ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাস আলোচনা করতে বসলে দেখা যাবে, তার একটি বৃহৎ অংশ জুড়ে রয়েছে মহম্মদ আলি জিন্নাহ (Muhammad Ali Jinnah)। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নেপথ্যের মূল কান্ডারি ছিলেন। আইনজীবী হিসেবে পেশাজীবন শুরু করে তারপর রাজনীতিতে তাঁর পদার্পণ। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একজন ঘনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন, তারপর কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে যান। ভারতে মুসলিম রাজনীতির ভিতকে শক্ত করবার চেষ্টা করেন। মুসলিম লীগ দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বেই মুসলমানদের জন্য স্বাধীন এক রাষ্ট্রের দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল। পাকিস্তান সৃষ্টি হলে সেই দেশের প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁকে পাকিস্তানের ‘বাবা-ই-কওম’ বা জাতির পিতা বলা হয়ে থাকে। স্ট্যানলি ওলপার্ট তাঁকে পাকিস্তানের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা বলে উল্লেখ করেছিলেন।
১৮৭৬ সালের ২৫ ডিসেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বোম্বে প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত করাচি শহরের (বর্তমানে যা পাকিস্তানে অবস্থিত) কাছে ওয়াজির ম্যানশনের দোতলায় একটি ভাড়ার অ্যাপার্টমেন্টে মহম্মদ আলি জিন্নাহর জন্ম হয়েছিল। জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয়েছিল মাহোমেদালি জিন্নাহভাই (Mahomedali Jinnahbhai)। তাঁর পিতা ছিলেন জিন্নাহভাই পুঞ্জা এবং তাঁর মায়ের নাম মিঠিবাই। জিন্নাহর পিতা ছিলেন একজন গুজরাটি বণিক, যিনি পানেলি গ্রামের একটি তাঁতি পরিবারে জন্মেছিলেন। পুঞ্জা এবং মিঠিবাই ১৮৭৫ সালে করাচিতে চলে যাওয়ার আগে বিবাহ করেছিলেন। জিন্নাহ তাঁদের দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন। জিন্নাহর আরও তিনটি ভাই এবং তিনটি বোন ছিল।
যাই হোক, জিন্নাহ কিন্তু তাঁর মাতৃভাষা গুজরাটিতে কিংবা উর্দুতে খুব একটা সাবলীল ছিলেন না, বরং ইংরেজি ভাষায় দারুণ পারদর্শী ছিলেন। জিন্নাহ বোম্বেতে তাঁর এক পারিবারিক আত্মীয়ের কাছে ছিলেন কিছু সময় এবং সেখানে গোকল দাস তেজ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ক্যাথিড্রাল অ্যান্ড জন কনন স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন। আবার করাচিতে তিনি সিন্ধ-মাদ্রাসা-তুল-ইসলাম এবং খ্রিস্টান মিশনারি সোসাইটি হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন। বোম্বে ইউনিভার্সিটি থেকে জিন্নাহ ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। জিন্নাহের শৈশব নিয়ে আবার অনেক গল্প প্রচলিত রয়েছে। তিনি নাকি অবসর সময় পুলিশ কোর্টে কাটাতেন এবং বিচারকার্য মন দিয়ে শুনতেন। দারুণ মনোযোগের সঙ্গে তিনি অধ্যয়ন করতেন, কখনও কখনও নাকি রাস্তার আলোতেও পড়াশোনা করতেন। এমনকি তিনি শিশুদের ধুলোবালিতে মার্বেল খেলে গা-হাত-পা অপরিচ্ছন্ন করার বদলে ক্রিকেট খেলতে বলতেন।
এক নজরে মহম্মদ আলি জিন্নাহ-র জীবনী:
- জন্ম: ২৫ ডিসেম্বর, ১৮৭৬
- মৃত্যু: ১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৮
- কেন বিখ্যাত: পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পিছনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন এবং পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল হন। আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন ও পরে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। কংগ্রেসের একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন পরবর্তী কালে মুসলিম লীগের প্রধান নেতা ছিলেন।
- স্বীকৃতি: মহম্মদ আলি জিন্নাহকে পাকিস্তানের ‘বাবা-ই-কওম’ বা জাতির পিতা বলা হয়ে থাকে। স্ট্যানলি ওলপার্ট তাঁকে পাকিস্তানের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা বলে উল্লেখ করেছিলেন।
১৮৯২ সালে জিন্নাহর পিতার একজন ব্যবসায়িক সহযোগী ফ্রেডরিক লে ক্রফ্ট জিন্নাহকে তাঁর ফার্মের সাথে লন্ডনে শিক্ষানবিশির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। জিন্নাহ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেন। লন্ডনে যাওয়ার পূর্বে তিনি এমিবাই জিন্নাহকে বিবাহ করেন। লন্ডনে থাকাকালীন জিন্নাহর মা এবং স্ত্রী দুজনেরই মৃত্যু হয়। ১৮৯৩ সালে জিন্নাহ-পরিবার বোম্বেতে চলে আসে। লন্ডনে এসে আইন অধ্যয়নে মনোনিবেশ করে জিন্নাহ ফার্মের শিক্ষানবিশি ছেড়ে দেন। পরবর্তীতে লন্ডনের লিংকনস ইন-এ অধ্যয়নের জন্য প্রবেশ করেন। পিউপিলেজ পদ্ধতিতে জিন্নাহর আইনি শিক্ষা চলে। আইন সম্পর্কে আরও সম্যক জ্ঞানার্জনের জন্য বইয়ের পাশাপাশি তিনি বিখ্যাত আইনজীবীদেরও অনুসরণ করতেন। এইসময়ে তিনি নিজের নাম করে নেন মহম্মদ আলি জিন্নাহ। তিনি ইউরোপে বেন্থাম, মিল, স্পেন্সার, কমতে-র চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে গণতান্ত্রিক জাতির ধারণা আত্মস্থ করেন। দাদাভাই নওরোজির ভক্ত হয়ে ওঠেন তিনি। রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদেও পাশ্চাত্য প্রভাব পড়তে থাকে। কিছুদিন আবার সেখানে আইন থেকে সরে গিয়ে একটি শেক্সপীয়রীয় কোম্পানির সঙ্গে মঞ্চের কাজে নামেন। যদিও পিতার কঠোর চিঠি পেয়ে সেখান থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। ১৮৯৫ সালে মাত্র ১৯ বছরে ইংল্যান্ডের বারে ডাক পাওয়া সর্বকনিষ্ঠ ব্রিটিশ ভারতীয় ছিলেন জিন্নাহ। এরপরই করাচিতে ফিরে আসেন, সেখান থেকে অল্প সময় পরেই চলে যান বোম্বে।
২০ বছর বয়সেই বোম্বেতে ব্যারিস্টারি শুরু করেন তিনি। জিন্নাহ ছিলেন তখন শহরের একমাত্র মুসলিম আইনজীবী। কর্মজীবনে একটি বাঁক আসে যখন অ্যাডভোকেট জেনারেল জন মোসলওয়ার্থ তাঁর সঙ্গে কাজ করবার জন্য জিন্নাহকে আমন্ত্রণ জানান। ১৯০০ সালে পিএইচ দস্তুর নামে একজন বোম্বাই প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট পদত্যাগ করলে জিন্নাহ অন্তর্বর্তী পদ পান। কিছু মাস পরে তাঁকে স্থায়ী পদের প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি তা বিনয়ের সঙ্গেই প্রত্যাখান করেন। ১৯০৮ সালের ককাস কেস পরিচালনা করে আইনজীবী হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। অবশ্য জনপ্রিয়তা তিনি তার আগেই অর্জন করেছিলেন, নতুবা ১৯০৫ সালে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত ভারতীয় নেতা বাল গঙ্গাধর তিলকের হয়ে লড়াই করবার জন্য তাঁকে নিয়োগ করা হত না।
আইন চর্চার পাশাপাশি কিন্তু জিন্নাহ রাজনীতিতেও উৎসাহী ছিলেন। ১৯০৪ সালের ডিসেম্বরে বোম্বেতে কংগ্রেসের বিংশতম বার্ষিক সভায় যোগদান করে প্রথম সক্রিয় রাজনীতিতে পদার্পণ করেন জিন্নাহ। কংগ্রেসের মধ্যপন্থী গোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন তিনি, এবং এই প্রথমদিকে জিন্নাহ হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পক্ষে ছিলেন। ১৯১০ সালে ষাট সদস্যের ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য হন। জিন্নাহ তখন বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, মুসলিম ওয়াকফ-ধর্মীয় দান-এর বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং স্যান্ডহার্স্ট কমিটিতে নিযুক্ত হয়েছিলেন, যা দেরাদুনে ভারতীয় সামরিক একাডেমি প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছিল।
১৯০৬ সালে সাম্প্রদায়িক বিবেচনায় মুসলিম লীগে যোগদান এড়িয়ে গেলেও ১৯১৩ সালে জিন্নাহ তাতে যোগদান করেন। ১৯১৩ এবং ১৯১৪ সালে জিন্নাহ কংগ্রেসের কাজেই লন্ডনে গিয়েছিলেন। ১৯১৬ সালে লক্ষ্ণৌতে লীগের অধিবেশনের সভাপতিও হন তিনি। ১৯১৬ সালে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে সংঘটিত লক্ষ্ণৌ চুক্তির মূল কান্ডারি ছিলেন জিন্নাহ। ১৯১৬ সালে হোমরুল লীগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি এবং অ্যানি ব্যাসান্ত ও তিলকের সঙ্গে ভারতের জন্য হোমরুল বা স্বশাসিত আধিপত্যের মর্যাদা দাবি করেন। তিনি মুসলিম লীগের বোম্বে প্রেসিডেন্সি বিভাগের প্রধান ছিলে। ১৯১৮ সালে জিন্নাহ রতনবাই পেটিট-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। অনেকের বিরোধিতা সত্ত্বেও এই বিবাহ করেন তাঁরা এবং পার্সি রতনবাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মারিয়াম নাম নেন, যদিও খুব একটা ব্যবহার করেননি কখনও। ১৯১৯ সালে জিন্নাহের একমাত্র সন্তান কন্যা দিনার জন্ম হয়।
১৯১৮ সালে গান্ধীজীর উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্কে ফাটল ধরতে থাকে জিন্নাহের। আসলে স্বাধীনতা লাভের পথ হিসেবে গান্ধীজীর অহিংসার পথকে মেনে নিতে পারেননি তিনি। গান্ধীর সত্যাগ্রহ অভিযানকে জিন্নাহ রাজনৈতিক নৈরাজ্য বলে মনে করতেন। ১৯২০ সালে জিন্নাহ কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন। মুসলিম লীগের সভাপতি হওয়ার পর, জিন্নাহ কংগ্রেসপন্থী দল এবং ব্রিটিশপন্থী উপদলের মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন।
রাজনৈতিক নানা কাজের কারণে তাঁদের বিবাহিত জীবনে ফাটল ধরেছিল। ১৯২৭ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। ১৯২৯ সালে রতনবাই-এর মৃত্যু হয়েছিল।
লন্ডনে গোল টেবিল সম্মেলনে জিন্নাহ গান্ধীজীর সমালোচনা করেন। অন্যদিকে মুসলিম লীগের অনৈক্যের কারণে হতাশ হয়ে রাজনীতি ছেড়ে তিনি লন্ডনে আইন অনুশীলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
আগা খান, চৌধুরী রহমত আলী এবং স্যার মুহম্মদ ইকবালের মতো বিশিষ্ট মুসলিম নেতারা জিন্নাহকে ভারতে ফিরে যেতে এবং পুনর্মিলিত মুসলিম লীগের দায়িত্ব নিতে রাজি করতে চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৩৪ সালে জিন্নাহ ফিরে আসেন এবং লিয়াকত আলী খানের সাহায্যে পার্টি পুনর্গঠন শুরু করেন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে লীগ একটি যোগ্য দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং মুসলিম ভোটারদের দৌলতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন দখল করে। জিন্নাহ কংগ্রেসের সঙ্গে জোটের প্রস্তাব দেন, তবে যেসব শর্ত দিয়েছিলেন তার সঙ্গে, সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, কংগ্রেসকে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে হবে এবং লীগকে ভারতের মুসলমানদের প্রতিনিধি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আলোচনা ব্যর্থ হয় এবং ১৯৩৮ সালে প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে সমস্ত কংগ্রেসম্যানের পদত্যাগকে হিন্দু আধিপত্য থেকে “মুক্তির দিন” হিসাবে ঘোষণা করেন জিন্নাহ।
১৯৩০-এর দশক থেকেই মুসলমানদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হতে থাকে। মুহম্মদ ইকবাল, চৌধুরী রহমত আলি প্রমুখ এই স্বতন্ত্র একটি রাষ্ট্রের পক্ষে সওয়াল করতে থাকেন। জিন্নাহ নিজেও মুসলমানদের অধিকার রক্ষার জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। জিন্নাহ বিশ্বাস করতেন হিন্দু ও মুসলিম, এই দুই জাতির মধ্যে অপূরণীয় পার্থক্য রয়েছে। এই ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গিই ১৯৪০ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের উদ্ভবের নেপথ্যে সক্রিয় ছিল। জিন্নাহ ঘোষণা করে অখন্ড ভারত মুসলমিদের ক্রমে কোনঠাসা, প্রান্তিক করে দেবে এবং এমনকি হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে গৃহযুদ্ধও হতে পারে। ১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেশনে দ্বিজাতিতত্ত্বকে গ্রহণ করা হয় এবং ‘পাকিস্তান’ নামক স্বতন্ত্র রাষ্ট্র নির্মাণের উদ্দেশ্যই পার্টির প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গৃহীত হয়। প্রস্তাবটি কংগ্রেস সরাসরি প্রত্যাখান করে। ১৯৪৩ সালের ২৬ জুলাই জিন্নাহকে হত্যার চেষ্টায় চরমপন্থী খাকসার সদস্যদের ছুরিকাঘাত ও আহত করা হয়।
১৯৪১ সালে ‘ডন’ নামে একটি পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন জিন্নাহ, যা ছিল লীগের মুখপাত্র এবং সেই পত্রিকার দ্বারাই নিজের চিন্তাভাবনাগুলি ছড়িয়ে দিতেন তিনি। জিন্নাহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছিলেন এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন। এই সময়কালে, লীগ প্রাদেশিক সরকার গঠন করে এবং কেন্দ্রীয় সরকারে প্রবেশ করে।
ভারতের গণপরিষদের জন্য ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস হিন্দু নির্বাচকমণ্ডলীর আসনগুলিতে এবং লীগ মুসলিম নির্বাচকমণ্ডলীর আসনগুলিতে জয়লাভ করে। ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ে আলোচনার জন্য ব্রিটিশ ক্যাবিনেট মিশন ভারতে আসে এবং ১৬ মে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করে, সেখানে স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশগুলি নিয়ে একটি অখন্ড ভারত গঠনের কথা বলা ছিল এবং ধর্মের ভিত্তিতে গঠিত প্রদেশগুলির কয়েকটি গোষ্ঠী গঠনের প্রস্তাব ছিল। ১৬ জুন দ্বিতীয় আরেকটি প্রস্তাবে ভারতকে বিভক্ত করার কথা ছিল। ভারতের খন্ডিত হওয়ার ভয়ে কংগ্রেস প্রথমে ১৬ মে প্রস্তাবের সমালোচনা করে এবং ১৬ জুনের প্রস্তাবকে প্রত্যাখান করে। প্রথমে জিন্নাহর নেতৃত্বে দুটি প্রস্তাবেই লীগ সমর্থন দিলেও পরে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল এবং বিধানসভা বয়কট করেছিল।
আরও উল্লেখ্য যে, উপরোক্ত কোন প্রস্তাবেই পাকিস্তান নামক স্বতন্ত্র রাষ্ট্র নির্মাণের কোন প্রসঙ্গ ছিল না, ফলে ১৬ আগস্ট পাকিস্তান অর্জনের জন্য জিন্নাহ ডিরেক্ট অ্যাকশন ঘোষণা করেন। এর কুফলই ছিল বাংলায় ছেচল্লিশের দাঙ্গা। ১৯৪৬ সালে লন্ডনে একটি সম্মেলনের পর লীগ অন্তর্বর্তী সরকারে প্রবেশ করে। তবে ক্রমে কংগ্রেস বুঝতে পারে বিভাজনই রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ এড়ানোর একমাত্র উপায়। কংগ্রেস ১৯৪৬ সালের শেষের দিকে ধর্মীয় ভিত্তিতে পাঞ্জাব ও বাংলাকে বিভক্ত করতে সম্মত হয়। নতুন ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন এবং ভারতীয় বেসামরিক কর্মচারী ভিপি মেনন একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছিলেন যেটি অনুযায়ী, পশ্চিম পাঞ্জাব, পূর্ববঙ্গ, বেলুচিস্তান এবং সিন্ধুতে একটি মুসলিম আধিপত্য তৈরি করবে। উত্তপ্ত এবং আবেগপূর্ণ বিতর্কের পর, কংগ্রেস পরিকল্পনাটি অনুমোদন করে। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে একটি গণভোটে পাকিস্তানে যোগদানের পক্ষে ভোট দেয়।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রথম গভর্নর জেনারেল হয়েছিলেন জিন্নাহ। বিপুল শরণার্থী সমস্যা মেটাতে তিনি অনেক শরণার্থী শিবিরের আয়োজন করলেও বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে যোগ দিলে এই যোগদানকে অবৈধ বলে মনে করেন জিন্নাহ। নতুন গঠিত রাষ্ট্রের উন্নতির দিকে নজর দিয়েছিলেন জিন্নাহ। কলেজ, সামরিক প্রতিষ্ঠান এবং পাকিস্তানের আর্থিক নীতি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পাকিস্তানকে একটি আধুনিক ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি। জিন্নাহ কিন্তু সহানুভূতিশীল, সহনশীল এক ধর্মের পক্ষপাতী ছিলেন। জিন্নাহ, নেহেরু ও গান্ধীর সাথেও সংঘাতের নয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের পক্ষে ছিলেন।
১৯৪০-এর দশক থেকেই যক্ষ্মা রোগে ভুগছিলেন জিন্নাহ। ১৯৪৮ সালে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হতে শুরু করে। অবশেষে যক্ষ্মা এবং ফুসফুসের ক্যান্সারে ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর এই জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা মহম্মদ আলি জিন্নাহ-এর মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান