ইতিহাস

মুল্‌করাজ আনন্দ

মুল্‌করাজ আনন্দ

ইংরেজি ভাষার অন্যতম বিখ্যাত ভারতীয় লেখক হলেন মুল্‌করাজ আনন্দ (Mulkraj Anand)। তাঁর লেখায় বারেবারে ফুটে উঠেছে সনাতন ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় সমাজের দারিদ্র্যের ছবি। ভারতে অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান সাহিত্য রচনার দিকপাল হিসেবে আর. কে. নারায়ণ, আহমেদ আলির পাশাপাশি উচ্চারিত হয় মুল্‌করাজ আনন্দের নাম। তিনিই প্রথম ভারতীয় লেখক যিনি ইংরেজিতে সাহিত্য রচনা করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করতে সক্ষম হন। আধুনিক ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যের ধ্রুপদী ঘরানার উপন্যাস এবং ছোটোগল্পের মর্যাদা দেওয়া হয় তাঁর রচনাগুলিকে। দরিদ্র, সর্বহারাদের কষ্ট, দুর্দশার কারণ বিশ্লেষণের এক সূক্ষ্ম প্রয়াস লক্ষ করা যায় তাঁর প্রতিটি লেখায়। তাঁর লেখা ‘আনটাচেব্‌ল’ (১৯৩৫) নামের উপন্যাসটিই ভারতীয় দরিদ্র নিরন্ন সমাজের হয়ে প্রচলিত সমাজব্যবস্থার প্রতি এক তীব্র জেহাদ। তাছাড়াও ‘কুলি’ (১৯৩৬), ‘টু লীভস্‌ অ্যাণ্ড এ বাড’ (১৯৩৭) তাঁর লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ দুই উপন্যাস। ইংরাজি ভাষায় তাঁর হাত ধরেই প্রথম পাঞ্জাবি ও হিন্দুস্তানি প্রবাদ-প্রবচন স্থান পেতে থাকে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানে ভূষিত হয়েছেন মুল্‌করাজ আনন্দ।

১৯০৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের অন্যতম কেন্দ্রীয় শহর পেশোয়ারে (অধুনা পাকিস্তান) মুল্‌করাজ আনন্দের জন্ম হয়। তাঁর বাবা লালচাঁদ পেশায় ছিলেন একজন সৈনিক এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল ঈশ্বর কউর। তাঁর বাবা সম্প্রদায়গত ও বৃত্তিগত দিক থেকে ঠাঠিয়ার সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যাদের প্রধান বৃত্তি ছিল তামা ও রূপোর কাজ করা। লালচাঁদ তাঁর বংশ পরম্পরাগত পেশা ত্যাগ করে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে সিপাহি হিসেবে যোগ দেন। অনেক ছোটো বয়স থেকেই ভারতের দরিদ্র সমাজের কষ্ট-দুর্দশা উপলব্ধি করতে পারতেন তিনি। বাল্যকাল থেকেই ধর্ম আর জাত-পাতের বেড়াজালে নিম্নবিত্ত মানুষের যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল যা তাঁকে লিখতে অনুপ্রাণিত করেছিল। পাঞ্জাবের মাটিতেই বাল্যকালের বেশিরভাগ সময়টা কেটেছে তাঁর। বাল্যবয়সে একজন বিবাহিত মুসলিম নারীর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন আনন্দ। তিনিই ছিলেন আনন্দের প্রথম দিককার লেখার প্রেরণা। ইতিমধ্যে একজন মুসলিমের সঙ্গে খাবার ভাগ করে খাওয়ায় তাঁদের পরিবারেরই এক আত্মীয়কে সমাজে একঘরে করে দেওয়া হয় এবং আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়। এই ঘটনা প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত করে তোলে আনন্দকে আর তাঁর এই রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাঁর লেখায়।

১৯২০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাশ করে অমৃতসরের খালসা কলেজে ভর্তি হন আনন্দ। তারপর ১৯২৪ সালে অমৃতসরের খালসা কলেজ থেকে মুল্‌করাজ আনন্দ স্নাতক উত্তীর্ণ হন। কলেজে পড়াকালীন ১৯২১ সালে গান্ধীজি পরিচালিত অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কারণে তাঁকে কারাবাসও করতে হয়েছিল কিছুদিনের জন্য। ১৯২৫ সালে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স সহ পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাশ করেন তিনি। এরপরে তিনি ইংল্যাণ্ডে রওনা দেন। ইংল্যাণ্ডে একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করার পাশাপাশি ইউনিভার্সিটি কলেজ লণ্ডনে স্নাতক স্তরে ভর্তি হন তিনি। পরে লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে পি.এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন আনন্দ ১৯২৮ সালে। তাঁর গবেষণায় বিষয় ছিল ‘ইংরেজ অভিজ্ঞতাবাদী ও বার্ট্রাণ্ড রাসেল’। এই প্রতিষ্ঠানে বৃত্তি নিয়ে জন লক, জর্জ বার্কলে, ডেভিড হিউম প্রমুখ বিখ্যাত সব দার্শনিকদের বিষয়ে পড়াশোনা করেন তিনি এবং অধ্যাপক ডয়েস হিক্‌স-এর অধীনে গবেষণা শুরু করেন। ঠিক এই সময়েই তিনি ব্লুমসবেরি গ্রুপের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন। বৌদ্ধিক সহযোগিতা বিষয়ে জেনেভায় রাষ্ট্রসংঘের আন্তর্জাতিক কমিটিতেও তিনি এই সময় নানারূপ বক্তব্য রেখেছিলেন। ইংল্যাণ্ডে থাকাকালীন প্রত্যক্ষভাবে আনন্দ বামপন্থী রাজনীতির দিকে মনোনিবেশ করেন।

প্রথাগত পড়াশোনা শেষ করে টি.এস এলিয়টের সাহিত্য বিষয়ক সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘দ্য ক্রাইটেরিয়ন’-এ কাজ করতে শুরু করেন মুল্‌করাজ আনন্দ। এর মধ্য দিয়েই তাঁর সাহিত্যজীবনও সূচিত হয়। তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস ‘আনটাচেবল্‌স’ প্রকাশ পায় ১৯৩৫ সালে আর এই প্রথম উপন্যাসের মধ্য দিয়েই ভারতীয় সাহিত্য জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন আনন্দ। এই উপন্যাসে দেখা যায় একজন শৌচাগার-পরিষেবক বাক্‌খার জীবনের এক বিশেষ দিনের ঘটনা যেখানে একজন উচ্চবর্ণের মানুষের উপরে হঠাৎ হুমড়ি খেয়ে পড়ায় তাঁকে কত না অপমান-গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে। ফলে বাক্‌খা তাঁর এই অস্পৃশ্য জন্মের জন্য নিজেকে অপরাধী ভাবতে থাকে এবং এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্য এক মিশনারীর কাছে যায়। ক্রমে দুজন ভারতীয়র মুখ থেকে সে গান্ধীজির এই অস্পৃশ্যতা দূরীকরণের সম্পর্কে মনোভাব বিষয়ে কথাবার্তা শুনতে পান। সমগ্র উপন্যাস জুড়ে বাক্‌খার উপরে অস্পৃশ্যতার কুপ্রভাবের কথাই ফুটে উঠেছে। এই উপন্যাসেই সর্বপ্রথম ইংরেজি ভাষার সঙ্গে পাঞ্জাবি ও হিন্দুস্তানি কথ্য বুলির মিশ্রণ ঘটতে দেখা যায় যা ভারতীয় সাহিত্যে এক অভিনব অধ্যায় সূচিত করে। ক্রমে মুল্‌করাজ আনন্দ হয়ে ওঠেন ভারতীয় সাহিত্যের চার্লস ডিকেন্স। ‘আনটাচেবল্‌স’ উপন্যাসটির প্রস্তাবনা লিখেছিলেন তাঁর সুহৃদ ই. এম. ফরস্টার। টি. এস. এলিয়টের পত্রিকায় কাজ করার সময়েই তাঁর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে আনন্দের। ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে আনন্দ যখন লণ্ডনে ছিলেন, সে সময় ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য তিনি প্রত্যক্ষভাবে প্রচারপত্র লিখে দিতেন। এই সময়ের মধ্যে ব্রিটিশ লেবার পার্টি এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ঘটে। ১৯৩৯ সালে লণ্ডন কাউন্টি কাউন্সিল অ্যাডাল্ট এডুকেশন স্কুলে দর্শন পড়াতে শুরু করেন আনন্দ। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় তিনি স্পেনে একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যান এবং সৈনিকের বদলে একজন দক্ষ সাংবাদিকের ভূমিকায় সমস্ত সংবাদ সংগ্রহ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে লণ্ডনের টিভি চ্যানেল বিবিসি-র হয়ে তিনি স্ক্রিপ্ট লিখতেন। এখানেই কাজ করতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে জর্জ অরওয়েলের। ১৯৪২ সালে প্রকাশিত হয় মুল্‌করাজ আনন্দের একটি উপন্যাস ‘দ্য সোর্ড অ্যাণ্ড দ্য সিক্‌ল’ যার ভূয়সী প্রশংসা করেন জর্জ অরওয়েল। ১৯৪৭ সালে স্থায়ীভাবে ভারতে ফিরে পূর্ণ সময়ের জন্য সাহিত্য সাধনায় মনোনিবেশ করেন তিনি। যদিও তার আগেই অধিকাংশ উপন্যাস তাঁর প্রকাশিত হয়ে গেছে। ভারতে বসে লেখা তাঁর মাত্র দুটি উপন্যাস হল – ‘কুলি’ (১৯৩৬) এবং ‘দ্য প্রাইভেট লাইফ অন অ্যান ইণ্ডিয়ান প্রিন্স’ (১৯৫৩)। ১৯৬০ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে আনন্দ সাহিত্য ও চারুকলা বিষয়ের রবীন্দ্র-অধ্যাপকের পদে আসীন ছিলেন এবং ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ভারতের ললিতকলা অ্যাকাডেমির চারুকলা বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন মুল্‌করাজ আনন্দ।

আজীবন বামপন্থী সমাজতান্ত্রিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন আনন্দ। ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে লন্ডনে থাকার সময় গভীরভাবে প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত হন আনন্দ। ভারতে প্রগতিশীল লেখক সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন মুল্‌করাজ আনন্দ এবং তাঁর সাহায্যেই এই সংঘের ইস্তাহার লেখা হয়েছিল প্রথম। সমাজতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন হওয়ার কারণে মার্ক্সবাদ, বামপন্থী রাজনৈতিক চেতনা ইত্যাদি বিষয়ে বহু লেখা লিখেছেন তিনি।

তাঁর লেখা উপন্যাসগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘কুলি’ (১৯৩৬), ‘টু লীভস্‌ অ্যাণ্ড এ বাড’ (১৯৩৭), ‘দ্য ভিলেজ’ (১৯৩৯), ‘অ্যা ক্রস ব্ল্যাক ওয়াটারস’ (১৯৪০), ‘দ্য সোর্ড অ্যাণ্ড দ্য সিকল’ (১৯৪২)। ১৯৫১ সালে ‘সেভেন সামারস’ নামে সাতটি উপন্যাসের একটি ধারাবাহিক রচনা প্রকাশ করেন আনন্দ যেখানে সাতটি পর্যায়ে আনন্দ তাঁর আত্মজীবনী লিখতে চেয়েছেন। এই ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্যায় ‘মর্নিং ফেস’ প্রকাশ পায় ১৯৬৮ সালে যা ১৯৭১ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হয়। এরপর একে একে প্রকাশ পেতে থাকে এই ধারাবাহিকের অন্য পর্যায়গুলি – ‘কনফেশান অফ এ লাভার’ (১৯৭৬), ‘বাব্‌ল’ (১৯৮৪), ‘লিট্‌ল প্লে’স অফ মহাত্মা গান্ধী’ (১৯৯০) এবং ‘নাইন মুডস অফ ভারত’ (১৯৯৯)। উপন্যাসের পাশাপাশি প্রচুর ছোটোগল্পও লিখেছেন তিনি। আনন্দের বিখ্যাত গল্পগ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখ্য – ‘দ্য লস্ট চাইল্ড অ্যাণ্ড আদার স্টোরিস’ (১৯৩৪), ‘দ্য বার্বারস ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাণ্ড আদার স্টোরিস’ (১৯৪৪), ‘দ্য পাওয়ার অফ ডার্কনেস অ্যাণ্ড আদার স্টোরিস’ (১৯৫৯), ‘বিটুইন টিয়ারস অ্যাণ্ড লাফটার’ (১৯৭৩)। এছাড়া তিনি দুটি বইতে ভারতীয় উপকথাগুলিকে নতুনভাবে বর্ণনা করেছিলেন যার মধ্যে অন্যতম ‘ইণ্ডিয়ান ফেয়ারি টেলস’ (১৯৪৬)। ১৯৪৬ সালেই মুল্‌করাজ আনন্দ নিজের সম্পাদনায় একটি চারুকলার পত্রিকা প্রকাশ করেন ‘মার্গ’ নামে।

১৯৫২ সালে সাহিত্যকর্মের মধ্যে দিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে শান্তি স্থাপনের প্রয়াসকে স্বীকৃতি জানিয়ে ওয়ার্ল্ড পীস কাউন্সিল মুল্‌করাজ আনন্দকে ‘আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কার’-এ সম্মানিত করে। ১৯৬৭ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তিনি পদ্মভূষণ পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৭৮ সালে কনফেশান অফ এ লাভার উপন্যাসের জন্য আনন্দ ৩০০০ টাকা মূল্যের ই. এম. ফরস্টার স্মৃতি পুরস্কারে ভূষিত হন।

২০০৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ৯৮ বছর বয়সে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মুল্‌করাজ আনন্দের মৃত্যু হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়