সববাংলায়

রবার্ট পিয়েরি

বিভাগঃ , ,

ভ্রমণের নেশা বহু মানুষকেই নিয়ে যায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। কখনও কখনও তা আর কেবলই ভ্রমণ থাকে না, নতুন কিছু অনুসন্ধানের একটি নেশাও চাপে কারও কারও মাথায়, তখন তা অভিযানের রূপ নেয়। তেমনই অভিযানের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা  একজন বিখ্যাত আমেরিকান অভিযাত্রী এবং অনুসন্ধানকারী হলেন রবার্ট পিয়েরি (Robert Peary)। তাঁর নেতৃত্বেই একটি দল প্রথম উত্তর মেরুতে পৌঁছেছিল, তিনি নিজে এবং তাঁর সমর্থকরা সেরকমই দাবি করে থাকেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবেও কাজ করেছিলেন একসময়। বহুবার সুমেরু অঞ্চলে (Arctic region) অভিযানে গিয়েছিলেন রবার্ট। গ্রীনল্যান্ড যে আসলে একটি দ্বীপ, তা প্রমাণ করেছিলেন তিনি। তাঁর উত্তর মেরু অভিযান নিয়ে নানা বিতর্কও প্রচলিত রয়েছে।

১৮৫৬ সালের ৬ মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার ক্রেসনে রবার্ট পিয়েরি-র জন্ম হয়। তাঁর সম্পূর্ণ নাম ছিল রবার্ট এডউইন পিয়েরি। তাঁর পিতার নাম চার্লস. এন. পিয়েরি এবং মা মেরি. পি. পিয়েরি। যখন রবার্টের মাত্র তিন বছর বয়স অর্থাৎ ১৮৫৯ সালে তাঁর বাবা চার্লস পিয়েরির মৃত্যু হয়। তখন রবার্ট পিয়েরি এবং তাঁর পরিবার মেইন রাজ্যের পোর্টল্যান্ডে চলে এসেছিলেন। সেখানে কাউন্টি সার্ভেয়ার হিসেবে কাজ করতেন রবার্ট।

পোর্টল্যান্ডেই বেড়ে উঠতে থাকেন রবার্ট। সেখানেই তাঁর প্রাথমিক পড়াশোনার সূচনা হয়। পোর্টল্যান্ড হাইস্কুলে (মেইন) ভর্তি হয়েছিলেন তিনি পড়াশোনার জন্য। ১৮৭৩ সালে সেই স্কুল থেকে সফলভাবে পাশ করবার পর তিনি বোডইন কলেজে চলে যান উচ্চশিক্ষার জন্য। সেখানে তিনি সামাজিক প্রতিষ্ঠান ডেল্টা কাপ্পা এপসিলন ফেটারনিটি এবং ফি বেটা কাপ্পা অনর সোসাইটির সদস্য হয়েছিলেন। এমনকি রোয়িং দলেরও সদস্য ছিলেন তিনি। ১৮৭৭ সালে উক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন রবার্ট।

১৮৭৮ থেকে ১৮৭৯ সাল পর্যন্ত রবার্ট থাকতেন মেইনের ফ্রাইবার্গে। কলেজের পর তিনি ওয়াশিংটন ডিসি-তে ইউএস ন্যাশনাল জিওডেটিক সার্ভে অফিসে টেকনিক্যাল ড্রয়িং তৈরির একজন ড্রাফ্টসম্যান হিসেবে কাজ করেন। এরপর তিনি যোগ দিয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীতে এবং ১৮৮১ সালের ২৬ অক্টোবর তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার কর্পসে লেফটেন্যান্ট ধরনেরই একটি পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। ১৮৮৪ থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত, তিনি নিকারাগুয়া খালের জরিপে একজন সহকারী ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন এবং পরে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার পদে উন্নীত হন। ১৮৮৫ সালে তাঁর লেখা ডায়েরির একটি এন্ট্রি থেকে জানা যায় যে, নৌবাহিনীতে কাজ করার সময়তেই উত্তর মেরুতে পৌঁছনোর সংকল্প করেছিলেন তিনি এবং এই ব্যাপারে প্রথম স্থানাধিকারী হওয়ার এক বাসনাও সেখানে স্পষ্ট প্রকাশ পেয়েছিল।

১৮৮৬ সালের এপ্রিল মাসে তিনি ন্যাশনাল একাডেমি অফ সায়েন্সেসের জন্য একটি গবেষণাপত্র লেখেন যার মধ্যে, গ্রিনল্যান্ডের হিমবাহ বা বরফের পাত, যাকে আইস ক্যাপও বলে, তা অতিক্রম করার জন্য দুটি পদ্ধতির প্রস্তাব করা হয়।

১৮৮৬ সালে পিয়েরি সুমেরু অঞ্চলে প্রথম অভিযান করেন। কুকুরে টানা স্লেজের মাধ্যমে গ্রীনল্যান্ড অতিক্রম করবার ইচ্ছে ছিল তাঁর। একটি তিমি শিকারের জন্য নির্মিত জাহাজ, যেগুলি হোয়েলার নামে পরিচিত, তা নিয়ে গিয়েছিলেন এবং সঙ্গে ছিলেন এক তরুণ ড্যানিশ ক্রিশ্চিয়ান মাইগার্ড। কিন্তু প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং অভিজ্ঞতার অভাবে সেই অভিযান ব্যর্থ হয়।

সমুদ্র ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় ভরপুর এক তরুণ কেবিন বয় ম্যাথিউ হেনসনের সঙ্গে আলাপের পর রবার্ট পিয়েরি তাঁকে তাঁর ব্যক্তিগত কর্মী হিসেবে নিয়োগ করেন৷ রবার্টের পরবর্তী প্রত্যেকটি আর্কটিক অভিযানে সঙ্গে ছিলেন এই হেনসন।

১৮৯১ থেকে ১৮৯২ সাল—এই সময়পর্বে দ্বিতীয়বার গ্রীনল্যান্ড অভিযান করেন পিয়েরি। আমেরিকান জিওগ্রাফিক সোসাইটি, ফিলাডেলফিয়া একাডেমি অফ ন্যাচারাল সায়েন্সেস, ব্রুকলিন ইনস্টিটিউট অফ আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস ইত্যাদি আরও কয়েকটি  সংস্থা এই অভিযানের জন্য রবার্টকে অর্থায়ন করেছিল। এই অভিযানে আবহাওয়াবিদ, খনিজবিদ, নৃতাত্ত্বিক এমনকি এক পাখি বিশেষজ্ঞও ছিলেন। এই অভিযানে সঙ্গে ছিলেন পিয়েরির স্ত্রী জোসেফাইন ডাইবিটস। ১৮৮৮ সালের ১১ আগস্ট তাঁদের বিবাহ হয়েছিল। তাঁদের দুই সন্তানের নাম মারি আহনিঘিটো এবং রবার্ট পিয়েরি জুনিয়র।

যাই হোক, এই দ্বিতীয় অভিযানে পা ভেঙে গুরুতরভাবে আহত হন রবার্ট। ছমাস বিশ্রামে থাকেন। ইগলু বানিয়ে থাকতেন, পশমের পোশাক ব্যবহার করতেন। এই অভিযানেই তাঁরা গ্রীনল্যান্ডকে একটি দ্বীপ হিসেবে প্রমাণ করেছিলেন।

১৮৯৮ থেকে ১৯০২ সালের মধ্যে যে অভিযান করেছিলেন রবার্ট পিয়েরি, তাতে দাবি করেছিলেন যে, ১৮৯৯ সালে এলেসমের দ্বীপের পশ্চিমে অবস্থিত ‘জেসুপ ল্যান্ড’-এর আবিষ্কার করেছিলেন তিনিই। দ্বীপটিকে চোখে দেখেছিলেন পিয়েরি। এও দাবি করেন যে, অ্যাক্সেল হেইবার্গ দ্বীপের দৃশ্য তিনি দেখেছিলেন এবং তা একই সময়ে নরওয়েজিয়ান অভিযাত্রী অটো সার্ভারড্রপের অভিযান ও এই দ্বীপটি আবিষ্কারের আগের ঘটনা। যদিও এক্সপ্লোরেশন সোসাইটি এবং ইতিহাসবিদরা এই দাবি নাকচ করে দিয়েছিলেন। তবে লন্ডনের রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি এবং আমেরিকান জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি সাহস, দৃঢ়তা, অজানা স্থানের ম্যাপিং এবং ১৯০০ সালে গ্রীনল্যান্ডের উত্তরতম বিন্দু কেপ মরিস জেসুপের আবিষ্কারের জন্য সম্মানিত করেছিল।

পিয়েরির পরবর্তী সুমেরু অভিযান ছিল ১৯০৫ থেকে ১৯০৬ সালের মধ্যে। এটি ছিল তাঁর সপ্তম সুমেরু অভিযান। রুজভেল্ট নামক একটি জাহাজ সঙ্গে ছিল তাঁর। এই অভিযানে তিনি উত্তরদিকে সর্বোচ্চ দূরত্বে যাওয়ার বিশ্বরেকর্ড করেছিলেন বলে দাবি করেছেন। এমনকি মে মাসে রুজভেল্টে ফিরে আসার পর পিয়েরি জুন মাসের কয়েক সপ্তাহ জুড়ে পশ্চিমে এলেসমেরের তীরে অত্যন্ত শ্রমসাধ্য ও সঙ্কটপূর্ণ ভ্রমণ শুরু করেছিলেন ও কেপ কোলগেট আবিষ্কার করেন। নিজের বইতে দাবি করেছেন যে ২৪ জুন উত্তর-পশ্চিমে  ইতিপূর্বে অনাবিষ্কৃত ক্রোকার ল্যান্ড দেখেছিলেন তিনি কেপ কোলগেটের শিখরদেশ থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি রবার্টকে ১৯০৫-০৬ সালের অভিযানে উত্তরের সর্বোচ্চ দূরত্বে পৌঁছনোর জন্য হুবার্ড মেডেল দিয়ে সম্মানিত করেছিল। পরবর্তীকালে, ১৯১৪ সালে ডোনাল্ড ব্যাক্সটার ম্যাকমিলান এবং ফিটঝুগ গ্রীনের অভিযানে দেখা গেছে যে আদতেই ক্রোকার ল্যান্ডের অস্তিত্ব নেই।

১৯০৮ সালের ৬ জুলাই রবার্ট তাঁর দলবল নিয়ে অষ্টম সুমেরু অভিযানের জন্য নিউইয়র্ক শহর ত্যাগ করেছিলেন। ১৯০৯ সালের ৬ এপ্রিল আরও পাঁচজনের সঙ্গে পিয়েরি এই উত্তর মেরু অভিযানে সফলতা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু ফিরে আসার পর তিনি জানতে পারেন যে, তাঁর পুরানো সহকর্মী কুক এক বছর আগে ১৯০৮ সালের এপ্রিলে উত্তর মেরু স্পর্শ করেছিলেন বলে দাবি করেছেন। সেই কারণেই মূলত রবার্টের প্রথম উত্তর মেরু পৌঁছনোর দাবিকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীকালে পিয়েরির ডায়েরি পর্যবেক্ষণ করেও অনেক গবেষক তাঁর উত্তর মেরুতে পৌঁছনোকে সন্দেহের চোখে দেখেছিলেন। অবশ্য পিয়েরির সমর্থকরা তাঁর এই অভিযানের সফলতায় কোনোরকম সন্দেহ করেননি।

১৯০১ সালের ৫ জানুয়ারি রবার্ট পিয়েরি লেফটেন্যান্ট কমান্ডার পদে এবং ১৯০২ সালের ৬ এপ্রিল কমান্ডার পদে উন্নীত হয়েছিলেন। ১৯১০ সালের অক্টোবরে পিয়েরি নৌবাহিনীতে ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হয়েছিলেন। ১৯১১ সালের ৩ মার্চ তিনি নেভাল সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের রিয়াল অ্যাডমিরাল হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। রবার্ট ১৯০৯ থেকে ১৯১১ এবং ১৯১৩ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত দ্য এক্সপ্লোরার্স ক্লাবের সভাপতি হিসেবে দুবার দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১৬ সালের গোড়ার দিকে তিনি আমেরিকার অ্যারো ক্লাব দ্বারা তৈরি একটি বেসরকারী সংস্থা ন্যাশনাল এরিয়াল কোস্ট প্যাট্রোল কমিশনের চেয়ারম্যান হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পিয়েরি আটটি এয়ারমেইল রুটের একটি সিস্টেমের প্রস্তাব করেন, যা ইউএস পোস্টাল সার্ভিসের এয়ারমেইল সিস্টেমের উৎপত্তির মূল কারণ হয়ে ওঠে।

১৮৯৭ সালের অভিযান থেকে ছয়টি ইনুইটকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আনার জন্য এবং পরবর্তীতে তাদের সাথে খারাপ আচরণের জন্য পিয়েরি সমালোচিত হন। এই ইনুইটদের নিউইয়র্কের আমেরিকান মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে প্রদর্শনের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছিল যেখানে পাঁচজন শেষ পর্যন্ত মারা গিয়েছিল। সুমেরু অভিযানের সময় এক ইনুইট মহিলা আলেকাসিনার সাথে পিয়ারীর সম্পর্ক ছিল বলে জানা যায়, এমনকি তাদের দুটি সন্তানও হয়েছিল বলে মনে করা হয়।

রবার্ট পিয়েরি নিজের বিচিত্র অভিযানগুলির অভিজ্ঞতার কথা নিয়ে নানা গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। সেই গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ‘দ্য সিক্রেটস অব পোলার ট্রাভেল’, ‘নিয়ারেস্ট দ্য পোল’, ‘দ্য নর্থ পোল: ইটস ডিসকভারি ইন ১৯০৯ আন্ডার দ্য অসপিসেস অব দ্য পিয়েরি আর্কটিক ক্লাব’, ‘দ্য ডিসকভারি অব দ্য নর্থ পোল’, ‘নর্থওয়ার্ড ওভার দ্য ‘গ্রেট আইস’, ‘দ্য নর্থ পোল’ ইত্যাদি।

আজীবন নানারকম সফল অভিযানের জন্য বিভিন্ন পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন রবার্ট পিয়েরি। আমেরিকান জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির তরফ থেকে পেয়েছিলেন কুলাম জিওগ্রাফিক্যাল মেডেল, শিকাগো জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি তাঁকে দিয়েছিল হেলেন কালভার পদক, ইম্পেরিয়াল জার্মান জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি থেকে পেয়েছিলেন নাচটিগাল স্বর্ণপদক, রয়্যাল ইতালিয়ান জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি থেকে কিং হামবার্ট স্বর্ণপদকে ভূষিত হয়েছিলেন, এছাড়াও হাঙ্গেরিয়ান জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির স্বর্ণপদক-সহ আরও নানা খেতাবে সম্মানিত হয়েছিলেন পিয়েরি। ১৯১৩ সালে গ্র্যান্ড অফিসার অফ দ্য লিজিয়ন অফ অনারে ভূষিত হন তিনি।

অবশেষে ১৯২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন, ডিসিতে ৬৩ বছর বয়সে এই কিংবদন্তি এবং বিতর্কিত অভিযাত্রী রবার্ট পিয়েরির মৃত্যু হয়েছিল।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading