বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি ধারা হল লোকনৃত্য। সেই লোকনৃত্যেরও নানারকম ধারার মধ্যে আবার জনপ্রিয় এবং প্রাচীন একটি ধারা হল রায়বেঁশে নাচ (Raibenshe Dance)। রায়বেঁশে নাচের কথা উঠলে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত লাইনগুলি প্রথমেই মনে আসে – “শ্যালীর সঙ্গে ক্রমে ক্রমে/ আলাপ যখন উঠল জমে/রায়বেঁশে নাচ নাচের ঝোঁকে/ মাথায় মারলে গাঁট্টা”। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম, বর্ধমান এবং মুর্শিদাবাদেই মূলত সবচেয়ে বেশি এই লোকনৃত্যকলাটি চোখে পড়ে। প্রধানত পুরুষদের এই নাচে একপ্রকার বীরত্ব প্রকাশের ভঙ্গি লক্ষ করা যায়। মার্শাল নৃত্যের একটি ধারা এই রায়বেঁশে নাচ। সাধারণত বাউরি, বাগদীদের মতো অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের মানুষদের দ্বারাই এই নৃত্য পরিবেশিত হত এবং তারাই মধ্যযুগীয় বাংলায় জমিদারদের দেহরক্ষী হিসেবেও কাজ করত। বাঙালিদের সামরিক শক্তি এবং বীরত্বের ইতিহাস এই রায়বেঁশে নৃত্যের মধ্যেই যেন প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। এই লোকনৃত্যের জনপ্রিয়তা আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কমে এলেও বাংলার বুক থেকে এখনও এর অস্তিত্ব লুপ্ত হয়ে যায়নি।
রায়বেঁশে শব্দটিকে বিযুক্ত করলে দেখা যায় দুটি শব্দের সংযোগে এটি তৈরি হয়েছে। রায় শব্দের অর্থ রাজকীয় এবং বেঁশে কথাটি আসলে বংশ বা বাঁশ থেকে উদ্ভুত। অতএব রায়বাঁশ থেকে রায়বেঁশে কথাটি এসেছে বলে মনে করা হয়। অবশ্য একাংশের মতে রাইবেশ অর্থাৎ নারী বেশ বা সাজ থেকে এই রায়বেশে নাচ কথাটির উৎপত্তি। আসলে রায়বেঁশের নর্তকরা ঘাঘরা ও পায়ে ঘুঙুর পরত বলেই হয়তো নারীর বেশভূষার সঙ্গে তুলনা করা হত।
গুরুসদয় দত্ত যখন রায়বেঁশেদের ইতিহাস অনুসন্ধানে রত হয়েছিলেন তখন এমন কথাও শুনেছিলেন যে আসলে রাজবংশী জাতের নাম থেকে এই রায়বেঁশে নামটির উৎপত্তি। কিন্তু গুরুসদয় দত্ত সেকথা বিশ্বাস করেননি কারণ রাজবংশীদের মধ্যে এই জাতীয় নাচের প্রচলন নেই। নিয়ত অনুসন্ধান এবং শিবরতন মিত্রের সহযোগিতার ফলে যে ইতিহাসের হদিশ তিনি পেয়েছিলেন তা এখানে উদ্ধৃত করা হল। গুরুসদয় দত্ত লিখেছেন, “…এই ‘রাইবিশে’ই ধর্মমঙ্গলের, কবিকঙ্কণ চন্ডীর এবং অন্নদামঙ্গলের রায়বাঁশ(-ভল্ল)ধারী অমীতবীর্য্য ‘রায়বেঁশে’ যোদ্ধা, যাহারা একাদশ শতাব্দীতে বর্দ্ধমান জেলার ‘শ্যামরূপা’র গড় হইতে মহামদ পাত্রের নেতৃত্বে ‘ময়নাগড়ে’ লাউসেনকে আক্রমণ করিয়াছিলেন—যাহারা অতি সুদূরে অতীতের গৌরবময় যুগে একদিন কলিঙ্গ রাজ্যের নেতৃত্বে সুদূর গুজরাট আক্রমণ করিয়াছিল এবং ষোড়শ শতাব্দীতে যাহারা মানসিংহের বিজয়বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হইয়া প্রতাপাদিত্যের সহিত যুদ্ধ করিয়াছিল।” ষোড়শ, সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই রায়বেঁশে যোদ্ধারা হিন্দু-মুসলিম রাজাদের সৈন্যবাহিনীতে এমনকি স্বয়ং মোগল সম্রাটের শ্রেষ্ঠ সেনাপতি মানসিংহেরও সেনাবাহিনীতে স্থান পেতেন।
রায়বেঁশে নাচ সম্পর্কে শোনা যায় যে, বীরভূম জেলাতেই এই নৃত্যের প্রথম প্রচলন হয়েছিল। তবে কারও কারও মতে, মুর্শিদাবাদের বড়ঞা ও খড়গ্রাম থানা এলাকায় এই নাচের উদ্ভব। ইতিহাস বলে মুর্শিদাবাদ জেলার বড়ঞা থানা এলাকার ফতেসিং পরগণায় ফতে হাড়ি নামক একজন স্বাধীনচেতা সামন্তরাজা রাজত্ব করতেন, যাঁরা দিল্লির শাসন মানতেন না। ১৬০০ খ্রীস্টাব্দে আকবর সেনাপতি মানসিংহকে এই অঞ্চলে পাঠান এঁদের দমন করবার জন্য। মানসিংহের সহকারী সৈন্যাধ্যক্ষ সবিতা রায় দীক্ষিত হাড়ি রাজাকে পরাস্ত করলে বাদশাহের অনুমতিতে তাঁকে ফতেসিং পরগণার শাসক নিযুক্ত করা হয়েছিল। সেই সবিতা রায়ের সঙ্গে রাজস্থান থেকে আগত ভল্লধারী যোদ্ধারাও রয়ে যান, যাঁরা যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হলেও চাষাবাদ জানতেন না। তাঁরা জমিদারদের লেঠেল হিসেবে কাজ করতেন। আগেকার দিনে বিবাহের পালকি এবং বরযাত্রীদের ডাকাতদের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য তাঁরা সেই বরযাত্রীর আগেপিছে নৃত্য করতে করতে যেতেন। ভল্লধারী এই যোদ্ধারাই রায়বেঁশে নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে স্থানীয় বাগদী, বাউরি, ডোম, হাড়ি প্রভৃতি অন্ত্যজ শ্রেণিদের নিয়ে তাঁরা রায়বেঁশে দল গঠন করেন। যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা একসময় ফুরোলে এই রায়বেঁশে দল বিভিন্ন বিবাহের অনুষ্ঠানে যুদ্ধনৃত্য প্রদর্শন করতে শুরু করেন। একটা সময় পর এই অন্ত্যজ রায়বেঁশেদের অপরাধপ্রবণ জাত হিসেবেই দেখা হত, গুরুসদয় দত্ত বীরভূমে গিয়ে পুনরায় এই প্রাচীন লোকনৃত্যটিকে পুনরুজ্জীবন দান করেছিলেন বলা যায়।
রায়বেঁশে নৃত্য কসরতপ্রধান। অত্যন্ত পুরুষালি এই নৃত্যের বৈশিষ্ট্যই যুদ্ধের নানা আঙ্গিকে পৌরুষ প্রদর্শন। জোরালো ও পুরুষালি চলাফেরা দেখা যায় এই নাচে। নানারকম মার্শাল আর্ট ধরণের শারিরীক অঙ্গভঙ্গির সংমিশ্রণ লক্ষ করা যায় এই লোকনৃত্যে। এছাড়াও এই নাচের বিভিন্ন কারিগরি দেখলে বুঝতে পারা যায় এরজন্য কতখানি অ্যাক্রোব্যাটিক দক্ষতার প্রয়োজন। যেমন ঘোড়ার পিঠে চড়া শিকারীর অনুকরণে যে বিশেষ প্রদর্শনটি এই নাচে দেখানো হয় তার জন্য উপযুক্ত দক্ষতার প্রয়োজন। কখনও নর্তকরা বর্শা নিক্ষেপের ভঙ্গি করে, কখনও বা তলোয়ার চালনা দেখায় হাতের ভঙ্গিতে। নাচের মাধ্যমেই যুদ্ধের অবস্থান তৈরি করে। কোনরকম অস্ত্র বা হাতাহাতি ছাড়াই কেবল নৃত্যদক্ষতার সাহায্যে তাঁরা যুদ্ধক্ষেত্রের আবহ তৈরি করতে পারে। এমনকি যুদ্ধে জয় এবং পরাজয়ের অবস্থানকেও ফুটিয়ে তোলে নৃত্যের সাহায্যে। উল্লেখ্য যে প্রযুক্তির প্রভাবের সঙ্গে সামাজিক বিনোদনেরও যেমন বিবর্তন হয়েছে, সেইসঙ্গে রায়বেঁশে নৃত্যেও পড়েছে তার প্রভাব। রায়বেঁশেরা যুদ্ধের প্রদর্শনের পাশাপাশি কখনও কখনও শারিরীক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নাগরদোলার আকার তৈরি করে, আবার বাঘ, ঘোড়া, হাতি, গরু ইত্যাদি জীবজন্তুর আকারের অনুকৃতিও করে থাকে। এই নৃত্যের মোট সময়কাল পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট। একেকটি রূপ বা চিত্র দেখাতে তাঁদের দুই থেকে পাঁচ সেকেন্ড লাগে।
এই মার্শাল ডান্সের সময় কোনরকম গান গাওয়া হয় না বা কোনরকম ছন্দবদ্ধ কবিতা বা শ্লোকও আবৃত্তি করা হয় না। এই নাচের সময় নর্তকরা মুখে বন্য চিৎকার করে, ‘ইঃ আঃ’ শব্দ করে নানা শারিরীক অঙ্গভঙ্গী করে থাকে।
সাধারণত এই রায়বেঁশে নাচ প্রদর্শনের জন্য বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ঢোল ও করতালের ব্যবহার করা হয়।
এই নর্তকরা একসময় মহিলাদের পোশাকে মূলত ঘাঘরার মত পোশাক ব্যবহার করত। তবে পরবর্তীকালে রায়বেঁশে নাচ প্রদর্শনের সময় মূলত ধুতিই প্রধান পোশাক হয়ে দাঁড়ায়। রায়বেঁশেের এই পোশাকের রূপান্তর প্রসঙ্গে একটু ইতিহাসের দিকে তাকানো দরকার। ১৮৪০ সালের পর, যখন বিদেশী ব্যান্ড, অর্কেস্ট্রা, বাইনাচের রমরমা তখন রায়বেঁশে নৃত্যশিল্পটি পড়েছিল অস্তিত্ব সংকটে। রায়বেঁশেদের পোশাক ও বিষয়বস্তু তখন আর দর্শকদের আকর্ষণ করতে পারছিল না। উনিশ শতকীয় সমাজের চাহিদা ছিল লম্পট নৃত্য, যা কিনা রায়বেঁশে নৃত্যের থেকে অনেক দূরবর্তী এক বস্তু। সেই ঢেউয়ে রায়বেঁশের মধ্যে নারী নৃত্যশিল্পীর দাবি উঠতে থাকে। তবে তা সম্ভব না হলে, পুরুষরাই নারীদের মতো পোশাক পরে নৃত্য পরিবেশন করতে শুরু করেছিলেন। নারীদের মতো লম্বা চুলও নাকি রাখতেন নর্তকরা, যেটি পরে বাবরি নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। এমনকি নর্তকরা যুবতীসুলভ কামুক ভাবভঙ্গিও ফুটিয়ে তুলতেন নৃত্যের মধ্যে। পরবর্তীকালে গুরুসদয় দত্ত যখন রায়বেঁশে নৃত্যের এই বিকৃতি থেকে তাকে উদ্ধার করেন এবং বিশুদ্ধ রায়বেঁশে নৃত্যকে বাংলার মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন তখন নৃত্যের মেয়েলি পোশাকও বদলে যায়। অনেক সময় ল্যাঙটের মতো করেও একখন্ড বস্ত্র পরিধান করতে দেখা যায় নর্তকদের। বীরত্বের প্রতীক হিসেবে নর্তকরা সাধারণত লাল রঙের ধুতিই পরিধান করেন এবং ঊর্ধ্বাঙ্গে কোনরকম পোশাক থাকে না। খালি গায়ে ঘাম ঝরিয়ে বীরের মতো যুদ্ধের ভঙ্গি ফুটিয়ে এই নৃত্য পরিবেশন করেন রায়বেঁশেরা। লাল ধুতির সঙ্গে তাঁদের ডান পায়ের গোড়ালিতে বাঁধা থাকে নুপুর। বাদ্যের তালে তালে পদচালনার ফলে নুপুরের ছন্দময় ধ্বনিও এই নৃত্যে এক বিশেষ মাধুর্য যোগ করে দেয়।
একসময় বিবাহের অনুষ্ঠানে এই রায়বেঁশে নাচ আয়োজিত হত। কিন্তু পরবর্তীকালে গুরুসদয় দত্তের ব্রতচারী সঙ্ঘের হাত ধরে রায়বেঁশে নৃত্যের প্রদর্শন ছড়িয়ে পড়েছিল আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে। এমনকি বহু পেশাদার নৃত্যশিল্পীও রায়বেঁশের অনুশীলন করে থাকেন। গুরুসদয় দত্তের উদ্যোগে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানেও এই রায়বেঁশে নৃত্যের প্রদর্শন হতে দেখা গেছে।
গুরুসদয় দত্ত একসময়ে বীরভূমের নানুর থানার চারকোল গ্রামের রামপদ প্রামাণিক, গোবর্দ্ধন প্রামাণিকদের মতো রায়বেঁশে শিল্পীদের নিয়ে এই লোকনৃত্যের প্রচার শুরু করেছিলেন। তবে বর্তমান প্রযুক্তির যুগে জনপ্রিয়তা হারালেও সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়ে যায়নি। পূর্ব বর্ধমানের শীতেন্দু চক্রবর্তী, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ঘুরে আসা বীরভূমের চারকোল গ্রামের মাধব প্রামাণিকের মতো প্রথিতযশা রায়বেঁশে শিল্পীদের দৌলতে আজও এই প্রাচীন লোকনৃত্যটির সগর্ব অস্তিত্ব বর্তমান।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারও এই রায়বেঁশে নৃত্যশিল্পীদের সম্পর্কে সচেতন। সরকার রায়বেঁশে শিল্পীদের জন্য কর্মশালারও আয়োজন করেছে। বর্তমানে বীরভূম, বর্ধমান এবং মুর্শিদাবাদের মোট ২৮৮জন রায়বেঁশে শিল্পী RCCH II (Rural Craft and Cultural Hub) প্রকল্পের আওতায় রয়েছেন। উল্লেখ্য যে UNESCO এই প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- ‘বাংলার লোকশিল্প ও লোকনৃত্য’, গুরুসদয় দত্ত, ছাতিম বুকস্, কলকাতা, মে, ২০০০
- https://en.wikipedia.org/
- https://rcchbengal.com/art/raibenshe
- https://www.indianetzone.com/
- https://miltonbhblog.wordpress.com/
- https://www.sangbadprabhati.com/
- https://bengali.news18.com/


আপনার মতামত জানান