ইতিহাস

রামচন্দ্র দত্ত

রামচন্দ্র দত্ত (Ramchandra Dutta) শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের একজন শিষ্য এবং শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জীবন- বৃত্তান্ত গ্রন্থটির রচয়িতা হিসেবে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। তিনি স্বামী বিবেকানন্দের মা ভুবনেশ্বরী দেবীর ভ্রাতুষ্পুত্র ছিলেন। বিবেকানন্দের থেকে তিনি বারো বছরের বড় ছিলেন। বিবেকানন্দের ষোল বছর বয়সে এই রামচন্দ্রই বিবেকানন্দকে দক্ষিণেশ্বর নিয়ে গিয়েছিলেন শ্রী রামকৃষ্ণের সাথে সাক্ষাতের জন্য।

১৮৫১ সালে ৩০ অক্টোবর কলকাতায় রামচন্দ্র দত্তের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম নৃসিংহ প্রসাদ দত্ত এবং মায়ের নাম তুলসীমনি দত্ত। তাঁর বাবা একজন বৈষ্ণব ছিলেন। নরেন্দ্রনাথ দত্ত, যিনি পরে স্বামী বিবেকানন্দ নামে জগৎ বিখ্যাত হন রামচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিলেন। রামচন্দ্রের মাত্র আড়াই বছর বয়সেই তাঁর মায়ের মৃত্যু হলে বিবেকানন্দের মা ভুবনেশ্বরী দেবী রামচন্দ্র দত্তকে মানুষ করেন। পরবর্তীকালে রামচন্দ্রের বাবা দ্বিতীয় বিবাহ করলে রামচন্দ্র দত্ত তা মেনে নিতে পারেননি। তাঁদের পরিবারে আর্থিক সংকট দেখা দিলে তাঁরা তাঁদের বাড়ি বেচে দিতে বাধ্য হন। রামচন্দ্র বাড়ি ছেড়ে অন্য এক আত্মীয়ের বাড়ি চলে যান।ছোটবেলা থেকেই রামচন্দ্র দত্ত খুব কৃষ্ণ ভক্ত ছিলেন। তিনি বিভিন্ন আশ্রমে আশ্রমে ঘুরে বেড়াতেন এবং সন্ন্যাসীদের সাথে সময় কাটাতেন। এই সময় থেকেই তিনি নিরামিষাশী হয়ে যান। 

রামচন্দ্র দত্ত জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইন্সটিটিউশনে পড়াশোনা করতেন যা পরে স্কটিশ চার্চ কলেজ নামে বিখ্যাত হয়। এরপর তিনি ক্যাম্পবেল মেডিকেল স্কুল থেকে স্নাতক হন। স্নাতক হওয়ার পর তিনি গভর্নমেন্ট কুইনাইন এক্সামিনারের (Government Quinine Examiner) সহকারি হিসেবে কাজে নিযুক্ত হন। এই সময়ে তাঁর আর্থিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তিনি মধ্য কলকাতায় একটি বাড়ি কেনেন। রামচন্দ্র দত্তের সাথে কৃষ্ণপ্রেয়সী দেবীর বিবাহ হয়।

ইংরেজ কর্মকর্তাদের সাথে কাজ করার সময় তিনি রসায়নবিদ্যার প্রতি প্রবল ভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তিনি কুরচি গাছের ছাল থেকে রক্তআমাশা (blood dysentery) রোগটির জন্য প্রতিষেধক তৈরি করতে সক্ষম হন এবং সেই প্রতিষেধক সরকারের দ্বারা অনুমোদিতও হয়। তৎকালীন খ্যাতনামা চিকিৎসকরা এই প্রতিষেধক চিকিৎসার স্বার্থে ব্যবহার করতে শুরু করলে তাঁর নাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলত তাঁকে কেমিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অফ ইংল্যান্ডের (Chemist Association of Bengal) সদস্য হিসেবে নিয়োগ করা হয়। এর পরে তাঁর পদন্নোতি করে তাঁকে সরকারি রাসায়নিক পরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। এর পাশাপাশি তিনি ক্যালকাটা মেডিকেল কলেজে (Calcutta Medical College) অধ্যাপনাও করতেন।

এই সময় থেকেই রামচন্দ্র আধুনিক বিজ্ঞান নিয়ে চর্চা শুরু করেন এবং ক্রমশ ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে পড়েন। অন্যান্য বিজ্ঞানমনস্ক মানুষদের মতোই তিনি মনে করতে শুরু করেন যে চারপাশে যা ঘটে  তার পিছনে কোন ঈশ্বর নয় বিজ্ঞান কাজ করে। এর ফলে তাঁর সাথে অনেক ধর্মভীরু মানুষের তর্ক লেগেই থাকত। 

এরপর তাঁর ছোট মেয়ে এবং ভাগ্নির পরপর কলেরায় মৃত্যু তাঁকে গভীর শোকে আচ্ছন্ন করে তুললে তিনি তাঁর দগ্ধ মনে শান্তির প্রলেপের খোঁজে ব্রাহ্ম, খৃস্ট এবং হিন্দু ধর্মে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত কিন্তু কোনো কিছুতেই মন বসাতে পারেননি। ১৮৭৯ সালে ১৩ নভেম্বর তিনি তাঁর বন্ধু গোপাল চন্দ্র মিত্র এবং আত্মীয় মনমোহন মিত্রের সঙ্গে দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সাথে দেখা করতে যান। শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে প্রথম সাক্ষাতেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। এরপরে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যতম একনিষ্ঠ  শিষ্য হন এবং তাঁর বাণী দিকে দিকে ছড়িয়ে দিতে তৎপর  হন। 

শ্রীরামকৃষ্ণের দু’ধরনের শিষ্য ছিল। তার মধ্যে একটি দল গৃহী সন্ন্যাসী এবং অপরটি গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী।  রামচন্দ্র দত্ত গৃহী সন্ন্যাসী ছিলেন এবং নরেন্দ্রনাথ দত্ত সংসার ত্যাগী সন্ন্যাসী হয়ে গিয়েছিলেন। ১৮৮৬ সালে ১৬ আগস্ট শ্রীরামকৃষ্ণের মৃত্যু হয়। রামচন্দ্র দত্ত তাঁর চিতাভষ্ম নিয়ে গিয়ে তাঁর কাঁকুড়গাছির বাড়ি ‘যোগোদ্যানে’ রাখেন। এরপর তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের নামে একটি মন্দির গড়ে তোলেন। সেটিই ছিল শ্রীরামকৃষ্ণের প্রথম মন্দির। তিনি মনে করতেন শ্রীরামকৃষ্ণ ঈশ্বরের প্রেরিত দূত ছিলেন। ১৮৯৩ সাল থেকে ১৮৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি নানান সভায় প্রায় আঠারোটি বক্তৃতা দেন। সেইসব বক্তৃতার মূল বিষয় ছিল শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন এবং বাণী। ১৮৯৩ সালে গুড ফ্রাইডের (Good Friday) দিন তিনি প্রথম শ্রীরামকৃষ্ণ বিষয়ক বক্তৃতা দিয়েছিলেন।

রামচন্দ্র দত্ত শ্রীরামকৃষ্ণ সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই রচনা করেন। ১৮৮৫ সালে তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের গুরুত্বপূর্ণ বাণীর সংকলন তৈরি করেন। রামচন্দ্র দত্তই প্রথম ‘শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জীবন বৃত্তান্ত’ নামে শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনী রচনা করেছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি একটি বাংলা পত্রিকাও প্রকাশ করতেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি খুবই নিয়ম-শৃঙ্খল পরায়ণ  ছিলেন। কাজের ক্ষেত্রেও তিনি কখনো অন্যায় বরদাস্ত করতেননা। ১৮৯৮ সালে তাঁর আমাশার সাথে সাথে ক্রনিক ডায়াবেটিস (chronic diabetes) এবং কার্বাঙ্কল (carbuncle) দেখা দেয়। ধীরে ধীরে তাঁর শরীরের অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকে এবং হৃদপিণ্ডের সমস্যা ও ক্রনিক অ্যাস্থমা (chronic asthma) দেখা দেয়। রামচন্দ্র দত্তের ১৮৯৯ সালের ১৭ জানুয়ারি মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৭ বছর। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুসারে তাঁর চিতা ভস্ম যোগোদ্যানের শ্রীরামকৃষ্ণদেবের মন্দিরের পাশে রাখা হয়।

  • telegram sobbanglay

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বুনো রামনাথ - এক ভুলে যাওয়া প্রতিভা



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন