ইতিহাস

নস্ট্রাদামুস

বিশ্বের একজন জনপ্রিয় ফরাসি জ্যোতিষ্‌বিদ এবং চিকিৎসক নস্ট্রাদামুস (Nostradamus) তাঁর বহুল ভবিষ্যৎবাণীর জন্য আজও সমানভাবে বিখ্যাত। ভবিষ্যৎবক্তা হিসেবে বিশ্বের জনপ্রিয় ব্যক্তিদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় তিনি। ইতিহাসের কিছু বিখ্যাত ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ ভবিষ্যৎবাণী করে তিনি ইতিহাসে স্বনামধন্য হয়েছেন। ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে জার্মানির হিটলারের অভ্যুত্থান সবই তিনি বহু আগে থেকেই দেখতে পেয়েছিলেন এবং তদনুরূপ বক্তব্য রেখেছিলেন। বিশ্বের ইতিহাসের ভবিতব্য ঘটনাবলি সম্পর্কে লেখা তাঁর বই ‘দ্য প্রফেসিস’ই তাঁকে সারা বিশ্বে পরিচিতি দিয়েছিল।

১৫০৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর (মতান্তরে ২১ ডিসেম্বর) দক্ষিণ ফ্রান্সের সেন্ট-রেমি-ডি প্রদেশে নস্ট্রাদামুসের জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম মাইকেল ডি নস্ত্রাডেম (Michael De Nostradame)। তাঁর বাবা জম ডি নস্ত্রাডেম ছিলেন একজন শস্য বিক্রেতা এবং ইহুদি নোটারি। তাঁর মায়ের নাম রেনিয়ের ডি সেন্ট-রেমি। ফ্রান্সে সরকারি তদন্তের তথা ইনকুইজিশনের সময় তাঁর ঠাকুরদা গাই গ্যাসোনেট (Guy Gassonet) ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বন করেন এবং সেই থেকেই তাঁর পরিবার নস্ত্রাডেম পদবি গ্রহণ করে। মাইকেল নস্ত্রাডেম পরবর্তীকালে নস্ট্রাদামুস হিসেবে পরিচিত হন। তাঁর পিতা-মাতার মোট নয়টি সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।

খুব ছোটোবেলা থেকেই নস্ট্রাদামুসের বুদ্ধিমত্তা ছিল চোখে পড়ার মত। ছোটোবেলায় মামাতো দাদু জ্যঁ ডি সেন্ট-রেমির কাছে তিনি খুবই যত্নসহকারে পড়াশোনা শিখেছিলেন। এই সময় কিশোর নস্ট্রাদামুস ল্যাটিন, গ্রিক, হিব্রু ভাষা এবং গণিতের একেবারে প্রাথমিক বিষয়গুলি অধ্যয়ন করেন। ঐ বয়সেই তাঁর মামাতো দাদু ইহুদি ধর্মের বিভিন্ন ঐতিহ্য-সংস্কার, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং মহাজগতের নানা বিস্ময়কর তথ্য সম্পর্কে তাঁকে অবগত করেছিলেন। স্বর্গের ধারণা এবং সেখানকার দেবতারা কিভাবে মানবজীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে সেই সংক্রান্ত ধারণাও দিয়েছিলেন তাঁর দাদু যা নস্ট্রাদামুসের কিশোর বয়সের মননকে ঋদ্ধ করেছিল।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


