সৈয়দ নুরুল হাসান

সৈয়দ নুরুল হাসান

যে সমস্ত মহান ব্যক্তিত্ব উচ্চশিক্ষা এবং উচ্চচিন্তার আলোকে দেশের জনসাধারণকে আলোকিত করে তুলেছিলেন মহৎ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সৈয়দ নুরুল হাসান (Saiyid Nurul Hasan) তাঁদের মধ্যে নিঃসন্দেহে অন্যতম। কেবলমাত্র সক্রিয় একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁর পরিচয় দিলে তা অসম্পূর্ণ থাকে। একজন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ, দক্ষ সংসদ সদস্য, সুপরিচিত প্রশাসক এবং বিশিষ্ট কূটনীতিক হিসেবে নুরুল হাসানের নাম ভারতবর্ষের ইতিহাসে স্মরণীয়। ভারতবর্ষে শিক্ষার অগ্রগতি এবং মানোন্নয়নের জন্য তিন দশক ধরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিরলস পরিশ্রম চালিয়ে গিয়েছেন তিনি। সমাজকল্যাণ এবং সংস্কৃতি মন্ত্রকের দায়িত্বও সামলেছিলেন তিনি দক্ষ হাতে। রাজ্যসভার সদস্য, দুটি রাজ্যের রাজ্যপাল, বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের কাণ্ডারি সৈয়দ নুরুল হাসানের প্রতিভা কেবলমাত্র এদেশেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। লন্ডনের রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্যপদ অলঙ্কৃত করেছিলেন তিনি। রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভার সদস্য হওয়ার পাশাপাশি সোভিয়েত ইউনিয়নে রাষ্ট্রদূত হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। নুরুল হাসানের মধ্যযুগের ভারতের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা ইতিহাস রচনার এক অন্য দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পাঠকের পরিচয়ের সুযোগ করে দিয়েছিল। বামপন্থায় আজীবন বিশ্বাসী সৈয়দ নুরুল হাসান বাম রাজনীতির ইতিহাসে খোদিত একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র।

১৯২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর লক্ষ্ণৌ শহরে ব্রিটিশ ভারতের সংযুক্ত প্রদেশের তালুকদার পরিবারে সৈয়দ নুরুল হাসানের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম সৈয়দ আব্দুল হাসান (Saiyid Abdul Hasan) এবং মায়ের নাম নুর ফতিমা বেগম (Nur Fatima Begum)। নুরুল হাসানের বাবা প্রথমে ছিলেন একজন জেলা সেটলমেন্ট অফিসার যিনি পরবর্তীকালে সংযুক্ত প্রদেশের কোর্ট অফ ওয়ার্ডের সভাপতি হয়েছিলেন। নুরুল হাসানের পরিবারের অধিকাংশ মানুষই উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন এবং কেউ কেউ সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন ওতপ্রোতভাবে। তাঁর মাতামহ স্যার সৈয়দ ওয়াজির হাসান আউধের বিচারালয়ের প্রধান বিচারপতি ছিলেন এবং একইসঙ্গে তিনি মুসলিম লীগের একজন নামজাদা নেতা হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। ১৯৩৬ সালে ওয়াজির হাসান হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। নুরুল হাসানের এক মামা সৈয়দ সাজ্জাদ জাহির ছিলেন একজন আইনজীবী এবং মার্কসীয় চিন্তাবিদ ও অপর আরেক মামা সৈয়দ আলি জাহির একজন ব্যারিস্টার ছিলেন যিনি পরবর্তীকালে উত্তরপ্রদেশের আইন মন্ত্রী হয়েছিলেন ও ইরানে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। নুরুল হাসানের বিবাহ হয়েছিল নবাব রেজা আলি খানের জ্যেষ্ঠ কন্যা নবাবজাদী খুরশিদ লাকা বেগম সাহিবার (Nawabzadi Khurshid Laqa Begum Sahiba) সঙ্গে। তাঁদের দুই সন্তানই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ছিল। নুরুল হাসানের পুত্র সায়িদ সিরাজুল হাসান ছিলেন একজন বিশিষ্ট পদার্থবিদ যিনি ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছিলেন। নুরুল হাসানের কন্যা সাইদা তালাত ফাতিমা হাসান ছিলেন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের একজন নামজাদা উদ্যোক্তা।

লক্ষ্ণৌতে অবস্থিত একটি শিয়া ইসলামিক মাদ্রাসা সুলতান উল মাদারিস থেকে নুরুল হাসান বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর পরবর্তী পড়াশোনার জন্য তিনি চলে আসেন কলকাতায় এবং লা মার্টিনিয়ার বয়েজ কলেজে অধ্যয়ন শুরু করেন। তবে এলাহাবাদের মুইর সেন্ট্রাল কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন তিনি। সেখানে বিখ্যাত অধ্যাপক আর.পি. ত্রিপাঠীর ছাত্র ছিলেন নুরুল হাসান। স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর আরও উচ্চস্তরের পড়াশোনার জন্য বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে অক্সফোর্ডের নিউ কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি এবং ভারতীয় ইতিহাস বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং সম্মানীয় ডক্টর অফ ফিলোজফি বা ডি.ফিল ডিগ্রি অর্জন করেন। অক্সফোর্ডের ছাত্র থাকাকালীন তিনি অক্সফোর্ড ইন্ডিয়া মজলিসের সভাপতিও নির্বাচিত হয়েছিলেন। 

একজন অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন নুরুল হাসান। লন্ডনের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে একজন প্রভাষক হিসেবে তিনি কাজ করেছিলেন প্রথমে। পরবর্তীকালে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের একজন অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারপার্সনের পদেও অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। প্রথম দিকে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের উন্নতিসাধনে নিরলস পরিশ্রম করে গিয়েছেন নুরুল হাসান। প্রথমে ইন্ডিয়ান হিস্টোরি কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে তিনবার সভাপতির পদ অর্জন করেছিলেন তিনি। লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি ইতিহাসের অধ্যাপনা করেছেন। পরবর্তীকালে তিনি লন্ডনের রয়্যাল হিস্টোরিকাল সোসাইটি এবং রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত হন। 

স্বাধীনতা সংগ্রামের আবহে বড় হয়ে ওঠা নুরুল হাসানের মধ্যেও একরকম জাতীয়তাবাদ এবং দেশাত্মবোধের বীজ বেড়ে উঠছিল। তিনি নিজেও হৃদয়ের তাড়না থেকে, পরাধীনতার যন্ত্রণা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন স্বদেশি আন্দোলনে। স্বাধীনতার লড়াইয়ের সময়তেই নুরুল হাসান গঠন করেছিলেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস ফেডারেশন। বামপন্থায় অবিচল বিশ্বাস এবং ধর্মনিরপেক্ষতা আজীবন ছিল নুরুল হাসানের মধ্যে। শিক্ষাক্ষেত্র থেকে বৃহত্তর রাজনীতির জগতে প্রবেশ করে যেভাবে তিনি রাজনীতিকে শিক্ষা এবং সমাজের মানোন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি এবং ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত এই পদের দায়িত্ব সামলেছিলেন। ১৯৭১-৭২ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯৭২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৭৭ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত নুরুল হাসান শিক্ষা, সমাজকল্যাণ এবং সংস্কৃতি মন্ত্রকের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য অবদান হলো, উচ্চবিদ্যালয় স্তর, জুনিয়র কলেজ এবং স্নাতক স্তরের শিক্ষায় ১০+২+৩ এই বিভাজনে শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন। ১৯৭২ সালে তিনি নয়া দিল্লির ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ হিস্টোরিকাল রিসার্চ’ নামক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলেন। নয়া দিল্লির ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ স্যোশাল সায়েন্স রিসার্চ’-এর তত্ত্বাবধানে ভারতবর্ষে ২৭টি সমাজবিজ্ঞানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেমন কলকাতার ‘সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন স্যোশাল সায়েন্স’ (১৯৭৩) ইত্যাদি স্থাপনের পিছনে মূল স্থপতি ছিলেন সৈয়দ নুরুল হাসান। তাঁর মন্ত্রীত্বের সময়ে সংসদের একটি আইনের অধীনে রামপুর রেজা লাইব্রেরির তহবিল ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ভারত সরকারকে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি নয়া দিল্লির ‘কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ’-এর সহ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। নুরুল হাসান যেহেতু একজন ইতিহাসবিদ ছিলেন, তাঁকে একটি বিজ্ঞান বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের সহ সভাপতি নির্বাচিত করায় এখানকার শীর্ষ বিজ্ঞানীরা ক্ষোভ প্রকাশও করেছিলেন। 

নুরুল হাসান ১৯৭৪-৭৫ নাগাদ সংসদে ‘টুয়ার্ডস ইকুয়ালিটি : দ্য রিপোর্ট অফ দ্য কমিটি অন দ্য স্ট্যাটাস অফ উওমেন ইন ইন্ডিয়া’র উত্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন সৈয়দ নুরুল হাসান। এই প্রতিবেদনটিই দিল্লির ‘সেন্টার ফর উওমেনস ডেভেলপমেন্ট স্টাডিস’ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তেরি করেছিল। 

ইউনেস্কো-র ‘হিস্টোরি অফ ম্যানকাইন্ড’ প্রোজেক্টের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন সৈয়দ নুরুল হাসান। চারবার তিনি ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনে ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৬৭ এবং ১৯৭১, মোট দুবার রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে ভারতীয় প্রতিনিধি দলের সদস্য ছিলেন তিনি। এছাড়াও ৫৭তম আন্ত:সংসদীয় সম্মেলনে ভারতীয় প্রতিনিধি দলের সদস্য ছিলেন সৈয়দ নুরুল হাসান। ১৯৭০ সালে মধ্যপ্রাচ্য সংকটে (কায়রো) রাজনৈতিক কমিশন এবং সংসদ সদস্যদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনের চেয়ারম্যানের পদও অলঙ্কৃত করেছিলেন তিনি। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বাদশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেছিলেন। নম্র স্বভাব এবং বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের জন্য মস্কোর একজন জনপ্রিয় ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন সৈয়দ নুরুল হাসান। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির অতিথি সদস্য ছিলেন তিনি। 

সৈয়দ নুরুল হাসান রাজনৈতিক জীবনের একেবারে শেষ দিকে পশ্চিমবঙ্গ এবং ওড়িশার রাজ্যপাল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। প্রথমে ১৯৮৬ সালের ১২ আগস্ট তিনি পশ্চিমবঙ্গের ত্রয়োদশ রাজ্যপাল হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ১৯৮৯ সালের ১ মার্চ পর্যন্ত প্রথম দফার মেয়াদ ছিল তাঁর। পরবর্তীকালে আরেকবার তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এই দ্বিতীয় দফায় ১৯৯০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৯৩ সালের ১২ জুলাই পর্যন্ত এই পদে বহাল ছিলেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল থাকাকালীন তিনি কলকাতায় ‘মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ইন্সটিটিউট অফ এশিয়ান স্টাডিজ’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নুরুল হাসান ওড়িশারও রাজ্যপাল হিসেবেও দুদফা দায়িত্ব পালন করেছিলেন। প্রথম দফায় ওড়িশার ৩২তম রাজ্যপাল হিসেবে ১৯৮৮ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব সামলান তিনি। দ্বিতীয় দফায় ৩৪তম ওড়িশার রাজ্যপাল হিসেবে ১৯৯৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেন নুরুল হাসান। এই দফার মেয়াদ ছিল ১৯৯৩ সালের ৩১ মে পর্যন্ত। 

মধ্যযুগের ভারতবর্ষের ইতিহাস নুরুল হাসানের গভীর গবেষণার বিষয় ছিল। তাঁর লেখা গ্রন্থগুলি নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিহাস রচনার অনবদ্য উদাহরণ। এছাড়াও নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক বিষয়কেন্দ্রিক চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর বেশ কিছু বইতে। নুরুল হাসানের লেখা উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হল, ‘থটস অফ অ্যাগ্রেরিয়ান রিলেশনস ইন মুঘল ইন্ডিয়া’, ‘চ্যালেঞ্জেস ইন এডুকেশন কালচার অ্যান্ড স্যোশাল ওয়েলফেয়ার’, ‘সাম প্রবলেমস অফ হায়ার এডুকেশন ইন ইন্ডিয়া’। কলকাতার রাজভবনের সৈয়দ নুরুল হাসানের বইয়ের সংগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি। 

১৯৯৩ সালের ১২ জুলাই ৭১ বছর বয়সে কলকাতায় কিডনির সমস্যার কারণে সৈয়দ নুরুল হাসানের মৃত্যু হয়৷ 

আপনার মতামত জানান