সববাংলায়

লোকদেবতা ওলাবিবি | ওলাদেবী | ওলাইচন্ডী | বিবিমা

বাংলার লোকসংস্কৃতির যে প্রাচীন ঐতিহ্য, তাতে বহু লৌকিক দেবদেবীর কথাও মিশে রয়েছে, যাঁদের মধ্যে কোনও কোনও দেবতার পূজার প্রচলন রয়েছে আজও। মূলত বাংলাদেশের তেমনই এক লোকদেবী হলেন ওলাদেবী (Oladevi) বা ওলাবিবি (Olabibi)। উল্লেখ্য যে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মসম্প্রদায়ের মধ্যে এই দেবীর অস্তিত্ব সীমাবদ্ধ নয়। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে এই দেবীর পূজা করেন মানুষ। তবে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ তাঁকে ওলাদেবী আর মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ তাঁকে ওলাবিবি হিসেবে পূজা করে থাকেন। তাঁকে মূলত কলেরার দেবী বলে মনে করা হয়। বাংলার এক প্রাচীন রোগ এই কলেরার হাত থেকে রক্ষা পেতেই মানুষ ওলাদেবীর পূজা করতেন। এই দেবীর নামটি জুড়েই তাই কলেরার অন্য একটি সমার্থক লৌকিক শব্দ হল ওলাওঠা – সম্ভবত ওলাদেবী ‘উঠিয়ে নিতেন’ বলেই রোগের এরূপ নামকরণ। এই দেবীর কথাপ্রসঙ্গে পুরাণের কথা যেমন আসে তেমনই বৈদিক সময়ের প্রসঙ্গও জড়িত এরসঙ্গে। দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত এই ওলাদেবীর পূজার প্রচলন কিন্তু মারওয়ার এবং রাজস্থানেও রয়েছে বলে জানা যায়।

ওলাদেবী এবং ওলাবিবি ছাড়াও এই দেবী ওলাইচন্ডী, বিবিমা ইত্যাদি নামে পরিচিত। পৌরাণিক লোককাহিনি অনুসারে ওলাদেবীকে অসুর, দানব ও দৈত্যদের কিংবদন্তি রাজা এবং সুবিখ্যাত স্থপতি মায়াসুরের স্ত্রী বলে মনে করা হয়। তবে এই ওলাদেবীকে আরও যে ছয়জন দেবতার সঙ্গে মিলিতভাবে পূজা করা হত, তাঁরা হলেন, ঝোলাবিবি, আজগাইবিবি, চাঁদবিবি, বাহড়বিবি, ঝেটুনেবিবি ও আসানবিবি। একত্রে এঁরা ‘সাতবিবি’ নামে পরিচিত। এই সাতবিবিকে বীরভূম অঞ্চলে বলা হয়ে থাকে সাত বাউনীত এবং বাঁকুড়ায় এঁরা সাত বনবিবি নামে পরিচিত। অনেকেরই বিশ্বাস মোট এই সাত দেবী আসলে বৈদিক দেবী ব্রাহ্মী, মহেশ্বরী, বৈষ্ণবী, বারাহী, ইন্দ্রাণী প্রমুখেরই রূপান্তর। মহেঞ্জোদারোতে ঐতিহাসিক অভিযানের ফলে পাওয়া পোড়মাটির অবশেষ থেকে মনে করা হয় সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগেও এঁদের সম্মিলিত পূজা প্রচলিত ছিল। একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা সাতজন নারীর ছবি দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। এই দেবী কলেরার মতো মারণরোগের হাত থেকে রক্ষা করেন এই বিশ্বাসেই পূজিতা হন। এখানে উল্লেখ্য যে, কলেরার বিশ্বব্যাপী বিস্তার এই গাঙ্গেয় বদ্বীপ থেকেই শুরু হয়েছিল এবং কলেরার প্রথম কেসটি ১৮১৭ সালে এই বাংলায় নথিভুক্ত করা হয়েছিল। অতএব এই তথ্য থেকে ধরে নেওয়া যেতে পারে উনবিংশ শতকে কলেরার প্রাদুর্ভাবের পরেই কলেরার দেবী হিসেবে এই ওলাদেবী বা ওলাবিবির উত্থান। তবে পূর্বোক্ত বৈদিক দেবীদের থেকে সাতজন লৌকিক দেবীতে রূপান্তরের ঘটনাটি ঠিক কোন সময়ে ঘটেছিল তা নিশ্চিতভাবে বলা দুরূহ।

ওলাদেবীকে হিন্দুধর্মের মানুষেরা কিন্তু লক্ষ্মী এবং সরস্বতীর মতো করেই কল্পনা করেছে এবং সেই কারণে তাঁদের ওলাদেবীর বিগ্রহ দেখা যায় নীল শাড়িতে এবং বিভিন্ন অলঙ্কারে সজ্জিতা, তাঁর গায়ের রঙ হলুদ, চোখ দুটি আবার কখনো বা তিনটি, হাত তাঁর প্রসারিত, কখনও কখনও তাঁর কোলে একটি শিশু উপবিষ্ট দেখা যায়। তবে মুসলমানরা, যাঁদের রয়েছে ওলাবিবির গান, তাঁরা এই দেবীকে বিবিমা বা ওলাবিবি বলে ডাকেন। মুসলমানদের কাছে ওলাবিবির ধারণাটি অন্যরকম। ওলাবিবি তাঁদের কাছে একজন কিশোরী রমণী, তাঁর পরনে তাই শাড়ির বদলে ঢিলেঢালা পাজামা ধরনের পোশাক, মাথায় টুপি, স্কার্ফ বা ওড়না এবং নানারকম অলঙ্কার দেখা যায়। এছাড়াও পায়ে তাঁর নাগরা জুতো কখনও কখনও মোজাও থাকে। এছাড়াও ওলাবিবির চুল খোলা থাকে এবং তাঁর হাতে কোথাও দেখা যায় ঝাঁটা, কোথাও বা আশাবারি, যার সাহায্যে তিনি তাঁর ভক্তদের রোগ নিরাময় করেন।

ওলাবিবির নিত্য পূজার পাশাপাশি ব্রত পূজা এবং কলেরা মহামারির সময়ে বিশেষ পূজা করা হয়। সাধারণত শনি ও মঙ্গলবারে নিরামিষ ভোজ্য নিবেদনের মাধ্যমে হিন্দুরা ওলাদেবীর নিত্যপূজা খুব অনাড়ম্বরভাবেই করে থাকেন। তবে মাঝেমাঝে পূজার সময় ছাগবলিও দেওয়া হয়। এছাড়াও বিশেষ পূজার সময় ‘মাঙন’ করবার রীতি প্রচলিত আছে। এই মাঙন হল বিভিন্ন বাড়ি থেকে ফুল-ফল ইত্যাদি ভিক্ষা করবার একটা লৌকিক রীতি। প্রাপ্ত সেই ফুল ও ফল দিয়েই ওলাদেবীর পূজা করা হয়ে থাকে। এছাড়াও পূজার নৈবেদ্য হিসেবে মিষ্টি, পান, বাদাম, সিদ্ধ চাল, বেত চিনি ইত্যাদি দেওয়া হয়ে থাকে। পূ্জার আগের দিন রাতে ওলাইচন্ডীকে নিয়ে গান করা হয়। চৈত্র-জৈষ্ঠ্য মাসে ওলাদেবীর বার্ষিক পূজা করা হয়ে থাকে। চৈত্র মাসের শেষদিকে ওলাবিবির থানে সাতটি ঢিবিতে শিরনি দেওয়া হয়। রোগমুক্তির প্রার্থনায় বহু ভক্ত আবার দেবীর থানের গাছে ঢিল বেঁধে রেখে যান। আবার মাঘ মাসের প্রতি শুক্রবার রাতে ওলাবিবির জন্যই জাগরণ গান গাওয়া হয়ে থাকে। মুসলমান মেয়ের দল সারারাত জেগে এই জাগরণের গান করেন। হিন্দু-মুসলমান উভয়েই থাকেন শ্রোতার আসনে। এই দেবীর পূজার জন্য কোন বিশেষ শাস্ত্রসম্মত মন্ত্র কিছু নেই, তবে হিন্দু পুরোহিতেরা পূজার সময় ‘এসো মা ওলাদেবী, বেহুল রাধির ঝি’ বলে ডাকেন। এই ওলাদেবী বা ওলাবিবি আদতে দুই সম্প্রদায়ের কাছেই সমানভাবে পূজিতা হন। এই দেবীর গায়ে সেভাবে কোন সাম্প্রদায়িক চিহ্ন নেই বললেই চলে। হাড়ি, ডোম প্রভৃতি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষেরাও এই ওলাদেবীর পূজা করে থাকেন।

ওলাদেবী বা ওলাবিবি মূলত একজন লৌকিক দেবী এবং প্রধানত বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেই তাঁর থানের আধিক্য লক্ষ করা গেলেও লৌকিক দেবদেবী নিয়ে গবেষণায় প্রসিদ্ধি অর্জনকারী গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসু দেখিয়েছেন যে, খোদ কলকাতা শহরেও ওলাবিবির কয়েকটি মন্দির রয়েছে। উত্তর-পূর্ব কলকাতার বেলগাছিয়া অঞ্চলে যেমন ওলাদেবী বা ওলাইচন্ডীর খ্যাতি দীর্ঘদিনের তেমনই আবার হদিশ দিয়েছেন যে, সুরেন্দ্র ব্যানর্জী স্ট্রীটের শীতলা মন্দিরেও রয়েছে ওলাদেবীর মূর্তি। কলকাতা ছাড়াও বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে, বিশেষত বৃহত্তর দিনাজপুর ও দক্ষিণাঞ্চলে ওলাদেবীর অনেক জনপ্রিয় থান দেখতে পাওয়া যায়।

ওলাদেবীর পূজা দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত রয়েছে ঠিকই তবে আধুনিক সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কলেরার মতো রোগের চিকিৎসার অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলে ওলাদেবীর পূজা হ্রাস পেয়েছে। তবু আজও ভক্তিবিহ্বল ও বিশ্বাসী মানুষ ওলাদেবীর থানে গিয়ে রোগমুক্তির কামনা করে মাথা ঠোকেন, ব্রত-মানত করেন, আচার-নিয়ম সব সুষ্ঠুভাবে পালন করে পূজার মাধ্যমে দেবীকে সন্তুষ্ট করবার প্রয়াস করে থাকেন।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading