ইতিহাস

বেনিতো মুসোলিনি

ফ্যাসিবাদের জনক নামে পরিচিত বেনিতো আমিল্কারে আন্দ্রেয়া মুসোলিনি (Benitto Amilcare Andrea Mussolini) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ইতালির সর্বাধিনায়ক ছিলেন। বেনিতো মুসোলিনি বিশ শতকের ইউরোপে প্রথম ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২২ থেকে ১৯৪৩ পর্যন্ত তিনি ইতালির প্রধানমন্ত্রীর পদে বহাল থাকেন। একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরশাসনকে সাংবিধানিক মর্যাদায় উন্নীত করা মুসোলিনি একজন রাজনৈতিক সাংবাদিকও ছিলেন।তিনি ইতালিয়ান সোশালিস্ট পার্টির (Italian Socialist Party) মুখপত্র, অবন্তী (Avanti) নামের একটি ইতালিয়ান দৈনিকের হয়ে লিখতেন।এছাড়াও মুসোলিনি একজন সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবী তথা সুলেখক ছিলেন।

১৮৮৩ সালের ২৯ জুলাই মুসোলনির রোমাগনা’র (Romagna) ফোরলি প্রোভিন্সের (Province of Forli) একটি ছোট শহর দোভিয়া দি প্রেদাপ্পিও’তে (Dovia di Predappio) জন্ম হয়। তাঁর বাবা আলেজান্দ্রো মুসোলিনি (Alessandro Mussolini) ছিলেন একজন কামার এবং মা রোজা (Rosa) একজন স্কুল শিক্ষিকা।ছোট থেকেই মুসোলিনির জীবন কেটেছে প্রবল দারিদ্র্যের মধ্যে। তাঁরা একটি দু কামরার জরাজীর্ণ ঘরে বাস করতেন। বাল্যকাল থেকেই ভীষণ জেদি, অবাধ্য এবং আক্রমণাত্মক ছিলেন তিনি।গ্রামের স্কুলে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না বলে তাঁকে একটি আবাসিক বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু এক সহপাঠীকে পকেটছুরি দিয়ে আহত করায় তাঁকে সেখান থেকে বহিষ্কার করে ফোরলিম্পোপলি’তে (Forlimpopoli) গিউস কারদুচি স্কুলে (Giosue Carducci School)  পাঠানো হয়। সেখানেও এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর জন্য তাঁকে আবার বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু ছাত্র হিসেবে তিনি বেশ মেধাবী ছিলেন।কোনোরকম বাধা বিপত্তি ছাড়াই লাসেন বিশ্ববিদ্যালয় (University of Lausanne) থেকে তিনি তাঁর উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন।পরে তিনি শিক্ষকতাও করেন কিন্তু অচিরেই সেসব ছেড়ে ১৯০২ সালে সুইৎজারল্যান্ডে চলে যান।

সুইজারল্যান্ডে গিয়ে কোনো নির্দিষ্ট কাজের সন্ধান না পেয়ে তিনি জেনেভা (Geneva), ফ্রিবোর্গ, (Fribourg) বার্নে (Bern) পাথরশ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এই সময়েই তিনি সমাজতান্ত্রিক দার্শনিকদের লেখা পড়ে প্রভাবিত হন। সঙ্গে ছিল তাঁর বাবার সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার আদর্শ। ধীরে ধীরে তিনি সুইৎজারল্যান্ডের ইতালীয় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে ক্রমশ সক্রিয় হয়ে উঠতে থাকেন। লাভেনিয়ার দেল লাভোরেটর (L’Avvenire del Lavoratore) নামে একটি পত্রিকার সঙ্গে কাজ করা শুরু করেন, সভা আয়োজন, বক্তৃতা দেওয়া এসবের মাধ্যমেই ক্রমশ রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। এই সময় তাঁকে একাধিকবার জেলেও যেতে হয়েছিল। ১৯০৪ সালে তিনি আবার ইতালিতে ফিরে আসেন। ১৯০৯ সালে আবার ইতালি ছেড়ে চলে যান এবং স্থানীয় সমাজতান্ত্রিক দলের হয়ে কাজ করা শুরু করেন।দীর্ঘদিন তিনি মিলানে ছিলেন এবং ১৯১০ সালে নিজের শহর ফোরলিতে ফিরে এসে তিনি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র লোটা দি ক্লাসে’র (Lotta di Classe) সম্পাদনা করেন।

তিনি প্রচুর পড়াশোনা করতেন। নিজেকে বুদ্ধিজীবি বলে মনে করতেন।সোরেলের (Sorel) ইউরোপীয় দর্শন থেকে শুরু করে ফিলিপ্পো তোমাসো মারিনেত্তি (Filippo Tommaso Marinetti), গুস্তাভ হার্ভ, (Gustave Herve), এরিকো মালাতেস্তা (Errico Malatesta,), ফ্রেড্রিক এঙ্গেলস (Friedrich Engles), কার্ল মার্ক্স (Karl Marx) এর লেখা ছিল তাঁর পছন্দের তালিকায়।এই সময়েই লা ভোচে’তে (La Voce) প্রকাশিত হয় তাঁর ‘এল ট্রেন্টিনো ভেদুতো দা উন সোশালিস্তা’ ( Il Trentino Veduto da un Socialista)। জার্মান সাহিত্য বিষয়ক বেশ কিছু প্রবন্ধ লেখার পাশাপাশি তিনি কিছু ছোটগল্পও লেখেন। সান্তি করভাজা’র (Santi Corvaja) সঙ্গে যৌথভাবে লেখেন একটি উপন্যাস এল’আমান্তে দেল কার্ডিনেলঃ ক্লডিয়া পার্টিসেলা, রোমাঞ্জো স্টোরিকো (L’amante del Cardinale: Claudia Particella, romanzo storico)। উপন্যাসটি ট্রেন্টোর একটি সংবাদপত্র  ইল পোপোলো’তে (Il Popolo) ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। তিনি ফরাসি এবং জার্মান ভাষা শিখে নিৎজে (Nietzsche), শোপেনআওয়ার (Schopenhauer) এবং কান্টের (Kant) লেখা্র কিছু অংশ অনুবাদ করতেন।

ইতালিতে ফিরে আসার পরে আবার একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ পান। কিন্তু সেটিও ছেড়ে দিয়ে শ্রম কল্যাণ সমিতির কাজ, সাংবাদিকতা এবং চরমতান্ত্রিক রাজনীতির পথে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। এই সময়েই তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে র‍্যাশেল গুইদির (Rachele Guidi) সঙ্গে। র‍্যাশেল মুসোলিনির ছোট, স্যাঁতস্যাতে ঘরেই তাঁর রক্ষিতা হিসেবে থাকতে শুর্রু করেন। ১৯১৪ তে তিনি বিয়ে করেন তাঁর প্রথমা স্ত্রী ইদা দালসেরকে (Ida dalser) এবং ১৯১৫ সালে র‍্যাশেলকে। তাঁদের বিয়ের অল্পদিন পরেই মুসোলিনি পঞ্চম বারের জন্য গ্রেফতার হন। কিন্তু ততদিনে তিনি ইতালির একজন সমাজতান্ত্রিক নেতা হিসাবে পরিচিতি পেতে শুরু করেন।তাঁকে সমাজাতান্ত্রিক দলের মুখপত্র অবন্তী’র সম্পাদনার ভার দেওয়া হয়।

কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে তিনি তাঁর দলের বিরাগভাজন হয়ে পড়েন।যেখানে তাঁর দল যুদ্ধের বিরোধিতা করে, সেখানে মুসোলিনি যুদ্ধের পক্ষেই মত দেন।তিনি যুদ্ধের কারণ হিসেবে সমাজতান্ত্রিকতাকেই দায়ী করেন, এবং ইতালিয়ান সমাজতান্ত্রিক দলের বিরোধিতা করেন।তাঁর এই হস্তক্ষেপের জন্য তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলে মুসোলিনির মধ্যে একটি মূলগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তিনি শ্রেণী দ্বন্দ্বের পরিবর্তে বৈপ্লবিক জাতীয়তাবাদের পক্ষে কথা বলতে শুরু করেন।সমাজ পরিচালনার জন্য তিনি সর্বহারাদের পরিবর্তে সমাজের যেকোনো স্তরের বিপ্লবী সৈন্যদলের চাহিদার ওপর জোর দিতে থাকেন। রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে ১৯১৪ তে মুসোলিনি একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্ম দেন, যাঁর নাম, ফ্যাসি রিভলিউজিওনারি দ’আজিওন ইন্টারনাজিনালিস্তা (Fasci Rivoluzionari d’Azione Internazionalista)। এই আন্দোলনের প্রতিনিধিরা নিজেদের ফ্যাসিস্ট (Fascists) বলে সম্বোধন করতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনি প্রায় নয় মাস সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে মুসোলিনির মধ্যে সমাজতান্ত্রিকতার খুব সামান্য অংশই খুঁজে পাওয়া যায়। ক্রমশ ফ্যাসিজমকেই তিনি একমাত্র পথ বলে দাবি করতে শুরু করেন। দুই বছরের মধ্যে ফ্যাসিস্টিরা রোমে একটি আলোচনাসভায় জাতীয় ফ্যাসিস্ট দল (National Fascist party) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।১৯২২ সালের ২৭ থেকে ২৮ শে অক্টোবরের মধ্যে একটা গোটা রাতে প্রায় ৩০,০০০ ফ্যাসিস্ট মানুষ রোমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লুইগি ফাক্তা’র (Luigi facta) পদত্যাগ এবং ইতালিতে নতুন ফ্যাসিস্ট সরকার গঠনের দাবিতে একজোট হন। এরপর, রাজা তৃতীয় ভিক্টর ইমানুয়েল (King Victor Emanuel III) ফাক্তা’র  সেনাশাসনের আবেদন খারিজ করে দিলে তিনি পদত্যাগ করেন, এবং রাজা ইতালির শাসনভার মুসোলিনির হাতে তুলে দেন।

প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন মুসোলিনি গোটা ইতালিতে একচ্ছত্র স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।এই আন্দোলনকে সমাজের কোনো নির্দিষ্ট স্তরে সীমাবদ্ধ না রেখে মুসোলিনি সমগ্র জাতির জন্য উন্মুক্ত করে দেন। তাঁর একনায়কতন্ত্রে ইতালির সমস্ত গণমাধ্যমকে নিজের ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন ঘটানোর মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করেন।ইতালিতে বিকল্প রাজনৈতিক দল গঠন বা অবস্থানের স্বাধীনতা কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে ওঠে। এর পাশাপাশি তিনি ইতালিতে পুলিশী রাজ কায়েম করেন।একনায়কতন্ত্র দ্বারা ইতালির গনতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকতাকে ধুলিস্যাৎ করে মুসোলিনি ১৯২৫ সালে ‘ইল দুচে’ (Il Duce) উপাধি নেন, যার অর্থ হলো নেতা। মুসোলিনির গোপন পুলিশদের সংস্থার নাম ছিল অর্গানাইজাজিওন পার লা ভিজিলাঞ্জা এ লা রিপ্রেজিওন দেল’অ্যান্টিফ্যসিমো,ওভরা (Organizzazione per la Vigilanza e la Repressione dell’Antifascimo, OVRA). ১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ওভরা’র কাজ ছিল ইতালিতে ফ্যাসিজম বিরোধী কার্যকলাপকে সমূলে উৎখাত করা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাসিজম বিরোধী শক্তিগুলির দ্বারা বারবার ইতালি পরাস্ত হতে থাকে। ইতালিতে মুসোলিনির একছত্র একাধিপত্য এবং পরাক্রম ক্রমশ মলিন হয়ে আসতে থাকে। ১৯৪৩ সালের জুলাইতে ইতালির রাজা মুসোলিনিকে পদচ্যুত করেন এবং তাঁকে গৃহবন্দী করা হয়। ১৯৪৫ সালের ২৫ এপ্রিল, রক্ষিতা ক্লারা পেটাচ্চি (Clara Petacci) এবং কিছু সহযোগীসহ সুইজারল্যান্ডে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন মুসোলিনি। তার ঠিক দুদিন পরে ধরা পড়েন, এবং তার পরের দিন অর্থাৎ ২৮ এপ্রিল, ক্লারা এবং তাদের সমস্ত সহযোগী সহ মুসোলিনিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁদের মৃতদেহ মিলান শহরের রাস্তায় প্রকাশ্যে আনা হলে ইতালির সাধারণ মানুষ মৃতদেহগুলির ওপরেই নিজেদের ক্ষোভ উগরে দেন।    

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।