সববাংলায়

রাকেশ শর্মা

মহাকাশে মানুষ পাঠিয়ে বিভিন্ন দেশ তাদের মহাকাশ অভিযানে সফলতা অর্জন করেছে এবং আজও করছে। ভারতও কিন্তু সেই দৌড়ে পিছিয়ে নেই। প্রথম ভারতীয় ব্যক্তি যিনি মহাকাশে পাড়ি দিয়েছিলেন তাঁর নাম রাকেশ শর্মা (Rakesh Sharma)। ভারতীয় বিমানবাহিনীর একজন পাইলট রাকেশ শর্মা মহাকাশে সাতদিন সময় কাটিয়েছিলেন। মূলত ভারত ও সোভিয়েত রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে সেই মহাকাশ অভিযান সংঘটিত হয়েছিল। একজন উইং কমান্ডার হিসেবে তিনি অবসর গ্রহণ করেছিলেন। তিনিই একমাত্র ভারতীয় যাঁকে সফল মহাকাশযাত্রার জন্য ‘হিরো অব দ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন’ খেতাবে সম্মানিত করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, এই রাকেশ শর্মাই রাজঘাটের মহাত্মা গান্ধীর সমাধি থেকে মাটি নিয়ে গিয়েছিলেন মহাকাশে। ভারতীয় মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে রাকেশ শর্মার নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে।

১৯৪৯ সালের ১৩ জানুয়ারি বর্তমান ভারতের পাঞ্জাবের অন্তর্গত পাতিয়ালায় এক হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে রাকেশ শর্মার জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম দেবেন্দ্রনাথ শর্মা এবং মায়ের নাম তৃপ্তা শর্মা। রাকেশের যখন ছয় বছর বয়স ছিল তখন ভারতীয় বিমানবাহিনীতে থাকা তাঁর এক খুড়তুতো ভাই তাঁকে এরোপ্লেন, তার ককপিট ইত্যাদি দেখিয়েছিলেন। সেইসব দেখে বিমানের প্রতি এতই আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন যে তারপর থেকে পাইলট হওয়ারই স্বপ্ন দেখতেন তিনি।

রাকেশ শর্মা হায়দ্রাবাদের সেন্ট জর্জ গ্রামার স্কুল থেকে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা সমাপ্ত করেন এবং তারপর সেকেন্দ্রাবাদের সেন্ট অ্যানস হাই স্কুল থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করেন। তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি হায়দ্রাবাদেরই নিজাম কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন এবং সেখান থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। ১৯৬৬ সালের জুলাই মাসে ন্যাশানাল ডিফেন্স একাডেমির (NDA) বিমানবাহিনীতে একজন শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগদান করেছিলেন তিনি। টানা চারবছর সেখানে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরে অবশেষে ১৯৭০ সালে একজন পাইলট হিসেবে ভারতীয় বিমানবাহিনীতে তাঁর অন্তর্ভুক্তি হয়৷

১৯৭০ সালে ভারতীয় বিমানবাহিনীতে একজন টেস্ট পাইলট হিসেবে যোগদান করেন তিনি এবং বহু স্তরের পরীক্ষা, পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছিল তাঁকে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় রাকেশ শর্মা মিগ-২১ যুদ্ধবিমানে একুশটি যুদ্ধ অভিযান দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেছিলেন।

এমনই সব কঠিন পথ নিজের অসামান্য দক্ষতায় অতিক্রম করে গিয়ে ১৯৮৪ সালে তিনি স্কোয়াড্রন লিডার পদে উন্নীত হয়েছিলেন।

১৯৮২ সাল রাকেশ শর্মা এবং ভারতবর্ষের জন্য খুবই স্মরণীয় ও গর্বের বছর। সেই বছরই ভারত বিমানবাহিনী ও সোভিয়েত রাশিয়ার ইন্টারকসমস স্পেশ প্রোগ্রামের যৌথ উদ্যোগে আয়েজিত মহাকাশ অভিযানের জন্য ভারতীয় হিসেবে রাকেশ শর্মাকে মহাকাশে পাঠানোর জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল। মহাকাশচারী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি মস্কোর ইউরি গ্যাগারিন কসমোনট ট্রেনিং সেন্টারে দুই বছর কঠোর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। এমনকি বেঙ্গালুরু আইএএফ-এ ক্লস্ট্রোফোবিয়া পরীক্ষার জন্য ৭২ ঘন্টা একটি ঘরে নিজেকে বন্দী করে রেখেছিলেন। সেই সময় তাঁর বিকল্প হিসেবে আরেক পাইলট রবিশ মালহোত্রাকে স্ট্যান্ডবাই করে রাখা হয়েছিল। তবে সমস্ত পরীক্ষাতেই সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন রাকেশ। অবশেষে ১৯৮৪ সালের ৩ এপ্রিল কাজাখ সোভিয়েত স্যোশালিস্ট রিপাবলিকের বাইকোনুর কসমোড্রোম থেকে উৎক্ষেপিত সয়ুজ টি-১১ (Soyuz T-11) মহাকাশযানে করে রাকেশ শর্মা ইউরি মালিশেভ এবং গেনাদি স্ট্রেকালভ নামক আরও দুই মহাকাশচারীর সঙ্গে স্যালিয়ুট-৭ অরবিটাল স্টেশনে (Salyut 7 Orbital Station) চলে যান। মহাকাশযানের কমান্ডার ছিলেন ইউরি মালিশেভ, ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন গেনাদি স্ট্রেকালভ এবং রাকেশ শর্মা মূলত বায়োমেডিসিন ও রিমোট সেন্সিং-এর কাজ সামলাতেন। মহাকাশে সেই স্যালিয়ুট-৭ স্টেশনে তাঁরা তিনজন ৭ দিন ২১ ঘন্টা ৪০ মিনিট কাটিয়েছিলেন।

মহাকাশে রাকেশ শর্মা শরীরচর্চা এবং নানরকম গবেষণা করেছিলেন। ওজনহীন অবস্থায় যোগব্যয়াম করলে মানুষের শরীরে তার কী ধরনের প্রভাব পড়ে তা পরীক্ষা করে দেখেছিলেন তিনি। তাঁর সেই দল মহাকাশে বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তিগত নানা গবেষণা চালায় যার মধ্যে ৪৩টি পরীক্ষামূলক সেশন অন্তর্ভুক্ত ছিল। মহাকাশ থেকে ভারতের ছবি তোলার কাজটিও করেছিলেন  রাকেশ।

সোভিয়েত ও ভারতীয় মহাকাশচারীরা, মস্কোর কর্মকর্তা এবং তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী একটি যৌথ টেলিভিশন সাংবাদিক সম্মেলন করেন ও সেখানে ইন্দিরা গান্ধী যখন রাকেশ শর্মার কাছে জানতে চান যে, মহাকাশ থেকে ভারতকে কেমন দেখতে লাগে, তখন উত্তরে রাকেশ শর্মা বলেছিলেন ‘সারে জাঁহা সে আচ্ছা’।

মহাকাশ অভিযানের জন্য দ্য ডিফেন্স ফুড রিসার্চ ল্যাব সুজির হালুয়া, আলু ছোলে এবং ভেজ পোলাও রাকেশ শর্মার জন্য প্যাক করে দিয়েছিল। রাকেশ এখান থেকে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জৈল সিং ও প্রতিমন্ত্রী ভেঙ্কাটরামণের প্রতিকৃতি এবং রাজঘাটের মহাত্মা গান্ধীর সমাধি থেকে মাটি নিয়ে মহাকাশে গিয়েছিলেন। মহাকাশ থেকে তিনি বার্মাতে অগ্নিকাণ্ড পর্যন্ত প্রত্যক্ষ করেছিলেন। মোট আটদিন পর ১১ এপ্রিল তাঁরা কাজাখস্তানের মাটিতে অবতরণ করেন।

১৯৮৭ সালে উইং কমান্ডার হিসেবে অবসর গ্রহণের পর রাকেশ শর্মা হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড-এর নাসিক বিভাগে প্রধান টেস্ট পাইলট হিসেবে যোগদান করেছিলেন। সেই সময় নাসিকের ওজারের কাছে একটি মিগ-২১ পরীক্ষা করার সময় একটি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয় তাঁকে। দ্রুত প্লেন থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হওয়ায় অল্পের জন্য বড়সড় বিপর্যয়ের হাত থেকে বেঁচে যান তিনি। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত সেখানে কাজ করার পর তিনি বেঙ্গালুরুতে হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেডের প্রিন্সিপাল টেস্ট পাইলট হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে রাকেশ শর্মা তাঁর কর্মক্ষেত্র থেকে অবসর নিয়েছিলেন।

রাকেশ শর্মার স্ত্রী-এর নাম মধু, ১৯৮২ সালে তাঁরা বিবাহ করেছিলেন। তাঁদের দুই সন্তান হলেন কপিল এবং মৃত্তিকা। কপিল একজন পরিচিত চলচ্চিত্র পরিচালক এবং কৃত্তিকা গণমাধ্যমের সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে নিজের পরিবার-পরিজন নিয়ে তিনি তামিলনাড়ুর কুনুরে জীবন অতিবাহিত করছেন।

রাকেশ শর্মা তাঁর কৃতিত্বের জন্য বেশ কিছু সম্মানীয় খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। তিনিই একমাত্র ভারতীয় যাঁকে ‘হিরো অব দ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন’ পুরস্কার দ্বারা সম্মানিত করা হয়। এছাড়াও রাকেশ শর্মাকে ভারতের সর্বোচ্চ শান্তিকালীন বীরত্বের পুরস্কার ‘অশোক চক্র’ প্রদান করা হয়েছিল। এই পুরস্কার তাঁর মিশনের অন্য দুইজন সদস্যকেও দেওয়া হয়।

ভারতের প্রথম মহাকাশচারী হিসেবে রাকেশ শর্মার নাম ভারতের মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading