পন্ডিত রঘুনাথ মুর্মু একজন ভারতীয় সাঁওতাল লেখক ও শিক্ষাবিদ যিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন সাঁওতাল ভাষার লিখিত বর্ণমালা ‘অলচিকি’ (Ol Chiki script) উদ্ভাবনের জন্য। তিনি কেবল অলচিকি বর্ণমালার স্রষ্টাই ছিলেন না তিনি একাধারে কবি ও সাহিত্যিকও ছিলেন। এছাড়াও তিনি সাঁওতালি সমাজের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত। তাঁর আবিষ্কৃত লিপি আজ সাঁওতালি পরিচয়ের মেরুদণ্ড। ভাষা, শিক্ষা, সাহিত্য, নাটক — সবক্ষেত্রে তাঁর অবদান এক নতুন যুগের সূচনা করে।
১৯০৫ সালের ৫ মে বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনে ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার ডাহারডি (দণ্ডবস) গ্রামে রঘুনাথ মুর্মুর (Raghunath Murmu) জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম নন্দলাল মুর্মু এবং মায়ের নাম সলমা মুর্মু । বাবা মায়ের চার সন্তানের মধ্যে রঘুনাথ হলেন তৃতীয় সন্তান। সামাজিক রীতি মেনেই রঘুনাথের বাবা তাঁর তৃতীয় সন্তানের নাম রাখেন ঠাকুরদার নামে ‘চুনু’। ছোট থেকেই নানান রোগে ভুগতেন রঘুনাথ। পরবর্তীতে এক ওঝার পরামর্শ অনুযায়ী তিনি ‘চুনু’ নামটি পাল্টে তাঁর তৃতীয় সন্তানের নাম রাখেন রঘুনাথ। রঘুনাথের স্ত্রীর নাম নুহা বাস্কে।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন কৌতূহলী, অনুসন্ধিৎসু ও শিল্পীসুলভ স্বভাবের। দণ্ডবস গ্রামের প্রকৃতি, জঙ্গল, নদী, পাহাড় — সবকিছুই তাঁর মনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। গ্রামের মানুষের ভাষা, গান, নাচ, রীতি-নীতি তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। কিন্তু তিনি খুব তাড়াতাড়ি বুঝতে পারেন—সাঁওতালি ভাষার কোনও নিজস্ব লিপি নেই, ফলে শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চা সীমাবদ্ধ। এই অভাবই পরবর্তীতে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
রঘুনাথের শিক্ষাজীবন শুরু হয় সাত বছর বয়সে গাম্ভারিয়া ইউ. পি. স্কুলে। স্কুলে ওড়িয়া ভাষায় পড়ানো হত যা রঘুনাথের বোধগম্য হত না। এরপর বহড়দা এম. ই. স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন তিনি। ১৯২২ সালে রঘুনাথ এম. ই. পাশ করে বারিপদা হাইস্কুল অফ্ ময়ূরভঞ্জে ভর্তি হন। ১৯২৮ সালে এই স্কুল থেকেই ম্যাট্রিক পাশ করেন তিনি। ১৯৩১ সালে রঘুনাথ বারিপদা পাওয়ার হাউস থেকে শিক্ষানবিশীর কোর্স করেন। এরপর রঘুনাথ, শ্রীরামপুর, গোসাবা এবং কোলকাতা থেকে বাণিজ্যিক প্রশিক্ষণ লাভ করেন। রঘুনাথ মুর্মুর কর্মজীবন শুরু হয় লোকগণনার অস্থায়ী কর্মী হিসাবে। এরপর তিনি বারিপদার পূর্ণ-চন্দ্র ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষক হিসাবে কিছুকাল কাজও করেন। তবে চাকরি তাঁর জীবনের লক্ষ্য ছিল না। ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর টান এতটাই প্রবল ছিল যে তিনি অবসর পেলেই নিজের গ্রামে ফিরে যেতেন এবং নতুন কিছু ভাবতে শুরু করতেন।
স্কুলে পড়াকালীন ছুটিতে মাঝে মাঝেই দণ্ডবস গ্রামে চলে আসতেন রঘুনাথ। এখানকার কাপি – বুরু নামক এক নির্জন জঙ্গলে খাতা পেন নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়াতেন। এটা মনে করা হয়ে থাকে এই কাপি বুরু জঙ্গলেই তিনি অলচিকি লিপি উদ্ভাবন করেন। ১৯২৫ সালে রঘুনাথ মুর্মু ‘অলচিকি’ বর্ণমালা আবিষ্কার করেন। অলচিকি লিপির বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি বর্ণের আকার প্রকৃতি, দৈনন্দিন জীবন ও সাঁওতালি সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রাণিত। লিপিটি সম্পূর্ণ ধ্বনিভিত্তিক, যুক্তাক্ষর নেই, লেখার নিয়ম সহজ — যা প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। ব্রাহ্মী-উৎপন্ন লিপিগুলোর থেকে আলাদা হওয়ায় এটি সাঁওতালি ভাষার স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনিকে নিখুঁতভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম। তাঁর এই লিপি সাঁওতালি সমাজে এক নতুন আত্মপরিচয়ের জন্ম দেয়।
১৯৩৮ সালে অলচিকি লিপিতে লেখা ছাপার জন্য রঘুনাথ কাঠের মুদ্রণ যন্ত্র তৈরি করেন এবং ১৯৩৯ সালের বারিপদার এক সভায় রঘুনাথ অলচিকি লিপি এবং মুদ্রণ যন্ত্রকে জনসমক্ষে আনেন। এরপর তিনি কলকাতার স্বদেশি টাইপ ফাউন্ড্রিতে প্রথম ‘অলচিকি’-র টাইপ সেটিং তৈরি করান। এটি ছিল সাঁওতালি ভাষার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। প্রথমবারের মতো সাঁওতালি ভাষা ছাপার অক্ষরে প্রকাশ পেল। এর ফলে পাঠ্যবই, নাটক, গান, গল্প — সবকিছু তৈরি করা সম্ভব হল।
১৯৪২ সালে দেশ জুড়ে স্বদেশী আন্দোলনের সময় তিনি বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে পালিয়ে বেড়ান এবং একই সাথে অলচিকি ভাষার প্রচার করতে থাকেন। অলচিকি লিপি আবিষ্কারের পর রঘুনাথ মুর্মু শুধু লেখালিখিতেই থেমে থাকেননি; তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে এক ধারাবাহিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে “অলচিকি আন্দোলন” নামে পরিচিত হয়। এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সাঁওতালি সমাজকে শিক্ষার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ করা, তাদের স্বতন্ত্র ভাষা ও সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং অলচিকি লিপিকে সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
তিনি গ্রামের যুবকদের নিয়ে বিশেষ শিক্ষাগোষ্ঠী গঠন করেছিলেন, যেখানে অলচিকি লিপির পাঠ, সাঁওতালি গান, নাটক, নৃত্য ও ইতিহাস নিয়ে নিয়মিত অনুশীলন চলত। রঘুনাথ নিজে নাট্যকার ও সংগঠক হিসেবে গ্রামে গ্রামে ঘুরে তাঁর নাটক ‘দাড়েগে ধন’, ‘লিতি লেনা’ ইত্যাদি মঞ্চস্থ করতেন। এই নাটকগুলোতে তিনি অলচিকি লিপির ব্যবহার, সাঁওতালি সমাজের অধিকার, আত্মপরিচয়, ভূমি ও সংস্কৃতির প্রশ্নকে সামনে আনতেন—যা গ্রামের সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলত।
১৯৩০–৪০ দশকে তিনি বারবার গোলযোগ, পুলিশি নজরদারি, আর্থিক অনটন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও শিক্ষাশিবির, লিপি প্রদর্শনী, পথসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে গেছেন। তাঁর অনুসারীরা পরবর্তীতে “অলচিকি বাহিনী” নামে পরিচিত গোষ্ঠীতে সংগঠিত হন, যারা প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের অলচিকি শেখাতেন।
এই আন্দোলন ব্যাপক আকার নিলে আন্দোলনের অন্যতম মুখ হিসেবে তাঁর নামে পুলিশ অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট জারি করে। ফলত রঘুনাথ জামশেদপুর পালিয়ে যান এবং টাটা স্টিলে কাজ করতে থাকেন। কিন্তু যেখানেই গেছেন, অলচিকি লিপির প্রচার থামাননি। তাঁর নাটক, গান, বক্তৃতা — সবকিছুই সাঁওতালি সমাজকে সংগঠিত করতে সাহায্য করেছিল।
সাঁওতাল জাতির শিক্ষা বিস্তারে অলচিকি লিপির প্রসারে আজীবন কাজ করে গিয়েছেন পন্ডিত রঘুনাথ মুরমু। তিনি কেবল অলচিকি লিপি সৃষ্টি করেই ক্ষান্ত থাকেননি। তিনি একই সাথে শিশু সাহিত্য, কবিতা, গল্প, উপন্যাস রচনা করেছেন অলচিকি লিপিতে। ‘অল চেমেদ’, ‘অল উপরুম’ তাঁর দুটি শিশু পাঠ্য বই। ‘দাড়েগে ধন’ তাঁর রচিত একটি অনন্য নাটক। ‘পারশি ইতুন’ তাঁর রচিত অলচিকি লিপিতে ইংরেজি শিক্ষার বই। এছাড়া সাঁওতালি শিক্ষার জন্য তিনি ‘রণড়’ নামে সাঁওতালি ব্যাকরণ বই লিখেছেন। এছাড়া উপদেশ মূলক গানের বই ‘লাকচার’ এবং তিনখণ্ডে মহাকাব্যধর্মী গ্রন্থ ‘হিতাল’ তাঁর সাহিত্য প্রতিভার অন্যতম পরিচায়ক। তাঁর রচনায় সাঁওতালি সমাজের সংগ্রাম, প্রকৃতির সৌন্দর্য, মানবিকতা ও আত্মমর্যাদার বার্তা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তিনি ১৫০টিরও বেশি বই লিখেছিলেন —যা সাঁওতালি সাহিত্যকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
১৯৮২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রঘুনাথ মুর্মুর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর কাজ থেমে যায়নি। বর্তমানে ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গে অলচিকি লিপি সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে। তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা কেন্দ্র, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সাঁওতালি সমাজে তাঁর অবদান এতটাই গভীর যে তাঁকে ‘গুরু গোমকে’ — অর্থাৎ ‘মহান শিক্ষক’ উপাধিতে সম্মানিত করা হয়। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর জন্মদিনটিকে সরকারী ছুটির দিন ঘোষণা করেন। আজ সাঁওতালি ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিটি স্তম্ভে রঘুনাথ মুর্মুর ছাপ স্পষ্ট। তিনি শুধু একটি লিপি তৈরি করেননি; তিনি একটি জাতিকে আত্মপরিচয়, মর্যাদা ও ভাষার অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


Leave a Reply to আজকের দিনে ।। ১ ফেব্রুয়ারি | সববাংলায়Cancel reply