ইতিহাস

পদবীর উৎস (বর্ণানুক্রমিক অ – ঔ বর্ণ)

পদবীর উৎস

অধ্বুর্য্য – পেশাভিত্তিক পদবী। অধ্বর শব্দের অর্থ যজ্ঞ। যে ঋত্বিক যজ্ঞের আগুনে আহুতি দিতেন, তাঁকে অধ্বুর্য্য বলা হয়। এই পদবী ব্রাহ্মণদের মধ্যে দেখা যায়।

অর্ণব – উপাধিভিত্তিক পদবী। ধর্মগুরুর উপাধি থেকে পদবীটি এসেছে। মূলত কায়স্থদের মধ্যে এই পদবী দেখা যায়।

অম্বুলি – স্থানভিত্তিক পদবী। অম্বুল গ্রাম থেকে পদবীটির উৎপত্তি বলে মনে করা হয়।

অগ্রদানী – পেশা বা কাজভিত্তিক পদবী। শ্রাদ্ধে বা পারলৌকিক কাজে অগ্রে বা আগে যিনি দান গ্রহণ করেন, তিনিই অগ্রদানী। ব্রাহ্মণদের মধ্যেই এই পদবীটি সাধারণত দেখা যায়।

অগ্নিহোত্রী – পেশাভিত্তিক পদবী। এই পদবীটি এসেছে অগ্নিহোত্র থেকে। অগ্নিহোত্র শব্দের অর্থ  – সাগ্নিকের করণীয় প্রাত্যহিক হোম। এই হোম যিনি নিয়মিত করেন তিনিই অগ্নিহোত্রী। ব্রাহ্মণদের মধ্যে এই পদবীটি দেখা যায়।

অধিকারী – এর দু’রকম অর্থ হয়। এক অর্থে অধ্যক্ষ, দলপতি। সাধারণত যাত্রাদল, কীর্তনদল, থিয়েটার দলের অধ্যক্ষদের অধিকারী বলা হতো। দ্বিতীয় অর্থে, কুচবিহারের রাজবংশী পুরোহিতদের পদবী অধিকারী দেওয়া হতো। যজমানের সংখ্যা বেশি হলে তাদের দেবাধিকারী পদবী দেওয়া হতো। ব্রাহ্মণ, বৈষ্ণব, মাহিষ্য, যোগী, রাজবংশী ইত্যাদি বিভিন্ন জাতির মধ্যে এই পদবী দেখা যায়।

অবধূত – এক ধরণের শৈব সন্ন্যাসী যাঁরা বর্ণাশ্রম ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে না। এঁরা সংসারের মায়ামুক্ত, সংস্কারমুক্ত। সাধু-সন্ন্যাসীদের মধ্যেই এই পদবী আজও টিঁকে আছে।

আঢ্য – আঢ্য শব্দটি ধনাঢ্য থেকে এসেছে । মূলত অভিজাত শ্রেণীর পদবী ছিল বলে মনে হয়, আজকাল এই পদবীটি খুব একটা প্রচলিত নয়। চলিত রূপ আড্ডি, আড্য ইত্যাদি।

আলু – একটি মত বলে আলু বস্তুবাচক পদবী। অন্য এক মতে, আলু শব্দটি এসেছে আলাপী থেকে। একসময় রাজারা বিনোদনের জন্য যে মহিলা গল্পকথক নিয়োগ করতেন, তাঁদের আলাপনী বলা হতো। সেই থেকেই এই পদবীর উৎপত্তি।

আশ – বীর্যবত্তা বা পারদর্শিতা থেকে এই পদবীটি এসেছে বলে মনে করা হয়। এই পদবী মূলত কায়স্থদের মধ্যে দেখা যায়।

আড়ি/আড়ী/আঢ়ী – আঢ্য থেকে আড়ী/আঢ়ী এসেছে বলে মনে করা হয়। সেই অর্থানুসারে – ধনী বা সমৃদ্ধ। ভিন্নমতে, প্রাদেশিক ভাষায় আড়ি অর্থ শিকারী (যে আড়ি পেতে অর্থাৎ আড়াল থেকে পশু শিকার করে)

আইচ – বীর্যবত্তা বা পারদর্শিতা থেকে এই পদবীটি এসেছে বলে মনে করা হয়। আইচ শব্দটি সংস্কৃত ‘আদিত্য’ শব্দের অপভ্ৰংশ। উগ্রক্ষত্রিয়, কর্ম্মকার, কায়স্থ, নমঃশূদ্র, পৌণ্ড্রক্ষত্রিয়, বারুজীবী, মোদক জাতির মধ্যে এই পদবীটি পাওয়া যায়।

আদক – অর্থগত বিশ্লষণ করে এই শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় – ‘অর্ধভাগদার’। আবার শব্দগত উৎস বিচার করে কেউ কেউ মনে করেন এই শব্দটি এসেছে ‘আদি’ থেকে। কোথাও কোথাও আদক এর উচ্চারণ আধক শোনা যায়। বাংলায় মূলত মাহিষ্য, কর্ম্মকার, তিওর, নমঃশূদ্র, বাইতি, ব্যগ্রক্ষত্রিয়, রাজবংশীদের মধ্যে এই পদবী দেখা যায়।

আগুয়ান – যাঁরা অগ্রগামী বা এগিয়ে আছেন। মনে করা হয়, যাঁরা যুদ্ধবিধ্যায় পারদর্শী ছিলেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সামনের সারিতে থাকতেন, তাঁদের আগুয়ান আখ্যা দেওয়া হতো। এই পদবীটি মূলত মাহিষ্য জাতির মধ্যে পাওয়া যায়।

আগোরি/আগুলিয়া/আগুরী  – উপাধিভিত্তিক পদবী। একসময় সীমান্তরক্ষীদের উপাধি ছিল আগোরি বা আগুলিয়া। এরা মূলত উগ্রক্ষত্রিয় ছিলেন। আবার কোথাও কোথাও সদগোপদের মধ্যেও এই পদবী পাওয়া যায়। মনে করা হয় যাঁরা অগ্রহার ভূমি লাভ করতেন, তাঁদের অগ্রহারীণ বা আগ্রহারিক বলা হতো। সেখান থেকেই এই পদবী এসেছে।

আচার্য – পেশাভিত্তিক পদবী। এই শব্দের প্রাচীন অর্থ বেদ-অধ্যাপক, শিক্ষাগুরু ইত্যাদি। মূলত ব্রাহ্মণ, কর্ম্মকার ও মালীদের মধ্যে এই পদবী দেখা যায়।

আচার্য্য – পেশাভিত্তিক পদবী। জ্যোতিষি বা জ্যোষীদের আচার্য্য বলা হতো।

আতর্থী – স্থানভিত্তিক পদবী। এটি ব্রাহ্মণদের গাঞি এর নাম আতুর্থী বা আতর্থী থেকে এসেছে।

আদিত্য – উপাস্য দেবতার নাম থেকে এসেছে এই পদবী। আবার এও মনে করা হয় মূল নামের (যেমন, বিক্রমাদিত্য) অন্তভাগ বা শেষভাগ থেকে আদিত্য পদবী এসেছে।

আউলিয়া – আউল সম্প্রদায়ভুক্ত সহজিয়া সাধকদের পদবী।

আড়তদার – পেশাভিত্তিক পদবী। আড়তের মালিক হলেন আড়তদার। যেকোন জাতির মধ্যেই এই পদবী থাকতে পারে।

আগমবাগীশ – উপাধিভিত্তিক পদবী। তন্ত্রশাস্ত্রে পণ্ডিত ব্যক্তিদের এই উপাধি দেওয়া হতো। একমাত্র তন্ত্রশাস্ত্রজ্ঞ ছাড়া এই পদবী দেখা যায় না।

ইন্দ্র – উপাস্য দেবতার নাম অনুসারেই এই পদবী। মূলত কায়স্থদের মধ্যে যাঁরা ইন্দ্র-উপাসক তাঁদের এই পদবী দেখা যায়। কায়স্থ ছাড়াও বৈদ্য, কর্ম্মকার ও মোদকদের মধ্যে এই পদবী লক্ষ্য করা যায়।

ঈশোর – এটি একটি নির্দিষ্ট পরিবারভুক্ত পদবী। কুচবিহার রাজপরিবারের কোনও মেয়ে রাজপরিবার ছাড়া অন্য কোথাও বিয়ে করলে, সেই রাজকন্যার গর্ভজাত সন্তানদের পদবী হয় ঈশোর।

উকিল – পেশাভিত্তিক পদবী। আইনজীবীদের উকিল বলে। ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মচারীরাও এককালে উকিল নাম পরিচিত ছিলেন। মূলত কায়স্থ ও ব্রাহ্মণদের মধ্যে এই পদবীর চল আছে। 

উপাধ্যায় – উপাধিভিত্তিক পদবী। নয়টি অর্জিত গুণ (আচার, বিদ্যা, বিনয়, প্রতিষ্ঠা, তীর্থদর্শন, নিষ্ঠা, আবৃতি, তপ ও দান) এর অধিকারী ব্রাহ্মণের উপাধি উপাধ্যায়। এই উপাধ্যায় পদবী স্বতন্ত্রভাবেও দেখা যায় আবার গাঞিনামের সাথে যুক্ত হয়ে গঙ্গোপাধ্যায়, বন্দ্যোপাধ্যায় ইত্যাদি পদবীও তৈরী হয়েছে।

ঋত্বিক – পেশাভিত্তিক পদবী। এঁরা যজমানের জন্য যজ্ঞ করতেন। ঋতুতে ঋতুতে যজ্ঞ করতেন বলে ঋত্বিক বলা হয়। মূলত ব্রাহ্মণদের মধ্যেই এই পদবী দেখা যায়।

এক্কা – বাংলার আদিবাসীদের মধ্যে প্ৰচলিত প্রাণীবাচক পদবী। আদিবাসীদের গোত্রগুলো মূলত গাছপালা, জীবজন্তু বা জড়পদার্থের নাম থেকে এসেছে। এক্কা-র অর্থ কুমীর।

ওঝা/ঝা – উপাধিভিত্তিক পদবী। ওঝা পদবীটি উপাধ্যায় থেকে এসেছে। এই উপাধির প্রচলন ছিল আর্যাবর্তে। পরে পূর্বভারতে আসে। মূলত বিহারে উপাধ্যায় অপভ্রংশ হয়ে ওঝায় পরিণত হয়। এখন বাংলায় ওঝা এর পরিবর্তে ঝা এর চল বেশি, কিন্তু আগে ওঝা ছিল কৃত্তিবাস তার উদাহরণ।

ওহদেদার/ওয়াদ্দেদার – পেশাভিত্তিক পদবী। ওয়াদা শব্দের অর্থ প্রতিশ্রুতি। প্রতিশ্রুত খাজনা আদায়ের জন্য নিয়োজিত রাজকর্মচারীদের বলা হতো ওয়াদাদার। সেখান থেকেই ওহদেদার বা ওয়াদ্দেদার এসেছে বলে অনুমান।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

তথ্যসূত্র


  1.  বঙ্গীয় শব্দকোষ - হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়
  2. আমাদের পদবীর ইতিহাস - লোকেশ্বর বসু
  3. পদবীর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস - শ্রীখগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
  4. বাংলার পদবি কথা - দেবাশিস ভৌমিক

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়