বাঘ হোক বা বাঘিনী প্রত্যেকেই যে নিজেদের এলাকা চিহ্নিত করতে বা নিজের উপস্থিতি জাহির করতে শরীর থেকে একপ্রকার তীব্র গন্ধযুক্ত তরল নিঃসরণ করে তা প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন বাঙালি বিজ্ঞানী রতনলাল ব্রহ্মচারী (Ratanlal Brahmachari)। শুধু আবিষ্কারই নয়, বিশেষ পদ্ধতিতে নিরলস গবেষণার ফলে প্রাণীদের ফেরোমোনের মধ্যস্থিত রাসায়নিক যৌগটির সন্ধান পেয়েছিলেন তিনি। প্রাণীদের আচরণ পর্যবেক্ষণের কাজে তিনিই ছিলেন পথিকৃৎ। ভারতের বিখ্যাত পোষ্য বাঘ খৈরিকে নিয়েও বহু গবেষণা করেছেন রতনলাল ব্রহ্মচারী। ২০১৫ সালে ‘ফিফটি ইয়ার্স অফ টাইগার ফেরোমোন রিসার্চ’ নামে তাঁর একটি গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ পায় যেখানে এই বিষয়ে তাঁর সুচিন্তিত মতামত ও বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। সত্তরের দশকে বহুবার আফ্রিকা ভ্রমণ করেন রতনলাল এবং সেখানকার পাহাড়ি গরিলাদের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে বিশদে গবেষণা করার কৃতিত্বও তাঁরই।
১৯৩২ সালে ঢাকার এক হিন্দু বাঙালি পরিবারে রতনলাল ব্রহ্মচারীর জন্ম হয়। ঢাকা, কলকাতা এবং পরে হামবুর্গে তাঁর শিক্ষাজীবন বিস্তৃত ছিল।
বিখ্যাত বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ছাত্র ছিলেন রতনলাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানকে বিষয় হিসেবে বেছে নেন। স্নাতকোত্তর স্তরের পড়া সেভাবে শেষ করতে পারেননি তিনি কারণ দেশভাগের কারণে বাংলাদেশ ছেড়ে তাঁকে সপরিবারে ভারতে চলে আসতে হয়। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সুপারিশে জার্মানিতে পদার্থবিজ্ঞানের উপর গবেষণা করার সুযোগ পান তিনি। পরবর্তীকালে যদিও তিনি জীববিদ্যার প্রতি আকৃষ্ট হন এবং বিষয়বস্ত বদল করেন। ১৯৫৭ সালে ইণ্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে ভ্রূণতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণায় নিযুক্ত হন রতনলাল ব্রহ্মচারী। আর এই বিষয়ে গবেষণার কাজে বহু দেশে ঘুরেছেন তিনি। বহুবার আফ্রিকা সফর করতে হয়েছে রতনলালকে। ইতালিতে গিয়ে অমেরুদণ্ডী সামুদ্রিক কিছু প্রাণীদের নিয়ে গবেষণা করেছেন রতনলাল। ইতালির নেপল্স আর পালেরমোর সামুদ্রিক গবেষণাগারই ছিল তাঁর কাজের জায়গা। ১৯৬৪ সালে বিখ্যাত ভ্রূণতত্ত্ববিদ গিসেপ্পে রিভেরবেরি এবং রতনলাল ব্রহ্মচারী উভয়ের একত্রে একটি যৌথ গবেষণাপত্র প্রকাশ পায়। এই গবেষণাপত্রেই তাঁরা দেখান যে ভ্রূণস্থিত রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড ভ্রুণের প্রতিলিপি তৈরি করতে বেশ কিছুটা দেরি করে। গবেষণার সময় তাঁরা লক্ষ করেছিলেন যে মাইটোসিস কোষবিভাজনের আগে যদি ভ্রূণের মধ্যে ক্রোমাইসিন বা অ্যাক্টিনোমাইসিনের মতো কিছু অ্যামাইনো অ্যাসিড প্রয়োগ করা যায় তাহলে ভ্রূণে কোন বিকৃতি লক্ষ করা যায় না।
তবে তাঁর গবেষণার প্রধান বিষয় ছিল প্রাণীদের শরীর থেকে নিঃসৃত ফেরোমোন। ১৯৬৪ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী জর্জ শালারের মতামত ছিল যে বাঘ একপ্রকার গন্ধযুক্ত রাসায়নিকের মাধ্যমে বার্তা বিনিময় করে থাকে। ঐ বছরই ভারতের কানহার জঙ্গলে জর্জ শালারের সঙ্গে এই গবেষণার কাজে রওনা দেন রতনলাল। তাঁরা সেখানেই একদিন লক্ষ করেন যে বাঘেদের নিঃসৃত সেই বিশেষ প্রকারের তরল অন্য হরিণেরা শুঁকে শুঁকে পালিয়ে যাচ্ছে। তাঁরা তখন বুঝতে পারেন যে এই তরলের মাধ্যমে বাঘেরা নিজেদের এলাকা চিহ্নিত করে থাকে। দীর্ঘ দশ দিন ধরে পর্যবেক্ষণ করে তাঁরা দেখেন যে সেই তরলের গন্ধটি বেশ ভাল কিন্তু সেই একই গন্ধ অন্যত্র চিড়িয়াখানার ভিতরে পাওয়া যায় না এবং তাঁরা এও লক্ষ করেন যে বাঘ কিংবা বাঘিনী উভয়েই মাঝে মাঝেই পা তুলে মূত্রত্যাগের মতোই সেই তরল নিঃসরণ করছে। এ বিষয়ে আরও বিশদ গবেষণার জন্য তিনি বেছে নিয়েছিলেন ভারতের বিখ্যাত পোষ্য বাঘিনী খৈরিকে। ওড়িশার যোশিপুরের বাঘিনী খৈরিকে পর্যবেক্ষণের সময়েও তিনি লক্ষ করেন যে একইভাবে সেও ঐ তীব্র সুবাসযুক্ত তরল নিঃসরণ করছে। আরও গবেষণার ফলে তিনি জানতে পারেন এই তরলের মধ্যে বিশেষ এক অণুর কারণে তীব্র সুবাস নির্গত হয়। সেই অণুটির রাসায়নিক নাম আসলে ২-অ্যাসিটাইল ১-পাইরোলিন যাকে সংক্ষেপে ২এপি বলা হয়। ওড়িশার নন্দনকাননের বাঘেদের নিয়েও তিনি গবেষণা করেছিলেন এবং অদ্ভুতভাবে লক্ষ করেছিলেন যে মূত্রত্যাগ অপেক্ষা বাঘেরা বা বাঘিনীরা এই বিশেষ প্রকার তরলই বেশি নিঃসরণ করে। একেই বিজ্ঞানের ভাষায় ফেরোমোন বলা হয়। রতনলাল ব্রহ্মচারীকে সে সময় এই ফেরোমোন বিষয়ের গবেষণায় সাহায্য করেছিলেন বিজ্ঞানী জ্যোতির্ময় দত্ত এবং তাঁর ছাত্রী মৌসুমী পোদ্দার। গ্যাস ক্রোমাটোগ্রাফি (GC) ও মাস স্পেক্টোগ্রাফি (MS) পদ্ধতিতে ফেরোমোনের অণুগুলিকে পৃথক করার কাজে সফল হন রতনলাল ব্রহ্মচারী। তিনি প্রথম আবিষ্কার করেন যে, এই বিশেষ অণুর উপস্থিতির পাশাপাশি একেক বাঘের শরীর থেকে নির্গত ফেরোমোনে একেক প্রকার ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে যা ফেরোমোনগুলিকে পৃথক করে। পরবর্তীকালে আরও বিস্তৃত গবেষণায় দেখা যায় যে মহুয়া ফুলে, বাসমতি চালে কিংবা অন্নপূর্ণা পাতায় এই বিশেষ অণুর কারণে তীব্র সুবাস নির্গত হয়। ১৯৯৭ সাল থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে গবেষণা করে সোনা মুগের ডালেও এই একই অণুর উপস্থিতি আবিষ্কার করেন রতনলাল যা তাঁকে বিশ্বে খ্যাতি এনে দেয়। রতনলাল দেখান যে গন্ধহীন ও গন্ধযুক্ত এই দুই প্রকার মুগ ডালের মধ্যে গন্ধযুক্ত মুগডালের গন্ধের মূল কারণ এই বিশেষ অণুর উপস্থিতি। ফেরোমোনের সাহায্যে এভাবে প্রাণী কিংবা উদ্ভিদের যোগাযোগের মাধ্যমকে তিনি নাম দেন কেমিক্যাল কমিউনিকেশন বা রাসায়নিক যোগাযোগ। বলা বাহুল্য যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আনুকূল্যেই তিনি এই বৃহৎ গবেষণা করতে সমর্থ হন। গবেষণার জন্য মোট চোদ্দবার নিজের খরচে আফ্রিকা ভ্রমণ করেছিলেন তিনি। ১৯৭৯ সাল থেকে দীর্ঘ তিরিশ বছর তিনি প্রাণীদের ফেরোমোন নিয়ে গবেষণা করেছেন। আমাজন, বোর্নিও এবং আন্দামানেও গিয়েছেন তিনি গবেষণার কাজে। বাংলায় প্রথম পোকামাকড়ের আচরণ নিয়ে গবেষণা করেছিলেন গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য আর তাঁর অনুপ্রেরণায় প্রাণীদের ব্যবহারবিধি নিয়ে আচরণবিজ্ঞানে বিশেষ অবদান রাখেন রতনলাল ব্রহ্মচারী।
‘জু-চেক’ নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলেন রতনলাল ব্রহ্মচারী, ১৯৮৪ সাল থেকে যেটি বর্ন ফ্রি ফাউণ্ডেশন নামে পরিচিত হয়। এই সংস্থার কাজ ছিল মূলত বন্যপ্রাণীকে বনের মধ্যেই ছেড়ে দিয়ে আসা এবং বন্যপ্রাণীর যথাযথ সংরক্ষণ।
বাংলা ও ইংরাজি দুই ভাষাতেই বহু বই লিখেছেন তিনি। বাংলায় লেখা তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলির মধ্যে ‘আফ্রিকার জঙ্গলে বারো বার’, ‘বাঘ সিংহ হাতি’ ইত্যাদি অন্যতম। এই বইদুটি পরে যদিও ইংরাজিতে অনুদিত হয়েছিল। বাংলাতে এই দুটি ব্যতীত আরেকটি পুস্তিকা লিখেছিলেন রতনলাল ব্রহ্মচারী যার নাম ‘বাঘ থেকে মুগডাল’। এছাড়া ইংরাজিতে তাঁর লেখা বাঘ বিষয়ে গবেষণা গ্রন্থ ‘মাই ট্রাস্ট উইথ বিগ ক্যাটস’ অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাঘের ফেরোমোন বিষয়ে তাঁর গবেষণার সারাৎসার প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৪ সালে ‘দ্য নিউরোবায়োলজি অফ কেমিক্যাল কমিউনিকেশন’ গ্রন্থে যা সম্পাদনা করেছিলেন কার্ল মুকিগন্যাট ক্যারেটা। এই বইতে অন্যান্য পশুদের পাশাপাশি মানুষের ফেরোমোন নিঃসরণ বিষয়েও তিনি সংক্ষিপ্ত ধারণা দিয়েছিলেন। ২০১৫ সালে প্রকাশ পায় তাঁর লেখা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বই ‘ফিফটি ইয়ারস অফ টাইগার ফেরোমোন রিসার্চ’। পদার্থবিজ্ঞানের উপরেও তিনি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন ‘সলিউশন অফ দ্য কম্বাইন্ড গ্র্যাভিটেশনাল অ্যাণ্ড মেসিক ফিল্ড ইকুয়েশনস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি’ নামে যা ১৯৬০ সালে ‘প্রগ্রেস অফ থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স’ পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছিল। বলা যেতে পারে পদার্থবিজ্ঞানের উপর লেখা এটিই তাঁর একমাত্র বই।
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে ১৯৯২ সালে রতনলাল ব্রহ্মচারী রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও ২০০৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.এস.সি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
২০১৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে রতনলাল ব্রহ্মচারীর মৃত্যু হয়। বিজ্ঞানের উন্নতিকল্পে তিনি আর.জি.কর মেডিক্যাল কলেজে দেহদান করেছেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান