ইতিহাস

নবীনচন্দ্র দাশ

নবীন চন্দ্র দাশ

বাঙালির রসনাতৃপ্তিতে রসগোল্লা আবিষ্কার করে বিখ্যাত হন নবীনচন্দ্র দাশ (Nabin Chandra Das)। একজন বাঙালি মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারী, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা হিসেবেই মূলত পরিচিত ছিলেন তিনি। উনিশ শতকে নবজাগরণের সময়কালে নবীনচন্দ্রের হাত ধরেই বাংলায় মিষ্টান্ন প্রস্তুতের ক্ষেত্রে নবজাগরণ ঘটেছিল। বাংলা তথা সমগ্র বিশ্বের রসনায় রসগোল্লাকে অন্তর্ভুক্ত করার কৃতিত্ব তাঁরই প্রাপ্য। পর্তুগিজদের থেকে শেখা দুধ কাটিয়ে ছানা তৈরি করার কৌশল প্রয়োগ করে নবীনচন্দ্র রসগোল্লা তৈরি করে সমগ্র বাংলা তথা বিশ্বকে এক অভিনব মিষ্টির সন্ধান দিয়েছিলেন। এই কারণেই নবীনচন্দ্রকে  ‘রসগোল্লার কলম্বাস’ নামেও আখ্যায়িত করা হয়। বাংলার এই কিংবদন্তি মিষ্টি প্রস্তুতকারী স্থানীয়দের কাছে ‘নবীন ময়রা’ হিসেবেও বিখ্যাত। রসগোল্লা ছাড়াও ‘বৈকুন্ঠ ভোগ’, ‘আতা সন্দেশ’, ‘কাঁঠাল সন্দেশ’, ‘আবার খাবো, ‘দেদো সন্দেশ’ ইত্যাদি বিখ্যাত মিষ্টান্নগুলিও নবীনচন্দ্রের অনন্য সৃষ্টি। 

১৮৪৫ সালে অবিভক্ত বাংলায় কলকাতার বাগবাজারে নবীনচন্দ্র দাশের জন্ম হয়। নবীনচন্দ্রের পূর্বপুরুষ চিনি প্রক্রিয়াকরণ ও তাঁর সঙ্গে জড়িত ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একসময়ে নবীনচন্দ্রের পুর্বপুরুষ ব্যবসায়ী হিসেবে যথেষ্ট সম্মানের অধিকারী ছিলেন। কিন্তু নবীনের জন্মের এক বছর পরেই তাঁদের ব্যবসার অবনতি হয় এবং তা বন্ধ হয়ে যায়। নবীনের জন্মের আগেই তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। তাঁর মা তাঁকে অত্যন্ত দারিদ্র্যের মধ্যে মানুষ করেছেন। পরবর্তীকালে বিখ্যাত কবিয়াল ভোলা ময়রার পৌত্রী ক্ষীরোদমণির সঙ্গে নবীনচন্দ্রের বিবাহ এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। মূলত ক্ষীরোদমণির উৎসাহেই নবীনচন্দ্র নতুন মিষ্টি আবিষ্কারের প্রতি মনোযোগী হয়ে পড়েন। তাঁদের একমাত্র পুত্রসন্তান কৃষ্ণচন্দ্র দাশ যিনি কে সি দাশ নামেই সর্বজনবিদিত, তাঁরও  ছিল বাবার মতোই নতুন মিষ্টি আবিষ্কারের ঝোঁক। তিনিই রসগোল্লাকে টিনবন্দি করে বিদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। রসগোল্লাকে দুধে ফেলে তৈরি করেন এক নতুন মিষ্টি ‘রসমালাই’। 

কলকাতার একটি মিশনারি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করলেেও দারিদ্র্যের কারণে তাঁর লেখাপড়ায় ইতি ঘটে। কিন্তু তাঁর নিত্যনতুন মিষ্টি আবিষ্কারের নেশাই তাঁকে আজ কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে। এছাড়াও তিনি মুখে মুখে ছড়া কাটতে পারতেন। নদীয়ার শান্তিপুরে নবীনের মায়ের এক আত্মীয় ইন্দ্র ছিলেন বিখ্যাত মিষ্টি প্রস্তুতকারী। তাঁদের দোকানের কাজে যুক্ত হয়ে নবীনচন্দ্রের কর্মজীবন শুরু হয়। তাঁরা অচিরেই শান্তিপুর থেকে কলকাতার বাগবাজারে এসে তাঁদের মিষ্টির দোকান খুলে ব্যবসা শুরু করেন। কলকাতায় আসার পরে ইন্দ্ররা নবীনের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। অপমানিত নবীন তাঁদের কাজ ছেড়ে মায়ের সঞ্চয় থেকে কিছু টাকা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে মিলে কলকাতার জোড়াসাঁকোর মাথাঘষা গলিতে নতুন দোকান খোলেন। কিন্তু অনভিজ্ঞ নবীন এবারও ব্যবসায় লোকসানের সম্মুখীন হয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দেন। অদম্য জেদ ও হার না মানা মনোভাব নিয়ে তাঁদের বসতবাটি সংলগ্ন বাগানটি বিক্রি করে মায়ের শেষ সম্বলটুকু দিয়ে বাগবাজারে আরও একটি দোকান খোলেন তিনি। কিন্তু এবারেও লোকসানের মুখ দেখেন নবীন। উচ্চবিত্ত বাবুমহল মাসকাবারি দোকানে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা একসঙ্গে বিল না হলে টাকা দিতেন না। ফলে নবীনের পক্ষে ধারে ব্যবসা করায় পুঁজিতে টান পড়তে শুরু করল। সেকালের সমাজে আরও একটি প্রথা প্রচলিত ছিল যারা জিলিপি, সিঙাড়া তৈরি করবে, তাঁরা সন্দেশ বা মিষ্টি তৈরি করতে পারবে না। কারণ দেবতার ভোগে এবং সমাজের উচ্চশ্রেণির লোকেদেরই অধিকার ছিল সন্দেশ খাওয়ার। নিম্নশ্রেণির মানুষেরা মিষ্টি বা সন্দেশ খাওয়া থেকে বঞ্চিত হতেন অর্থাভাবে। নবীনচন্দ্র তাঁর নতুন দোকানে নানা ধরনের সন্দেশ তৈরি করতে শুরু করেন। বেঁচে যাওয়া সন্দেশ তিনি সাধারণ মানুষ ও প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। অবিক্রিত মিষ্টির কিছুটা অংশ দিয়ে তিনি নিরন্তর নতুন মিষ্টি উদ্ভাবনের চেষ্টা চালাতেন। এইভাবেই জন্ম হয় ‘বৈকুন্ঠ ভোগ’, ‘আতা সন্দেশ’, ‘কাঁঠাল সন্দেশ’, ‘আবার খাবো’-র মতো মিষ্টিগুলি। নবীনচন্দ্রের তৈরি এই অভিনব মিষ্টিগুলি খুবই জনপ্রিয় হয়। সেই সময়ে বাংলায় প্রয়োজনের তুলনায় দুধের যোগান ছিল অতিরিক্ত। ব্যবহারের পর অতিরিক্ত দুধ গোয়ালারা ফেলে দিতেন। বাংলার বাইরের রাজ্যগুলিতে দুধ কাটানো ছানা থেকে মিষ্টান্ন প্রস্তুত করে তা ভগবানকে নিবেদন করা ছিল অন্যায়। মূলত এই কারণেই দুধ কাটিয়ে ছানা তৈরি করার পদ্ধতিও সেই যুগের ময়রারা জানতেন না। ১৮৬৮ সালে পর্তুগিজরা প্রথম দুধ কাটিয়ে ছানা তৈরি করার কৌশল আবিষ্কার করেন। নবীনচন্দ্র পর্তুগিজদের শেখানো ছানা তৈরির কৌশল শিখে ছানা দিয়ে রকমারি সন্দেশ প্রস্তুত করতে শুরু করেন। শুধু সন্দেশ তৈরি করেই তাঁর সৃজনশীলতা তৃপ্ত হয়নি, তিনি আরও নতুন কিছু আবিষ্কার করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। প্রতিনিয়ত তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলত। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল হিসেবে বেশ কিছু সন্দেশ নষ্টও হত। তাছাড়াও শুকনো সন্দেশের আরও একটি অসুবিধা হল তা গলায় আটকে যেত। নবীনের স্ত্রী ক্ষীরোদমণি তাঁর কাছে নতুন রসালো মিষ্টি তৈরির আবদার করতেন প্রতিনিয়ত যা খেতেও সুস্বাদু হবে অথচ গলায় আটকেও থাকবে না। নবীন স্ত্রীর আবদার ও নতুন রসালো মিষ্টি আবিষ্কারের নেশায় প্রায়ই তাঁর নিজস্ব মিষ্টির দোকানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতেন।

এমন একদিন নিছকই পরীক্ষামূলকভাবে ছানা দিয়ে সন্দেশ তৈরি করার সময়ে হাতের তালুতে ছানার গোল একটা বল বানিয়ে ফুটন্ত মিষ্টির সিরায় ফেলে দেন। কিছুক্ষণ পরে তা ফুলে উঠে আকারে দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং তা মুখে দিতেই গলে যায়। এইভাবেই ১৮৬৮ সালে জন্ম হয় রসগোল্লার। রসের মধ্যে পড়ে ছানার গোল্লাটি রসে টইটম্বুর হয়ে যায় বলে নবীনচন্দ্র এর নাম রাখেন ‘রসগোল্লা’। নবীনচন্দ্র রসগোল্লা আবিষ্কার করে তাঁর আশেপাশের মানুষদের খাইয়ে বাহবা পেয়েছিলেন। একদিন ব্যবসায়ী রায়বাহাদুর ভগবান দাস নবীনচন্দ্রের দোকানে আসেন তাঁর ছোট ছেলেটিকে নিয়ে। তাঁর ছোট ছেলেটি খুবই তৃষ্ণার্ত থাকায় নবীন তাঁর সদ্য আবিষ্কৃত রসগোল্লা দিয়ে ছোট ছেলেটিকে জল খেতে দেন। ভগবান দাসের ছেলেটি রসগোল্লা খেয়ে খুবই খুশি হয় ও আশ্চর্য হয়। মূলত ছোট ছেলেটির অভিব্যক্তিতে ভরসা করে ভগবান দাস তাঁর পরিবার ও বন্ধুদের জন্য নবীনচন্দ্রের রসগোল্লা নিয়ে যান। ভগবান দাসের হাত ধরেই নবীনচন্দ্রের রসগোল্লা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ভগবান দাসের কলকাতার ব্যবসায়িক মহলে যথেষ্ট প্রভাব ছিল। ফলে ‘রসগোল্লা’ দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল তথাকথিত বাবুমহলে। কিন্তু উচ্চবিত্তদের ঠাকুরঘরে রসগোল্লার প্রবেশাধিকার ছিল না। কারণ ফোটানো মিষ্টি ঠাকুরের ভোগে নিবেদন করা যায় কিনা সেই নিয়ে সংশয় ছিল প্রথম দিকে। অবশ্য বেশিদিন সেই বাধা টিকতে পারেনি রসগোল্লার পর্বতপ্রমাণ জনপ্রিয়তার সামনে। রসগোল্লা আবিষ্কারের মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত সকলের আয়ত্তের মধ্যে চলে আসে মিষ্টিটি। নবীনচন্দ্রের সারাজীবনের অন্বেষণ শেষ হয়। রসগোল্লার জনক  হিসেবে নবীনচন্দ্রের নাম দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তিনি শুধুমাত্র রসগোল্লা আবিষ্কার করেই ক্ষান্ত থাকেননি। তিনি চেয়েছিলেন সকলে এই অদ্ভুত মিষ্টির স্বাদ গ্রহণ করুক। সেই লক্ষ্যে তিনি তাঁর পরিচিত সকল মিষ্টি ব্যবসায়ীদের রসগোল্লা তৈরির প্রক্রিয়া হাতে-কলমে শেখাতে শুরু করেন। স্ত্রী ক্ষীরোদমণির অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি নিজের আবিষ্কারের স্বত্ব সংরক্ষিত করেননি। নবীনচন্দ্রকে ‘রসগোল্লার কলম্বাস’ নামেও আখ্যায়িত করা হয়। সেকালে তাঁকে নিয়ে একটা ছড়াও লকের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল – ‘বাগবাজারের নবীন দাশ / রসগোল্লার কলম্বাস’। নবীনচন্দ্রের রসগোল্লার খ্যাতি দেশ-বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর একমাত্র পুত্র কৃষ্ণচন্দ্র দাশ রসগোল্লাকে বিদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ১৯৩০ সালে টিনের ক্যানে রসগোল্লাকে প্যাকেটজাত করেন। বর্তমানে এই ‘ক্যানড রসগোল্লা’র চাহিদা প্রবলভাবে রয়েছে ইউরোপ এবং আমেরিকায়। রসনাতৃপ্তি ছাড়াও রসগোল্লা সকল বাঙালির কাছে আবেগের একটি স্থান দখল করে নিয়েছে।

২০১৪ সালে রসগোল্লার ভৌগোলিক নির্দেশিকা (জি আই ট্যাগ) নিয়ে উড়িষ্যার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের এক আইনি যুদ্ধ হয়। এক্ষেত্রে উড়িষ্যা সরকার দাবি করেন আনুমানিক ৬০০ বছর আগে পুরীতে জগন্নাথদেবকে রসগোল্লা ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হত। কিন্তু সেই রসগোল্লা তৈরি হত সুজি ও ময়দার মিশ্রণে যা নবীনচন্দ্রের আবিষ্কৃত রসগোল্লার মত দেখতে হলেও তাঁর স্বাদ ও রূপ ছিল আলাদা। বহু বির্তকের পরে ২০১৯ সালে বাংলাকে রসগোল্লা আবিষ্কারের জন্য জি আই ট্যাগ প্রদান করে ভারত সরকার। নবীনচন্দ্রের জীবনী নিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালক পাভেল ‘রসগোল্লা’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন যার নাম-ভূমিকায় অভিনয় করেন অভিনেতা উজান গাঙ্গুলী।

১৯২৫ সালে আশি বছর বয়সে কলকাতায় নবীনচন্দ্রের মৃত্যু হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

তথ্যসূত্র


  1. 'নবীন ময়রার রসগোল্লা', চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য, সাপ্তাহিক দেশ, ৫৪ বর্ষ ৩০ সংখ্যা, ২৩ মে ১৯৮৭, পৃষ্ঠা ৩৮ 
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. https://indianexpress.com/
  4. https://m.economictimes.com/
  5. https://www.anandabazar.com/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়