ইতিহাস

আর.কে.নারায়ণ

বিংশ শতকের একজন সুবিখ্যাত লেখক ছিলেন আর.কে.নারায়ণ (R.K.Narayan), যিনি তাঁর অসাধারণ লেখনী দিয়ে ইংরেজি সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। দক্ষিণ ভারতের একটি কাল্পনিক শহর ‘মালগুড়ি’র উপরে লেখা তাঁর কাহিনীগুলি আজও পাঠকমহলে সুপরিচিত। ইংরেজি সাহিত্যের সর্বকালের সেরা তিনজন লেখকের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।

১৯০৬ সালের ১০ই অক্টোবর তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত ভারতের মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সী (অধুনা তামিলনাড়ু রাজ্যের চেন্নাই)-র এক হিন্দু পরিবারে আর.কে.নারায়ণের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম ছিল রসিপুরম কৃষ্ণস্বামী আইয়ার নারায়ণস্বামী (Rasipuram Krishnaswami Iyer Narayanaswami)। তাঁর বাবার নাম রসিপুরম ভেঙ্কটরাম কৃষ্ণস্বামী আইয়ার ও মায়ের নাম ছিল জ্ঞানাম্বল। বাবা ছিলেন একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। আট ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন নারায়ণ। তাঁর এক ছোট ভাই রামচন্দ্রন ছিলেন জেমিনি স্টুডিওর সম্পাদক এবং আর এক ছোট ভাই লক্ষণ ছিলেন ব্যঙ্গচিত্রশিল্পী (cartoonist)। পরবর্তীকালে ২৮ বছর বয়সে নারায়ণের বিবাহ হয় রাজম নামে এক মহিলার সঙ্গে। এই দম্পতির হেমা নামে একটি কন্যাসন্তান ছিল। কিন্তু বিবাহের পাঁচ বছর পরই টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হয়ে নারায়ণের স্ত্রীর মৃত্যু হয়। বাকি জীবনে নারায়ণ আর বিবাহ করেননি।

বাবার কাজের জন্য ঘন ঘন বদলির প্রয়োজন হওয়াতে শৈশবের কিছু অংশ আর.কে.নারায়ণ তাঁর দিদিমা পার্বতীর সঙ্গে কাটিয়েছিলেন। এই সময়ে তিনি দিদিমার কাছ থেকে গণিত, ভারতীয় পুরাণের কাহিনী, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করেছিলেন। দিদিমা তাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘কুঞ্জাপ্পা’। এখানে থাকাকালীন একটি ময়ূর ও একটি দুষ্টু বানর ছিল তাঁর প্ৰিয় বন্ধু এবং সারাদিনের খেলার সঙ্গী। নারায়ণ ছিলেন একজন আগ্রহী পাঠক। তিনি চার্লস ডিকেন্স, ওয়েডহাউস, আর্থার কোনান ডয়েল ও টমাস হার্ডি পড়ে বড় হয়েছেন।
দিদিমার কাছে থাকার সময় নারায়ণ মাদ্রাজের কয়েকটি স্কুলে পড়েছিলেন, যার মধ্যে আছে লুথেরান মিশন স্কুল, সি.আর.সি হাই স্কুল এবং ক্রিশ্চিয়ান কলেজ হাই স্কুল। তাঁর বাবা যখন মহারাজা কলেজ হাই স্কুল-এ বদলি হয়ে আসেন, নারায়ণ নিজের পরিবারের সঙ্গে থাকার জন্য মাইসোরে চলে যান। বিদ্যালয়ের সুসজ্জিত পাঠাগারের পাশাপাশি তাঁর বাবার দ্বারাও তাঁর পড়ার অভ্যাসটি অনুপ্রাণিত হয়েছিল এবং তিনি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে লেখালেখিও শুরু করেছিলেন।

উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পাশ করার পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছিলেন। এরপর এক বছর বাড়িতে বসে পড়াশোনা ও লেখালেখি করার পর ১৯২৬ সালে তিনি পরীক্ষায় পাশ করেন ও মহারাজা কলেজে ভর্তি হন। চার বছর পর তিনি স্নাতক হন। এরপর এক বন্ধু তাঁকে বলেন যে স্নাতকোত্তরের পড়াশোনা তাঁর সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসাকে হত্যা করবে। এই কথা শুনে তিনি তাড়াতাড়ি একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজে ঢুকে পড়েন। কিন্তু ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাঁকে শারীরশিক্ষার শিক্ষকের জায়গা নেওয়ার অনুরোধ করলে তার প্রতিবাদে নারায়ণ ইস্তফা দেন। এই অভিজ্ঞতা নারায়ণকে উপলব্ধি করিয়ে দেয় যে তাঁর জন্য একমাত্র সঠিক পেশা হল লেখালেখি, এবং তিনি বাড়িতে বসে উপন্যাস লেখার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত লেখাটি ছিল ‘ডেভেলপমেন্ট অফ মেরিটাইম লজ অফ সেভেন্টিন্থ সেঞ্চুরি ইংল্যান্ড’ (Development of Maritime Laws of 17th-Century England) নামে একটি বইয়ের পর্যালোচনা। তিনি মাঝে মাঝেই স্থানীয় ইংরেজি সংবাদ পত্র ও পত্রিকাতে বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতে থাকেন। যদিও তাঁর আয় খুব বেশি ছিল না, কিন্তু নারায়ণের বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের লোকজন তাঁর এই প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানিয়েছিল।

তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস ছিল ‘স্বামী অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’। নারায়ণের কাকা এই বইটির বিরূপ সমালোচনা করেছিলেন এবং কয়েকজন প্রকাশকও এটিকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। নারায়ণের ছোটবেলার কিছু কাহিনী নিয়ে বইটি রচিত হয়েছিল। এখানেই নারায়ণ ‘মালগুড়ি’ নামক কাল্পনিক শহরটি তৈরি করেছিলেন। তাঁর বিবাহের পরে নারায়ণ মাদ্রাজের একটি পত্রিকা ‘দ্য জাস্টিস’-এর সাংবাদিক হিসেবে যোগদান করেন। এই পত্রিকাটি স্থানীয় ব্রাহ্মণদের অধিকৃত ছিল। এই সময় তিনি অক্সফোর্ডের এক বন্ধুর কাছে ‘স্বামী অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ বইটির পান্ডুলিপি পাঠান এবং সেই বন্ধুটি গ্রাহাম গ্রীনকে সেই পান্ডুলিপি দেখান। গ্রাহাম গ্রীনের সহযোগিতায় ১৯৩৫ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। গ্রীন নারায়ণকে তার নাম সংক্ষিপ্ত করারও পরামর্শ দিয়েছিলেন যাতে এটি ইংরেজীভাষী পাঠকদের কাছে বেশি স্বীকৃত হয়।
নারায়ণের দ্বিতীয় বই ‘দ্য ব্যাচেলার অফ আর্টস’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে। এই বইটিতে তাঁর কলেজের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণিত আছে এবং এর মূল বিষয় হল দুটি বিদ্রোহী কিশোর-কিশোরীর কথা। এর পরের বছর প্রকাশিত হয় তাঁর তৃতীয় উপন্যাস ‘দ্য ডার্ক রুম’। বৈবাহিক কলহ নিয়ে আলোচনা করা এই বইটিতে বিয়ের পর কীভাবে এক মহিলা অত্যাচারিত হয় তা দেখানো হয়েছে। চতুর্থ বই ছিল ‘দ্য ইংলিশ টিচার’, যা ছিল একটি আত্মজীবনীমূলক রচনা। নারায়ণের জীবনের বিভিন্ন ঘটনার উপর ভিত্তি করেই বইটি রচিত হয়েছিল। কিন্তু চরিত্রগুলির জন্য ছিল আলাদা আলাদা নাম এবং কাল্পনিক শহর ‘মালগুড়ি’তে ছিল এর প্রেক্ষাপট।

১৯৪০ সালে আর.কে.নারায়ণ ‘ইন্ডিয়ান থট’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। তাঁর কাকার সাহায্যে তিনি গোটা মাদ্রাজ শহরে প্রায় এক হাজার জন গ্রাহক সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু নারায়ণের পরিচালনায় অক্ষমতার কারণে মাত্র এক বছর পরেই এটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৪২ সালে নারায়ণের লেখা প্রথম ছোটগল্পের সংকলন প্রকাশিত হয়, যার নাম ছিল ‘মালগুড়ি ডেস’। ১৯৪৭ সালে তিনি জেমিনি স্টুডিওর চলচ্চিত্র ‘মিস মালিনী’র জন্য চিত্রনাট্য রচনা করেন। এটি ছিল তাঁর লেখা একমাত্র চিত্রনাট্য। তাঁর বইয়ের বিক্রি ভালো হতে থাকায় ১৯৪৮ সালে নারায়ণ মাইসোরের উপকন্ঠে নিজস্ব বাড়ি তৈরির কাজ শুরু করেন, যা শেষ হয় ১৯৫৩ সালে। এই বছরই মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি প্রেস প্রথম বারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর লেখা প্রকাশ করে। ১৯৫৬ সালে তিনি রকফেলার ফেলোশীপ (Rockefeller Fellowship) নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান। এখানেই নারায়ণের সঙ্গে তাঁর বন্ধু ও পরামর্শদাতা গ্রাহাম গ্রীনের দেখা হয়।

এর পরবর্তী বছরগুলিতে আর.কে.নারায়ণ আরো অনেকগুলি বই প্রকাশিত হয়। যার মধ্যে আছে, ‘দ্য ম্যান-ইটার অফ মালগুড়ি’, ‘গডস, ডেমনস অ্যান্ড আদারস’, ‘দ্য ভেন্ডর অফ সুইটস’, ‘এ হর্স অ্যান্ড টু গোটস’, ‘দ্য এমারেল্ড রুট’, ‘এ রাইটার্স নাইটমেয়ার’, ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অফ নাগরাজ’, ‘দ্য গ্র্যান্ডমাদারস টেল’ ইত্যাদি। এছাড়াও তিনি ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারতের অনুবাদ করেছিলেন যা প্রকাশিতও হয়েছিল। প্রবন্ধ লেখাতেও তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তাঁর লেখা কয়েকটি প্রবন্ধের নাম, ‘নেক্সট সানডে’, ‘মাই ডেটলেস ডায়েরি’, ‘মাই ডেস’ প্রভৃতি।
আর.কে.নারায়ণের কিছু কাহিনী থেকে চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছিল। তাঁর লেখা বই ‘দ্য গাইড’ থেকে তৈরি হয়েছিল ‘গাইড’ নামক ছবিটি। পরিচালনা করেছিলেন বিজয় আনন্দ। তৈরি হয়েছিল একটি ইংরেজি সংস্করণও। কিন্তু মূল কাহিনী থেকে বিচ্যুতির কারণে খুশি হতে পারেননি নারায়ণ। তিনি ‘লাইফ’ নামক পত্রিকায় চলচ্চিত্রটির সমালোচনা করে ‘দ্য মিসগাইড গাইড’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। ‘মিস্টার সম্পথ’ নামের কাহিনীটি একই নাম দিয়ে চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়েছিল। অভিনয়ে ছিলেন পদ্মিনী ও মতিলাল এবং প্রযোজনা করেছিল জেমিনি স্টুডিও। নারায়ণের আরো একটি উপন্যাস ‘দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপার্ট’ থেকে তৈরি হয়েছিল কন্নড় ভাষার চলচ্চিত্র ‘ব্যাঙ্কার মারগায়া’। ‘স্বামী অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’, ‘দ্য ভেন্ডর অফ সুইটস’ এবং নারায়ণের আরো কিছু ছোটগল্প নিয়ে অভিনেতা-পরিচালক শঙ্কর নাগ তৈরি করেছিলেন একটি টিভি সিরিজ, ‘মালগুড়ি ডেস’। এই সিরিজের চিত্রনাট্য নারায়ণকে খুশি করেছিল এবং মূল কাহিনী থেকে বিচ্যুত না হওয়ার জন্য নারায়ণ পরিচালক ও প্রযোজকের প্রশ্ংসা করেছিলেন।

আর.কে.নারায়ণ তাঁর নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থা তৈরি করেছিলেন যার নাম ছিল ‘ইন্ডিয়ান থট পাবলিকেশন্স’, যেটি আজও চালু আছে।
সারা জীবনে আর.কে.নারায়ণ অজস্র পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন। ‘দ্য গাইড’ উপন্যাসের জন্য পেয়েছিলেন ‘সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার’। এই উপন্যাসটি যখন চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়েছিল, তখন নারায়ণ এর জন্য ‘ফিল্মফেয়ার পুরস্কার’ পেয়েছিলেন। ‘ব্রিটিশ রয়্যাল সোসাইটি অফ লিটারেচার’ তাঁকে ‘এ.সি. বেনসন’ পদক দিয়ে সম্মানিত করে। ভারত সরকার তাঁকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘পদ্মবিভূষণ’ ও তৃতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘পদ্মভূষণ’ প্রদান করে। ‘ইউনিভার্সিটি অফ লিডস’, ‘দিল্লি ইউনিভার্সিটি’ ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ মাইসোর’ তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। বেশ কয়েকবার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও তিনি এই পুরস্কার লাভ করতে পারেননি।

২০০১ সালের ১৩ই মে ৯৪ বছর বয়সে চেন্নাইয়ে আর.কে.নারায়ণের মৃত্যু হয়। ২০১৬ সালে নারায়ণের মাইসোরের বাড়িটিকে তাঁর সম্মানে একটি সংগ্রহশালায় রূপান্তরিত করা হয়েছে।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন