সববাংলায়

মতি নন্দী

মতি নন্দী (Moti Nandi) একজন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক যিনি মূলত বিখ্যাত খেলাকে কেন্দ্র করে লেখা তাঁর অসামান্য সাহিত্যকীর্তির জন্য। ‘ফাইট কোনি, ফাইট!’ এই একটি সংলাপই ক্রীড়াসাহিত্যিক হিসেবে অমর করে রেখেছে মতি নন্দীকে। কোনি তাঁর অত্যন্ত বিখ্যাত একটি উপন্যাস যা নিয়ে পরবর্তীকালে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র। তবে শুধুই আনন্দবাজার পত্রিকার ক্রীড়াসাংবাদিকতা কিংবা শিশু-কিশোরদের উপযোগী ক্রীড়াসাহিত্য রচনা নয়, বাংলা আধুনিক কথাসাহিত্যে বিংশ শতাব্দীর ভাঙা সমাজের-ফাঁপা মানুষের অস্তিত্বের সংকট ফুটে উঠেছিল তাঁর লেখায়। অসামান্য সাহিত্য সৃষ্টির কৃতিত্বের জন্য তিনি ‘আনন্দ পুরস্কার’ ও ‘সাহিত্য আকাদেমি’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। আনন্দবাজারের ক্রীড়া সাংবাদিক হয়ে তিনি ১৯৮০ সালে মস্কো অলিম্পিক, ১৯৮৪ সালে লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিকে এবং দিল্লি এশিয়ান গেমসেও প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং একসময় আনন্দবাজার পত্রিকার ক্রীড়া বিভাগের সম্পাদক পদেও উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

১৯৩১ সালের ১০ জুলাই উত্তর কলকাতার তারক চ্যাটার্জী লেনে মতি নন্দীর জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম মতিলাল নন্দী। তাঁর বাবা চুনীলাল নন্দী ছিলেন সরকারি চাকুরিজীবী। তাঁর মায়ের নাম মলিনাবালা দেবী। তাঁদের পূর্বপুরুষদের পদবি ছিল দে সরকার, কিন্তু মতি নন্দীর পিতামহই প্রথম পদবি বদলে ‘নন্দী’ লেখা শুরু করেন। মতি নন্দীর শৈশব-কৈশোর এবং যৌবন কেটেছে উত্তর কলকাতায় আর সেই কারণেই পুরোনো কলকাতা ও বাঙালির সনাতন আবেগ নিয়েই তিনি বেড়ে উঠেছেন। তাঁর নিজের মধ্যে বাঙালির ক্রীড়াপ্রবণতা পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। তিনি নিজেও খুব ভালো ফুটবল খেলতেন। যখন তাঁর সতেরো বছর বয়স, সেই সময় তাঁর বাবার মৃত্যু এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে মতি নন্দীর পরিবার কলকাতা থেকে হুগলির দশঘরা গ্রামে চলে আসে। যুদ্ধের আবহ থেকে মুক্তি পেয়ে গ্রামে প্রকৃতির কাছে এক অনাবিল সুখ ও সরল জীবনের স্বাদ পেয়েছিলেন মতি নন্দী যা তাঁর পরবর্তী সময়ের সাহিত্য রচনায় প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু প্রকৃতির এই সাহচর্য তিনি বেশি দিন উপভোগ করতে পারেননি, ম্যালেরিয়ার কারণে তিন্নি,গ্রাম ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হন। দেশভাগ, দাঙ্গা-বিধ্বস্ত কলকাতা তাঁকে যে যন্ত্রণা দিয়েছিল, তারই প্রতিচ্ছবি আমরা তাঁর রচনায় প্রত্যক্ষ করি।

দশ বছর বয়সে স্কটিশচার্চ স্কুলে মতি নন্দীর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় এবং এই বিদ্যালয় থেকেই ১৯৪৮ সালে ম্যাট্রিক ও ১৯৫০ সালে আই.এস.সি পাস করেন তিনি। ১৯৫১ সালে অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ডিপ্লোমা অর্জন করার পর ১৯৫৭ সালে কলকাতার মণীন্দ্রচন্দ্র কলেজ থেকে বাংলায় অনার্সসহ বি.এ পাস করেন। ১৯৫২ সালে স্টেট ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিতে অ্যাপ্রেন্টিস হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। কিন্তু বিনা পারিশ্রমিকে সেখানে খুব বেশি দিন কাজ করতে পারেননি তিনি।

১৯৫৭ সালে সাংসারিক জীবন শুরু করার পরে উর্পাজনের কারণে ১৯৬৯ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় ক্রীড়া-সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন মতি নন্দী। সেসময় প্রতি মঙ্গলবার আনন্দবাজারের ‘মাঠে ময়দানে’ ক্রোড়পত্রে তাঁর নিয়মিত লেখা প্রকাশ হত। খো-খো, কবাডি, সাঁতারের মতো বাংলার বিস্মৃতপ্রায় খেলাগুলিকে তিনি এই লেখার মধ্য দিয়ে প্রচারের আলোয় নিয়ে আসেন। বিভিন্ন খেলোয়াড়দের জীবনী তাঁর কলমেই কখনো সমালোচনার আকারে আবার কখনো তীব্র বিদ্রুপ-ভঙ্গিতে প্রকাশিত হয়। ক্রীড়া-সাংবাদিকতাকে নতুন এক উচ্চতা প্রদান করেছিলেন তিনি, সৃষ্টি করেছিলেন সাংবাদিকতার নতুন ভাষা। আনন্দবাজার পত্রিকার ক্রীড়া-সাংবাদিক হিসেবে তিনি ১৯৮০ সালে মস্কো অলিম্পিক, ১৯৮৪ সালে লস্ আ্যাজ্ঞেলেস অলিম্পিক এবং দিল্লি এশিয়ান গেমসেও প্রতিনিধিত্ব করেছেন। পরবর্তীকালে আনন্দবাজারের ক্রীড়া বিভাগের সম্পাদক পদে আসীন হয়েছিলেন মতি নন্দী। দীর্ঘ পঁচিশ বছর আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকার পরে ১৯৯৪ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য মতি নন্দী ‘কলকাতা স্পোর্টস জার্নালিস্ট’ ক্লাবের সভাপতিও ছিলেন।

তারক চ্যাটার্জী লেনে থাকাকালীন মতি নন্দী বিখ্যাত নাট্যকার মোহিত চট্টোপাধ্যায়, গায়ক ও সুরকার বিমান মুখ্যোপাধায় ও কবি শিবশম্ভু পালকে বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলেন। কবি শিবশম্ভু পাল একদিন তাঁকে ‘প্রবাহ সাহিত্য’ নামে এক সাহিত্য সভায় নিয়ে যান যেখানে সদস্যপদ পাওয়ার পর নিয়মিত তাঁর নিজের লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুরাগী মতি নন্দীর প্রথম গল্প ‘ছাদ’ প্রকাশ পায় দীর্ঘ চার বছর পরে ১৯৫৬ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় এবং সেই বছরই ‘পরিচয়’ পত্রিকায় ‘চোরা ঢেউ’ নামে আরেকটি গল্প প্রকাশ পায় তাঁর। ১৯৫৮ সালে ‘শারদীয়া পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় মতি নন্দীর সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘বেহুলার ভেলা’ যা বাংলার সাহিত্য অঙ্গনে তাঁকে লেখক হিসেবে বিরাট পরিচিত এনে দেয়। এরপর ‘অমৃত’ পত্রিকায় ১৯৬৯ সালে প্রকাশ পায় তাঁর ‘শূন্যে অন্তরীণ’ গল্পটি। এই সময়ে তিনি সাংবাদিক হিসেবেও কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। সাংবাদিকতার পেশায় থেকেও তাঁর সাহিত্যরচনায় কখনও ভাটা পড়েনি। তাঁর উপন্যাসগুলিতে তিনি ক্রীড়া জগতের বিভিন্ন দিক যেমন তুলে ধরেছেন তেমনি ধ্রুপদি সাহিত্যও রচনা করেছেন। তাঁর রচনার শিল্পনৈপুণ্যের গুণে ‘কোনি’, ‘স্ট্রাইকার’, ‘ননীদা নট আউট’, ‘জীবন অনন্ত’ ‘কলাবতী’ সিরিজ ইত্যাদি উপন্যাসের ক্রীড়া চরিত্রগুলি পাঠকমহলে জনপ্রিয় হয়েছে।

অন্য স্বাদের গল্পের মধ্যে মতি নন্দীর উল্লেখযোগ্য গল্পগুলি হল ‘সাদা খাম’, ‘গোলাপ বাগানে’, ‘উভয়ত সম্পূর্ণ’ বিজলীবালা’ ইত্যাদি। শিশু ও কিশোরদের প্রতি বিশেষ যত্নবান ছিলেন তিনি। তিনি বিশ্বাস করতেন সদ্য কৈশোরে পা রাখা ছেলে-মেয়েদের যদি ভালো গল্প উপহার দেওয়া যায়, তাহলে তাঁরা ভবিষ্যতে ভালো মানুষ তৈরি হবে। সেই লক্ষ্যেই তিনি কিশোরদের জন্য বহু ক্রীড়ামূলক সাহিত্য রচনা করে ক্রীড়া সাহিত্যকে এক অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিলেন যা ভবিষ্যতের লেখকদের কাছে দৃষ্টান্তস্বরূপ। তাঁর ধ্রুপদী সাহিত্যগুলিতে সম্পর্কের টানাপোড়েন, নারী-পুরুষদের অম্লমধুর সম্পর্ক, প্রেম, সমাজের বাস্তবতা, অর্থনীতির মত জটিল বিষয়গুলিও তাঁর সুনিপুণ লেখনীর গুণে সমৃদ্ধ হয়েছে। সমাজের পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায় যাঁরা প্রতিনিয়ত দারিদ্র্য আর অবহেলার শিকার তাঁরা উপযুক্ত প্রশিক্ষিত হলে নিজের প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে সক্ষম তা তিনি ‘কোনি’ উপন্যাসের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘কোনি’ গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে আমরা যাকে দেখি সে আসলে পিছিয়ে পড়া প্রতিভাবান সমাজেরই একটি মুখ। শত বাধা ও অপমান সত্ত্বেও তাঁর প্রতিভার বিচ্ছুরণ রোধ করা যায় না। অন্যদিকে ‘বেহুলার ভেলা’ গল্পের প্রধান চরিত্র প্রমথ। তাঁর চোখ দিয়েই তিনি উত্তর কলকাতার গলিজীবন বণর্না করেছেন মতি নন্দী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার পরিবর্তনের রূপরেখা ফুটে উঠেছে তাঁর রচনাগুলিতে। মতি নন্দীর রচনার চরিত্রেরা সকলেই কলকাতানিবাসী মধ্যবিত্ত বঙ্গসন্তান। স্বাধীনতা পরবর্তী কলকাতার রাজপথ থেকে গলিপথের জীবনের নিদারুণ জটিলতা, উত্তর কলকাতার গলির বাসিন্দাদের পারস্পরিক শ্রেণি-বৈষম্য স্হান পেয়েছে ‘জলের ঘুর্ণি ও বকবক শব্দ’ উপন্যাসটিতে। আবার তাঁর লেখা ‘কলাবতী’ সিরিজে আমরা দুটি বনেদি বাড়ির উপাখ্যান ও ক্রিকেট নিয়ে ভালোবাসার গল্প দেখতে পাই।

তাঁর জনপ্রিয় উপন্যাসগুলির মধ্যে অন্যতম হল ‘নায়কের প্রবেশ ও প্রস্হান’, ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘দ্বাদশ ব্যক্তি’, ‘দূরদৃষ্টি’, ‘জীবন্ত’, ‘ছায়া’, ‘নির্বাচিত গল্প’, ‘কপিল নাচছে’ ইত্যাদি। তাঁর নিজের আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘দ্বাদশ ব্যাক্তি’তে খেলার মাঠ ও জীবনের রূপরেখা একাকার হয়ে গেছে। দ্বাদশ ব্যক্তি ক্রিকেট খেলার সেই ব্যক্তি যে অতিরিক্ত হিসেবে থাকে এবং প্রয়োজনে দলের হয়ে খেলতে নামে। ব্যক্তিগত জীবনে নির্বাচিত হয়েও খেলতে না পারার যন্ত্রণা, জয় বা পরাজয়ে নিরুত্তর থাকা ফুটে ওঠে মতি নন্দীর এই উপন্যাসে। প্রত্যেকের মধ্যেই এমন এক ব্যক্তি থাকে যাকে একসময় নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করতেই হয়, সেই ব্যক্তিই মতি নন্দীর রচনায়-ভাবনায় ‘দ্বাদশ ব্যক্তি’ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। এইভাবেই কলকাতার কথাকার হয়ে উঠেছেন মতি নন্দী।

তাঁর সমস্ত গল্প এবং উপন্যাসগুলি অধিকাংশই ‘আনন্দ পাবলিশার্স’ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়াও তাঁর ক্রীড়াসংক্রান্ত কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল ‘খেলার যুদ্ধ’, ‘ক্রিকেটের ডন’, ‘বিশ্বজোড়া বিশ্বকাপ’, ‘একটা ক্রিকেট’ ইত্যাদি নামে। ‘কোনি’ উপন্যাসটি ১৯৮৬ সালে সরোজ দে’র পরিচালনায় চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে এবং ক্ষিদ্দার ভূমিকায় সেখানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অসামান্য অভিনয় দর্শকমহলে জনপ্রিয় হয়। এছাড়াও ১৯৭৬ সালে ‘স্ট্রাইকার’ উপন্যাসকে কেন্দ্র করে আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয় যেখানে নামভূমিকায় অভিনয় করেন শমিত ভঞ্জ । ১৯৫৮ সালে তাঁর লেখা ‘ধুলোবালি মাটি’ পেয়েছিল ‘মানিক স্মৃতি’ পুরষ্কার। ১৯৭৪ সালে কৃতী সাহিত্যিক হিসেবে ‘আনন্দ পুরস্কার’ পান মতি নন্দী এবং পরে ১৯৯১ সালে ‘সাদা খাম’ উপন্যাস ‘সাহিত্য আকাদেমি’ পুরস্কারের সম্মান এনে দেয় মতি নন্দীকে। ২০০০ সালে শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ‘বাংলা আকাদেমি’ পুরস্কার লাভ করেন তিনি। সবশেষে ২০০২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘শরৎস্মৃতি’ পুরস্কারে সম্মানিত করেছে।

২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি মতি নন্দীর মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading