সববাংলায়

মেরিলিন মনরো মৃত্যু রহস্য

আমেরিকান চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো (Marilyn Monroe) কেবল অভিনয়ের জন্যই নয়, তাঁর লাস্যময়তা ও তীব্র যৌন আবেদনময়ী রূপের জন্যেও সারা বিশ্বে পরিচিত। ১৯৫০-৬০-এর দশকে আমেরিকায় যৌনতার প্রতীক ছিলেন মেরিলিন। এমনকি তিনি যৌন বিপ্লবেরও অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু মাত্র ৩৬ বছর বয়সে নিজের কেরিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যখন এতবড় একজন তারকার হঠাৎ মৃত্যু হয়েছিল, নড়েচড়ে বসেছিলেন সকলেই। মনরো মানসিক একধরনের রোগে ভুগতেন। তাঁর চিকিৎসকেরা বলেছিলেন, আচমকা এবং অপ্রত্যাশিতভাবে মেজাজ বদলে যেত মনরোর। এছাড়াও গভীর ভয় এবং ঘনঘনই চুড়ান্ত হতাশায় ভুগতেন তিনি। ফলে প্রাথমিকভাবে বারবিটুরেট ঔষধের ওভারডোজ মৃত্যুর কারণ হিসেবে উঠে এলেও পরে আত্মহত্যার বদলে কেনেডি পরিবারের দিকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগের ইঙ্গিত করা হয়েছিল। যদিও এতবছর পরেও মনরোর মৃত্যু রহস্যাবৃতই রয়ে গেছে।

১৯৬২ সালের ৪ আগস্ট শনিবারে লস এঞ্জেলেসের বেন্টউডে নিজের বাড়ি ১২৩০৫ ফিফথ হেলেনা ড্রাইভে মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে মেরিলিন মনরোর মৃত্যু হয়েছিল। ঘরের দরজা তাঁর বন্ধ ছিল। তাঁরই গৃহকর্ত্রী ইউনিস মারে শনিবার সে-বাড়িতেই রাত্রিযাপন করেছিলেন। মারে রবিবার ভোর তিনটে নাগাদ মনরোর বেডরুমের দরজার নীচ থেকে আলো দেখতে পান এবং তাঁর ব্যপারটা কিঞ্চিৎ অনুসন্ধানযোগ্য বলে মনে হয়। মনরোর কোনো সাড়া না পেয়ে দরজাটিও যে লক করা তাও আবিষ্কার করেন। এরপরই ভীত ইউনিস মারে বিলম্ব না করে ফোন করেছিলেন মনরোর চিকিৎসক মনরোগ বিশেষজ্ঞ রাল্ফ গ্রিনসনকে। রাল্ফ বাড়িতে ঢোকেন এবং এক জানলা দিয়ে মনরোর বেডরুমে তাঁকে নিথরভাবে পড়ে থাকতে দেখেন। সেই জানলা দিয়েই কোনোক্রমে বেডরুমে ঢুকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেন মনরোকে। বিছানায় তিনি নগ্ন অবস্থায় মুখ থুবড়ে পড়েছিলেন, তাঁর এক হাতে ধরা ছিল টেলিফোন এবং পাশে পড়েছিল নেম্বুটাল ক্যাপসুলের খালি শিশি। পুলিশ সূত্রে খবর তাতে নাকি মোট ৫০টি ক্যাপসুল ছিল। টাইমস জানিয়েছে, যে মনরোর ঘর থেকে তাঁর কোনো বয়ান বা নোট পাওয়া যায় নি। তিনটে পঞ্চাশ নাগাদ মনরোর চিকিৎসক হাইম্যান এঙ্গেলবার্গ এসে মেরিলিন মনরোকে মৃত বলে ঘোষণা করেছিলেন। ভোর চারটে কুড়ি পর্যন্ত পুলিশে খবর দেওয়া হয়নি কারণ তাঁর ডাক্তাররা বলেছিলেন, পুলিশে জানানোর আগে মনরোর সিনেমা স্টুডিও থেকে অনুমতি নেওয়া দরকার। যাইহোক, অবশেষে চারটে পঁচিশে লস এঞ্জেলেস পুলিশ বিভাগকে এই মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়েছিল।

মনরোর আকস্মিক মৃত্যু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে প্রথম পাতার খবর ছিল। মনরোর মৃত্যুর পশ্চাতে প্রাথমিকভাবে তাঁর মানসিক অসুস্থতার সঙ্গে দীর্ঘ সংগ্রাম এবং মানসিক উত্তেজনা প্রশমনের ঔষধ অতিরিক্ত মাত্রায় সেবনকেই অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। মৃত্যুর পরদিন অর্থাৎ রবিবার, ৫ই আগস্ট করোনার ডেপুটি থমাস নোগুচি মনরোর মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করেছিলেন। সেই কাজে তাঁকে সহায়তা করেছিলেন, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নরম্যান ফারবেরো, রবার্ট লিটম্যান এবং নরম্যান তাবাচনিক। ১৭ই আগস্ট প্রকাশিত হয় এই তদন্তের ফলাফল, তাতে চিফ করোনার থিওডোর কারফি মনরোর মৃত্যুকে ‘সম্ভাব্য আত্মহত্যা’ বলেই ঘোষণা করেছিলেন। ময়নাতদন্তের ফলে মনরোর রক্তে ক্লোরাল হাইড্রেট, পেন্টোবারবিটাল এবং যকৃতেও ১৩এমজি শতাংশ পেন্টোবারবিটাল পাওয়া গিয়েছিল। এসবের কারণেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, তীব্র বারবিটুরেট বিষক্রিয়ায় মনরোর মৃত্যু হয়। তাঁর শরীরে কোনো বাহ্যিক ক্ষতও পাওয়া যায় নি। জানা গেছে, যে মৃত্যুর সময় তিনি বেশ বিষন্ন মেজাজে ছিলেন। সুইসাইড নোট না পাওয়া নিয়ে বলা হয়েছিল যে, এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ পরিসংখ্যান অনুযায়ী আত্মহত্যাকারীদের চল্লিশ শতাংশেরও কম মানুষ নোট লিখে রেখে যান।

এখন মনরোর মৃত্যুদিনের ঘটনাবলীর দিকে একটু নজর দেওয়া যাক। ৪ আগস্ট অর্থাৎ শনিবার মনরো তাঁর বেন্টউডের বাড়িতেই ছিলেন। সকালবেলায় ফোটোগ্রাফার লরেন্স শিলারের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, ‘সামথিংস গট টু গিভ’-এর সেটে তোলা তাঁর নগ্ন চিত্রগুলি প্রকাশের বিষয়ে। ব্যক্তিগত ম্যাসাজ থেরাপিস্টের কাজ থেকে ম্যাসাজও নিয়েছিলেন। সেদিন সকাল থেকেই সে-বাড়িতে তাঁর গৃহকর্ত্রী ইউনিস মারে উপস্থিত ছিলেন এবং ছিলেন তাঁর প্রচারক প্যাট্রিসিয়া নিউকম্ব। ইউনিস মারে সেদিন রাত্রিযাপন করেন বেন্টউডের বাড়িতে। নিউকম্ব জানিয়েছিল তাঁদের মধ্যে একটু তর্কাতর্কি হয়েছিল এবং আগেরদিন রাতে মনরো ঘুমোয়নি ভালো করে। বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রাল্ফ গ্রিনসন আসেন একটি থেরাপি সেশনের জন্য। সন্ধে সাতটার দিকে গ্রিনসন চলে যাওয়ার আগে তিনি মারেকে তাঁর সঙ্গেই সে রাতে থাকতে বলেন। আনুমানিক সাতটা থেকে সাতটা পনেরোর মধ্যে মনরোর কাছে জো ডিমাজিও জুনিয়রের একটি ফোন এসেছিল। এখানে উল্লেখ্য এই জুনিয়র ডিমাজিওর বাবার সঙ্গে মনরোর বিবাহ বিচ্ছেদের পরে জুনিয়রের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল। ডিমাজিও এক বান্ধবীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বিচ্ছেদের কথা জানান মনরোকে। তারপর সাতটা চল্লিশ-পয়তাল্লিশ নাগাদ মনরো মনোরোগ চিকিৎসক গ্রিনসনকে ফোন করে ডিমাজিওর খবরটি জানিয়েছিলেন। সেদিন রাত আটটা নাগাদ অভিনেতা পিটার লফোর্ড একটি নৈশ পার্টিতে মনরোর উপস্থিতি কামনা করে তাঁকে ফোন করেছিলেন। যদিও মনরোর কন্ঠস্বরেই তাঁর মনে হয়েছিল সে মাদকাসক্ত রয়েছে। এরপর অবশ্য মনরোর আইনজীবী রুডিন যখন ফোন করেন বেন্টউডের বাড়িতে মারে তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে, মনরো ভালোই আছেন। তারপর রাতভোরের দিকেই অমন অঘটন ঘটে গিয়েছিল।

মনরোর ব্যক্তিগত জীবনেও হতাশা উদ্রেককারী ঘটনার অভাব ছিল না। বিশেষত জীবনে কোনো স্থায়ী জীবনসঙ্গী ছিল না তাঁর। ১৯৪২ সালে ১৬ বছর বয়সে যে-ছেলেটিকে বিবাহ করেছিলেন, চার বছর পর তা বিচ্ছেদে পর্যবসিত হয়েছিল। আবার ১৯৫৪ সালে নিউ ইয়র্ক ইয়াঙ্কিস তারকা জো ডিমাজিওকে বিয়ে করেন কিন্তু নয়মাস পরেই তাদের সম্পর্কে ছেদ পড়ে। এরপর ১৯৫৬ সালে নাট্যকার আর্থার মিলারের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হলেও ১৯৬১ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছিল। সেবছরই মনরো নতুন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল এবং সেই ভালোলাগার অনুভূতি কেবল একতরফা নয়, ছিল পারস্পরিক। শুধু তাই নয়, জন এফ কেনেডির ভাই অ্যাটর্নি জেনারেল রবার্ট এফ কেনেডির সঙ্গেও মনরো প্রেম করতেন বলে জানা যায় এই সম্পর্কগুলিও কোনো পরিণতি পায়নি এবং কেনেডিদেরকে জড়িয়েই মনরোর মৃত্যুরহস্যে অন্য এক তত্ত্ব উঠে আসে।

১৯৬৪ সালে ফ্র্যাঙ্ক. এ. ক্যাপেল তাঁর ‘দ্য স্ট্রেঞ্জ ডেথ অব মেরিলিন মনরো’ বইতে দাবি করেন রবার্ট এফ কেনেডি নিজের কর্মজীবন রক্ষা করার জন্য মনরোকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল। এখান থেকেই আত্মহত্যার বদলে হত্যার প্রসঙ্গটি জোরালো হয়ে উঠতে থাকে। আবার ১৯৭৩ সালে নরম্যান মেইলার তাঁর ‘মেরিলিন : আ বায়োগ্রাফি’ বইতে বলেন, রবার্ট কেনেডির সঙ্গে মনরোর সম্পর্ক ছিল, সেই কারণে এফবিআই অথবা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি মনরোকে হত্যা করেছিল কেনেডির ওপর চাপ সৃষ্টি করবার জন্য। পরে অবশ্য মাইক ওয়ালেসের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে নিজের এই অভিযোগ প্রত্যাহার করেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন অর্থের প্রয়োজনীয়তার কারণে বাণিজ্যিকভাবে সফল হওয়ার জন্য তিনি গ্রন্থে ওরকম দাবি করেছিলেন। আবার রবার্ট. এফ স্লাটজার ‘দ্য লাইফ অ্যান্ড কিউরিয়াস ডেথ অব মেরিলিন মনরো’ বইতে রবার্ট. এফ কেনেডিকেই মনরোর মৃত্যুর জন্য দায়ী করেছিলেন। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত অ্যান্থনি স্কাডুটো নামের এক সাংবাদিকের লেখা গ্রন্থ ‘হু কিলড মেরিলিন মনরো’তেও স্লাটজারের দাবিকে স্বীকার করে নেওয়া হয়। আবার ১৯৮২ সালে স্পেরিগ্লিও প্রকাশ করেন ‘মেরিলিন মনরো: মার্ডার কভার-আপ’ প্রকাশ করেন। তাতে তিনি দাবি করেছিলেন যে, মনরোকে হোফা এবং জিয়ানকানা হত্যা করেছিলেন। স্পেরিগ্লিও তাঁর বইতে লিওনেল গ্র্যান্ডিসনের দেওয়া বিবৃতি যোগ করেছেন, যিনি মনরোর মৃত্যুর সময় লস এঞ্জেলেস কাউন্টি করোনার অফিসে কাজ করতেন। গ্র্যান্ডিসনের মতে, মনরোর শরীরে ব্যাপকভাবে আঘাত করা হয়েছিল কিন্তু ময়নাতদন্তের রিপোর্ট থেকে এটি বাদ দেওয়া হয়েছিল। তিনি নাকি মনরোর ‘লাল ডায়েরি’ও দেখেছিলেন, যাতে কেনেডির থেকে জানা অনেক গোপন তথ্য মজুত ছিল, কিন্তু সে-ডায়েরিও অদ্ভুতভাবে গায়েব হয়ে গিয়েছিল।

মনরোর মৃত্যুকে ঘুরে এতই বিতর্ক তৈরি হয়েছিল যে লস এঞ্জেলেসের পুলিশ বিভাগ তাঁর মৃত্যুর দুই দশক পরে সেই রহস্যমৃত্যুর মামলাটি পুনরায় চালু করে তদন্ত শুরু করেছিল। যদিও জেলা অ্যাটর্নি তারপরেও তাঁর মৃত্যুর জন্য ঔষধের ওভারডোজকেই দায়ী করেছিলেন। অল্প সময় পরে অ্যান্টনি সামারস নামে একজন সাংবাদিক তদন্ত শুরু করে প্রায় ৬৫০টি মনরোর সাক্ষাৎকারের টেপরেকর্ড উদ্ধার করেছিলেন। সেগুলো একত্র করে ‘দ্য মিস্ট্রি অফ মেরিলিন মনরো: দ্য আনহার্ড টেপস’ নামে জনগণের সামনে একটি ডকুমেন্টারি আকারে প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই ডকুমেন্টারিতে দাবি করা হয়, যে, বাড়িতে মনরোর মৃত্যু হয়নি, হাসপাতালে যাওয়ার পথে তিনি নাকি মারা গিয়েছিলেন। অ্যাম্বুলেন্স কোম্পানির মালিক ওয়াল্টার শেফার একথা বলেছিলেন। আবার লেখক জন শার্লক সেই ডকুমেন্টারিতে বলেছেন, যে, গ্রিনসন নাকি নিজে তাঁকে জানান যে মনরো বাড়িতে নয়, হাসপাতালে যাওয়ার সময় তাঁর মৃত্যু হয়। ডকুমেন্টারিতে অ্যান্টনি সামারস জানান যে, মনরোর মৃত্যুটিকে পরিকল্পনা করে ঢেকে রাখা হয়েছিল। সেই টেপরেকর্ডারের ডকুমেন্টারিতেই মনরোর গৃহকর্ত্রী জানিয়েছেন, মৃত্যুর ঘটনার দিনে রবার্ট এফ কেনেডি নাকি সে-বাড়িতে এসেছিলেন এবং মনরোর সঙ্গে নাকি কেনেডির বচসাও হয়েছিল। আবার এও সন্দেহ করেন সামারস, যে, মনরো হয়তো কেনেডির কাছে গোপন কোনো তথ্য জেনে ফেলেছিলেন, হতে পারে তা নিউক্লিয়ার বিষয়ক, এবং মনরো যদি তা ফাঁস করে দেন, কেনেডি পরিবার সেই ভয়েও ভীত ছিলেন সম্ভবত, সেকারণেই মনরোর মৃত্যুকে ধোঁয়াশার আড়ালে রেখে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

এইভাবে আত্মহত্যা, হত্যা ইত্যাদি নানারকম তত্ত্বের জল্পনা মনরোর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দানা বেঁধে উঠেছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু আজও সেই কিংবদন্তী অভিনেত্রীর মৃত্যু রয়ে গেছে রহস্যেরই অন্তরালে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading