ভূগোল

নোয়াখালী জেলা

বাংলাদেশ ৬৪টি জেলাতে বিভক্ত। বেশিরভাগ জেলাই স্বাধীনতার আগে থেকে ছিল, কিছু জেলা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গঠিত, আবার কিছু জেলা একটি মূল জেলাকে দুভাগে ভাগ করে তৈরি হয়েছে মূলত প্রশাসনিক সুবিধের কারণে। প্রতিটি জেলাই একে অন্যের থেকে যেমন ভূমিরূপে আলাদা, তেমনি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও স্বতন্ত্র। প্রতিটি জেলার এই নিজস্বতাই আজ বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে। সেরকমই একটি জেলা হল নোয়াখালী জেলা (Noakhali)।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল হল নোয়াখালী জেলা যা একদা ভুলুয়া নামে পরিচিত ছিল। নোয়াখালী জেলা  সমগ্র বাংলাদেশে নারকেল নাড়ু, ম্যাড়া পিঠে ও খোলাজা পিঠের জন্য বিখ্যাত। ১৯৪৬ সালের রক্তাক্ত দাঙ্গা ইতিহাসে এই জেলাকে স্মরণীয় করে রেখেছে।  

বাংলাদেশের একটি অন্যতম জেলা নোয়াখালীর উত্তরে কুমিল্লা ও চাঁদপুর জেলা, দক্ষিণে মেঘনার মোহনা ও বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ফেনী ও চট্টগ্রাম জেলা, পশ্চিমে লক্ষ্মীপুরভোলা জেলা ঘিরে রয়েছে সমগ্র জেলাটিকে। রাজধানী ঢাকা থেকে এই জেলা প্রায় একশো ষাট কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। নোয়াখালী জেলার প্রধান নদী মেঘনা। এছাড়াও এই জেলার উল্লেখযোগ্য নদী হল ডাকাতিয়া ও ছোট ফেনী নদী। এই জেলায় বহু খাল রয়েছে যার মধ্যে নোয়াখালী খাল, কালির খাল, মধুখালি খাল, রহমতখালি খাল, আতিয়াবাড়ি খাল, আত্রা খাল, হুরা খাল, ভবানিগঞ্জ খাল, গাহজাতলি খাল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


নোয়াখালী জেলার আয়তন সমগ্র বাংলাদেশের প্রায় ৪২০২.৭০ বর্গ কিলোমিটার। ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জনসংখ্যার বিচারে নোয়াখালী সমগ্র বাংলাদেশে নবম জনবহুল জেলা। এই জেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩৩,৭০,২৫১ জন।  

নোয়াখালী জেলার প্রাচীন নাম ভুলুয়া। ঐতিহাসিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ত্রিপুরার পাহাড় থেকে প্রবাহিত ডাকাতিয়া নদীতে বন্যা হওয়ায় ভুলুয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভয়াবহভাবে প্লাবিত হয় এবং এই প্লাবনে অনেক ফসলি জমি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমন অবস্থা থেকে বাঁচার জন্য ১৬৬০ সালে একটি বিশাল খাল খনন করা হয় যার সাহায্যে জলের বিপুল প্রবাহকে ডাকাতিয়া নদী থেকে রামগঞ্জ, সোনাইমুড়ি ও চৌমুহনী হয়ে মেঘনা এবং ফেনী নদীর দিকে দিক ঘুরিয়ে প্রবাহিত করে দেওয়া হয়। এই নতুন খালটির নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় নাম হয় ‘নোয়া’ অর্থাৎ নতুন খাল। এর ফলে অঞ্চলটির নাম লোকমুখে বিবর্তিত হয়ে নোয়াখালী হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। ১৮৬৮ সালে ভুলুয়া জেলাকে নোয়াখালী জেলা হিসেবে নামাঙ্কিত করা হয়। 

ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে জানা যায় যে উনিশ শতাব্দীর শেষ ত্রিশ দশকে এই নোয়াখালী জেলার গোড়াপত্তন হয়েছিল। তবুও তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী কুমিল্লার একটি অংশ ছিল এই জেলা। নোয়াখালীর সাধারণ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে জানা যায় ১৮৩০ সালে ওয়াহাবি আন্দোলন ও ১৯২০ সালের খিলাফৎ আন্দোলনে এই জেলার স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা। ১৯৪৬ সালে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় যে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংগঠিত হয়েছিল তার প্রভাব পড়েছিল এই জেলাতেও যা ইতিহাসে ‘নোয়াখালী দাঙ্গা’ নামে পরিচিত। ১৯৪৬ সালের লক্ষ্মীপূজার দিনে মুসলমান আক্রমণকারীদের হাতে বহু হিন্দুর মৃত্যু হয়। সুরেন্দ্রনাথ বসু, রাজেন্দ্রলাল রায়চৌধুরীর মতো বিখ্যাত কংগ্রেসের নেতাদের হত্যা করে মুসলিম লিগের উগ্র সমর্থকেরা। ধর্ষণ, গণহত্যায় নোয়াখালী রক্তাক্ত হয়ে যায়। দাঙ্গা শুরু হওয়ার তিনদিনের মধ্যেই উভয়পক্ষের হানাহানিতে প্রায় চার হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং লক্ষাধিক মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। উদ্বাস্তু মানুষের ঢল পার্শ্ববর্তী কুমিল্লা, চাঁদপুরে পালিয়ে যেতে থাকে। একইসঙ্গে বহু হিন্দু নারী-পুরুষকে বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হয়। মহাত্মা গান্ধী দাঙ্গা-পরবর্তী পরিস্থিতি দেখার জন্য নোয়াখালী জেলায় এলে বর্তমান সোনাইমুড়ি উপজেলার জয়াগ নামক স্থানে তাঁর নামে একটি আশ্রম তৈরি হয় যা ‘গান্ধী আশ্রম’ নামে পরিচিত। গান্ধীজি ১১৭ মাইল পথ শধুমাত্র পায়ে হেঁটে দাঙ্গাবিধ্বস্ত বহু গ্রাম পরিদর্শন করেন। গান্ধীজির বহু চেষ্টাতেও সেসময় দাঙ্গার আগুন সম্পূর্ণ নেভেনি।

মুক্তিযুদ্ধের এক করুণ ইতিহাস আবর্তিত হয়েছে নোয়াখালীকে কেন্দ্র করে। ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর হাত থেকে স্বাধীন হয়েছিল এই জেলা। একটি গণকবর, একটি স্মৃতিস্তম্ভ আজও এই জেলার মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মোহাম্মদ রুহুল আমিনের স্মৃতি বহন করে চলেছে। বাংলাদেশের একমাত্র জেলা নোয়াখালী যার নিজের নামে কোনো শহর নেই। এর জেলা শহর ‘মাইজদী’ নামে পরিচিত যা এই জেলার সদর দপ্তর। 

নোয়াখালী জেলায় ‘বাংলা’ ভাষার ব্যবহার প্রচলিত হলেও এই জেলার একটি নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা রয়েছে, যেটি ‘নোয়াখাইল্লা ভাষা’ নামে পরিচিত। এই ভাষার নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। নোয়াখালী জেলার অধিকাংশ মানুষ এই ভাষায় কথা বলে থাকেন। 

এই জেলার ৯৫ শতাংশ মানুষই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। তবে এখানে কয়েকঘর হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের মানুষও থাকেন।

সমগ্র জেলাটি মোট নয়টি উপজেলায় বিভক্ত যেগুলি হল- কবিরহাট, কোম্পানিগঞ্জ, চাটখিল, নোয়াখালী সদর, বেগমগঞ্জ, সুবর্ণচর, সেনবাগ, সোনাইমুড়ি এবং হাতিয়া। এই জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে অধিকাংশই বাংলাদেশ আওয়ামী লিগের  শাসনাধীন। এছাড়াও প্রশাসনিক বিভাগের মধ্যে এখানে দশটি থানা, আটটি পৌরসভা এবং তিরানব্বইটি ইউনিয়ন রয়েছে।  

নোয়াখালী জেলার বেশিরভাগ মানুষ মৎস্য চাষের সঙ্গেই বেশি মানুষ জড়িত। বছরে একবারই শস্যোৎপাদন হয়ে থাকে এখানে। দেশের অর্থনীতির প্রায় চল্লিশ শতাংশই আসে এখানকার কৃষি থেকে। ধান, খেসারি, মুগ, আখ ইত্যাদি এখানকার প্রধান ফসল।

নোয়াখালী জেলার উল্লেখযোগ্য ভ্রমণস্থানের তালিকা অপূর্ণই থেকে যাবে যদি তালিকার শুরুতেই শহীদ ভুলু স্টেডিয়াম, বজরা শাহী মসজিদ, লুর্দের রাণীর গীর্জা, গান্ধী আশ্রম, ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, মাইজদী, নোয়াখালী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, চর জব্বর, নোয়াখালী জেলা জামে মসজিদ, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোহাম্মদ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর, সোনাইমুড়ী, শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের আশ্রম, চৌমুহনী নিঝুম দ্বীপের নাম না থাকে। এছাড়াও নোয়াখালীর  বিখ্যাত ঐতিহ্যপূর্ণ ‘নোয়াখালী পাবলিক লাইব্রেরী’র কথা না বললেই নয়। এই লাইব্রেরীটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৯৫ সালে। ১৯৪৪ সালে যখন নোয়াখালী শহর মেঘনার ভাঙ্গনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে বসেছিল সেইসময়ে লাইব্রেরীটি নোয়াখালীর প্রধান শহর মাইজদী কোর্টে স্থানান্তরিত হয়েছিল। ঐতিহ্যবাহী এই লাইব্রেরীতে বর্তমানে ব্রিটিশ ভারতের অনেক দুর্লভ বইের পাশাপাশি প্রায় কুড়ি হাজার বই আছে। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে অবস্থিত নোয়াখালী ড্রিম ওয়ার্ল্ড পার্ক এই জেলার অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র হিসাবে অত্যন্ত সুপরিচিত।

নোয়াখালী জেলায় জন্মগ্রহণ করা বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন শহীদ বীর শ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন। তাঁর সাহসিকতা, যুদ্ধে দক্ষতা ও স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। শহীদ বুদ্ধিজীবী এ. এন. এম. মুনীর চৌধুরী ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একজন অন্যতম লেখক যাঁর জন্মস্থান এই নোয়াখালী জেলা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী হবিবুর রহমান একাধারে মঞ্চ ও টেলিভিশন অভিনেতা, মঞ্চ নির্দেশক এবং লেখক আতাউর রহমান বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের একজন পথিকৃৎ। তাছাড়া বাংলা একাডেমি বইমেলার উদ্যোক্তা চিত্তরঞ্জন সাহা, গীতিকার-সুরকার-সংগীত পরিচালক-গায়ক এবং মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, শিক্ষাবিদ-প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক আবুল কালাম মোহাম্মদ কবীর, মরণোত্তর একুশ পদক প্রাপক সাহিত্যিক-সুরকার-সমাজকর্মী ও নোয়াখালী গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের সাবেক সেক্রেটারি ঝর্ণাধারা চৌধুরী, জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক প্রণব ভট্ট, দেশের প্রথম নারী স্পিকার ও রাজনীতিবিদ শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রাবন্ধিক-বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষক-শিক্ষাবিদ এবং বুদ্ধিজীবী মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী প্রমুখ ব্যক্তির নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য। 

নোয়াখালী জেলার একমাত্র উৎসব বলতে ফকির ছাড়ু মিজি সাহেবের দরগায় প্রতি বছর মাঘ মাসের এক তারিখে বিরাট মেলা বসে। প্রায় দুশো বছরের ঐতিহ্যবাহী এই মেলায় বহু দূর থেকে জনসমাগম ঘটে।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও