ইতিহাস

ভানুভক্ত আচার্য

ভানুভক্ত আচার্য

ভানুভক্ত আচার্য (Vanu Bhakta Acharya) একজন উল্লেখযোগ্য নেপালি কবি, অনুবাদক এবং  নেপালের নবজাগরণের পথিকৃৎ। নেপালি ভাষাকে নেপালের সীমানা ছাড়িয়ে ভারতের উত্তরাংশে ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে নেপালের আদিকবির  সম্মান অর্জন করেছিলেন ভানুভক্ত আচার্য । তিনি রামায়ণসহ বহু সংস্কৃতকাব্য সংস্কৃত ভাষা থেকে নেপালি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। নেপালের সংস্কৃতি, সাহিত্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভানুভক্ত অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন যার কারণে তাঁকে  ‘আচার্য’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাঁর ঐকান্তিক চেষ্টায় নেপালি ভাষা পৃথিবীর অন্যান্য ভাষাগুলির মধ্যে অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ভানুভক্তের রচনাগুলি তাঁর মৃত্যুর পরে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

১৮১৪ সালের ১৩ জুলাই নেপালের তানাহু জেলার চুন্ডি রামঘা গ্রামে এক শিক্ষিত অভিজাত ব্রাহ্মণ পরিবারে ভানুভক্তের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ধনঞ্জয় আচার্য যিনি একজন সরকারি চাকুরে ছিলেন।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

সকল ভাইবোনদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভানুভক্তের শিক্ষাজীবন শুরু হয় তাঁর শাস্ত্রজ্ঞ পিতামহের কাছে সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে। তাঁর পিতামহ তাঁকে শাস্ত্রশিক্ষাদানের পাশাপাশি ধর্মীয় জ্ঞানও প্রদান করেন যা পরবর্তীকালে তাঁকে ধর্ম সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলে। বাল্যকালের শিক্ষা শেষ করে তিনি উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য বারাণসীতে যান। তিনি ধর্ম, শাস্ত্র, জ্যোতিষ ইত্যাদি নানা বিষয়ে সুপণ্ডিত ছিলেন।
ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশগুলিতে সংস্কৃত ভাষার আধিপত্যের কারণে ধর্ম, শাস্ত্র ও পাঠ্যবইগুলি সংস্কৃত ভাষায় রচিত ছিল। মুষ্টিমেয় কিছু উচ্চবর্গের মানুষ ছাড়া সাধারণ মানুষের কাছে সংস্কৃত ভাষা ছিল দুর্বোধ্য ও অজ্ঞেয়। এর আগে নেপালি ভাষায় ভানুভক্ত কোনো সাহিত্য রচনা করেননি। তাঁর পূর্বসূরি কবিরা যখন সংস্কৃত ভাষায় কবিতা লিখে গেছেন, তখন ভানুভক্তই প্রথম নেপালি ভাষায় তাঁর কবিতাগুলি রচনা করেছিলেন। এই কারণেই ভানুভক্তের রচনাগুলি  জনসাধারণের কাছে সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার পাশাপাশি নেপালি ভাষাটিকেও জনপ্রিয় করে তোলে। ভানুভক্তের রচনাগুলি সম্পূর্ণরূপে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবমুক্ত এক মৌলিক রচনা যার মধ্যে দেশীয় ভাবধারা সম্পূর্ণরূপে বর্তমান ছিল। তাঁর রচনা অধ্যাত্মবোধের উপর নির্ভরশীল ছিল যা সমসাময়িক সমাজ-মানসিকতার পরিচয় বহন করে। ধনী পরিবারের সন্তান ভানুভক্ত একদিন এক দরিদ্র শ্রমিকের কাজ দেখে অণুপ্রাণিত হন। শ্রমিকটি মৃত্যুর পরে সমাজে নিজের অবদান রেখে যাওয়ার উদ্দেশ্যে নিজের অঞ্চলে জলকষ্ট দূর করার জন্য একটি কুয়ো নির্মাণ করেন। এই ঘটনার দ্বারা ভানুভক্ত সাধারণ মানুষের জন্য কিছু করার জন্য অণুপ্রাণিত হয়ে রামায়ণ অনুবাদের কাজ শুরু  করেন। তিনি তাঁর কবিতা ‘ঘাঁসি’র মাধ্যমে সমাজে ঐ দরিদ্র শ্রমিকটির  অবদানের কথা সকলের কাছে পৌঁছে দেন যা তৎকালীন সমাজে একটি বিশেষ ছাপ রাখতে সক্ষম হয়েছিল। মহাকাব্য রামায়ণ পড়ে ভানুভক্ত রামের বীরত্বপূর্ণ কাহিনী দ্বারা আকৃষ্ট হন এবং তা  সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সেটিকে নেপালি ভাষায় অনুবাদ করেন। ভানুভক্তের পূর্বে কেউই কখনো নেপালি ভাষায় অনুবাদের কাজ করেননি। তিনি ১৮৪১ সালে বাল্মীকি-রামায়ণ অনুবাদের কাজ শুরু করে ১৮৫৩ সালে তা শেষ করেন। সহজ, সরল নেপালি ভাষায় লেখা কিন্তু ধর্মীয়ভাব সম্পন্ন ‘ভানুভক্তকে রামায়ণ’ তথা ভানুভক্তের রামায়ণ ছিল তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা। তিনি রামায়ণের মূল সারাংশ একই রেখে তাঁর রচনায় এনেছিলেন নেপালি সংস্কৃতির ছাপ যার ফলে তাঁর অনুবাদ এতটাই গীতিপূর্ণ ছিল যে তা একটি কবিতার থেকেও বেশি গীতিকাব্য হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। এইরূপ গীতিকাব্য রচনা করে  ভানুভক্ত পরবর্তীকালের নেপালি কবিদের পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠেন।

১৮১৪ সালে নেপালের রাজশক্তির সঙ্গে ইংরেজদের সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে। এই যুদ্ধের ফলস্বরূপ ১৮১৫ সালে ‘সগৌলির সন্ধি’ স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির শর্তানুযায়ী নেপালকে পূর্ব ও পশ্চিমের প্রায় এক তৃতীয়াংশ ভূ-ভাগ ব্রিটিশ শাসককে হস্তান্তর করতে হয় যা নেপালের শিক্ষিত সমাজ মেনে নিতে পারেনি। ভানুভক্ত আচার্য নিজের রচনার মাধ্যমে এই অবমাননাকর চুক্তির বিরুদ্ধে জনসাধারণের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত করার জন্য সচেষ্ট হন। তিনি নিজের আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে অনুভব করেছিলেন যে একমাত্র আধ্যাত্মিকতাই পারে সাধারণ মানুষের মধ্যে আত্মশক্তি বৃদ্ধি করতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে।  সাধারণ মানুষের মধ্যে মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলার উদ্দেশ্যেই তিনি রামায়ণ অনুবাদ করেন। তাঁর এই মহান কাজ তাঁকে নেপালের জনমানসে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল। রামায়ণ ছাড়াও তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য অনুবাদ সাহিত্যগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘কান্তিপুরী নাগরী’, ‘এক মন চিত্তলাগাই চাকরী’, ‘গড়িয়া খোয়ামিত ইয়াস’, ‘গিরিধারী লে’, ‘বালাজি দেখান’, ‘রোজ রোজ দর্শন পাঞ্চু’ ভক্তমালা’ (১৮৫৩), ‘বধূশিক্ষা’ (১৮৬২), ‘রামগীতা’ (১৮৬৮) ইত্যাদি। ভানুভক্ত ছিলেন একজন সুদক্ষ সমালোচক। তৎকালীন সমাজের অসাম্য ও নেপালের রাজতন্ত্রের সমালোচনাও তিনি সুদক্ষভাবে উপস্থাপন করে গেছেন তাঁর রচনার মাধ্যমে। ন্যায়ের পক্ষে, সর্বদাই কোনো পক্ষপাতিত্ব না করে কেবলমাত্র জনসাধারণের মঙ্গলসাধনের উদ্দেশ্যেই তিনি রাজতন্ত্রের সমালোচনার মাধ্যমে তাঁর লেখনীকে স্বতন্ত্র করে গেছেন। রাজতন্ত্রের সমালোচনার কারণে তিনি রাজরোষের শিকার হন। কিছু কাগজপত্রে স্বাক্ষরজনিত কারণে, অন্যদিকে পরিবার ও আমলাতন্ত্রকে বিদ্রুপ করার জন্য ভানুভক্তের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির ঘটনা তাঁকে কারাগারে বন্দি করে। বন্দীদশায় নিজের এবং অন্য বন্দীদের মুক্তির আবেদন জানিয়ে  নেপালের প্রধানমন্ত্রী রাণার কাছে তিনি শ্লোক আকারে চিঠি লিখেছিলেন তা ‘প্রশ্নোত্তর মালা’ নামক একটি কাব্যের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর পরে। ১৮৫৩ সালে রচিত ‘প্রশ্নোত্তর মালা’ ভানুভক্তের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনাগুলির মধ্যে অন্যতম বলে বিবেচিত হয়। বন্দীদশায় তাঁর ভগ্ন শরীরে প্রতিনিয়ত মিথ্যে প্রতিশ্রুতির আশ্বাস তাঁকে মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত করে তোলে। অবশেষে তিনি কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন কিন্তু তারপর বেশিদিন বাঁচেননি তিনি।

ভানুভক্তের জীবদ্দশায় তাঁর কোনো সৃষ্টিই প্রকাশিত হয়নি বা তিনি কোনো স্বীকৃতিও পাননি। তাঁর মৃত্যুর পরে নেপালের অন্য এক বিখ্যাত কবি মতিরাম ভট্ট ১৮৯১ সালে ভানুভক্তের সমস্ত পাণ্ডুলিপি ও রচিত সাহিত্যগুলিকে প্রকাশ করেন। মতিরাম ভট্টই আচার্য ভানুভক্ত আচার্য কে নেপালের ‘আদি কবি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ১৯৫৫ সালে নেপালের তৎকালীন রাজা মহেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ একটি কমিশন গঠন করেন যেখানে নেপালের অন্য এক বিখ্যাত কবি বালকৃষ্ণ সামাকে কমিশনের নেতা নির্বাচন করেন। এই কমিশন আচার্য ভানুভক্তকে নেপালের সংস্কৃতিতে ব্যক্তিগত অবদানের জন্য ‘জাতীয় বীর’ আখ্যা দেন। নেপাল সরকার ভানুভক্তের জন্মদিন উপলক্ষ্যে ১৩ জুলাই তারিখে প্রতি বছর ‘ভানু জয়ন্তী’ পালন করে থাকেন। প্রতি বছর এই দিনে নেপালের সমস্ত সাহিত্যিক, লেখক ও সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা সাহিত্য সভা এবং সাংস্কৃতিক সম্মেলনের মাধ্যমে দিনটি উদযাপন করে থাকেন। নেপালের সঙ্গে ভারতের উত্তরাংশে দার্জিলিং ও সিকিমেও ‘ভানু জয়ন্তী’ মহাসমারোহের সাথে উদ্‌যাপন করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং-এর ম্যালে ভানুভক্তের একটি পূর্ণাবয়ব মূর্তি স্হাপন করা হয়েছে এবং সম্প্রতি নেপাল সরকার তাঁর স্মরণে দুটি ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে।

১৮৬৮ সালের ২৩ এপ্রিল নেপালের তানাহু জেলার সেতীঘাটে ভানুভক্ত আচার্যের মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন