ভারতের এক অন্যতম সফল ও জনপ্রিয় শিল্পপতি এবং টাটা সন্স কোম্পানির পূর্বতন চেয়ারম্যান রতন টাটা (Ratan Tata)। ১৯৯১ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি টাটা গ্রুপেরও চেয়ারম্যান ছিলেন। টাটা পরিবারের ঐতিহ্যবাহী এই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে প্রথমে একজন ম্যানেজমেন্ট ট্রেনি হিসেবে যোগ দিয়ে ধীরে ধীরে সংস্থার বিভিন্ন স্তরে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি এবং পরবর্তীতে চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত হন। নানা চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনাকে সামনে রেখেও তিনি টাটা গ্রুপের ব্যবসাকে শুধু ভারতের মধ্যেই নয়, বিশ্বের বহু দেশে বিস্তৃত করতে সক্ষম হন। নিজের মেধা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে কোম্পানিকে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিষ্ঠিত করেন রতন টাটা, যার ফলে টাটা গ্রুপের বৈদেশিক আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। গাড়ি নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি, ইস্পাত, ভোক্তা পণ্যসহ একাধিক ক্ষেত্রে টাটা গ্রুপের উপস্থিতি সুদৃঢ় হয় তাঁর নেতৃত্বে। ২০০০ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’ এবং ২০০৮ সালে ‘পদ্মবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করে। শুধুমাত্র ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, জনহিতকর কাজেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা লক্ষণীয়।
১৯৩৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর বম্বেতে রতন টাটার জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম নাভাল টাটা। জানা যায়, জামশেদজি টাটার কনিষ্ঠ পুত্র স্যার রতনজি টাটা ও তাঁর স্ত্রী নবতাজবাঈ টাটার কোন সন্তানাদি না থাকায় তাঁরা নাভাল টাটাকে দত্তক নেন। নাভাল টাটা দুটি বিবাহ করেন। প্রথম স্ত্রী সোনুর সন্তান রতন টাটা। রতন টাটার দশ বছর বয়স যখন, তাঁর বাবা নাভাল টাটা আরেক সুইস-ভারতীয় মহিলা সিমোন টাটাকে বিবাহ করে পরিবার ছেড়ে চলে যান। এরপর তিনি তাঁর দিদা নবতাজবাঈ টাটার অভিভাবকত্বে বড় হয়ে ওঠেন।
রতন টাটার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় ক্যাম্পিয়ন স্কুলে এবং সেখানে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পরে তিনি ভর্তি হন বম্বের ক্যাথিড্রাল অ্যাণ্ড জন ক্যানন স্কুলে। এরপরে সিমলার বিশপ কটন স্কুলেও পড়াশোনা করেছেন তিনি। নিউ ইয়র্কের রিভারডেল কান্ট্রি স্কুল থেকে ১৯৫৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন রতন টাটা। পরে ১৯৫৯ সালে নিউ ইয়র্কেরই কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর্কিটেকচার ও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং (Architecture and Structural Engineering) বিষয়ে স্নাতক পাশ করেন। তারপরে পড়াশোনার গতিপথ বদলে যায় তাঁর। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুল থেকে অ্যাডভান্সড ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে একটি সীমিত সময়ের কোর্স সম্পন্ন করেন।
আমেরিকার ‘জোনস অ্যাণ্ড ইমনস’ নামের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে কাজের মধ্য দিয়েই তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরে ১৯৬১ সালে টাটা গ্রুপে যোগ দিয়ে টাটা স্টিলের কারখানায় বিভিন্ন স্তরে কাজ করে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। দীর্ঘ দশ বছর ধরে পরিশ্রম করে অধ্যবসায়ের সঙ্গে সামান্য এক কর্মচারী থেকে রতন টাটা কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের পদে আসীন হন। জাহাঙ্গীর রতনজি দাদাভাই টাটা ১৯৯১ সালে টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যান পদ থেকে অবসর নেন ও রতন টাটাকে টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যান পদে মনোনীত করেন। নিজের একার চেষ্টাতে রতন টাটা টাটা গ্রুপের অধীনেই ‘ন্যাশনাল রেডিও অ্যাণ্ড ইলেক্ট্রনিক্স’ অর্থাৎ ‘নেলকো’ সংস্থাকে দাঁড় করান। কিন্তু আর্থিক মন্দার কারণে পরবর্তীতে সেই সংস্থা বন্ধ হয়ে যায়। টাটা গ্রুপে তখনও কাজ করছিলেন রতন টাটা। আর জে আর ডি টাটার অবসরকালীন সময়ে পাওয়া এই চেয়ারম্যানের দায়িত্বে কোম্পানির অন্য সকলেই তাঁর উপর রুষ্ট ছিলেন। রতন টাটার উপরে কারও বিশেষ ভরসা ছিল না। প্রবল বিরোধিতার মোকাবিলা করতে প্রথমেই রতন টাটা কোম্পানিতে চাকরি করার একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা ধার্য করেন যার ফলে প্রবীণ অফিসাররা অনেকেই অবসর গ্রহণ করেন। এর পাশাপাশি টাটা গ্রুপের সকল কোম্পানিকে নির্দেশ দেন তিনি যাতে তারা তাদের লাভের একাংশ কোম্পানির শ্রীবৃদ্ধির জন্য লগ্নি করে। দীর্ঘ ২১ বছর এই কোম্পানির চেয়ারম্যানের পদে থেকে টাটা গ্রুপকের চল্লিশ গুণ বড়ো করে তোলেন রতন টাটা।
তাঁর আমলেই টাটা মোটরসের থেকে বিশ্বখ্যাত গাড়ির ব্র্যাণ্ড জাগুয়ার অ্যাণ্ড রোভার-কে অধিগ্রহণ করা হয় যার ফলে বিশ্বের বাজারে টাটা কোম্পানির গাড়ির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। একইসঙ্গে টাটা স্টিল কোম্পানি ‘কোরাস’ নামে একটি সংস্থাকেও অধিগ্রহণ করে। ক্রমেই আন্তর্জাতিক কোম্পানি হয়ে ওঠে টাটা গ্রুপ। বিশ্বের প্রায় ছয়টি মহাদেশের মোট ১০০টি দেশে টাটা নিজের ব্যবসাকে বিস্তৃত করে তুলেছে রতন টাটার দক্ষ পরিচালনায় ও মেধায়। মূলত সাতটি ভাগে টাটা গ্রুপের ব্যবসাকে পরিচালনা করেন রতন টাটা – তথ্য-প্রযুক্তি, ব্যাঙ্কিং, ইলেক্ট্রনিক্স, রাসায়নিক দ্রব্য, পণ্যদ্রব্য, বস্ত্রবয়ন ইত্যাদি। জামশেদজি টাটা মাত্র তিরিশ হাজার টাকা নিয়ে যে ব্যবসা শুরু করেছিলেন রতন টাটা সেই ব্যবসাকেই দশ কোটি ডলারের মূল্যে নিয়ে যান দক্ষ হাতে। ভারতের বুকে সবথেকে বড় আউটসোর্সিং কোম্পানি হিসেবে টিসিএসকে প্রতিষ্ঠিত করেন রতন টাটা।
১৯৯৮ সালে তাঁর নেতৃত্বে টাটা কোম্পানি বাজারে নিয়ে আসে ‘টাটা ইণ্ডিকা’ নামের একটি নতুন গাড়ির মডেল যা মাত্র দু বছরের মধ্যেই ভারতের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাঁর আধীনেই ২০০৭ সালে টাটা স্টিল ব্রিটিশ-ডাচ কোম্পানি কোরাস (corus) অধিগ্রহণ করে। এরফলে ভারতের গণ্ডি ছাড়িয়ে টাটা স্টিলের লণ্ডন শাখা তৈরি হয় এবং এশিয়ার পাশাপাশি ইউরোপের ইস্পাতের বাজারও দখল করে টাটা গ্রুপ। টাটা মোটরসের অনেক যন্ত্রাংশ এবং টাইটান ঘড়ির আধুনিক মডেলের অনেক উন্নতিসাধন করেন তিনি। ভারতের ই-কর্মাস ওয়েবসাইট স্ন্যাপডিল, চা বিক্রেতা ‘টি বক্স’-এ নিজের উপার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করেন তিনি। ‘টাটা টি’ তাঁর নেতৃত্বেই ‘টেটলি’ সংস্থাকে অধিগ্রহণ করে। ১৯৯১ সালে তিনি যখন চেয়ারম্যান হন, সেই সময় মুক্তবাজার অর্থনীতির সুবিধে পুরোমাত্রায় গ্রহণ করেন ও সংস্থার রেভিন্যু এবং লাভের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলেন।
২০১২ সালে টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যানের পদ থেকে অবসর নেন তিনি। তাঁর ২১ বছরের মেয়াদে টাটা গ্রুপের রেভিন্যু ৪০ গুণ ও লাভ ৫০ গুণ বৃদ্ধি পায়। রতন টাটার অবসরের পর পালনজি মিস্ত্রির ছেলে সাইরাস মিস্ত্রি টাটা গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান হন। ২০১৬ সালে সাইরাস মিস্ত্রিকে চেয়ারম্যান পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং বহু অফিসার ও ভারতীয় শিল্পপতিদের অনুরোধে রতন টাটা অন্তর্বর্তীকালীন চেয়ারম্যানের কার্যভার গ্রহণ করতে সম্মত হন। ২০১৭ সাল পর্যন্ত পরবর্তী চেয়ারম্যান নিযুক্ত না হওয়া পর্যন্তরতন টাটা কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে আসীন ছিলেন ।
রতন টাটার জীবনের সর্বাধিক আলোচিত অধ্যায় হল ‘ন্যানো’ প্রকল্প। মধ্যবিত্তের আয়ত্তের মধ্যে সল্পমূল্যের গাড়ি তৈরির প্রকল্প তাঁর অন্যতম স্বপ্ন ছিল। প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গুরে কৃষকদের থেকে ন্যানো কারখানা করার জন্য জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে এক রাজনৈতিক তরজায় পড়ে সমালোচিত হন রতন টাটা। কারখানা তৈরির জমি না দেওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। পরে গুজরাতে কারখানা স্থানান্তরিত করে ন্যানো গাড়ি বাজারে আনলেও তা মধ্যবিত্ত মানুষের কদর পায়নি। যদিও প্রকল্পটি প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি, তবুও এটি ভারতের অটোমোবাইল ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত।
শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যই নয়, বহু জনহিতকর কাজেও তিনি সবসময় পাশে থেকছেন। ২০১০ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুলে একটি এক্সিকিউটিভ সেন্টার গড়ে তোলার জন্য রতন টাটা ৫ কোটি ডলার দান করেন। তাঁরই নামে এই প্রেক্ষাগৃহের নাম দেওয়া হয় ‘টাটা হল’। তাঁর অধীনস্থ সংস্থা টাটা কনসাল্টেন্সি সার্ভিস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কার্ণেগী মেলন বিশ্ববিদ্যালয়কে অটোমোবাইল বিষয়ে গবেষণার জন্য ৩ কোটি ডলার দান করে। ‘আইআইটি’ ভারতের বুকে তথ্য-প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক প্রতিষ্ঠান যেখানে মানুষের সাধ্যের মধ্যে প্রযুক্তিগত পণ্য নির্মাণের লক্ষ্যে রতন টাটার নির্দেশে টাটা গ্রুপ এই প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা প্রদান করা করে।
ভারতের ‘ন্যাশনাল ম্যানুফ্যাকচারিং কম্পিটিটিভনেস কাউন্সিল’-এর সদস্য ছিলেন তিনি। তাছাড়া আমেরিকার ‘অ্যালকোয়া আইএনসি’ এবং ‘মণ্ডিলেজ ইন্টারন্যাশনাল’-এর বোর্ড অফ ডিরেক্টরসের সদস্য ছিলেন। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক ডি. লিট. উপাধি পেয়েছেন। দেশ-বিদেশের অসংখ্য পুরস্কারের পাশাপাশি ২০০০ সালে ‘পদ্মভূষণ’ পুরস্কার এবং ২০০৮ সালে ‘পদ্মবিভূষণ’ পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর বয়সজনিত অসুস্থতার কারণে রতন টাটার মৃত্যু হয়। ১০ অক্টোবর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য ওরলি পারসি শ্মশানে সম্পন্ন করা হয়। তিনি অকৃতদার ছিলেন এবং মৃত্যুর পর উইলে তিনি ₹১০,০০০ কোটি টাকা সম্পত্তির বেশির ভাগ অর্থ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উন্নতির জন্য দান করেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান