শিল্প-সাহিত্য

ও হেনরি

ও হেনরি (O Henry) একজন আমেরিকান ছোট গল্পকার যিনি ঊনবিংশ শতকে জন্মগ্রহণকারী ছোটগল্প লেখক হিসেবে সারা বিশ্বে বিপুল জনপ্রিয়। তাঁর আসল নামটির চেয়ে ছদ্মনামেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত। সারাজীবন ধরে রচনা করেছেন অসংখ্য কালজয়ী ছোটগল্প যা কয়েক শতাব্দী পরেও পাঠকের মন কেড়ে নেয়।

১৮৬২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা অঙ্গরাজ্যের গ্রিন্সবোরো শহরে ও হেনরির জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম উইলিয়াম সিডনি পোর্টার (William Sydney Porter)। বাবার নাম অ্যালগারনন সিডনি পোর্টার এবং মায়ের নাম মেরি জেন ভার্জিনিয়া সোয়াইম পোর্টার। বাবা পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। ও হেনরির বিবাহ হয় এথোলা ইস্টেস নামক এক মহিলার সঙ্গে। এই দম্পতির একটি পুত্রসন্তান সদ্যোজাত অবস্থাতেই মারা যায়। পরে মার্গারেট ওয়ার্থ পোর্টার নামে একটি কন্যা জন্ম নেয়। এথোলার অকালমৃত্যু হলে ছোটবেলার বান্ধবী সারা লিন্ডসে কলিমেনকে বিবাহ করেন হেনরি। কিন্তু এই সম্পর্কও চিরস্থায়ী হয়নি।

ও হেনরি যখন মাত্র তিন বছর বয়স তাঁর মায়ের মৃত্যু হলে ও হেনরি তাঁর বাবার সাথে তাঁর ঠাকুরমার বাড়ি চলে আসেন। কাকিমা এভেলিনার দায়িত্বে বড় হতে থাকেন হেনরি। মূলত কাকিমার উৎসাহেই বইয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মায় সেই অল্প বয়স থেকেই। এভেলিনা যে স্কুলে শিক্ষকতা করতেন সেই স্কুলেই ভর্তি হন হেনরি। ১৮৭৬ সালে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে তিনি ভর্তি হন লিন্ডসে স্ট্রিট হাই স্কুলে। কিন্তু পড়াশোনা শেষ না করেই সেই স্কুল ছেড়ে দেন হেনরি এবং কাকার ওষুধের দোকানে কাজে ঢুকে যান।

চার বছর সেখানে কাজ করে ও হেনরি ফার্মাসিস্টের লাইসেন্স অর্জন করেন। এরপর ১৮৮২ সালে শারীরিক অসুস্থতার কারণে বায়ুপরিবর্তনের উদ্দেশ্যে পারিবারিক বন্ধু জেমস হলের সাথে টেক্সাসে চলে যান তিনি। জেমসের পুত্র রিচার্ড হলের অধীনে কাজে যোগ দিলেও তিনি বেশিরভাগ সময় বই পড়ে এবং স্প্যানিশ ও জার্মান ভাষা শেখার কাজেই কাটিয়ে দিতেন হেনরি। এইসময় তাঁর কিছু লেখা প্রকাশিত হয় গ্রিন্সবোরোর স্থানীয় পত্রিকাতে।

শরীর কিছুটা সুস্থ হওয়ায় ১৮৮৪ সালে ও হেনরি চলে আসেন অস্টিন শহরে। জীবিকার তাগিদে নানা রকম কাজ করতে থাকেন তিনি যার মধ্যে ছিল ফার্মাসিস্ট, হিসাবরক্ষক, কেরানি প্রভৃতি। ১৮৯১ সালে ও হেনরি অস্টিনের ফার্স্ট ন্যাশনাল ব্যাঙ্কে ক্লার্ক হিসেবে কাজে যোগদান করেন। এখানে কাজ করাকালীনই তিনি ১৮৯৪ সালে বের করেন ‘দ্য রোলিং স্টোন’ নামে একটি রম্যপত্রিকা। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এই বছরেই ব্যাঙ্কে প্রায় চার হাজার ডলারের গরমিল ধরা পড়ায় তহবিল তছরূপের দায় পড়ল হেনরির উপরে। বিচলিত হেনরি ব্যাঙ্কের কাজ ছেড়ে দিয়ে মনোনিবেশ করলেন পত্রিকা প্রকাশনার কাজে। কিন্তু সেখানেও হতে লাগলো লোকসান। শেষে ১৮৯৫ সালে বন্ধ হয়ে গেলো ‘দ্য রোলিং স্টোন’-এর প্রকাশ।

পুলিশের নজর থেকে বাঁচতে হেনরি চলে আসেন হিউস্টনে। এখানে মাসিক ২৫ ডলারের বিনিময়ে ‘হিউস্টন পোস্ট’ সংবাদপত্রে কলাম লেখকের চাকরি নেন। কিন্তু পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে পারলেন না তিনি। ১৮৯৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে পুলিশ হেনরির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। বিচারের মুখোমুখি হতে না চাওয়া হেনরি চলে যান অরলিন্সে। এখানে এসে কাজ নেন স্থানীয় সংবাদপত্র ‘টাইমস পিকায়ুন’ এবং ‘নিউ অরলিন্স ডেল্টা’তে। মাসখানেক পর বন্ধুবান্ধবের সহযোগিতায় হন্ডুরাসের উদ্দেশে যাত্রা করলেন তিনি। হন্ডুরাসের সাথে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কোনো আসামি বিনিময় চুক্তি ছিল না। তাঁর আশা ছিল, কয়েক বছর এখানে কাটিয়ে দিয়ে অভিযোগ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেলে ফিরে আসবেন।

ছয় মাস পর এখানে থাকাকালীনই স্ত্রী এথোলার অসুস্থতার খবর পেয়ে অস্টিনে ফিরে আসেন তিনি। মানবিক কারণে পুলিশ তখন তাঁকে গ্রেফতার করেনি। কিন্তু স্ত্রী এথোলার অকাল মৃত্যু হলে ১৮৯৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে পুলিশ হেনরিকে আটক করে। তহবিল ভাঙার অপরাধে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয় তাঁর যদিও তিনি নির্দোষ ছিলেন।

১৮৯৮ সালের ২৫ এপ্রিল, স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধ শুরুর সময় ওহাইয়ো অঙ্গরাজ্যের কলম্বাসের জেলখানায় কয়েদি নম্বর ৩০,৬৬৪ হিসেবে জেলজীবন শুরু করেন হেনরি। তাঁর ফার্মাসিস্টের লাইসেন্সের কারণে জেলের ফার্মেসিতে তিনি নিযুক্ত হন। এখানে বসেই তিনি মেয়ের ভরণ-পোষণের জন্য ছোট ছোট গল্প লিখতে শুরু করেন। কিন্তু জেলখানায় বন্দি দণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামির লেখা পাঠকেরা পড়তে নাও চাইতে পারে এই ভেবে তিনি ছদ্মনামের প্রতি আকৃষ্ট হন। প্রায় দশ-বারোটি ছদ্মনাম ব্যবহার করার পরে উইলিয়াম সিডনি পোর্টার ‘ও হেনরি’ এই নামটি ব্যবহার করা শুরু করেন।

কেন এবং কীভাবে উইলিয়াম সিডনি পোর্টার ও’ হেনরি নামটির প্রতি আকৃষ্ট হন, তা নিয়ে কয়েকটি গল্প আছে। নিজের জীবদ্দশাতেও তিনি কয়েকবার কয়েকটি কাহিনীর কথা বলেছেন। কেউ কেউ বলেন, ও’ হেনরি আসলে পোর্টারের পরিচিত এক ফরাসি ফার্মাসিস্ট, এটিয়েন অসিয়ান হেনরির সংক্ষিপ্ত রূপ। আবার অনেকের ধারণা, শৈশবের পোষা বেড়াল হেনরি দ্য প্রাউড থেকেই ও’ হেনরির জন্ম। লেখক গাই ড্যাভেনপোর্টের মতে, ও’ হেনরি আসলে ওহাইয়ো জেল বা পেনিটেনশারির প্রতিনিধিত্ব করে।

সবথেকে প্রচলিত গল্প হলো, নিউ অরলিয়েন্সে থাকাকালীন পোর্টার সহকর্মীদের সাথে প্রায়ই শহরের নানা রেস্তোরাঁয় যেতেন। টাইমস-পিকায়ুনের রিপোর্টার আর্নস্ট হপনারের সাথে একরাতে তিনি গিয়েছিলেন টোব্যাকো প্ল্যান্ট স্যালুন নামে এক বিখ্যাত পানশালায়। সেখানে বিশাল ভিড় থাকায় এত মানুষের পানের অর্ডার সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিল বারটেন্ডার হেনরি। কাস্টমারেরাও প্রায়ই তাঁকে ডাকছিল, “ও হেনরি, আরেক গ্লাস দাও!” বলা হয় সেই থেকে ‘ও’ হেনরি’ নামটা গেঁথে যায় পোর্টারের মাথায়।

তার নিজমুখে বলা একটি গল্পে দেখা যায়, লেখা ছাপানোর আগে ও’ হেনরি তাঁর এক বন্ধুর সাথে ছদ্মনামের ব্যাপারে কথা বলছিলেন। উপযুক্ত নাম খোঁজার জন্য তাঁরা একটি পত্রিকা খুলে বসেন। সেখান থেকে ‘হেনরি’ নামটি তাঁদের মনে ধরল। একে শেষ নাম হিসেবে বেছে নিলেন লেখক। বন্ধু পরামর্শ দিলেন, প্রথম নাম হিসেবে ইংরেজি কোনো অক্ষর ব্যবহার করতে। তার পরামর্শ মেনেই এবং ‘ও’ অক্ষরটি লেখা সহজ বলে হেনরির আগে জুড়ে গিয়ে পোর্টার হয়ে গেলেন ও’ হেনরি। আরেক জায়গায় অবশ্য তিনি দাবি করেছেন, ‘ও’ হলো অলিভিয়েরের সংক্ষিপ্ত রূপ, যা ছিল তাঁর প্রথম ছদ্মনাম।

জেলখানায় বন্দি থাকাকালীন ভালো ব্যবহার করার কারণে তাঁর সাজার মেয়াদ কমে যায়। তিন বছর পরে ১৯০১ সালের ২৪শে জুলাই কারাবাস থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। ততদিনে কিছুটা পরিচিতি পেয়েছেন ছোটগল্পকার হিসেবে। সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে তিনি পাড়ি দিলেন নিউ ইয়র্ক। চুক্তিবদ্ধ হলেন ‘নিউ ইয়র্ক সানডে ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের সাথে, প্রতি সপ্তাহে একটি লেখা জমা দেওয়ার শর্তে। এর পাশাপাশি অন্য পত্রিকাতেও চলতে থাকল লেখা।

১৯০৪ সালে প্রকাশিত হয় হেনরির প্রথম ছোটগল্পের সংকলন, ‘ক্যাবেজ অ্যান্ড কিংস’। এই বইয়ের গল্পগুলি রচিত হয়েছিল তাঁর ছয়মাস হন্ডুরাসে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে। এরপর একে একে প্রকাশিত হতে থাকে ‘দ্য ফোর মিলিয়ন’, ‘দ্য ট্রিমড ল্যাম্প’, ‘হার্ট অফ দ্য ওয়েস্ট’, ‘হুইরলিগিগস’ প্রভৃতি গল্পগ্রন্থ। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিপুল জনপ্রিয়তা পায় বইগুলি। চরিত্র গঠনের অভিনবতা এবং গল্পের শেষে থাকা অভাবনীয় চমকই ছিল তাঁর লেখার মূল আকর্ষণ। হেনরির গল্পের চরিত্ররা প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য উদ্ভব করতো সৃজনশীল উপায়ের, যা পাঠকদের মন কেড়ে নিত। তাঁর লেখা কয়েকটি সুবিখ্যাত গল্প হল, ‘দ্য গিফট অফ দ্য ম্যাজাই’, ‘আফটার টোয়েন্টি ইয়ার্স’, ‘আ স্ট্রেঞ্জ স্টোরি’, ‘হার্ট অ্যান্ড হ্যান্ডস’, ‘দ্য লাস্ট লিফ’, ‘আ নিউজপেপার স্টোরি’, ‘দ্য প্রিজনার অফ জেম্বলা’, ‘দ্য কপ অ্যান্ড দ্য অ্যান্থেম’ ইত্যাদি। লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখের দু একদিন আগে তিনি লেখা শুরু করতেন। কিন্তু তাঁর লেখার হাত এতোই ভালো ছিল যে সম্পাদককে কখনো তাঁর লেখার ওপর কাটাছেঁড়া করতে হত না।

লেখক হিসেবে সাফল্য পেলেও তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল অসুখী। স্ত্রীর পর কন্যা মার্গারেটও মারা যান যক্ষ্মা রোগে। দ্বিতীয় বিবাহও স্থায়ী হয়নি। ব্যর্থতার যন্ত্রণা থেকেই অনিয়মিত মদ্যপান শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায় যকৃত। ১৯১০ সালের ৫ জুন মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের এক হাসপাতালে ও হেনরির মৃত্যু হয়। পরবর্তীকালে তাঁর পৈতৃক বাড়িটি রূপান্তরিত হয় সংগ্রহশালায়

অসামান্য ছোটগল্প লেখার স্বীকৃতি স্বরূপ আমেরিকা ও হেনরির নামে ‘ও হেনরি পুরস্কার’ প্রদান করে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।