ইতিহাস

রামাস্বামী ভেঙ্কটরমণ

ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম রামাস্বামী ভেঙ্কটরমণ (Ramaswamy Venkataraman)। তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের অষ্টম রাষ্ট্রপতি। এছাড়াও তিনি একজন খ্যাতনামা আইনজীবী হিসেবেও পরিচিত। তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনেও অংশগ্রহণ করেছিলেন।

১৯১০ সালের ৪ ডিসেম্বর তামিলনাড়ুর তানজোর জেলার পট্টুকোটাই শহরের নিকটবর্তী রাজামাদাম গ্রামে রামাস্বামী ভেঙ্কটরমণের একটি আইয়ার পরিবারে জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম কে.রামাস্বামী আইয়ার। ১৯৩৮ সালে ভেঙ্কটরমণের সাথে জানকী ভেঙ্কটরমণের বিবাহ হয়। তাঁদের মোট তিনটি সন্তান।

ভেঙ্কটরমণ পট্টুকোটাই শহরের সরকারী উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ করেন। তারপর স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন তিরুচিরাপল্লী জাতীয় কলেজ থেকে। পরবর্তীকালে তিনি অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন মাদ্রাজের লোয়োলা কলেজ থেকে। আরও পরে তিনি আইন পাশ করেছিলেন মাদ্রাজ ল কলেজ থেকে। ১৯৩৫ সালে তিনি মাদ্রাজ হাইকোর্টে আইন চর্চা শুরু করেন। স্বাধীনতার পরে ১৯৫১ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্টেও আইনজীবী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

আইন অনুশীলনের সময়েই ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন ভেঙ্কটরমণ। ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণের জন্য ইংরেজ সরকারের ভারতীয় প্রতিরক্ষা আইনের অধীনে ১৯৪২ সালে তাঁকে আটক করে রাখা হয়েছিল। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ পর্যন্ত তাঁকে কারাবাস করতে হয় এবং এই সময় থেকেই আইনের প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পায়। ১৯৪৬ সালে যখন ব্রিটিশদের থেকে ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রায় আসন্ন তখন ভেঙ্কটরমণকে একদল আইনজীবীর সঙ্গে পাঠানো হয় জাপান অধিকৃত মালায়া এবং সিঙ্গাপুরে সহযোগিতার অভিযোগে অভিযুক্ত ভারতীয় কিছু নাগরিকদের রক্ষার করার জন্য।

আইনজীবী জীবনের প্রথম থেকেই শ্রম সম্পর্কিত আইন বিষয়ে তাঁর বিস্তর আগ্রহ ছিল। ১৯৪৪ সালে কারাগার থেকে মুক্তিলাভের পর তিনি তামিলনাড়ু প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির শ্রম বিভাগের সংগঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৪৯ সালে তিনি শ্রম আইন জার্নাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেটি শ্রমিক সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত প্রকাশ করে। এটি একটি বিশেষজ্ঞ প্রকাশনা হিসেবেও স্বীকৃতি লাভ করেছে। ট্রেড ইউনিয়নের বিভিন্ন কর্মকান্ডের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। এমনকি তিনি রেল শ্রমিক, ডক-শ্রমিক, কর্মজীবী সাংবাদিক, বৃক্ষরোপণ কর্মী প্রভৃতিদের ইউনিয়নের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং কোনো কোনো ইউনিয়ন নিজে প্রতিষ্ঠাও করেছেন। ভেঙ্কটরমণ সংবিধানের খসড়া কমিটির সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তিনি মাদ্রাজের প্রাদেশিক বার ফেডারেশনের হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫০ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য হিসেবে তিনি স্বাধীন ভারতের অস্থায়ী সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৭, এই সময়কালে প্রথম সংসদের সদস্য হিসেবে তিনি নিযুক্ত ছিলেন। আইনজীবী হিসেবে যখন কর্মরত সেই সময়ে ১৯৫২ সালে তিনি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মেটাল ট্রেডস কমিটির অধিবেশনে শ্রমিকদের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। এছাড়াও নিউজিল্যান্ডের কমনওয়েলথ সংসদীয় সম্মেলনে তিনি ভারতের সংসদীয় দলের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন।

১৯৫৭ সালে পুনরায় নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও ভেঙ্কটরমণ মাদ্রাজ রাজ্য সরকারের মন্ত্রীর পদ গ্রহণের জন্য লোকসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত রাজ্যের শিল্প, শ্রমিক, সহযোগিতা, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং বাণিজ্যিক কর দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এই সময়কালের মধ্যেই তিনি মাদ্রাজ আইন পরিষদের উচ্চসভার নেতৃত্ব দিয়েছেন।

১৯৬৭ সালে ভেঙ্কটরমণ ইউনিয়ন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হন এবং তাঁকে শিল্প, শ্রম, বিদ্যুৎ, পরিবহন, যোগাযোগ, রেলপথের দায়িত্ব অর্পন করা হয়। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এই পদ অলঙ্কৃত করেছেন তিনি। ১৯৭৭ সালে মাদ্রাজ (দক্ষিণ) নির্বাচনী এলাকা থেকে তিনি পুনরায় লোকসভার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে বিরোধী দলের সদস্য হয়েছিলেন। সেসময় পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির দায়িত্বও পালন করেছিলেন তিনি।

ভেঙ্কটরমণ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার রাজনীতি বিষয়ক কমিটি এবং অর্থনীতি বিষয়ক কমিটিরও সদস্য ছিলেন। ১৯৮০ সালে ভেঙ্কটরমণ পুনরায় লোকসভার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন এবং ইন্দিরা গান্ধী সরকারের অর্থমন্ত্রী  হিসেবে নিযুক্ত হন। পরবতীকালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্বও সামলেছিলেন এবং ১৯৮৪ পর্যন্ত এই পদে বহাল ছিলেন। এইসময় তিনি ভারতবর্ষে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচী শুরু করবার কৃতিত্ব অর্জন করেন। ভেঙ্কটরমণই এ পি জে আব্দুল কালামকে মহাকাশ গবেষণা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচীতে স্থানান্তরিত করেছিলেন। তিনি পুরো মিসাইল সিস্টেমকে একত্রিত করে এর নামকরণ করেন ইন্টিগ্রেটেড গাইডেড মিসাইল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (Integrated Guided Missile Development Program)।

১৯৮৪ সালে তিনি ভারতবর্ষের সপ্তম উপ-রাষ্ট্রপতি (Vice-President) এবং ১৯৮৭ সালে তিনি ভারতের অষ্টম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি মোট চারজন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করেছেন এবং তাঁদের মধ্যে তিনজনকে নিয়োগ করেছেন৷ সেই তিনজন প্রধানমন্ত্রী হলেন ভি.পি. সিং, চন্দ্র শেখর এবং পি.ভি নরসিমা রাও (P.V. Narashima Rao)।

১৯৫৩ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রতিনিধি ছিলেন। ১৯৫৮ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনের ৪২তম অধিবেশনে ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতা ছিলেন ভেঙ্কটরমণ এবং ১৯৭৮ সালে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত আন্তঃ সংসদীয় সম্মেলনে তিনি ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের সদস্য ছিলেন।

বিভিন্ন পুরস্কারে ভেঙ্কটরমণ সম্মানিত হয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় নাগার্জুনা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টরেট অব ল উপাধি প্রদান করে। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকেও ডক্টর অব ল সম্মান পেয়েছিলেন। পেয়েছিলেন সোভিয়েত ভূমি পুরস্কার (Soviet Land Prize)। স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য পেয়েছিলেন তাম্রপত্র। কাঞ্চীপুরমের শঙ্করাচার্য তাঁকে ‘সাত সেবা রত্ন’ উপাধি প্রদান করেছিলেন। জাতিসংঘ প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের সভাপতি হিসেবে বিশিষ্ট পরিষেবার জন্য জাতিসংঘের সেক্রেটারি-জেনারেলের থেকে একটি স্যুভেনির (Souvenir) স্মারক প্রদান করা হয়েছিল ভেঙ্কটরমণকে।

ভেঙ্কটরমণের লেখা উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বই হল, ‘রোল অব প্ল্যানিং ইন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভলপমেন্ট’,  ‘মাই প্রেসিডেন্টিয়াল ইয়ারস’, ‘দ্য রোল অব এ প্রাইভেট মেম্বার অব পার্লামেন্ট’।

২০০৯ সালের ১২ জানুয়ারি ভেঙ্কটরমণ মূত্রনালীর সংক্রমণজনিত ইউরোসেপসিস (Urosepsis) রোগে আক্রান্ত হয়ে  সেনা হাসপাতালে ভর্তি হন। এছাড়াও নিম্ন রক্তচাপ ধরা পড়ে তাঁর। ২০ জানুয়ারী থেকে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে। অবশেষে দিল্লীর সেনা হাসপাতালে একাধিক অঙ্গ ক্ষয়ের (Multiple organ failure) কারণে ২০০৯ সালের ২৭ জানুয়ারি ৯৮ বছর বয়সে রামাস্বামী ভেঙ্কটরমণের মৃত্যু হয়।

  • telegram sobbanglay

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বুনো রামনাথ - এক ভুলে যাওয়া প্রতিভা



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন