ইতিহাস

মাইকেল ফ্যারাডে

বিজ্ঞান এবং সমগ্র মানবসভ্যতা যেসব মানুষের কাছে চিরঋণী হয়ে আছে তাঁদের মধ্যে অন্যতম একজন মাইকেল ফ্যারাডে (Michael Faraday)। রসায়ন ও পদার্থবিদ্যায়  তাঁর অবদান বিশ্ববন্দিত। মূলত তড়িৎচুম্বকীয়  (Electromagnetism) তত্ত্ব এবং তড়িৎ রসায়ন (Electrochemistry) নিয়ে তাঁর গবেষণা এবং আবিষ্কার তাঁকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। বৈদ্যুতিক নানা যন্ত্রের সাহায্যে প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে সভ্যতার যে অগ্রগতি হয়ে চলেছে প্রতিদিন তার মূল কারিগর ছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর এই বিজ্ঞানী, মাইকেল ফ্যারাডে।

১৭৯১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর মাইকেল ফ্যারাডে জন্মগ্রহণ করেন ইংল্যান্ডের সারে (Surrey) শহরতলির নিউইংটন বাটস্ (Newington Butts) অঞ্চলে, যেটি বর্তমানে দক্ষিণ লন্ডন পৌরসভার (London Borough of Southwark) অন্তর্ভুক্ত। ফ্যারাডের পিতার নাম জেমস ফ্যারাডে (James Faraday) এবং মাতা মার্গারেট ফ্যারাডে (Margaret Faraday)। আর্থিক অনটন ছিল তাঁদের সংসারে নিত্যসঙ্গী।  ১৭৯০ সাল নাগাদ জেমস তাঁর স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে নিয়ে উত্তর ইংল্যান্ড থেকে চলে আসেন লন্ডনে। সেখানেই এক শরৎকালে মাইকেল ফ্যারাডের জন্ম হয়। চার সন্তানের মধ্যে ফ্যারাডে হলেন তৃতীয়। তাঁর পিতা পেশায় ছিলেন একজন কামার। তাঁরা স্যান্ডেমেনিয়ান (Sandemanian) নামক এক খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। এই খ্রীষ্টধর্ম ফ্যারাডের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। ফ্যারাডে সারাহ্ বার্নার্ডকে (Sarah Barnard) বিবাহ করেছিলেন ১৮২১ সালের ১২ জুন তারিখে। সারাহ্ বার্নার্ডের সঙ্গে একদিন ওই গীর্জাতেই তাঁর দেখা হয়েছিল। তাঁরা নিঃসন্তান।

গীর্জায় প্রত্যেক রবিবার যে পঠনপাঠনের ব্যাবস্থা ছিল ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত সেখানেই ফ্যারাডের প্রাথমিক শিক্ষালাভ। কিন্তু তাঁর পিতা প্রায়শই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। হয়ত দীর্ঘদিন কাজে যেতে পারতেন না ফলে সাংসারিক অনটন বেড়ে চলে এবং সেকারণেই ফ্যারাডের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা বন্ধ করে দেন। অর্থ রোজগারের জন্য তিনি কাজ করতে শুরু করেন ব্ল্যান্ডফোর্ড স্ট্রীটের (Blandford Street) এক বইয়ের দোকানের সরবরাহকারী কর্মী (Delivery Boy) হিসেবে। তখন বয়স ১৪ বছর। বাড়িতে বাড়িতে বই পত্রিকা ইত্যাদি পৌঁছে দেওয়াই কাজ ছিল তাঁর। কঠোর পরিশ্রম করে তিনি মালিকের সুনজরে পড়েন এবং তাঁকে তখন বই বাঁধাই কর্মী (Book Binder) হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। সারাদিন বাঁধাইয়ের কাজ করে অবসরে তিনি সেইসব  বই পড়তে শুরু করেন এবং বিজ্ঞান বিষয়ক বই তাঁকে আকৃষ্ট করত সবচেয়ে বেশি। বিশেষত যে দুটি বই তাঁকে আমূল নাড়া দিয়েছিল তার একটি হল ‘দি এনসাক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা’ (The Encyclopedia Britannica)।  এই বইয়ের তৃতীয় সংস্করণে তড়িৎ সংক্রান্ত একটি প্রবন্ধ বিদ্যুতের প্রতি তাঁকে আগ্রহী করে তোলে। অপর বইটি বিজ্ঞানী জেন মার্সেট (Jane Marcet)-এর সাধারণ মানুষের জন্য সহজ করে লেখা রসায়নবিদ্যার একটি প্রায় ৬০০ পাতার বই ‘কনভারসেশন অন কেমিস্ট্রি’ (Conversation on Chemistry)।  বইটি তাঁকে এমন মুগ্ধ করেছিল যে তিনি তাঁর অল্প পুঁজি দিয়ে বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য এবং যন্ত্রপাতি কিনে বইতে পড়া কথাগুলির সত্যতা পরীক্ষা করে দেখতেন।

বিখ্যাত বিজ্ঞানী জন টাটুমের (John Tatum) পদার্থবিদ্যা সংক্রান্ত প্রাকৃতিক দর্শনের ওপর একটি জনসভার বক্তৃতার টিকিটের জন্য ফ্যারাডের বড় ভাই টাকা দিয়েছিলেন তাঁকে। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ১৮১২ সালে  যখন তিনি বিখ্যাত বিজ্ঞানী হামফ্রে ডেভীর (Humphrey Davy) রসায়নবিদ্যা সংক্রান্ত চারখানি বক্তৃতা শোনার টিকিট পেয়েছিলেন। বক্তৃতা শুনে তিনি লিখে রেখেছিলেন এবং সেইসঙ্গে নিজের চিন্তাভাবনার টুকরো টুকরো অংশ তাতে জুড়ে দিয়েছিলেন নোট হিসেবে ফলে পৃষ্ঠাসংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩০০। সেই পান্ডুলিপি তিনি বইয়ের মতো বাঁধিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন হামফ্রে ডেভীকে। ডেভী তাতে বিস্মিত এবং খুশি হন। ১৮১৩ সালে গবেষণা চলাকালীন এক বিস্ফোরণে ডেভীর চোখের ক্ষতি হয়। সেই কারণে ডেভী সহকারী হিসেবে নোট লিখে রাখার জন্য মাইকেল ফ্যারাডেকে নিয়োগ করেন। এর কিছুদিন পর জন পেইনি (John Payne)  নামক এক ব্যাক্তি মনোমালিন্যের কারনে পদত্যাগ করলে ডেভী ‘রয়্যাল ইন্সটিটিউশনে’ (Royal Institution) তাঁর রাসায়ানিক গবেষণার সহকারীপদ (Assistant) ফ্যারাডেকে প্রদান করেন। ১৮১৩ সালের ১ মার্চ মাইকেল ফ্যারাডে রয়্যাল ইন্সটিটিউশনে কাজ করতে শুরু করেন। তখন তাঁর বয়স ২১ বছর। ডেভী তাঁর ইউরোপ ভ্রমণের সচিব (Secretary) হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ফ্যারাডেকেই। ১৮ মাসব্যাপী বিভিন্ন দেশভ্রমণকালে প্রচুর বিখ্যাত বিজ্ঞানীর সংস্পর্শে আসেন তিনি ফলে বিবিধ বিষয়ে শিক্ষালাভের সুযোগ ঘটে। ১৮১৬ সালে ২৪ বছর বয়সে ফ্যারাডে তাঁর প্রথম বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন শহরের দার্শনিক সমাজ ‘সিটি ফিলজফিক্যাল সোসাইটি’তে (City Philosophical Society)। প্রকাশ করেন ক্যালসিয়াম হাইড্রক্সাইডের (Calcium Hydroxide) বিশ্লেষণ সংক্রান্ত তাঁর প্রথম গবেষণা পত্র।

প্রথমদিকে ফ্যারাডে ক্লোরিন (Chlorine) নিয়ে গবেষণাতেই নিয়োজিত রেখেছিলেন নিজেকে। বিভিন্ন গ্যাস তরলীকরণ (liquefaction) করেছিলেন তিনি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল এই ক্লোরিন গ্যাসের তরলীকরণ।  কীভাবে একটি যান্ত্রিক পাম্প ব্যবহার করে গ্যাসকে তরল করা যায় এবং তা ঘনীভূত হয়ে তার পারিপার্শ্বিককে শীতল করে তুলতে পারে এই পদ্ধতি আবিষ্কার করেন ফ্যারাডে। বর্তমানের হিমযন্ত্র বা রেফ্রিজারেটরগুলি (Refrigerator) তাঁর এই আবিষ্কারেরই ফলাফল। ১৮২৫ সালে ফ্যারাডে রসায়নবিদ্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদার্থ ‘বেনজিন’ (Benzene) আবিষ্কার করেছিলেন যাকে তিনি বলতেন হাইড্রোজেন বাইকার্বুরেট (Bicarburate of Hydrogen)। ফ্যারাডে জানিয়েছিলেন বিদ্যুত এবং রাসায়ানিকের মধ্যেকার সম্পর্কের কথা এবং এই তড়িৎ রসায়নের (Electrochemistry) ওপরই গড়ে তোলেন তড়িৎবিশ্লেষণের সূত্রগুলি (Laws of Electrolysis)।  অ্যানোড ( Anode), ক্যাথোড (Cathode), ইলেকট্রোড (Electrode) ইত্যাদি পরিভাষাগুলি (Terms) ফ্যারাডের উদ্ভাবিত তত্ত্বের ওপরই নির্ভর করে গড়ে উঠেছে।

১৮২১ সালের একটি গবেষণা মাইকেল ফ্যারাডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব। একটি ধাতব তারের মধ্যে দিয়ে বিদ্যুত প্রবাহিত হলে তার মধ্যে চৌম্বকত্ব গড়ে ওঠে। এই তত্ত্ব পূর্বেই আবিষ্কৃত। ফ্যারাডে পরীক্ষা করে দেখালেন কিভাবে বিদ্যুতের সুপরিবাহী (Good Conductor of Electricity) পারদ (Mercury) এবং বিদ্যুতের সাহায্যে একটি ধাতব তার বা বস্তু চুম্বকের চারপাশে ক্রমাগত ঘুরতে পারে। তাঁর এই আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করেই বৈদ্যুতিক মোটর (Electric Motor) তৈরির মূলনীতি গড়ে ওঠে। তাঁর তড়িৎচুম্বকীয় তত্ত্ব (Electromagnetism) আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হল ১৮৩১ সালে। গতিশক্তি ( Kinetic Power) থেকে বৈদ্যুতিক শক্তি (Electrical Power) তৈরির উপায় আবিষ্কার করলেন তিনি। তারের কুন্ডলীর মধ্যে একটি চুম্বককে ক্রমাগত চলাচল করাতে থাকলে বিদ্যুত উৎপন্ন হয় এই সত্য আবিষ্কার সত্যিই এক যুগান্তকারী ঘটনা। এটিই হল জেনারেটর (Generator) তৈরির মূলনীতি। প্রথম এই বৈদ্যুতিক জেনারেটরকে বলা হল ‘ডায়নামো’ (Dynamo) । বিদ্যুতকে মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তুললেন তিনি। ১৮৪৫ সালে তিনি গবেষণা করে দেখেন আলোকরশ্মি এবং চুম্বকের একটা নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। একটি চৌম্বকক্ষেত্রকে (Magnetic Field) চলমান একটি আলোর রেখার গতিপথের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবহার করতে পারলে সেই আলোকরশ্মিকে ঘোরানো যায়। এই আবিষ্কার এক ঐতিহাসিক ঘটনা। আলো ও চুম্বকের এই সম্পর্কের তত্ত্বকেই ১৮৬৪ সালে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল (James Clerk Maxwell) বিশদে বর্ণনা করেন এবং বলেন আলো একটি তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ।  ১৮৪৫ সালেই ফ্যারাডে ‘ডায়াম্যাগনেটিজমে’র (Diamagnetism) তত্ত্ব দিয়েছিলেন। এছাড়াও ফ্যারাডের খাঁচা (Faraday’s Cage), গ্যাস নিয়ে গবেষণাকালীন তৈরি রাবার বেলুন (Rubber Balloon) ইত্যাদি তাঁর  উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারগুলির মধ্যে কয়েকটি। এক সময় আধানের (Electrostatic Charge) একককে বলা হত ফ্যারাডে। তাছাড়া এক অণু (Mol) ইলেকট্রনে আধানের পরিমাণকে বলা হয় ‘ফ্যারাডে ধ্রুবক’ (Faraday Constant)।

১৮২৪ সালে ৩২ বছর বয়সে ‘রয়্যাল সোসাইটি’ (Royal Society) দ্বারা নির্বাচিত হন তিনি ফলে নিজের যোগ্যতায় হয়ে ওঠা একজন বিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। তার পরের বছর ১৮২৫ সালে তিনি রয়্যাল ইন্সটিটিউশন গবেষণাগারের পরিচালকের (Director) পদ পেয়েছিলেন। ১৮৪৮ এবং ১৮৫৮ এই দুবার তিনি রয়্যাল সোসাইটির সভাপতি হওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিলেন। ১৮৩২ সালে আমেরিকার শিল্প ও বিজ্ঞান আকাদেমির (American Academy of Art and Sciences) বিদেশি সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। এছাড়াও ‘রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’ (Royal Swedish Academy of Science), ‘ফ্রেঞ্চ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’ (French Academy of Science) ইত্যাদি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ১৮৩৩ সালে ফ্যারাডেই  রয়্যাল ইন্সটিটিউশনে রসায়নের প্রথম ফালেরিয়ান অধ্যাপক (Fullerian Professor of Chemistry) হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন।

‘নাইটহুড’ (Knighthood) উপাধি গ্রহণে অসম্মত হয়েছিলেন ফ্যারাডে। অবশ্য এর পিছনে তার ওপর খ্রীষ্টধর্মের প্রভাবই কাজ করেছিল। ১৮৩৫ এবং ১৮৪৬ সালে দুবার তিনি ‘রয়্যাল মেডেল’ (Royal Medal) লাভ করেছিলেন। ১৮৩২ এবং ১৮৩৮ সালে দুবার ‘কপলে মেডেল’ও (Copley Medal) পেয়েছিলেন। ১৮৪৬ সালে ‘রামফোর্ড মেডেল’ (Rumford Medal) এবং ১৮৬৬ সালে পেয়েছিলেন ‘অ্যালবার্ট মেডেল’ (Albert Medal)।

১৮৩৯ থেকে তিনি স্নায়ুবৈকল্যজনিত (Nervous Breakdown) স্মৃতিক্ষয় রোগে ভুগতে শুরু করেন। যদিও এরপরেও গুরুত্বপূর্ণ অনেক গবেষণা এবং আবিষ্কার করেছিলেন। ১৮৪৮ সালে হ্যাম্পটন কোর্টে (Hampton Court) পেয়েছিলেন একটি বাড়ি। সেখানেই তাঁর জীবনাবসান হয়। মৃত্যুর কিছুদিন আগে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের (Westminster Abbey) গোরস্থানে তাঁর কবর করবার প্রস্তাব করা হয়। সেখানে ব্রিটেনের রাজা-রাণীর কবর রয়েছে। কিন্তু ফ্যারাডে সে প্রস্তাবে রাজি হননি। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে হাইগেইট কবরস্থানে (Highgate Cemetery) সমাধিস্থ করা হয়। মহান বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডের ১৮৬৭ সালের ২৫ আগস্ট ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যু হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।