সববাংলায়

মার্গো সাবান ও খগেন্দ্রচন্দ্র দাস

বিভাগঃ ,

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আজও আমরা এমন কিছু জনপ্রিয় পণ্য প্রায়শই ব্যবহার করে থাকি, যেগুলির সঙ্গে ১০০ বছরেরও বেশি পুরোনো, প্রাক্-স্বাধীনতা যুগের ইতিহাস এবং বাঙালির কৃতিত্বের নিশান জড়িয়ে রয়েছে। ব্যবসাতে বাঙালির বদনাম আজ বাজারে প্রচলিত কিন্তু জনপ্রিয় এইসব পণ্যের উদ্ভব ও বিকাশের দিকে একবার ফিরে তাকালে বোঝা যায় এক সময়ে বাঙালিই ব্যবসাতে এই দেশকে পথ দেখিয়েছিল। তেমনই একটি ঐতিহাসিক পণ্য হল মার্গো সাবান (Margo Soap), যার সঙ্গে স্বদেশী আন্দোলনের ইতিহাস তো জড়িয়ে আছেই, সংলগ্ন হয়ে আছে এক বাঙালি খগেন্দ্রচন্দ্র দাসেরও (Khagendra Chandra Das) নাম। বিলেত ফেরত এই রসায়নবিদ বহুজাতিক সংস্থার চাকরিকে প্রত্যাখ্যান করে ভারতে এসে তৈরি করেছিলেন ক্যালকাটা কেমিক্যাল কোম্পানি। ব্রিটিশ শাসনাধীন এই দেশকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করবার মন্ত্র যাঁরা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, খগেন্দ্রচন্দ্র দাস তাঁদেরই একজন।

মার্গো নিম সাবানের উপকারিতায় আজও মানুষের সমান বিশ্বাস। নিমগাছ থেকে উপাদান সংগ্রহ করে উৎপাদিত ভেষজ গুণসম্পন্ন এই সাবান শুষ্ক ত্বককে কোমল রাখতে সাহায্য করে, ত্বকের চুলকানি ও লালভাব দূর করে এমনকি ত্বকের ওপর বাহ্যিক সংক্রমণের কারণে তৈরি হওয়া সমস্যা নিরাময়তেও মার্গো সাবানের জুড়ি মেলা ভার। এতদিন ধরে মানুষের ভরসা ও বিশ্বাসকে আঘাত করে মার্গো কখনই তার মান পড়তে দেয়নি। মানুষ পুরাতন ভালো জিনিসের ওপর চিরকালই ভরসা রেখে এসেছে। মার্গো সাবানের পথচলাও ১০০ বছরের বেশি হয়ে গেল। এই সাবান তৈরির নেপথ্য ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যাবে কেবলমাত্র লাভক্ষতির একটি ব্যবসামাত্র এটি ছিল না, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল স্বদেশী আন্দোলনের উত্তেজনা, ব্রিটিশ বিরোধিতা এবং ব্রিটিশ-অধীনস্থ এই দেশকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথের দিশা দেখানোর প্রয়াস।

মার্গো সাবানের জন্মেরও আগে তার প্রধান কারিগর খগেন্দ্রচন্দ্র দাসের জীবনের দিকে তাকাতে হবে, তবেই এই সাবানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাসটিকে স্পষ্ট করে বুঝতে পারা যাবে।

বাংলার এক ধনী, সম্ভ্রান্ত বৈদ্য পরিবারে খগেন্দ্রচন্দ্র দাসের জন্ম হয়েছিল। তাঁর পিতা রায়বাহাদুর তারকচন্দ্র দাস ছিলেন একজন বিচারক এবং মা মোহিনী দেবী ছিলেন একজন কট্টর গান্ধীবাদী ও সক্রিয় স্বাধীনতা কর্মী। অতএব বাড়িতেই স্বদেশী আন্দোলনের হাওয়ায় বড় হয়ে উঠেছিলেন খগেন্দ্রচন্দ্র।

কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পড়াশুনা শেষ করবার পরে তিনি শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমানে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি) লেকচারার হিসেবে যোগদান করেছিলেন। এসময়, লর্ড কার্জনের নেতৃত্বে বঙ্গভঙ্গ সংঘটিত হয়। ফলত চারদিকে ব্রিটিশ বিরোধিতা দানা বেঁধে উঠছিল। বিদেশি পণ্য বয়কট করার ধুম পড়ে গিয়েছিল এবং দেশীয় পণ্য ব্যবহার করাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য। এই সমস্ত বিপ্লবী চিন্তা ও ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন খগেন্দ্রচন্দ্র। তিনি সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, বাল গঙ্গাধর তিলক প্রমুখের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ফলস্বরূপ ভারত সরকারের ঘনিষ্ঠ কর্মচারী তাঁর বাবা তারকচন্দ্রকে জানানো হয় এই সমস্ত কার্যকলাপে অংশ নিলে এবং এর প্রতিরোধ না করলে খগেন্দ্রচন্দ্রকে গ্রেপ্তার করা হবে। সেই সময় খগেন্দ্রচন্দ্রের বাবা তাঁকে বিদেশে পড়তে যেতে উৎসাহ দেন এবং ব্রিটিশদের প্রতি রাগ থেকেই ব্রিটেন নয়, খগেন্দ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

ইন্ডিয়ান সোসাইটি ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অফ সায়েন্টিফিক ইন্ডাস্ট্রি থেকে বৃত্তি নিয়ে খগেন্দ্রচন্দ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রওনা দেন এবং সেখানে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়াতে প্রবেশ করেন। তবে খগেন্দ্রচন্দ্র এবং সুরেন্দ্রমোহন বসু, যিনি পরবর্তীকালে ডাকব্যাক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, দুজনকেই ১৯০৭ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। ১৯১০ সালে সেখান থেকে দুজনেই রসায়নে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তাঁরা স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে বি.এসসি ডিগ্রি নিয়ে স্নাতক হওয়া প্রথম ভারতীয় ছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও কিন্তু স্বাধীনতার কাজে সক্রিয় ছিলেন খগেন্দ্রচন্দ্র। এছাড়াও লালা হরদয়ালের সঙ্গে খগেন্দ্রচন্দ্র ঘনিষ্ঠভাবে দেশের কাজ করেছিলেন। ভারতে ফেরার আগে জাপানে গিয়ে ভবিষ্যত ব্যবসার পরিকল্পনাগুলি বাস্তবায়নের জন্য একটি কোর্স করেন। আসলে খগেন্দ্রচন্দ্র চেয়েছিলেন একটি ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবসা করতে কারণ এই শিল্পটিই ব্রিটিশদের দ্বারা কোনঠাসা হয়ে ছিল। এরকম রাসায়নিক একটি কোম্পানি স্থাপনের জন্য আরও যে জ্ঞান প্রয়োজন তা বুঝতে পেরেই জাপান থেকে সেই বিষয়ক একটি কোর্স করেছিলেন তিনি। খগেন্দ্রচন্দ্র বিলেত ফেরত হলেও মনেপ্রাণে এতখানিই স্বদেশী ছিলেন যে, আমেরিকা ও জাপান থেকে ফিরে আসার পর খাদির পোশাক ছাড়া অন্য কোনরকম পোশাক তিনি ব্যবহার করতেন না। যাঁরাই নিজেদের উদ্যোগে কোন ব্যবসা শুরু করতে চাইত খগেন্দ্রচন্দ্র তাদের সবসময়ই প্রচন্ড উৎসাহ দিতেন। এমনকি এও শোনা যায়, যারা চাকরি করতে চাইত তাদেরকে চাকরি খোঁজা বন্ধ করে নিজের উদ্যোগে কোনও ব্যবসা শুরু করায় উৎসাহিত করতেন তিনি৷ ব্যবসা শুরু করার জন্য অনেককেই তিনি অর্থ দিয়েছিলেন এবং সেই অর্থ কখনও ফেরতও চাননি। তাঁর এমন আচরণ থেকেই বুঝতে পারা যায় দেশকে তিনি আর্থিক স্বাধীনতার, নিজস্ব শিল্পের ভিত্তি তৈরির পথ দেখাতে চেয়েছিলেন।

১৯১৬ সালে খগেন্দ্রচন্দ্র আর.এন সেন এবং বি.এন মৈত্রের সঙ্গে একজোটে ক্যালকাটা কেমিক্যাল কোম্পানি স্থাপন করেছিলেন। ব্রিটিশ অধীনস্থ ভারতবর্ষে এক বাঙালির উদ্যোগে তৈরি এই ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিটি দেশকে নতুন পথের দিশা দেখিয়েছিল। ৩৫, পন্ডিতিয়া রোডে এই কোম্পানির অফিস ছিল এবং তিলজলায় ছিল একটি অতিরিক্ত কারখানা। প্রাথমিকভাবে মূলত টয়লেট পণ্যের কারণে কোম্পানিটি অত্যন্ত সফলতা পেয়েছিল। এরপর খগেন্দ্রচন্দ্র আয়ুর্বেদ নিয়ে নাড়াঘাঁটা করেন এবং নিমগাছ থেকে নির্যাস বের করার নিখুঁত পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে, নিমের সেই উপাদান থেকে ১৯২০ সালে যে দুটি পণ্য নির্মাণ করলেন সেগুলি হল, নিম মার্গো সাবান এবং নিম টুথপেষ্ট। নিম যেহেতু মারগোসা নামেও পরিচিত তাই সাবানটির নাম রেখেছিলেন মার্গো সাবান। নিমকে পণ্য তৈরির জন্য বিশেষভাবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন কারণ তিনি মনে করেছিলেন নিম প্রকটভাবেই ভারতীয়ত্বের প্রতীক। তাঁর জাতীয়তাবাদী চেতনা এই নিম মার্গো সাবান নির্মাণের পশ্চাতে কতখানি সক্রিয় ছিল তা স্পষ্টতই বুঝতে পারা যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৪০-এর দশকে খগেন্দ্রচন্দ্র দাসের মার্গো সাবানের বিজ্ঞাপনটি এঁকে দিয়েছিলেন স্বনামধন্য চিত্রপরিচালক, সাহিত্যিক ও চিত্রশিল্পী সত্যজিৎ রায়

মার্গো সাবানের এমনই মূল্য তিনি ধার্য করেছিলেন যাতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ খুব সহজেই স্বদেশী এই সাবান ক্রয় করতে পারে। এছাড়াও ল্যাভেন্ডার ডিউ পাউডার-সহ আরও বেশ কয়েকটি পণ্য তাঁর কোম্পানি তৈরি করেছিল।

খগেন্দ্রচন্দ্রের কোম্পানি এবং তার পণ্য এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পণ্য বিতরণের সূচনা করতে সক্ষম হন তাঁরা। এমনকি সিঙ্গাপুরেও পণ্য বিতরণের জন্য একটি বিরাট ডিস্ট্রিবিউশন চেইন গড়ে তোলেন। দেশের সমস্ত প্রধান শহরে কোম্পানিটির বিতরণ অফিস তৈরি হয়। তামিলনাড়ুতে একটি অতিরিক্ত কারখানাও স্থাপিত হয়েছিল। ১৯৬০-এর দশকে খগেন্দ্রচন্দ্র দাসের মৃত্যুর সময় তাঁর কোম্পানিটি দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে সবচেয়ে সুপরিচিত ছিল। খগেন্দ্রচন্দ্রের মৃত্যুর এত বছর পরেও মার্গো সাবান স্বমহিমায় বিরাজ করছে। তবে বহুবার তার মালিকানার হাতবদল ঘটেছে। খগেন্দ্রচন্দ্রের মৃত্যুর পর তাঁর ছোটভাই জগদীশচন্দ্র দাশগুপ্ত কোম্পানির চেয়ারপার্সন হিসেবে ব্যবসার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্যালকাটা কেমিক্যাল কোম্পানি আর্থিক সঙ্কটের সম্মুখীন হলে কোম্পানিটি মার্গো-সহ অন্যান্য ব্র্যান্ডগুলিও এমএনসি-এর কাছে বিক্রয় করে দেয়। নতুন মালিকানার অধীনে যাওয়া সত্বেও ভেষজ গুণসম্পন্ন এই মার্গো সাবান কিন্তু নিজের বাজার পুরোদমেই ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল এবং ক্রমাগত উন্নতির পথে অগ্রসর হচ্ছিল। এরপর আরও কয়েকবার মার্গোর মালিকানা বদল হয়েছিল। পরবর্তীকালে হ্যাঙ্কেল ইন্ডিয়ার হাত হয়ে বর্তমানে মার্গো জ্যোতি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের মালিকানাধীন। ২০১১ সালে হ্যাঙ্কেল ইন্ডিয়া জ্যোতি ল্যাবের কাছে মার্গোকে বিক্রয় করে দিয়েছিল। রসায়নবিদ খগেন্দ্রচন্দ্র দাসের হাতে তৈরি ১০০ বছরেরও বেশি পুরোনো এই মার্গো সাবান আজও রমরমিয়ে ব্যবসা করে চলেছে এবং তার উপকারিতা ও জনপ্রিয়তা আজও অম্লান। এক বাঙালির ব্যবসায়িক সফলতারও নিশান এই মার্গো সাবান। সেদিক থেকেও এই পণ্যটির ঐতিহাসিক মূল্যটিকে অস্বীকার করা চলে না।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading