ইতিহাস

রজনীকান্ত

রজনীকান্ত (Rajinikanth) একজন কিংবদন্তি দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রাভিনেতা। তামিল চলচ্চিত্র জগতে তাঁকে একজন মহীরুহ হিসেবে গণ্য করা হয়। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি একজন সফল চলচ্চিত্র প্রযোজক এবং চিত্রনাট্যকারও। সিনেমাজগত ছাড়াও তিনি রাজনীতির জগতেও একজন সফল ব্যক্তিত্ব।

১৯৫০ সালে ১২ ডিসেম্বর ভারতের মাইসোর রাজ্যের ব্যাঙ্গালোর শহরে একটি মারাঠি পরিবারে রজনীকান্তের জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম শিবাজী রাও গায়কোয়াড়। মারাঠি রাজা ছত্রপতি শিবাজীর নামে তাঁর নামকরণ করা হয়। তাঁর বাবা রামোজি রাও গায়কোয়াড় একজন পুলিশ কনস্টেবল ছিলেন। তাঁর যখন নয় বছর বয়স তাঁর মাকে হারান রজনীকান্ত। রজনীকান্ত ছোট থেকে মারাঠি এবং কন্নড় দুটি ভাষাতেই দক্ষ ছিলেন। তাঁর চার ভাই বোনের মধ্যে তিনিই সবথেকে ছোট। তাঁর দুই ভাইয়ের নাম সত্যনারায়ন রাও এবং নাগেশ্বর রাও এবং তাঁর দিদির নাম অশ্বত্থ বালুভাই। ১৯৫৬ সালে তাঁর বাবার অবসর গ্রহণের পর তাঁরা হনুমন্ত নগরে চলে যান।

রজনীকান্তের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় ব্যাঙ্গালোরের গাভীপুরাম গভর্নমেন্ট কানাডা মডেল প্রাইমারি স্কুলে (Gavipuram Government Kannada Model Primary School)। ছোটবেলা থেকেই তিনি পড়াশোনায় ও খেলাধুলা দুটোতেই সমান দক্ষ ছিলেন। স্কুলে পড়াকালীন তিনি ক্রিকেট, ফুটবল এবং বাস্কেটবল খেলতেন। এই সময়েই তাঁর দাদা তাঁকে রামকৃষ্ণ মঠে ভর্তি করেন। সেখানে তিনি সনাতন হিন্দু ধর্ম এবং বেদ সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করেন। এই সময় থেকেই তিনি সেখানে হওয়া বিভিন্ন নাটকে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন। সেইসব নাটকে তাঁর অভিনয় তখন অনেকেরই মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। এরপর তাঁকে আচার্য পাঠশালা পাবলিক স্কুলে (Acharya Pathasala Public School) ভর্তি করা হয়। সেখান থেকেই তিনি তাঁর স্কুলজীবনের পড়াশোনা শেষ করেন। সেই সময় তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত নাটকেও অভিনয় করতেন।

স্কুলজীবন শেষ হওয়ার পর রজনীকান্ত বিভিন্ন পেশায় কাজ করেছেন। এমনকি সেই সময়ে তিনি কুলি হিসেবেও কাজ করেন। এরপর তিনি বাস কন্ডাক্টর হিসেবে ব্যাঙ্গালোর ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসে যোগদান করেন। সেই সময় তাঁকে প্রখ্যাত কন্নড় নাটক রচয়িতা টোপি মুন্নিয়াপ্পা  তাঁর রচিত একটি পৌরাণিক নাটকে রজনীকান্তকে অভিনয় করার প্রস্তাব দেন। তিনি এরপর থেকে নিয়মিতভাবে নাটকে অভিনয় করতে থাকেন। এই সময়েই তিনি মনস্থির করেন যে অভিনয়কেই তিনি পেশা হিসেবে নেবেন। যদিও তাঁর পরিবার তাঁর সেই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেননি, কিন্তু পরে তাঁরা তা মেনে নেন। সেই সময় তাঁকে রাজ  বাহাদুর  নামে তাঁর এক বন্ধু খুব সাহায্য করেন। রজনীকান্ত মাদ্রাজ ফিল্ম ইনস্টিটিউটে যোগ দেন এরপর। সেই ইনস্টিটিউটে থাকাকালীন সময়েই প্রখ্যাত তামিল  চলচ্চিত্র পরিচালককে বালাচন্দরের নজরে পড়েন রজনীকান্ত। তিনি তাঁকে তামিল শেখার পরামর্শ দিলে রজনীকান্ত দ্রুত তামিল শিখে নেন।

তামিল চলচ্চিত্রে রজনীকান্তের অভিনয় জীবন শুরু হয় কে বালাচন্দর পরিচালিত ছবি “অপূর্বা রাগাঙ্গাল” (Apoorva Ragangal) দিয়ে। এই ছবিটিতে একটি ছোট ভূমিকায় তিনি অভিনয় করেন। ছবিটি ১৯৭৫ সালে মুক্তি পায় এবং ১৯৭৬ সালে জাতীয় পুরস্কার পায়। রজনীকান্তের পরের মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি পুত্তান্না কানাগালের পরিচালিত “কথা সঙ্গমা” (Katha Sangama) ১৯৭৬ সালে মুক্তি পায়। এরপর তিনি আরো বেশ কিছু ছবিতে ছোট ছোট ভূমিকায় অভিনয় করতে শুরু করেন। তাঁর অভিনীত প্রথম ছবি যেটিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অভিনয় করেন হল “মুন্দ্রুমুদিচু” (Moondru Mudichu)। ১৯৭৭ সালে  তেলেগু ছবি “চিলাকাম্মা চিপ্পিন্দি” (Chilakamma Cheppindi) ছবিতে তিনি প্রথমবার মুখ্য অভিনেতার চরিত্রে অভিনয়  করার সুযোগ পান। সেই বছরেই প্রখ্যাত পরিচালক এস পি মথুরামান রজনীকান্তকে তাঁর পরিচালিত “ভুবানা ওরু কেলভি কুরি” (Bhuvana Oru Kelvi Kuri) ছবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করান। এস পি মথুরামানের সাথে রজনীকান্ত পরে প্রায় চব্বিশটি ছবি করেন। সেই সময় মুক্তিপ্রাপ্ত বেশিরভাগ ছবিতেই তিনি পার্শ্ব চরিত্রে কিংবা খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করতেন। ১৯৭৭ সালে রজনীকান্ত অভিনীত পনেরোটি  ছবি মুক্তি পায় এবং ১৯৭৮ সালে তাঁর অভিনীত কুড়িটি ছবি মুক্তি পায়।

তামিল ছবির পাশাপাশি তিনি তেলেগু এবং কন্নড় ছবিতে সমানভাবে অভিনয় করতে থাকেন। এম ভাস্কর পরিচালিত “বৈরভী” (Bairavi) ছবিটি ছিল প্রথম তামিল ছবি যেটিতে তিনি নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন। এই ছবিটির চূড়ান্ত সাফল্য দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে তাঁকে একজন তারকার স্থানে বসিয়ে দেয়। এরপর দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন শহর তাঁর বড় বড় পোস্টারে ছেয়ে যায়। সেই সময় তাঁর অভিনীত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছবি হল “মুল্লুম মালারুম” (Mullum Malarum), “ভানাক্কাটুকুরিয়া কাথালিয়ে” (Vanakkatukuriya Kathaliye), “ধর্মা যুদ্ধম” (Dharma Yuddam), “ভায়াসু পিলিচিন্দি” (Vayasu Pilichindi) ইত্যাদি। তাঁর অভিনীত প্রথম মালায়ালাম সিনেমা “আলাউদ্দিনাম আলভুথা ভিলাক্কম” (Allauddinum Albhutha Vilakkum)। এই ছবিটি আরব্য রজনী থেকে একটি গল্প নিয়ে তৈরি করা হয়।

রজনীকান্ত সব সময় অমিতাভ বচ্চনকে তাঁর অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেন। সেই সময়ে অমিতাভ বচ্চন অভিনীত হিন্দি ছবির তামিল রিমেকে রজনীকান্ত অভিনয় করতেন। ১৯৮০ সালে অমিতাভ বচ্চন অভিনীত হিন্দি ছবি ‘ডন’-এর রিমেক “বিল্লা” মুক্তি পায় যেখানে রজনীকান্ত মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেন। এই ছবিটির সাফল্য তাঁকে দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রে পাকাপাকি জায়গা করে দেয়। রজনীকান্ত অনেক কমেডি ছবিতেও অভিনয় করেছেন। ১৯৮৩ সালে তিনি তাঁর প্রথম বলিউড ছবি “অন্ধা কানুন” এ অভিনয় করেন। এই ছবিটিতে তাঁর সহ-অভিনেতা ছিলেন অমিতাভ বচ্চন এবং হেমা মালিনী। এই ছবিটি সেইসময়কার অন্যতম বাণিজ্যিকভাবে সফল ছবির মধ্যে একটি ছিল। ১৯৮৫ সালে  তাঁর অভিনীত আরেকটি হিন্দি ছবি “বেওয়াফাই” মুক্তির পায়। এই ছবিটিতে নায়কের চরিত্রে রাজেশ খান্না অভিনয় করেন এবং খলনায়কের চরিত্রে রজনীকান্ত । তৎকালীন সময়ে তাঁর অভিনীত কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছবি হল “নান সিগাপ্পু মানিথান” (Naan Sigappu Manithan), “মিঃ ভারাথ” (Mr. Bharath), “গুরু শিষ্যান” (Guru Sishyan), “ভেলাইকারাণ” (Velaikaran) ইত্যাদি।

১৯৯১ সালে তিনি মনিরত্নম  পরিচালিত “থালাপাথি” (Thalapathi) তে অভিনয় করেন। ১৯৯৩ সালে  মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি “ভাল্লি” (Valli) র  জন্য তিনি প্রথম চিত্রনাট্য লেখেন। ২০১১ সালের পর থেকে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর অভিনীত ছবির সংখ্যা অনেকটাই কমে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে তিনি যেসব ছবিতে অভিনয় করেছেন সেই ছবিগুলি সবই বাণিজ্যিকভাবে ভীষণ সফল হয়েছে। ২০২০ সালে  তাঁর অভিনীত “দরবার” (Darbar) ছবিটি মুক্তি পায়। রজনীকান্ত এখনো পর্যন্ত দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে সর্বাধিক জনপ্রিয় অভিনেতা।  একসময় তিনি এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বাধিক অর্থ উপার্জনকারী অভিনেতা ছিলেন।

সিনেমা জগতের সাথে যুক্ত থাকার পাশাপাশি তিনি রাজনৈতিকভাবে একজন সক্রিয় মানুষ। সমাজে হওয়া যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় প্রতিবাদ করেন। ২০০২ সালে  কর্নাটক সরকার যখন কাবেরী নদীর জল তামিলনাড়ুতে ছাড়তে অস্বীকার করে সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে  তিনি প্রতিবাদ জানিয়ে অনশন করেন। ২০১৭ সালে  তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। ২০২১ সালে  তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর প্রতিনিধিত্ব করার পরিকল্পনা রয়েছে।

১৯৮১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রজনীকান্তের সাথে লতা রঙ্গচারীর বিবাহ হয়। তাঁদের দুই কন্যা সন্তান – ঐশ্বর্যা রজনীকান্ত ও সৌন্দর্যা রজনীকান্ত। ঐশ্বর্যা একজন চলচ্চিত্র পরিচালক এবং সংগীতশিল্পী। ঐশ্বর্যার সাথে প্রখ্যাত অভিনেতা ধনুশের বিবাহ হয়। সৌন্দর্যাও একজন চলচ্চিত্র পরিচালক এবং গ্রাফিক ডিজাইনার (graphic designer)। প্রথমে প্রখ্যাত শিল্পপতি অশ্বিন রামকুমারের সাথে সৌন্দর্যার বিবাহ হয় এবং  পরবর্তীকালে তাদের  বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার পর  তিনি প্রখ্যাত অভিনেতা ভিশাগান ভানাঙ্গামুদিকে বিবাহ করেন।

রজনীকান্ত বিভিন্ন ছবিতে অভিনয়ের জন্য অনেক পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন। তার মধ্যে রয়েছে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, তামিলনাড়ু রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার,  কলাইমামানি পুরস্কার ইত্যাদি। ২০০০ সালে  তাঁকে ভারত সরকার দ্বারা প্রদত্ত পদ্মভূষণ সম্মান এবং ২০১৬ সালে পদ্মবিভূষণ সম্মানে সম্মানিত করা হয়। তিনি ভারতের একমাত্র চিত্র তারকা যিনি স্কুল পাঠ্যে স্থান করে নিয়েছেন। সি.বি.এস.ই (CBSE) তাদের ষষ্ঠ শ্রেণীর পাঠ্যসূচীতে তাঁর জীবন নিয়ে ‘ফ্রম বাস কন্ডাক্টর টু সুপারস্টার’ (From Bus Conductor to Superstar) নামে একটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করেছে।

  • telegram sobbanglay

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান - বাঙালির গর্ব



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

সাহিত্য অনুরাগী?
বাংলায় লিখতে বা পড়তে এই ছবিতে ক্লিক করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন