৃত মানের খুব কাছাকাছি।  এখানে উল্লেখ্য যে উপবৃত্তের ক্ষেত্রফল ও পরিধি নিয়ে মহাবীরাচার্যের পূর্বে কোনো গণিতবিদ আলোচনা করেননি। এছাড়াও একটি সংখ্যার বর্গ ও ঘনমূল নির্ণয় করার উপায়ও বের করেছিলেন। তিনি  নিশ্চিত করে  জানিয়েছিলেন যে, একটি ঋণাত্মক সংখ্যার বর্গমূলের অস্তিত্ব নেই।

ভগ্নাংশ নিয়ে মহাবীরাচার্য তাঁর গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছিলেন। তিনি ছয় ধরনের ভগ্নাংশ গণনা করেছিলেন এবং একক ভগ্নাংশের ব্যবহার মহাবীরাচার্যের অনন্য অবদানগুলির মধ্যে একটি। তাঁর গ্রন্থে একটি ভগ্নাংশকে একক ভগ্নাংশের যোগফল হিসেবে প্রকাশ করার জন্য পদ্ধতিগত নিয়ম বলে দেওয়া আছে। এই নিয়ম আসলে বৈদিক যুগে ভারতীয় গণিতে একক ভগ্নাংশের ব্যবহারকে অনুসরণ করে গঠিত।

মহাবীরাচার্য তাঁর গ্রন্থে বর্গ এবং বৃত্তকে সমান ক্ষেত্রফলের বর্গ ও বৃত্তে রূপান্তরিত করবার পদ্ধতিও বাতলে দিয়েছিলেন।

আদিত্য এবং তাঁর পূর্বসূরি ব্রহ্মগুপ্ত চক্রীয় চতুর্ভুজের বৈশিষ্ট্যের উপর আলোকপাত করেছিলেন। এর পরে, মহাবীরাচার্য চক্রীয় চতুর্ভুজের বাহুর দৈর্ঘ্য এবং কর্ণ বের করার জন্য সমীকরণ দিয়েছিলেন। তিনি বিন্যাস ও সমবায় (Permutation and Combination) সংখ্যার জন্য সাধারণ সূত্র প্রদান করেছিলেন। এছাড়াও তিনি মূল পরিমাণ, সুদ, চক্রবৃদ্ধি পরিমাণ ইত্যাদি নিয়েও তাঁর গ্রন্থে প্রয়োজনীয় আলোচনা করেছিলেন।

এই মহান ভারতীয় গণিতবিদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে যেমন কম জানা যায় তেমনি তাঁর মৃত্যুসাল নিয়েও সংশয়ের অবকাশ রয়েছে। তবে অধিকাংশ গবেষকই মনে করে থাকেন যে, আনুমানিক ৮৭০ সাল পর্যন্তই ছিল তাঁর সময়কাল, অতএব সেই বছরেই সম্ভবত মহাবীরাচার্যের মৃত্যু হয়েছিল।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading