সর্বকালের সেরা আমেরিকান বাস্কেটবল খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্ববিখ্যাত মাইকেল জর্ডন (Michael Jordan)। বাস্কেটবল মাঠের ক্রীড়াজীবন শেষ করে তিনি বর্তমানে একজন অন্যতম সফল ও ধনী ব্যবসায়ী। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে সমগ্র পৃথিবীতে ‘ন্যাশনাল বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশন’ (National Basketball Association)-কে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন তিনি। সমগ্র বিশ্বের একজন জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক আইকন হয়ে উঠেছিলেন মাইকেল জর্ডন। ন্যাশনাল বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশন বা এনবিএ আয়োজিত ১৫টি বাস্কেটবল সিজনে অংশ নিয়ে মোট ৬টি সিজনে শিকাগো বুলের পক্ষে পুরস্কার জিতেছিলেন তিনি। এনবিএ-এর শার্লট হর্নেটস-এর মুখ্য অধিকর্তা ও চেয়ারম্যান পদেও আসীন ছিলেন জর্ডন। বাস্কেটবল মাঠে তাঁর লাফানোর দক্ষতার কারণে ‘এয়ার জর্ডন’ বা ‘হিজ এয়ারনেস’ নামেও পরিচিত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৯৯ সালে ইএসপিএন-এর সমীক্ষায় বিশ শতকের সেরা উত্তর আমেরিকান অ্যাথলিটের মর্যাদা পেয়েছিলেন মাইকেল জর্ডন। এছাড়াও ২০০৯ ও ২০১০ সালে পরপর দুবার বাস্কেটবলের ‘হল অফ ফেম’ সম্মানে ভূষিত হন।
১৯৬৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্ক সিটির ব্রুকলিন শহরের ফোর্ট গ্রিনে মাইকেল জর্ডনের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম মাইকেল জেফ্রি জর্ডন। তাঁর বাবা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির পরিদর্শক জেমস আর জর্ডন সিনিয়র এবং তাঁর মা ডেলোরিস একজন ব্যাঙ্ক কর্মী। ১৯৬৮ সালে উত্তর ক্যারোলিনার উইলিমিংটনে চলে আসে জর্ডন পরিবার। পরবর্তীকালে ১৯৮৯ সালে জুইয়েনিতা নামে এক মহিলার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁদের তিনটি সন্তানও জন্ম নেয়। কিন্তু ২০০১ সালে তাঁদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে।
উইলমিংটনের এমস্লি ল্যানি এ হাই স্কুলে পড়াশোনা করেছেন মাইকেল জর্ডন। এই স্কুলে পড়াকালীনই বাস্কেটবল এবং ফুটবল খেলায় তাঁর দক্ষতা ফুটে ওঠে। প্রথমে ভার্সিটি বাস্কেটবল দলে যোগ দিলেও দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র হওয়ার দরুণ তাঁর খেলার সুযোগ ঘটেনি। বয়স অনুপাতে তাঁরই এক বন্ধু হার্ভেস্ট লিওরি স্মিথ তুলনায় লম্বা হওয়ার সুবাদে সেবারে বাস্কেটবল দলে সুযোগ পেয়েছিল সে। কিন্তু পরের বছর পুনরায় জর্ডন ভার্সিটির বাস্কেটবল দলে যোগ দেন এবং তখন তাঁর সুযোগ হয় খেলার। ক্রমেই ল্যানির জুনিয়র ভার্সিটি বাস্কেটবল দলের একজন তারকা খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন তিনি এবং ৪০ পয়েন্টের বহু খেলায় অংশ নিতে থাকেন তিনি। পরের বছর উচ্চতায় আরেকটু লম্বা হওয়ায় ভার্সিটি রোস্টারে খেলার সুযোগ পান মাইকেল জর্ডন এবং হাই স্কুল ম্যাচগুলির শেষ দুই মরশুমে প্রত্যেক ম্যাচে প্রায় ২৫ পয়েন্টেরও বেশি স্কোর করেন জর্ডন। ১৯৮১ সালে ম্যাকডোনাল্ডস অল আমেরিকান গেমে খেলার জন্য নির্বাচিত হন তিনি এবং প্রত্যেক ম্যাচে গড়ে ২৭ পয়েন্ট স্কোর করেন তিনি। ক্রমে তাঁর দক্ষতার জন্য উত্তর ক্যারোলিনা, দক্ষিণ ক্যারোলিনা, সিরাকিউজ, ভার্জিনিয়া ইত্যাদি অঞ্চলের বাস্কেটবল দলেও তাঁর ডাক আসতে থাকে। ১৯৮১ সালেই চ্যাপেল হিলের উত্তর ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বাস্কেটবল স্কলারশিপ অর্জন করেন এবং তার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক ভূগোল বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।
কলেজে পড়াকালীন প্রশিক্ষক ডিন স্মিথের দলে বাস্কেটবল খেলতে শুরু করেন মাইকেল জর্ডন। উত্তর ক্যারোলিনায় প্রথম মরশুমে ১৯৮২ সালের ‘আটলান্টিক কোস্ট কনফারেন্স’ অথবা এসিসি সংস্থার পক্ষ থেকে ‘রুকি অফ দ্য ইয়ার’ হিসেবে মনোনীত হন জর্ডন। তাঁর দল এসিসি চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে এবং ন্যাশনাল কলেজিয়েট অ্যাথলেটিক অ্যাসোসিয়েশনের চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়কে পরাজিত করে। একজন জুনিয়র হিসেবে দলের হয়ে গোল করার কৃতিত্ব অর্জন করেন মাইকেল জর্ডন। স্পোর্টিং নিউজ পত্রিকার পক্ষ থেকে মাইকেল জর্ডন ‘কলেজ প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার’ হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৮৪ সালে ‘জাতীয় বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশন’-এর হয়ে ‘শিকাগো বুলস’ দলে বাস্কেটবল খেলার জন্য মনোনীত হন জর্ডন। ১৯৮৪ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক বাস্কেটবল দলের সদস্য ছিলেন তিনি যে দল ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলসে স্বর্ণপদক জিতেছিল। ঠিক যে সময় ‘শিকাগো বুলস’-এ যোগ দেন মাইকেল জর্ডন, তখন এই দলের কৃতিত্বে খুব একটা বিজয়ীর রেকর্ড ছিল না। মাত্র ছয় হাজার অনুরাগী দর্শক ছিল সেই দলের। তাঁর ক্রীড়াশৈলী এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ মনোভাব, লাফানোর ক্ষমতা ইত্যাদির জন্য খুব দ্রুতই তিনি দর্শকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। প্রথম মরশুমেই তিনি অল-স্টার দলে জায়গা করে নেন এবং কিছু দিনের মধ্যেই ‘রুকি অফ দ্য ইয়ার’ শিরোপা অর্জন করেন মাইকেল জর্ডন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ১৯৮৫-৮৬ সাল নাগাদ পা ভেঙে যাওয়ায় প্রায় ৬৪টি ম্যাচে খেলতে পারেননি তিনি। পরে আবার মাঠে ফিরে বস্টন কেলটিক্সের বিপক্ষে ৪৯ পয়েন্ট স্কোর করেন তিনি। উইল্ট চেম্বারলিনের আগে মাইকেল জর্ডনই ছিলেন প্রথম বাস্কেটবল খেলোয়াড় যিনি একটিমাত্র সিজনে মোট ৩০০০ পয়েন্ট স্কোর করেন। ক্রমেই জর্ডন নিজের অন্যান্য দক্ষতা উন্নত করতে থাকেন এবং ১৯৮৮ সালে তাঁকে ‘ডিফেন্সিভ প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার’ অভিধায় ভূষিত করা হয়। তিনিই সেই সিজনে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে নির্বাচিত হন যিনি ‘লিগস মোস্ট ভ্যালুয়েব্ল প্লেয়ার’ হিসেবে বিখ্যাত হন। সেই বছরের অল-স্টার গেমেও ‘মোস্ট ভ্যালুয়েব্ল প্লেয়ার’ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। জর্ডনের পাশাপাশি স্কটি পিপেন, বিল কার্টরাইট, হোরেস গ্র্যান্ট প্রমুখ খেলোয়াড়দের নিয়ে এসে ‘শিকাগো বুলস’ দলকে আরো শক্তিশালী করে তোলেন তিনি। ১৯৯২ সালে মাইকেল জর্ডন ‘ড্রিম টিম’-এও খেলেছিলেন যে দল স্পেনের বার্সেলোনায় গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমসে অংশ নিয়েছিল। ১৯৯৩ সালে ‘শিকাগো বুলস’-এর পক্ষ থেকে পরপর তিনবার প্লে-অফ ‘মোস্ট ভ্যালুয়েব্ল প্লেয়ার’-এর শিরোপা পেয়েছিলেন মাইকেল জর্ডন। এই সময়পর্বেই জর্ডনের বাবা জেমস ডাকাতদের হাতে খুন হন এবং এই ঘটনা জর্ডনকে শোকগ্রস্ত করে তোলে। তাছাড়া মাইকেল জর্ডনের জুয়া খেলার অভ্যাসের কথা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ায় ঐ বছর অক্টোবর মাসে বাধ্য হয়ে পেশাদারি বাস্কেটবল থেকে স্বেচ্ছা-অবসর নেন তিনি। ততদিনে তিনটি টানা এনবিএ শিরোপা, তিনটি নিয়মিত সিজন মোস্ট ভ্যালুয়েব্ল প্লেয়ার শিরোপা, তিনটি প্লে-অফ শিরোপা এবং টানা সাতটি স্কোরিং শিরোনাম জিতেছিলেন মাইকেল জর্ডন। নয়টি মরশুমে তিনিই শিকাগো বুলস দলের সর্বকালের শীর্ষস্থানীয় স্কোরারের শিরোপা জিতেছিলেন তিনি।
১৯৯৪-৯৫ সালে তিনি আবার মাঠে ফেরেন এবং বার্মিংহাম ব্যারনস দলের হয়ে খেলেন। এই মরশুমে তিনি যখন পুনরায় স্থায়ীভাবে খেলতে শুরু করেন এবং শিকাগো বুলস দলে ফিরে আসেন, সেই সময় দর্শকরা তাঁর থেকে খুব বেশি কিছু আশা করেনি। কিন্তু সকলকে বিস্মিত করে নিজের দক্ষতা আবার প্রমাণ করেন তিনি। এই সময় লাইভ অ্যাকশন কার্টুন ছবি ‘স্পেস জ্যাম’-এর শ্যুটিং-এও নিয়মিত যোগ দিতেন তিনি। ক্রমে মাইকেল জর্ডন ২৫ হাজার পয়েন্ট স্কোর করার মাধ্যমে দশম এনবিএ খেলোয়াড় হিসেবে নির্বাচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে শিকাগো বুলস চতুর্থ এনবিএ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে নেয়। ১৯৯৬-৯৭ সালটা জর্ডনের জন্য অনেক কষ্টকর ছিল, একদিকে শারীরিক অবস্থার অবনতি আর অন্যদিকে মনোযোগের অভাবের কারণে শিকাগো বুলসের খেলার দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এনবিএ-এর শার্লট হর্নেটস-এর মুখ্য অধিকর্তা ও চেয়ারম্যান পদেও আসীন ছিলেন জর্ডন। বাস্কেটবল মাঠে তাঁর লাফানোর দক্ষতার কারণে ‘এয়ার জর্ডন’ বা ‘হিজ এয়ারনেস’ নামেও পরিচিত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৯৯ সালে ইএসপিএন-এর সমীক্ষায় বিশ শতকের সেরা উত্তর আমেরিকান অ্যাথলিটের মর্যাদা পেয়েছিলেন মাইকেল জর্ডন। এছাড়াও ২০০৯ ও ২০১০ সালে পরপর দুবার বাস্কেটবলের ‘হল অফ ফেম’ সম্মানে ভূষিত হন।
বাস্কেটবল খেলার পাশাপাশি একজন ব্যবসায়ী হিসেবেও তাঁর যথেষ্ট প্রতিপত্তি ও খ্যাতি ছিল। লাভজনক বিজ্ঞাপন, তাঁর নিজের গল্ফ কোম্পানি আর গল্ফ খেলার সরঞ্জামের ব্যবসা তাঁকে কোটিপতিতে পরিণত করেছে। ১৯৯৭ সালে তাঁকে বিশ্বের সবথেকে বেশি বেতনভুক অ্যাথলিটের মর্যাদা দেওয়া হয়। ক্রীড়ার ইতিহাসে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যার সঙ্গে বার্ষিক ৩ কোটি ডলার বেতনের চুক্তি করা হয়েছিল। তাছাড়া বিজ্ঞাপনের সাম্মানিক হিসেবে তিনি ৪ কোটি ডলার বার্ষিক চুক্তিতে সম্মত হয়েছিলেন।
১৯৯৯ সালে শেষবারের মত খেলা থেকে অবসর নেন মাইকেল জর্ডন। এর মধ্যে দিয়ে বাস্কেটবল খেলার ইতিহাস একটা যুগের সমাপ্তি ঘটে। ২০০০ সালে তিনি ওয়াশিংটন উইজার্ডের বাস্কেটবল অপারেশনের সহ-উদ্যোক্তার শিরোপা লাভ করেন। এর ফলে এনবিএ-এর উদ্যোক্তাদের মধ্যে তিনিই ছিলেন তৃতীয় আফ্রো-আমেরিকান। ঐ বছরই স্কুলে স্কুলে শিক্ষকদের সহায়তার জন্য ১০ লক্ষ ডলার সাহায্যের বন্দোবস্ত করেন মাইকেল জর্ডন। ‘ফোর্বস’ পত্রিকার তরফে এক সমীক্ষায় জানা যায় তাঁর সমগ্র ক্রীড়াজীবনে মাইকেল জর্ডন মোট ৯ কোটি ডলার বেতন হিসেবে উপার্জন করেছিলেন, কিন্তু নাইকি, হ্যান্স ইত্যাদি কোম্পানির বিজ্ঞাপনে কাজ করার সুবাদে তাঁর কর-ব্যতিরেকে মোট উপার্জন ছিল ১৮০ কোটি ডলার।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান