খেলা

পিয়ের দে কৌবার্তিন

আধুনিক অলিম্পিক গেমসের জনক হিসেবে পরিচিত পিয়ের দে কৌবার্তিন (Pierre De Coubartin) একজন ফরাসি শিক্ষক, ইতিহাসবিদ এবং আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির প্রতিষ্ঠাতা। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির দ্বিতীয় সভাপতিও ছিলেন তিনি। ফরাসি অভিজাত পরিবারে জন্ম হলেও যে কোনো সংগঠিত ক্রীড়াকে তিনিই প্রথম ফরাসি শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেন। বৌদ্ধিক চিন্তা-চর্চার পাশাপাশি শরীরচর্চার প্রয়োজনীয়তার কথা ফ্রান্সের আপামর জনমানসে প্রচার করতে সমর্থ হয়েছিলেন পিয়ের দে কৌবার্তিন । তিনি মনে করতেন খেলাধূলার মাধ্যমেই একমাত্র মানসিক শক্তি অর্জন সম্ভব। আজীবন শিক্ষাবিজ্ঞান, ইতিহাস এবং সমাজবিজ্ঞানের চর্চা করেছেন পিয়ের দে কৌবার্তিন । তাঁর স্মরণেই আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি খেলোয়াড়ি মানসিকতা প্রদর্শনের জন্য অ্যাথলিটদের ‘পিয়ের দে কৌবার্তিন পদক’ প্রদান করে।

১৮৬৩ সালের ১ জানুয়ারি প্যারিসের এক অভিজাত ফরাসি পরিবারে পিয়ের দে কৌবার্তিনের জন্ম হয়। তাঁর প্রকৃত নাম চার্লস পিয়ের দে ফ্রেডি ব্যারন দে কৌবার্তিন (Charles Pierre De Fredy Baron De Coubertin)। তাঁদের পরিবারের ঐতিহ্য বা রীতি হিসেবে নামের শুরুতে ‘ফ্রেডি’ বসানো হত। তাঁর বাবা চার্লস লুইস দে ফ্রেডি ব্যারন দে কৌবার্তিন (Charles Louis de Frédy, Baron de Coubertin) একজন কট্টর রাজকীয় জনপ্রিয় শিল্পী ছিলেন এবং মা ছিলেন মেরি মার্সেই গিগল্ট দে ক্রিসেনয় (Marie–Marcelle Gigault de Crisenoy)। তাঁর বাবা মূলত রোম্যান ক্যাথলিক গির্জার অনুসারী ছবি আঁকতেন, রোমান্টিকতা, আধ্যাত্মিকতা ইত্যাদিই ছিল তাঁর ছবির বিষয়। প্যারিসের সালোঁতে তিনি বহু পুরস্কার পেয়েছিলেন। ফ্রান্সের এক পরিবর্তনশীল সমাজ-রাজনৈতিক অবস্থার মধ্য দিয়ে বড়ো হয়েছেন পিয়ের দে কৌবার্তিন। ফ্রাঙ্কো-প্রুসিয়ান যুদ্ধে ফ্রান্সের পরাজয়, ফ্রান্সে তৃতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এসবই তাঁর শিশুমনে প্রভাব ফেলেছিল। ব্যক্তিগত জীবনে কৌবার্তিনের এক পুত্র ও এক কন্যা ছিল।

১৮৭৪ সালে এক্সটার্নাট ডি লা রু ডি ভিয়েন (Externat de la rue de Vienne) নামের এক জেস্যুইট স্কুলে পিয়ের দে কৌবার্তিনের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। এই স্কুলটি সদ্য তৈরি হয়েছিল সেই সময়। তাঁর বাবা-মা ভেবেছিলেন এই স্কুলে জেস্যুইট যাজকের অধীনে কৌবার্তিনের মধ্যে মূল্যবোধ এবং আধ্যাত্মিক শিক্ষা বিস্তার লাভ করবে। এই স্কুলের প্রথম তিনজন সেরা ছাত্রের মধ্যে অন্যতম ছিলেন পিয়ের দে কৌবার্তিন। একইসঙ্গে সেই স্কুলের এলিট অ্যাকাডেমির একজন অফিসারও ছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে সমাজবিজ্ঞান, শিক্ষাবিজ্ঞান এবং ইতিহাস বিষয়ে তিনি গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন এবং শিক্ষাবিজ্ঞানই তাঁর আদর্শ পথ হয়ে ওঠে। ১৮৩৩ সালে ইংল্যাণ্ডে থমাস আর্নল্ডের রাগবি স্কুলে তিনি প্রথম শারীরশিক্ষার পাঠ গ্রহণ করেন।

পিয়ের দে কৌবার্তিনের কর্মজীবন শুরু হয় সমস্ত ফরাসি বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে শারীরশিক্ষা ও ক্রীড়াকে অন্তর্ভূক্ত করার মধ্য দিয়ে। রাগবি ফ্রেঞ্চ চ্যাম্পিয়নশিপের রেফারির ভূমিকাও একসময় পালন করেছেন তিনি। ব্রিটিশ স্কুলগুলির অনুকরণে তিনি চেয়েছিলেন ফরাসি স্কুলগুলিতেও একইভাবে শারীরশিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হোক। শিক্ষাব্যবস্থায় অ্যাথলেটিক্সের গুরুত্বের কথা সেসময় ইংল্যাণ্ডে প্রচার করেছিলেন থমাস আর্নল্ড এবং তাঁকেই আদর্শ মানেন পিয়ের দে কৌবার্তিন। কৌবার্তিন বুঝতে পেরেছিলেন যে সংগঠিত ক্রীড়া একটি সমাজ বা জাতির সামাজিক শক্তি বৃদ্ধি করে। এমনকি তাঁর কাছে দৃষ্টান্ত ছিল প্রাচীন গ্রিসের জিমন্যাসিয়াম যেখানে একইসঙ্গে বৌদ্ধিক ও শারীরিক সক্ষমতার পরিশীলন চলতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সমস্ত ফরাসি বিদ্যালয়ে শারীরশিক্ষাকে প্রথাগত শিক্ষার অন্তর্ভূক্তিকরণের যে প্রয়াস নিয়েছিলেন কৌবার্তিন তা ব্যর্থ প্রতিপন্ন হয়। এই অবস্থাতেই প্রাচীন অলিম্পিক গেমসকে পুনরুদ্ধার করার চিন্তা তাঁর মাথায় আসে।

এই সময়েই ১৮৬৬ সালে ইংল্যাণ্ডে ড. ব্রুকস নিজ উদ্যোগে লণ্ডনের ক্রিস্টাল প্যালেসে একটি জাতীয় অলিম্পিক গেমস আয়োজন করেছিলেন আর এই ঘটনা কৌবার্তিনকে অনুপ্রাণিত করে। উভয়ের মধ্যে আলাপচারিতার মাধ্যমে ব্রুকস কৌবার্তিনের প্রচেষ্টাকে সাহায্য করতে উদ্যোগী হন। গ্রিসের সরকারের কাছে অলিম্পিক গেমসের পুনরুদ্ধারের কাজে সাহায্য প্রার্থনা করেন পিয়ের দে কৌবার্তিন। ১৮৯৬ সালে এথেন্সে যে আধুনিক অলিম্পিক গেমসের সূচনা ঘটে তাতে আর্থিক সহায়তা করেছিলেন ইভাঞ্জেলিস জাপ্পাস (Evangelis Zappas)  এবং কন্সট্যান্টিনোস জাপ্পাস (Konstantinos Zappas)। এছাড়াও জর্জ অ্যাভারহফ প্যানান্থিনাইকো স্টেডিয়ামটি সুগঠিত করে তুলতে গ্রিস সরকারকে আর্থিকভাবে অনেকে সাহায্য করেছিলেন। পিয়ের দে কৌবার্তিনের উদ্দেশ্য ছিল এই অলিম্পিক গেমসের পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি একে আন্তর্জাতিক ক্রীড়ায় পরিণত করা। শুধু তাই নয়, কৌবার্তিন চেয়েছিলেন অলিম্পিক গেমসের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বে শান্তির পরিমণ্ডল গড়ে তুলতে এবং যুদ্ধের বাতাবরণ বা সম্ভাবনা দূর করতে।

অলিম্পিকের একটি দার্শনিক তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করতেন কৌবার্তিন। তিনি মনে করতেন যে ক্রীড়ায় জয়লাভ করাটাই মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, জীবনের মতো ক্রীড়াতেও দারুণভাবে লড়াই করাটাই মুখ্য। জয়ের বদলে লড়াই বা জয়লাভের প্রচেষ্টার দার্শনিক গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন কৌবার্তিন। তিনি চাইতেন অপেশাদার অ্যাথলিটদের এই অলিম্পিকে নিয়ে আসতে কিন্তু তাঁর এই চিন্তা ১৮৯৪ সালের ২৩ জুন প্যারিসের সরবোনে আয়োজিত কংগ্রেসে সমালোচিত হয়। তবু ১৯০৯ সাল পর্যন্ত তিনি অলিম্পিকে অপেশাদার ক্রীড়াকুশলীদের যোগদানের ব্যাপারে তর্ক-বিতর্ক চালিয়ে গেছেন। এই কংগ্রেসেই অলিম্পিকের পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং প্রাচীন গ্রিসের অলিম্পিকের সমস্ত নিয়ম মেনে চার বছর অন্তর এই আধুনিক অলিম্পিক আয়োজন করার উদ্যোগ গৃহীত হয়। তাছাড়া আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিও গঠিত হয় এই কংগ্রেসের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। আরেকটি বিষয় এই কমিটিতে সিদ্ধান্ত হয় যে, যে সকল ক্রীড়াকুশলী তাদের ক্রীড়ার মাধ্যমে অর্থোপার্জন করেন তাঁদের এই প্রতিযোগিতায় নেওয়া হবে না। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৮৯৬ সালের প্রথম আধুনিক অলিম্পিক আয়োজিত হয়েছিল গ্রিসের এথেন্সে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কৌবার্তিন বাধ্য হন সুইজারল্যাণ্ডের লুসেন শহরে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিকে সরিয়ে নিয়ে যেতে। কিন্তু জার্মানরা যখন প্যারিসে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় তাতে তাঁর স্ত্রীয়ের বোন মারা যান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কৌবার্তিনের দুই ভাগ্নেও মারা যান।

১৮৮৯ সালে ফ্রান্সে ‘ফ্রেঞ্চ অ্যাথলেটিক অ্যাসোসিয়েশন’ স্থাপন করেন পিয়ের দে কৌবার্তিন যার সংক্ষিপ্ত নাম ‘ইউএসএফএসএ’ (USFSA)। তিনিই সর্বপ্রথম অ্যাথলেটিক্সের উপর ফরাসি সাময়িকপত্র ‘লা রিভ্যু অ্যাথলেটিক’ প্রকাশ করেন। ইংল্যাণ্ডের রাগবি স্কুলে পাঠগ্রহণকালীন অভিজ্ঞতার কথা পিয়ের দে কৌবার্তিন তাঁর ‘এল এডুকেশন এন অ্যাঞ্জেলিটারি’ (L’Education en Angleterre) বইতে সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন যা ১৮৮৮ সালে প্রকাশ পায়। তাঁর লেখা কিছু বিখ্যাত ক্রীড়া সংক্রান্ত বইয়ের নাম হল – ‘লা জিমন্যাস্টিক ইউটিলিটেয়ার’ (১৯৩৫), ‘মেমোয়ারস অলিম্পিক্স’ (১৯৩১), ‘নোটস অন এল এডুকেশন পাবলিক’ (১৯০১), ‘পেডাগজি স্পোর্টিভ’ (১৯২২) ইত্যাদি।  

১৯০৬ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের সময় কৌবার্তিন প্রথম আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯২৪ সাল পর্যন্ত তিনি ঐ পদে আসীন ছিলেন। সভাপতি থাকাকালীন ১৯১২ সালের অলিম্পিকে পিয়ের দে কৌবার্তিন আধুনিক পেন্টাথেলন ক্রীড়াকে অন্তর্ভূক্ত করেন। ১৯৩৬ সালে জার্মানি পিয়ের দে কৌবার্তিনের নাম মনোনয়ন করেছিল নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য, কিন্তু নোবেল পাননি তিনি। ১৯১২ সালের অলিম্পিককে কেন্দ্র করে লেখা তাঁর কবিতা ‘ওড টু স্পোর্ট’-এর জন্য কৌবার্তিন স্বর্ণপদক লাভ করেন। ২০১৩ সালে রাশিয়া সরকার পিয়ের দে কৌবার্তিনের স্মরণে ক্রীড়াজগতের কিংবদন্তি হিসেবে কৌবার্তিনের ছবি সম্বলিত একটি স্ট্যাম্প প্রকাশ করে। তাঁর স্মরণেই আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি খেলোয়াড়ি মানসিকতা প্রদর্শনের জন্য অ্যাথলিটদের ‘পিয়ের দে কৌবার্তিন পদক’ প্রদান করে।   

১৯৩৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর সুইজারল্যাণ্ডের জেনেভায় পিয়ের দে কৌবার্তিনের মৃত্যু হয়।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

2 Comments

2 Comments

  1. Pingback: অলিম্পিক গেমস | সববাংলায়

  2. Pingback: অলিম্পিকের অনুপ্রেরণাদায়ী অ্যাথলিটরা | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন