সববাংলায়

ভীমসেন যোশী

বিভাগঃ , ,

হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক ভীমসেন যোশী (Bhimsen Joshi) মূলত খেয়াল গায়ক হিসেবেই বিখ্যাত। তাঁর শ্রোতারা ছাড়াও সঙ্গীত সমালোচকদের থেকেও প্রশংসা অর্জন করেছিলেন তিনি। অসাধারণ নৈপুণ্যে খেয়াল গানের ধারাকে সমৃদ্ধ করে গিয়েছেন ভীমসেন যোশী। তবে খেয়াল ছাড়াও ভজন, ঠুংরি, দাদরা ইত্যাদি সঙ্গীতেও তাঁর দক্ষতা ছিল অসামান্য। হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কিরানা ঘরানার শিল্পী ভীমসেন ভারতের এক কিংবদন্তী গায়ক ছিলেন। তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয় গায়ক যাঁর কনসার্টের পোস্টার বিজ্ঞাপন হিসেবে টাঙানো হয়েছিল নিউ ইয়র্ক সিটির রাস্তায়। ১৯৬৪ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে একাধারে আফগানিস্তান, ইতালি, ফ্রান্স, কানাডা ইত্যাদি পৃথিবীর নানা প্রান্তে সঙ্গীতানুষ্ঠান করেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর অনুরোধে ১৯৮৮ সালে ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা’ নামে একটি মিউজিক ভিডিওতে সুরারোপ ও অভিনয় করেন ভীমসেন যোশী যা পরে খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। মারাঠি, কন্নড়, হিন্দি সহ বহু ভারতীয় ছবিতে গান গেয়েছেন পণ্ডিত ভীমসেন যোশী।

১৯২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের বম্বে প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ধারওয়াড় জেলার গরগ গ্রামে এক কন্নড় দেশাথা মাধব ব্রাহ্মণ পরিবারে ভীমসেন যোশীর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম গুরুরাজ রাও যোশী এবং মায়ের নাম গোদাবরী বাঈ। তাঁর বাবা পেশায় একজন স্কুলশিক্ষক ছিলেন। তাঁদের ষোলোটি সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠপুত্র ছিলেন ভীমসেন। খুব ছোটোবেলাতেই মাকে হারান তিনি। শৈশবে হারমোনিয়াম, তানপুরা ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র এবং সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন তিনি। মিউজিক ব্যাণ্ডের মিছিল বেরোলেই তার পিছু পিছু চলে যেতেন তিনি। এই আগ্রহ থেকে প্রায়ই ব্যাণ্ডের পিছন পিছন যেতে যেতে ক্লান্ত হয়ে পথের মধ্যেই কোথাও একটা ঘুমিয়ে পড়তেন তিনি এবং পরে তাঁর বাবা-মাকে বাধ্য হয়ে তাঁকে খোঁজার জন্য পুলিশের দ্বারস্থ হতে হত। এরপর থেকে ভীমসেনের জামায় ‘গুরুরাজের পুত্র’ লেখাটা লিখে দিতেন তাঁর বাবা। এর পর থেকে রাস্তার কোথাও ঘুমিয়ে পড়লে তাঁর বাবার পরিচিতরা ভীমসেনকে ঘুমন্ত অবস্থাতেই তুলে নিরাপদে বাড়ি নিয়ে আসতেন। পরবর্তীকালে ১৯৪৪ সালে তাঁর মামার মেয়ে সুনন্দা কাট্টিকে বিবাহ করেন ভীমসেন যোশী। তাঁদের চার সন্তান যথাক্রমে রাঘবেন্দ্র, উষা, সুমঙ্গলা ও আনন্দ। এই বিবাহ অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরে ১৯৫১ সালে নাগপুরে দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন যোশী। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীয়ের নাম ভাতসালা মুধোলকর। মুধোলকর এবং যোশীর তিন সন্তান যথাক্রমে জয়ন্ত, সুভদা এবং শ্রীনিবাস।  

বিখ্যাত পণ্ডিত ইনায়েত খানের প্রশিক্ষিত শিষ্য কুর্তাকোটির ছনাপ্পার কাছে প্রথমে সঙ্গীতে তালিম নেওয়া শুরু করেন ভীমসেন যোশী। তাঁর কাছেই ভৈরব এবং ভীমপলাশী রাগ শেখার পরে ধীরে ধীরে তাঁর এক স্বতন্ত্র গায়কী তৈরি হতে থাকে। এর পরবর্তীকালে আরও অনেক গুরুর কাছে গান শিখলেও সঙ্গীতের এক প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ছনাপ্পার কাছেই। এরপরে বাগলকোটের পণ্ডিত শ্যামাচার্য যোশীর কাছে সঙ্গীতশিক্ষা করতে শুরু করেন। তাঁর কাছে গান শেখার পাশাপাশি হারমোনিয়াম বাজানোও শিখেছিলেন তিনি। মহান শিল্পী হরিদাস শ্রী মহীপতি দাসারুর যোগ্য শিষ্য ছিলেন শ্যামাচার্য। একবার বম্বেতে এইচএমভি-র গানের রেকর্ডিং করার সময় শ্যামাচার্য ভীমসেনকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে পুরো রেকর্ডিং শেষ করতে পারেননি শ্যামাচার্য এবং ভীমসেন যোশীকে অনুরোধ করেন বাকি গানগুলি যেন তিনি নিজেই গেয়ে রেকর্ডিং করেন। এই ঘটনা তাঁর সঙ্গীত জীবনে এক নতুন মোড় সূচিত করে। শৈশবে ঝিঁঝিট রাগের উপর আবদুল করিম খানের গাওয়া ‘পিয়া বিন নাহি আভৎ চ্যান’ নামের এক ঠুমরি শুনে প্রভূত মুগ্ধ হয়েছিলেন ভীমসেন যোশী। তিনি নিজেও পরে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে এই গানটি শুনেই তিনি নিজে একজন সঙ্গীতশিল্পী হওয়ার কথা ভাবেন। এই সময়ে কুন্দগোলে পণ্ডিত সওয়াই গন্ধর্বের একটি গানের অনুষ্ঠান শোনেন ভীমসেন।

১৯৩৩ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে ধারওয়াড় ছেড়ে বিজাপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হন ভীমসেন, শুধুমাত্র একজন উপযুক্ত গুরুর সন্ধান করার জন্য। সেই সময় গোয়ালিয়র ছিল সঙ্গীতচর্চার জন্য বিখ্যাত। কিন্তু সেখানে যাওয়া, থাকা, খাওয়া সব মিলিয়ে অনেক খরচের ব্যাপার ছিল। ভীমসেন জানতেন যে গোয়ালিয়র কিংবা বিজাপুর যাওয়ার প্রস্তাবে কিছুতেই তাঁর বাবা রাজি হবেন না। তাই কাউকে কিছু না জানিয়েই মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করেই একপ্রকার গোয়ালিয়রের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন তিনি। প্রায় ২ মাস পরে গোয়ালিয়র পৌঁছান এবং ওস্তাদ হাফিজ আলি খানের কাছে গান শিখতে শুরু করেন। গোয়ালিয়র যাওয়ার সময় তাঁর কাছে কোন পয়সা-কড়িও ছিল না। শোনা যায় ট্রেনের সহযাত্রীর থেকে পয়সা ধার করেছিলেন তিনি। গোয়ালিয়রে গিয়ে গোয়ালিয়রের মহারাজাদের পরিচালিত মাধব স্কুলে ভর্তি হন ভীমসেন আর সেখানেই ওস্তাদ হাফিজ আলি খানের কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন তিনি। হাফিজ আলি ছিলেন বিশিষ্ট সরোদবাদক। এরপরে লক্ষ্ণৌ, কলকাতা, গোয়ালিয়র, দিল্লি, কানপুর, রামপুর ইত্যাদি উত্তর ভারতের নানা জায়গায় দীর্ঘ তিন বছর ধরে ভ্রমণ করেন তিনি শুধুমাত্র একজন উপযুক্ত গুরুর সন্ধানে। রামপুর ঘরানার বিশিষ্ট শিল্পী ওস্তাদ মুস্তাক হুসেন খানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হলে তাঁর কাছেই এক বছরেরও বেশি সময় সঙ্গীতশিক্ষা করেন। ক্রমে তাঁর বাবা জলন্ধরে খুঁজে পান ভীমসেনকে এবং তাঁকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। এই জলন্ধরে আসার আগে ভীমসেন থাকতেন বিশিষ্ট বাঙালি অভিনেতা পাহাড়ী সান্যালের বাড়িতে। তাঁর বাড়িতে পরিচারকের কাজ করতেন ভীমসেন। এই জলন্ধরেই হরবল্লভ সঙ্গীত সম্মেলনে আগত এক দৃষ্টিহীন ধ্রুপদী সঙ্গীতশিল্পীর কাছে গান শিখতে শুরু করেন তিনি। সেই গুরুর দাক্ষিণ্যেই বিনামূল্যে নিকটস্থ একটি হোটেলে খেতে পেতেন তিনি। হরবল্লভ সঙ্গীত সম্মেলনেই ভীমসেন যোশী শোনেন পণ্ডিত সওয়াই গন্ধর্বের গান। এই গান শুনে তিনি মনস্থির করেন সওয়াই গন্ধর্বের শিষ্যত্ব গ্রহণ করবেন তিনি। পণ্ডিত সওয়াই গন্ধর্ব পুণের ধারওয়াড়েই থাকতেন। তাঁর কাছেই ১৯৩৬ সালে পাকাপাকিভাবে নাড়া বেঁধে গান শিখতে শুরু করেন তিনি। গুরুগৃহে থাকার সময় গুরুর ঘরও পরিষ্কার করে দিতেন তিনি, সেইসঙ্গে তাঁর স্নান-খাওয়ার দায়িত্বও নিয়েছিলেন।

১৯৪১ সালে ১৯ বছর বয়সে প্রথম লাইভ অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন ভীমসেন যোশী। এর পরের বছরই ১৯৪২ সালে এইচএমভি থেকে প্রথম তাঁর একটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয় যেখানে মারাঠি এবং হিন্দি ভাষার কিছু ভক্তিগীতি গেয়েছিলেন যোশী। ১৯৪৩ সালে যোশী মুম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সেখানে একজন বেতারশিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। তাঁর গুরু সওয়াই গন্ধর্বের ৬০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ১৯৪৬ সালে মুম্বাইতে একটি কনসার্টে তাঁর সঙ্গীত পরিবেশন দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৮৪ সালে প্রথম ভারতীয় গায়ক হিসেবে প্রথম প্ল্যাটিনাম ডিস্ক অর্জন করেন ভীমসেন যোশী। ‘ডেকান হেরাল্ড’ পত্রিকার বিশিষ্ট সঙ্গীত সমালোচক এস এন চন্দ্রশেখর যোশীর গান শুনে যথেষ্ট প্রশংসা করেছিলেন, সুর, তাল, লয়ের উপর তাঁর দখল, সঠিক নোটে সুর প্রয়োগের দক্ষতা চন্দ্রশেখরকে মুগ্ধ করেছিল। ষাট এবং সত্তরের দশকে তাঁর গানের মধ্যে দ্রুত এবং দীর্ঘ স্বরের টান, অভূতপূর্ব শ্বাস নিয়ন্ত্রণের কৌশল লক্ষ্য করা যেত। কিরানা ঘরানার ঐতিহ্যবাহী গায়নরীতিতে সরগম আর তেহাই-এর অসামান্য প্রয়োগে সঙ্গীত পরিবেশন করতে পারতেন যোশী। মাঝেমাঝেই অনাকাঙ্ক্ষিত বোলতানের প্রয়োগ তাঁর পরিবেশনকে আরও চমকপ্রদ করে তুলত। শুদ্ধ কল্যাণ, মিয়াঁ কি তোহরি, পুরিয়া ধনশ্রী, মূলতানি, ভীমপলাশী, দরবারি মালকোশ, আভোগী, ললিত, মিয়াঁ কি মল্লার, আশাবরী ইত্যাদি রাগের গায়নে ভীমসেন যোশী ছিলেন অপ্রতিরোধ্য এবং অতুলনীয়। সঙ্গীতের বিশুদ্ধতার প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন যোশী, তাই গানের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক ধারায় খুব একটা চর্চা করেননি তিনি। বেগম আখতার, কেশরবাই কেরকার, ওস্তাদ আমির খান প্রমুখ শিল্পীদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায় তাঁর গানে। শ্রীমতি গাঙ্গুবাঈ হঙ্গলের সঙ্গে কিরানা ঘরানাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর অনুরোধে ১৯৮৮ সালে ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা’ নামে একটি মিউজিক ভিডিওতে সুরারোপ ও অভিনয় করেন ভীমসেন যোশী যা পরে খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল।

১৯৫৬ সালে মান্না দে’র সঙ্গে ‘বসন্ত বাহার’ ছবিতে প্লে-ব্যাক গায়ক হিসেবে কাজ করেন ভীমসেন যোশী। এরপর মারাঠি ছবি ‘স্বয়ম্বর যায়ে সিতেচে’তে (১৯৬৪) এবং কন্নড় ছবি ‘সন্ধ্যা রাগা’তে (১৯৬৬)ও প্লে-ব্যাক গায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। পণ্ডিত যশরাজের সঙ্গে ১৯৭৩ সালে বীরবল মাই ব্রাদার ছবিতে একত্রে গান গেয়েছিলেন ভীমসেন। ১৯৫৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা ছবি ‘তানসেন’-এও গান গেয়েছিলেন তিনি। ১৯৮৫ সালে ‘আনোখি’ ছবিতে গান গাওয়ার জন্য শ্রেষ্ঠ পুরুষ প্লে-ব্যাক গায়ক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন যোশী। পি এল দেশপাণ্ডের পরিচালনায় মারাঠি ছবি ‘গুলাচা গণপতি’তেও গান গেয়েছিলেন তিনি।

ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ১৯৭২ সালে পদ্মশ্রী এবং ১৯৮৫ সালে পদ্মভূষণ পুরস্কারে ভূষিত হন ভীমসেন যোশী। এরপরে ১৯৯৮ সালে সঙ্গীত নাটক অকাদেমির সদস্যপদ লাভ করেন তিনি। ১৯৯৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মবিভূষণ’ সম্মান জ্ঞাপন করেন। ২০০৮ সালে ‘ভারতরত্ন’ উপাধি অর্জন করেন যোশী।

২০১১ সালের ২৪ জানুয়ারি ৮৮ বছর বয়সে ভীমসেন যোশীর মৃত্যু হয়।            


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading