ইতিহাস

প্রফুল্ল চন্দ্র সেন

প্রফুল্ল চন্দ্র সেন(Prafulla Chandra Sen) একজন ভারতীয় বাঙালি রাজনীতিবিদ, স্বাধীনতা সংগ্রামী ও গান্ধীবাদি নেতা যিনি পশ্চিমবঙ্গের তৃতীয় মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ‘আরামবাগের গান্ধী’ নামেও পরিচিত।

১৮৯৭ সালের ১০ এপ্রিল বর্তমান বাংলাদেশের খুলনা জেলার সেনহাটি গ্রামে প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের জন্ম হয়৷ তাঁর পিতার নাম গোপালচন্দ্র সেন। প্রফুল্ল চন্দ্রের ছেলেবেলার বেশিরভাগটাই কাটে বিহারে। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা বিহারের বিদ্যালয় থেকেই শুরু হয় এবং দেওঘরের আর.মিত্র ইন্সটিটিউশন থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন। তারপর তাঁর পিতা বদলি হয়ে কলকাতায় চলে এলে প্রফুল্ল চন্দ্র কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে অনার্স নিয়ে বিএসসি পাশ করেন।

প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের কর্মজীবন শুরু হয় একটি অ্যকাউন্টিং ফার্মে যোগদান করে৷ গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পরই তিনি তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন৷ এরপর তিনি আর্টিকেল ক্লার্ক হওয়ার উদ্দেশ্যে সূদুর ইংল্যান্ডে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু ১৯২০ সালে কংগ্রেস পার্টির কলকাতা অধিবেশনে মহাত্মা গান্ধীর ভাষণ শুনে তাঁর মত পরিবর্তন হয়৷ প্রফুল্ল চন্দ্র সেন বিদেশে পাড়ি দেওয়ার পরিকল্পনা ত্যাগ করেন৷ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গণ-অসহযোগ আন্দোলনে গান্ধীর আহ্বানে তিনি সাড়া দিয়ে স্বদেশী এবং সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য তিনি ১৯৩৩ সালে হুগলী জেলার আরামবাগের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে চলে আসেন। গান্ধীজি তাঁকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন৷ স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত থাকার দরুন এবং ব্রিটিশ বিরোধী কর্মকান্ডের জন্য ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত বহুবার তিনি কারাগারে বন্দী ছিলেন। এমনকি তিনি তাঁর শ্রীরামপুরের বাড়িটি কংগ্রেসের কার্যালয় হিসাবে ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন। আজীবন অকৃতদার এই মানুষটি খুবই সাধারণ জীবন যাপন করতেন। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ১৯৪৪ সালে তিনি আরামবাগ থেকে বেঙ্গল অ্যাসেম্বলির বিরোধী দলের নেতা হিসেবে নির্বাচিত হন৷ ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করার পর ১৯৪৮ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় তাঁকে মন্ত্রীসভায় কৃষিমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেন৷ তিনি বিধানচন্দ্র রায়ের উপমন্ত্রী হিসেবেও কাজ করেছেন৷ ১৯৬২ সালে বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যু হলে প্রফুল্ল চন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের তৃতীয় মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন৷ মুখ্যমন্ত্রীত্ব গ্রহণের তিন বছর পরই রাজ্যে মারাত্মক ভাবে খাদ্যের ঘাটতি দেখা দিলে তিনি রাজ্যে খাদ্য-শস্যের রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেন৷ তাঁর শুরু করা রেশনিং ব্যবস্থা আজও চলে আসছে। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে আরামবাগ থেকে কংগ্রেস প্রার্থী হয়ে তিনি ভোটে লড়তে গিয়ে আর এক গান্ধীবাদী নেতা বাংলা কংগ্রেসের প্রার্থী অজয় মুখোপাধ্যায়ের কাছে মাত্র ৮২০ ভোটে পরাজিত হন৷ এরপর যদিও তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় নির্বাচিত হন কিন্তু কোনভাবেই আর উচ্চপদে আসীন হতে পারেননি।

জন দরদি নেতা হিসেবে তিনি বিশেষ খ্যাত ছিলেন৷ তিনি নারী শিক্ষার প্রসারের জন্য আরামবাগে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন রথিপুর বরদা বাণীপীঠের ছাত্রাবাসের ছাউনির টিনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

১৯৯০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের মৃত্যু হয়।

ব্রিটিশ আমলে প্রকাশিত সংবাদপত্র ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট ‘ – এ ১৯৯০ সালের ২৮ শে সেপ্টেম্বর প্রফুল্ল চন্দ্র সেন সম্পর্কে লেখা হয়, “a fiery freedom fighter from Bengal state in Eastern India and later the state’s Chief Minister practiced a selfless and principled brand of politics long forgotten in India today”.

আরামবাগ পুরসভা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, প্রফুল্লচন্দ্র সেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন কলকাতার একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে ‘পদ্মিনী অটো লিমিটেড’–এর একটি গাড়ি তাঁকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। গাড়িটির নম্বর ডব্লু.এম.বি–৯৬৬। পরবর্তীকালে বর্ধমানের একটি গ্যারেজ কোম্পানি সেই গাড়ি কিনে নেয়। বর্তমানে আরামবাগ পুরসভার উদ্যোগে নজরুল উদ্যানে একটি সুদৃশ্য কাচের ঘরে গাড়িটি প্রদর্শনীর জন্য রাখা রয়েছে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।