রজার বেকন

রজার বেকন

মধ্যযুগীয় ইউরোপে পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের জনক হিসেবে পরিচিত ছিলেন বিজ্ঞানী রজার বেকন (Roger Bacon)। তাঁর লেখা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘ওপাস মাজুস’ থেকেই তাঁর উদ্ভাবনী কৃতিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। একদিকে মধ্যযুগীয় অন্ধবিশ্বাসের বিরোধিতা আর অন্যদিকে পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের দ্বারাই কেবল বিশ্বপ্রকৃতির জ্ঞানলাভের ধারণা প্রচার করার কারণে গির্জার যাজকেরা তাঁকে ধর্মদ্রোহী আখ্যা দিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের পদ থেকে বরখাস্ত করে। শুধুই বিজ্ঞানচর্চা নয়, গ্রিক ও আরবি দর্শনের উপরও গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন রজার বেকন। গণিতশাস্ত্রের জগতে ‘জ্যামিতি’ থেকে শুরু করে পদার্থবিদ্যার ‘অপটিক্স’ সবেতেই তাঁর বিশেষ অবদান ছিল। তাছাড়া মধ্যযুগের শুরুর দিকে জাদুবিদ্যা এবং অলৌকিক তন্ত্রের চর্চাও করেছিলেন তিনি।

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইংল্যাণ্ডের সমারসেটের ইলচেস্টার শহরে এক সম্ভ্রান্ত জমিদার বংশে রজার বেকনের জন্ম হয়। তাঁর জন্ম সাল নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কেউ বলেন তাঁর জন্ম হয়েছে ১২১০ সালে, কেউ বলেন ১২১৫ সালে; আবার কারো কারও মতে ১২২০ সালে জন্ম হয় রজার বেকনের। পরবর্তীকালে ১২৬৭ সালে প্রকাশিত তাঁর একটি বই ‘ওপাস টেরিটিয়াম’-এ রজার বেকন লিখেছিলেন যে চল্লিশ বছর আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। সেই তথ্য থেকে অনুমান করা হয় মোটামুটিভাবে তেরো বছর বয়সে পড়াশোনা শুরু হলে তাঁর জন্ম সাল হতে পারে ১২১৪। আবার অন্য এক সূত্র অনুসারে ১২২৭ সালে তিনি প্রথম বর্ণমালা শিখেছিলেন বলে জানা যায়। তবে এক্ষেত্রে ধরে নিতে হয় তাঁর জন্ম হয়েছিল ১২২২ সালে, কিন্তু এই তথ্যের যৌক্তিকতা প্রমাণিত হয়নি। ফলে সাধারণভাবে ১২১৪ সালেই রজার বেকনের জন্ম হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়। রজার যেহেতু তাঁর বাবা-মায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন না, তাই বাবা-মায়ের অনুপস্থিতিতে তাঁদের সম্পত্তির অধিকারী হবেন তিনি এমন আশাও ছিল না তাঁর। তাঁর বাবা-মায়ের ইচ্ছা ছিল রজার বেকন একজন পুরোহিত বা যাজক হবেন।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হওয়ার আগে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন সম্পর্কে বিশেষ তথ্য পাওয়া যায় না। তবে কারো কারো মতে স্থানীয় এক যাজকের কাছে লাতিন ভাষা ও গণিত অধ্যয়ন করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য। তেরো বছর বয়সে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন রজার বেকন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার খরচ, থাকা-খাওয়ার খরচ সবই তাঁর বাবা দিয়েছিলেন। বহু বছর এই বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়াশোনা করেছিলেন তিনি। ব্যাকরণ, তর্কশাস্ত্র, অলঙ্কারশাস্ত্র, জ্যামিতি, পাটিগণিত, সঙ্গীত এবং জ্যোতির্বিদ্যা অধ্যয়ন করেন রজার বেকন। অক্সফোর্ড থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন রজার বেকন।

১২৪১ সাল পর্যন্ত অক্সফোর্ডেই অধ্যাপনা করতেন তিনি। কেবলমাত্র খ্রিস্টান ছিলেন না বলে অ্যারিস্টটলের সমস্ত পাঠ একসময় প্যারিসে নিষিদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু ১২৪০ সালের দিকে আবার সেই পাঠ স্বীকৃতি পায় প্যারিসে। অক্সফোর্ডে সেই অ্যারিস্টটল বিষয়েই একজন দক্ষ অধ্যাপক হিসেবে রজার বেকনের পরিচিতি গড়ে ওঠে। অ্যারিস্টটলের ধারণা ও চিন্তাভাবনার উপর বহু বক্তৃতা দিয়েছেন তিনি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্যারিসের একজন কলাবিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন রজার। অক্সফোর্ডের মতো এখানেও লাতিন ভাষায় শিক্ষাদান করা হতো। তখনও পর্যন্ত বিজ্ঞানের উপর আগ্রহ জন্মায়নি রজারের। পেরিগ্রিনাস নামে এক উদ্ভাবকের অনুপ্রেরণায় তাঁর মধ্যে বিজ্ঞান ও দর্শন বিষয়ে আগ্রহ জন্মায়। একটি চিঠিতে পেরিগ্রিনাস রজারকে জানিয়েছিলেন একটি সেনাবাহিনীতে কাজ করার সময় তাঁর চুম্বক আবিষ্কারের কথা। ক্রমে তাঁর পরিবারের সঞ্চিত সব অর্থ এই বিজ্ঞানচর্চার কাজে লাগান রজার, বহু বইপত্র, যন্ত্রপাতি, গাণিতিক ধারাপাত কিনে ফেলেন তিনি। এই সব বইগুলি আদপে পাণ্ডুলিপি ছিল এবং সেগুলি হাতে লিখে অনুকরণ করার কারণে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছিল। ভাষাবিজ্ঞান, আলোকবিজ্ঞান, গণিতের চর্চায় গভীরভাবে নিবিষ্ট হয়ে পড়েন তিনি। বন্ধু এবং পারিপার্শ্বিকের জগত থেকে একবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে অধ্যয়নে মগ্ন হয়ে যান রজার বেকন। গণিতের ক্ষেত্রে জ্যামিতির প্রয়োগ সংক্রান্ত বিষয়েই তাঁর সবথেকে বেশি অবদান ছিল। আল হাইথামের লেখা জ্যামিতির বই পড়েছিলেন তিনি এবং প্রাকৃতিক দৃষ্টিশক্তির ঘাটতির জন্য লেন্স ব্যবহারের দিকে মনোনিবেশ করেন রজার এবং লেন্স তৈরিতে মনোনিবেশ করেন। প্রাকৃতিক বস্তু বিবর্ধক হিসেবে লেন্সকে প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন তিনি।

আধুনিক বিজ্ঞানের নানা দিক নিয়ে তিনি তখন থেকেই আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। এই সময়কার লেখাপত্রে তাঁর অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা আছে, যা পরবর্তীকালে কখনো তিনি আর চর্চা করেননি। ১২৫০ সালে একটি চিঠিতে কারিগরি যন্ত্রপাতি এবং আলোকবিজ্ঞানের নানা যন্ত্রপাতি সম্পর্কে নিজের মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন রজার বেকন। ১২৫১ সালে প্যারিস ভ্রমণ করেন বেকন এবং পরে অক্সফোর্ডে পড়ানো ছেড়ে দিয়ে রজার বেকন যোগ দেন অর্ডার অফ দ্য ফ্রায়ার্স মাইনরে। একজন ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান ছিলেন তিনি একথা সত্য, একইসঙ্গে তিনি বিশ্বাস করতেন যে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের সৃষ্ট এই পৃথিবী ও প্রকৃতিকে বোঝা যাবে। সেন্ট অগাস্টিন পৌত্তলিক খ্রিস্টান দার্শনিকদের থেকে শিক্ষা নিতে বলেছিলেন রজার বেকনকে, আর রজারও এই শিক্ষায় বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। অনেকে মনে করেন বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি এই যাজকদের দলে যোগ দেওয়ার কাজটির পিছনে রজার বেকনের দুটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে। প্রথমত পরিবারের সমস্ত অর্থ বৈজ্ঞানিক গবেষণার পিছনে ব্যয় করার কারণে নিজের ভরণপোষণের প্রয়োজন হয়েছিল বেকনের আর দ্বিতীয়ত ধর্মগ্রন্থ তথা বাইবেল বিরোধী বিজ্ঞানচর্চার প্রচারের জন্য একটি প্রতিষ্ঠিত ভিত্তিভূমি দরকার ছিল যা ফ্রান্সিসকান পোপদের এই গোষ্ঠীর থেকে তিনি পেয়েছিলেন বলে মনে করা হয়।

অক্সফোর্ড ফ্রায়ারিতে যোগ দেওয়ার পরে বিজ্ঞানচর্চা থেকে বিরত হননি তিনি। অক্সফোর্ড ফ্রেয়ারিতে একটি চমৎকার গ্রন্থাগার ছিল যেখানে বেকন পড়াশোনা করতে থাকেন। ১২৫৬ সালে ইংল্যাণ্ডের সেই ফ্রেয়ারির একাডেমিক কাউন্সিলের সভাপতি হন কর্ণওয়েলের রিচার্ড। কিন্তু সেই রিচার্ডের ভাবধারায় বিশেষ আস্থা ছিল না তাঁর এবং অনেকক্ষেত্রে তাঁর সমালোচনা করেছিলেন রজার বেকন। কর্ণওয়েলের রিচার্ড আসার পরেই ফ্রেয়ারির গ্রন্থাগারে রজারকে আর পড়তে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না এবং তাঁকে প্যারিসের একটি ফ্রেয়ারিতে পাঠানো হয়। ফ্রেয়ারিতে থাকার সময় তিনি ক্যালেণ্ডার সংস্কারের কাজ করেছিলেন রজার। প্যারিসে থাকার সময় বেকন গণিতের অধ্যাপনা করতেন। ১২৬৪ সালে কার্ডিনাল ডি ফল্কসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি এবং গির্জার সহায়তার জন্য একটি বিজ্ঞানমূলক বই লেখার প্রস্তাব দেন। কিন্তু কার্ডিনাল ডি ফল্কস এই কথার অন্য মানে বুঝে বইটি দেখতে চান। ততদিনে বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করতেও পারেননি রজার আর্থিক দুরবস্থার জন্য। পরের বছরই কার্ডিনাল ফল্কস পোপ চতুর্থ ক্লেমেন্ট-এর পদে উন্নীত হলে আর্থিক সহায়তা পেতে অসুবিধে হয়নি রজার বেকনের। ১২৬৬ সালে একটি চিঠিতে পোপ রজার বেকনকে এই বিজ্ঞানমূলক বই লেখার কাজ চালিয়ে যেতে বলেন গোপনে। ১২৬৭ সালে গির্জার অনুমোদনে বিজ্ঞানভিত্তিক কাজের একটি কোষগ্রন্থ নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন রজার বেকন। সেই প্রস্তাবের মধ্যেই ছিল তিনটি বইয়ের পরিকল্পনা – ৮৪০ পাতার ‘ওপাস মাজুস’, ‘ওপাস মাইনুস’ এবং ‘ওপাস টেরিটিয়াম’। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ানোর বিষয়ে বিজ্ঞানের নানা চিন্তাধারা অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছিলন রজার বেকন। এই প্রস্তাবিত বইগুলিতেই প্রথম রজার বেকন দেখান যে রামধনুর বর্ণালিগুলি ৪২ ডিগ্রি কোণে আপতিত হয় যা তাঁর আগে কেউ কখনো আবিষ্কার করেনি। ভাষাবিজ্ঞানের উপরও বেশ কিছু গবেষণা প্রকাশ পেয়েছিল এই লেখায়। ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের চর্চার বিষয়েও ‘ওপাস মাজুস’ বইতে নিজের মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন রজার বেকন। এই বইটির সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি রজার বেকন পাঠিয়ে দেন পোপ চতুর্থ ক্লেমেন্ট-এর কাছে কিন্তু সেই পাণ্ডুলিপি এসে পৌঁছানোর আগেই পোপের মৃত্যু ঘটে। ফলে রজারের বিজ্ঞানমূলক ভাবনা-চিন্তা বিশ্বের দরবারে প্রকাশ পাওয়ার সব পরিকল্পনা ধূলিসাৎ হয়।

এই সময় ইংল্যাণ্ডে ফিরে গিয়ে প্রাকৃতিক দর্শনের উপর সাধারণ বক্তব্য এবং গণিতের উপর কিছু ভাবনা-চিন্তা প্রকাশের জন্য দুটি বই লেখেন রজার বেকন – ‘কমুনিয়া ন্যাচারালিয়াম’ এবং ‘কমুনিয়া ম্যাথমেটিকা’। এই দ্বিতীয় বইটিতে জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত নানা চর্চার কথা লেখা রয়েছে। বেকন বিশ্বাস করতেন যে, পৃথিবী একটি গোলক এবং কোনো কিছু এর চারধারে ঘুরতে পারে। বেশ কিছু নক্ষত্র থেকে পৃথিবীর দূরত্বও নির্ণয় করেন তিনি ১৩ কোটি মাইল। বিবর্ধক কাচ, বারুদ ইত্যাদি তাঁর আবিষ্কারের অন্যতম প্রধান উপাদান।

১২৯২ সালের জুন মাসে ইংল্যাণ্ডের অক্সফোর্ডে রজার বেকনের মৃত্যু হয়।

 

আপনার মতামত জানান