ইতিহাস

মনমোহন সিং

মনমোহন সিং (Manmohan Singh) একজন ভারতীয় জগদ্বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং রাজনীতিবিদ যিনি স্বাধীন ভারতের  ১৪তম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন৷  মনমোহন সিং ভারতের প্রথম শিখ ধর্মাবলম্বী প্রধানমন্ত্রী এবং জওহরলাল নেহেরুর পর দেশের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি পরপর দুবার দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেছেন এবং মেয়াদ পূর্ণ করেছেন। তাঁর সবথেকে বড় কৃতিত্ব, তিনি অর্থনৈতিক মন্দার কবল থেকে দেশকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন৷

১৯৩২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পাঞ্জাবের গাহ (বর্তমান পাকিস্তানের চকওয়াল জেলা) জেলায় মনমোহন সিংয়ের জন্ম হয়৷ তাঁর বাবার নাম শ্রী গুরমুখ সিং এবং মায়ের নাম শ্রীমতী অমৃত কৌর। তিনি খুব অল্প বয়সে তাঁর মাকে হারান এবং  ঠাকুমার কাছে থেকেই তিনি বড় হয়ে ওঠেন৷

মনমোহন সিং ভারত ভাগের পরে তাঁর পরিবারের সাথে ভারতের অমৃতসরে চলে আসেন এবং এখানকার হিন্দু কলেজে পড়াশোনা করেন। এরপর ১৯৪৮ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন এবং এখান থেকেই তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে৷  তাঁর  শিক্ষা জীবন ছিল অত্যন্ত উজ্বল। তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৭ সালে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে সম্মানিক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯৬২ সালে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যুফিল্ড কলেজ থেকে ডি.ফিল ডিগ্রি সম্পন্ন করেন৷ তাঁর গবেষণা পত্রের বিষয় ছিল ১৯৫১-১৯৬০ এই সময়কালে রপ্তানি বানিজ্যে ভারতের ভূমিকা, রপ্তানি বানিজ্যের ভবিষ্যত ও নীতির বৈশিষ্ট্য। তাঁর এই গবেষণা পত্রের ভিত্তিতেই তিনি “ইন্ডিয়াস এক্সপোর্ট ট্রেন্ডস আ্যন্ড প্রসপেক্টস ফর সেল্ফ-সাস্টেন্ড গ্রোথ” নামে একটি বই তিনি রচনা করেছিলেন৷

ডি.ফিল শেষ করার পর তিনি ভারতবর্ষে ফিরে আসেন। মনমোহন সিংয়ের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৫৭ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের  অর্থনীতির লেকচারার হিসেবে৷ ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত তিনি লেকচারারের পদে ছিলেন৷ এর পর ১৯৫৯ ও ১৯৬৩ সালে তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে রিডার ছিলেন৷ ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন । ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সম্মেলনের সঙ্গে যুক্ত হন৷ এরপর অর্থনীতিবিদ হিসাবে বিদেশ বাণিজ্য মন্ত্রকের উপদেষ্টা নিযুক্ত হন তিনি৷ ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিল্লি স্কুল অফ ইকোনমিক্সের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭২ সাল থেকে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হন৷ ১৯৭৬ সালে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিবের পদে যুক্ত ছিলেন৷ তারপরই ১৯৮০ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি পরিকল্পনা কমিশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। তিনি ১৯৮২ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়ের অধীনে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর নিযুক্ত হন এবং ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত এই পদে ছিলেন। মনমোহন ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত ভারতের পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হন। পরিকল্পনা কমিশনে তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি তিনি দক্ষিণ কমিশনের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত হন ৷

১৯৯০ সালে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংয়ের অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা হন৷  ১৯৯১ সালের মার্চ মাসে তিনি ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশনের চেয়ারম্যান হন৷ ১৯৯১ সালের জুন মাসে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি ভি ভি নরসিমা রাও মনমোহন সিংকে তাঁর অর্থমন্ত্রী হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন।

১৯৯১ সালে ভারতবর্ষ  মারাত্মকভাবে অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছিল। সেই সময় মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী হিসাবে বেশ কয়েকটি কাঠামোগত সংস্কার করেছিলেন যা ভারতের অর্থনীতি স্বাভাবিক  করে তুলেতে সাহায্য করেছিল। ১৯৯১ সালে  মনমোহন সিং আসাম রাজ্যের আইনসভা দ্বারা প্রথমে  রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।  এরপর  ১৯৯৫, ২০০১, ২০০৭ এবং ২০১৩ সালে তিনি পুনরায় নির্বাচিত হন। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতায় থাকাকালীন সিং রাজ্যসভায় বিরোধী দলের নেতা ছিলেন। ১৯৯৯ সালে, তিনি দক্ষিণ দিল্লি থেকে লোকসভায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তবে আসনটি জিততে পারেননি। ২০০৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেস লোকসভায় সর্বাধিক সংখ্যক আসন পায়৷ সোনিয়া গান্ধী মনমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থী প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করেন। মনমোহন সিং লোকসভার কোনও আসন জিততে পারেননি।  চোদ্দতম লোকসভা নির্বাচন অর্থাৎ ২০০৪ সালের ২২ মে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন। জওহরলাল নেহেরুর পর তিনিই প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি পাঁচবছর পদে অধিষ্ঠিত থাকার পরও দ্বিতীয় বার পাঁচবছরের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৬ তম লোকসভা নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহন করেননি। মনমোহন সিংয়ের জন ভাবমূর্তি খুব উজ্জ্বল৷ তিনি জনপ্রতিনিধি হিসেবে যথেষ্ট খ্যাতি পেয়েছিলেন৷ ২০১০ সালের ফোর্বস ম্যাগাজিন অনুসারে বিশ্বের শক্তিশালী ব্যক্তিদের তালিকায় মনমোহন সিংহ ১৮ তম স্থানে রয়েছেন। এই ম্যাগাজিন অনুসারে তিনি নেহেরুর সময় থেকে হওয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে সারা বিশ্বে সর্বাধিক প্রসংশিত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী৷

২০০৫ সালে প্রধানমন্ত্রী সিং এবং তাঁর সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রক জাতীয় গ্রামীণ স্বাস্থ্য মিশন (এনএইচআরএম) শুরু করেন৷ ২০০৯-সালের ২ জুলাই মনমোহন  সিং ও তাঁর মন্ত্রীসভা শিক্ষার অধিকার আইন চালু করেন। অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার, গুজরাট, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান এবং হিমাচল প্রদেশে আই আই টি (IIT)  খোলা হয়েছিল তাঁর আমলেই৷ তাঁর সরকার সর্বশিক্ষা অভিযান কর্মসূচিও চালু রেখেছিল। নিরক্ষরতার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সম্পূর্ণ ভারতে, বিশেষত গ্রামীণ অঞ্চলে স্কুল উদ্বোধন করা এবং মধ্যাহ্নভোজ (Mid Day Meal) করানোর মতন পরিকল্পনা এই কর্মসূচির অঙ্গ ছিল৷ ২০০৫ সালে জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি আইন (National Rural Employment Guarantee Act (NREGA ) এবং তথ্য অধিকার আইন তাঁর মেয়াদকালে সংসদে পাস হয়। সেই সময়েই বিধবা, গর্ভবতী মহিলা এবং ভূমিহীন ব্যক্তিদের জন্য টাকা পয়সা সম্পর্কীত কিছু সুবিধা চালু করা হয়েছিল। মনমোহন সিং তাঁর মন্ত্রীত্বকালে ব্যবহারিক বৈদেশিক নীতি অব্যাহত রেখেছিলেন৷ 

মনমোহন সিং প্রচুর উপাধি ও সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন৷ ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘ডক্টর অফ লেটারস’ উপাধি প্রদান করে এবং ২০০৯ সালে ওই বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগে ডঃ মনমোহন সিংহ চেয়ার গঠন করেন। ১৯৯৭ সালে আলবার্টা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অফ ল’ ডিগ্রি প্রদান করে। ২০০৫ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে একটি সম্মানসূচক ডক্টর অফ সিভিল ল ডিগ্রি প্রদান করেন এবং ২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে  কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় একই সম্মানের সাথে তাঁকে ভূষিত করে৷ এরপর সেন্ট জনস কলেজ তাদের পিএইচডি বৃত্তি চালু করে মনমোহন সিংয়ের সম্মানার্থে এবং সেই বৃত্তির নামকরণ করে ডঃ মনমোহন সিং স্কলারশিপ এর নামে ৷

২০০৮ সালে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় মনমোহন সিংকে সম্মানসূচক ডক্টর অফ লেটার্স ডিগ্রি প্রদান করে৷ পরের বছরই তাঁকে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হয়। ২০১০ সালে, তিনি কিং সৌদ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। আবার ২০১৩ সালে তিনি মস্কো স্টেট ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন ইনস্টিটিউট কর্তৃক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেছেন। ২০১৭ সালে শান্তি, নিরস্ত্রীকরণ এবং বিকাশের জন্য ইন্দিরা গান্ধী পুরষ্কার দেওয়া হয় মনমোহন সিংকে।

মনমোহন সিং বহু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ১৯৯৩ সালে তিনি সাইপ্রাসে কমনওয়েলথের সরকার সভায় এবং সেই বছরেই ভিয়েনায় মানবাধিকার বিষয়ক বিশ্ব সম্মেলনে ভারতীয় প্রতিনিধিদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।