নস্ট্রাদামুসের প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ সম্পূর্ণ হয়েছিল তাঁর দাদুর কাছেই। পরে চোদ্দ বছর বয়সে ইউনিভার্সিটি অফ অ্যাভিগনোনে ঔষধশাস্ত্র নিয়ে তিনি পড়াশোনা করা শুরু করেন। যদিও মাত্র এক বছর পরেই তাঁকে বাধ্য হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেশের বাড়ি ফিরে যেতে হয়, কারণ সে সময় সমগ্র ফ্রান্স জুড়ে দেখা দেয় বিউবনিক প্লেগ। নিজের বাড়ি ফিরে তিনি এই প্লেগের আয়ুর্বেদিক ঔষধ প্রস্তুতকারক হিসেবে কাজ করেছিলেন। বাইশ বছর বয়সে ঔষধশাস্ত্রে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের উদ্দেশে তিনি মন্টেপেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এই প্রতিষ্ঠানের ক্যাথলিক ধর্মগুরুরা তাঁর আগের ঔষধ-প্রস্তুতকারকের অভিজ্ঞতার কথা জেনে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাড়িয়ে দেন। তাছাড়া নস্ট্রাদামুসের জ্যোতিষবিদ্যার প্রতি আগ্রহকেও ক্যাথলিক ধর্মগুরুরা ভালোভাবে মেনে নেননি। আবার অন্য একটি তথ্য অনুযায়ী তাঁকে আদৌ বহিষ্কার করা হয়নি বরং ১৫২৫ সালে তাঁকে ঔষধ প্রস্তুতের অনুমোদন দেওয়ার কথা বলা হয়। মধ্যযুগীয় শিক্ষাব্যবস্থায় প্রচলিত প্রথা হিসেবে তিনি এই সময় তাঁর নাম পরিবর্তন করে ল্যাটিন ভাষায় নস্ত্রাডেম থেকে নস্ত্রাদামাসে পরিবর্তন করেন। ফ্রান্সে প্লেগ সংক্রমণের সময় তিনি দুটি চিকিৎসা সংক্রান্ত বই লেখেন। প্রথমটি হল একটি অনুবাদমূলক বই ‘গ্যালেন, একজন রোমান চিকিৎসক’ আর দ্বিতীয়টির নাম ‘দ্য ট্রেইট ডে ফার্ডেমেন্স’ যা কিনা প্লেগের প্রতিকার এবং ত্বকের যত্নের বিষয়ে লেখা হয়।

এই সময়পর্বে ফ্রান্স এবং ইতালির সর্বত্র ঘুরে ঘুরে তিনি প্লেগে আক্রান্ত মানুষদের শুশ্রুষা এবং চিকিৎসা করছিলেন। বলা যায় একজন ঔষধ প্রস্তুতকারক এবং চিকিৎসক হিসেবেই নস্ট্রাদামুস তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। সেই সময় প্রতিষেধক বলতে পারদ থেকে সৃষ্ট দ্রবণ ছাড়া বিশেষ কিছু ছিল না। কিন্তু নস্ট্রাদামুস রোগীর শরীরে নির্দিষ্ট অংশ কেটে রক্তপাত ঘটিয়ে জীবাণু দূরীকরণের প্রচলিত পন্থা মানেননি। তিনি সংক্রামিত মৃতদেহ শহর থেকে দূরে সরানোর প্রচেষ্টা চালান। তাঁর আবিষ্কৃত ‘রোজ পিল’ সামান্য মাত্রায় প্লেগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ভালো ফল দেয়, রোগীর ব্যথার উপশম ঘটায়।

ঔষধ প্রস্তুতকারক হিসেবে তাঁর কাজের পরিচিতি ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাঁর আবিষ্কৃত ওষুধে সুফল মিলতে থাকে রোগীদের এবং তার ফলে ঐ প্রদেশের মানুষদের থেকে তিনি প্রভূত আর্থিক সহায়তা লাভ করেন। ১৫৩৮ সাল নাগাদ গির্জার তদন্তের হাত থেকে বাঁচতে গ্রিস, ইতালি প্রভৃতি স্থানে প্রাচীন মিস্ট্রি স্কুলগুলিতে তিনি ঘুরতে থাকেন এবং সেই সময়পর্বেই তাঁর মধ্যে একটি অদ্ভুত মানসিক উত্তরণ ঘটে। ভ্রমণকালে একদল ফরাসি সন্ন্যাসীদের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। তাঁর ভবিষ্যৎবাণী অনুযায়ী সেই দলের পূর্বতন পোপ পঞ্চম সিক্সটাসের পরে পোপ হন ফেলিস্‌ পেরেত্তি। বলা যায় তখন থেকেই তাঁর এই ভবিষ্যৎ দর্শন ক্ষমতার সূত্রপাত ঘটে। সালোঁ ডি প্রদেশে এরপর থেকে তিনি থাকা শুরু করলে ক্রমশই ঔষধশাস্ত্র থেকে তাঁর আগ্রহ কেন্দ্রীভূত হয় অতিলৌকিক বিষয়ের প্রতি। বলা হয় এই সময় রাত্রে তিনি এক বাটি ভর্তি জল এবং ওষধি গাছের দিকে মনোনিবেশ করে বস্তুজগতকে একপ্রকার অতিক্রম করে যেতেন এবং অতিলৌকিক কিছু দেখতে পেতেন যা কিনা ধরে নেওয়া হয় তাঁর ভবিষ্যৎবাণীর মূল ভিত্তি। ১৫৫০ সালে নস্ট্রাদামুস প্রথম একটি জ্যোতিষবিদ্যার পঞ্জিকা রচনা করেন যা আগামী দিনের কিছু ঘটনার ভবিষ্যৎবাণী করেছিল। এই বইটি সমগ্র ফ্রান্সে তাঁকে অল্প সময়েই পরিচিতি এনে দেয়।

১৫৫৪ সালে তিনি সিদ্ধান্ত নেন ১০ খণ্ডের একটি বৃহদাকার গ্রন্থ রচনা করার যেখানে আগামী ২০০০ বছরের জন্য মোট ১০০টি ভবিষ্যৎবাণী থাকবে। এই বইয়ের নাম দেন তিনি ‘সেঞ্চুরিস্‌’। ১৫৫৫ সালে প্রকাশ পায় নস্ট্রাদামুসের সবথেকে আলোচিত, সবথেকে বিতর্কিত বই ‘লে প্রফেসিস’। এই বইটি তাঁর প্রধানতম, দীর্ঘস্থায়ী ভবিষ্যৎবাণীগুলির সংকলন। ধর্মীয় অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে তিনি একটি সুপরিকল্পিত পন্থায় এই কাজটি করেন। তাঁর সমস্ত ভাবীকথনকে ছন্দোবদ্ধ চতুষ্পদীতে বেধে গ্রিক, ল্যাটিন, দক্ষিণ ফ্রান্সের প্রাদেশিক ভাষা এবং ইতালীয় ভাষার মিশ্রণে একটি কৃত্রিম অস্পষ্টতা তৈরি করেন। তবে মনে করা হয় যে তিনি কখনোই গির্জার রোষের মুখে পড়েননি, তদন্তের জেরার শিকারও তাঁকে হতে হয়নি। কারণ ক্যাথলিক চার্চের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক আজীবন বজায় ছিল।

তাঁর খ্যাতি ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং নবজাগরণের সময় তিনি একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন। ফ্রান্সের রাজা দ্বিতীয় হেনরির স্ত্রী ক্যাথারিন ডি মেডিসি নস্ট্রাদামুসের সহায়তায় তাঁদের পরিবারের উপর নির্দেশিত কোনো অজানা আঘাতের ব্যাখ্যা চেয়ে তাঁকে প্যারিসে ডেকে পাঠান এবং রানি তাঁর সন্তানদের রাশিফল নির্ণয় করান নস্ট্রাদামুসের সাহায্যে। পরে ক্যাথারিন ডি মেডিকির বদান্যতায় নস্ট্রাদামুস কাউন্সিলর এবং রাজা হেনরির রাজসভায় ‘ফিজিশিয়ান-ইন-অর্ডিনারি’ হিসেবে কাজের সুযোগ পান। ১৫৫৬ সালে অদ্ভুতভাবে রাজা দ্বিতীয় হেনরি সম্পর্কে একটি ভবিষ্যৎবাণী করে বসেন নস্ট্রাদামুস যে, একটি তরুণ সিংহ তার থেকে প্রৌঢ় এক সিংহকে যুদ্ধে পরাজিত করে তার চোখ খুবলে নেবে এবং তার ফলে সেই প্রৌঢ়ের ভয়ানক নির্মমভাবে মৃত্যু ঘটবে। তিনি দ্বিতীয় হেনরিকে কোনো রকম আনুষ্ঠানিক যুদ্ধে অংশ না নেবার জন্য সতর্ক করে দেন। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎবাণী এতই সত্য যে, তিন বছর পরেই ৪১ বছর বয়সে রাজা দ্বিতীয় হেনরি একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধে বিপক্ষের বর্শায় চোখ বিদ্ধ হয়ে মারা যান। এমনভাবে সেই বর্শা চোখে বিদ্ধ করে ছিল যে তা পিছনদিকে মাথা ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছিল।

নস্ট্রাদামুসের এই ভবিষ্যৎবাণীর সমালোচনা করে কেউ কেউ তাঁকে শয়তানের ভৃত্য বলেছেন, কেউ বলেছেন তিনি ভণ্ড এবং ইউরোপের অভিজাত মহলে তাঁর কোনো কদরই তৈরি হয়নি। তবে ইতিহাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তাঁর ভবিষ্যৎবাণীর সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে। ১৬৬৬ সালের লণ্ডনের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, জার্মানিতে অ্যাডলফ্‌ হিটলারের উত্থান, এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হিরোসিমা-নাগাসাকি শহরে পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাও নস্ট্রাদামুস ভবিষ্যৎবাণী করেছেন। এছাড়া বিংশ শতাব্দীর আরেকটি ভয়াবহ ঘটনা ছিল প্রেসিডেন্ট জন. এফ. কেনেডির হত্যাকাণ্ড যা প্রায় দুই শতাব্দী আগেই তিনি বলে গিয়েছিলেন। ২০১২ সালে পৃথিবী ধ্বংস হবে নস্ট্রাদামুসের এমন এক ভবিষ্যৎবাণী নিয়ে নিকট অতীতে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে বহু জলঘোলা হয়েছে। হলিউডে একটি ফ্যান্টাসি এবং কল্পবিজ্ঞান ঘরানার একটি চলচ্চিত্র খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘২০১২’ নামে।

১৫৬৬ সালের ২ জুলাই বিকেলে নস্ট্রাদামুস তাঁর সচিব চ্যাভিগনিকে ডেকে বলেন, “কাল সূর্যোদয়ে আমাকে আর জীবন্ত দেখতে পাবে না।” পর দিন ভোরে তাঁর বিছানার পাশে নস্ট্রাদামুসকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। নস্ট্রাদামুসের দেহাবশেষ তার মৃত্যুর বেশ পরে আবিষ্কৃত হয়। নতুন করে তার সমাধি গড়ে ওঠে– চার্চ অব সেন্ট লরেন্টে ১৮১৩ সালে। সমাধিফলকে তার স্ত্রী লিখেছিলেনঃ “এখানে অস্থিসর্বস্ব রয়েছে যাঁর তিনি বিশ্বে স্বনামধন্য মিচেল নস্ট্রাদামুস, একক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর প্রায় ঐশ্বরিক কলমের মাধ্যমে তিনি সকল মরণশীল প্রাণী, নক্ষত্রের প্রভাব এবং আগামী বিশ্বের সকল সম্ভাব্য ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করে গেছেন। তিনি বেঁচে ছিলেন ৬২ বছর ৬ মাস ২৭ দিন। ১৫৬৬ সালে স্যালোনে তাঁর মৃত্যু হয়। ভবিষ্যতের মানুষ যেন তাঁর বিশ্রামের ব্যাঘাত না ঘটায়। অ্যানি পৌসারডে গেমেল (Anne Pousarde Gemelle) তাঁর স্ত্রী, সকল আত্মীয় পরিবারের প্রকৃত অভিনন্দন কামনা করে।”

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও