ইতিহাস

সমরেশ বসু

সমরেশ বসু

বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে যে সব গুণী ব্যক্তিত্বদের লেখনীর দ্বারা তাঁদের মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য লেখক হলেন সমরেশ বসু (Samaresh Basu)। তিনি বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। সাহিত্যিক হিসেবে একশোটির বেশি উপন্যাস ও দুশোটিরও বেশি ছোট গল্প লিখেছেন তিনি। ছোটদের জন্য তাঁর সৃষ্টি খুদে গোয়েন্দা চরিত্র ‘গোয়েন্দা গোগোল’ বাংলা গোয়েন্দা গল্পের এক অনন্য সাধারণ সৃষ্টি। শুধু স্বনামে নয় লিখেছেন ‘কালকূট’ ও ‘ভ্রমর’ ছদ্মনামেও । কট্টর বামপন্থী সমরেশ বসুর রচনায় বার বার ফিরে এসেছে মেহনতী মানুষের সংগ্রামের কাহিনী। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ সম্মানিত হয়েছেন  আনন্দ পুরস্কার ও সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে।

১৯২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর ঢাকা বিক্রমপুরে রাজনগর গ্রামে সমরেশ বসুর জন্ম হয়। সমরেশ বসুর পিতৃদত্ত নাম সুরথনাথ বসু। তাঁর বাবার নাম মোহিনীমোহন বসু ও মায়ের নাম শৈবলিনী বসু। ছোটবেলা থেকে সমরেশের লেখাপড়ায়  আগ্রহ ছিল না। কিন্তু লেখাপড়া বাদে আর সকল কিছুতেই তাঁর ছিল অতি উৎসাহ। সাঁতার কাটা, বাঁশি বাজানো, থিয়েটার করা, ছবি আঁকা সব কিছুতেই তিনি ছিলেন পারদর্শী। তাঁর এই বাউন্ডুলে স্বভাবের জন্য  সমরেশের বাবা তাঁকে নৈহাটিতে বড়দার কাছে পাঠিয়ে দেন লেখাপড়া করার জন্য। কিন্তু এখানে এসেও বিশেষ কিছু লাভ হয় নি। কিছুদিন স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরে আবারও লেখাপড়া থেকে দুরে পালাতে চাইতেন তিনি। সমরেশের দাদা মন্মথ বসু তাঁর এই বাউন্ডুলে স্বভাবের জন্য তাঁকে বলতেন ‘প্রবলেম চাইল্ড’। ক্লাস টেন অবধি পড়াশোনা করার পরে  হঠাৎ করেই  বিয়ে করে বসেন তাঁর চেয়ে বয়সে বড় ডির্ভোসী গৌরী দেবীকে। নৈহাটি থেকে শ্যামনগর ও জগদ্দলের মাঝখানে আঁটপুর নামে একটি আধাবস্তি অঞ্চলে সংসার জীবন শুরু করার পরে এক ভিন্ন ধরনের জীবনযুদ্ধের শরিক হন তিনি। সংসার চালানোর জন্য কখনও তিনি ডিম বিক্রি করেছেন, কখনও চটকলে দিনমজুরের কাজ করেছেন। তাঁদের চার সন্তানের মধ্যে সাহিত্যিক নবকুমার বসু অন্যতম। পরবর্তীকালে সমরেশ বসু নিজের ছোট শ্যালিকা ধরিত্রী বসুকে বিবাহ করেছিলেন। 


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

১৯৪৩ সালে তিনি ইছাপুরের বন্দুক কারখানায় চাকরি পান তিনি। এখানে ১৯৪৯ সাল অবধি তিনি কর্মরত ছিলেন। ইছাপুরের বন্দুক কারখানায় চাকরি পান তিনি মূলত তাঁর আঁকার পারদর্শীতার কারণে। এখানে তাঁর সাথে পরিচয় হয় সত্যপ্রসন্ন দাসগুপ্তের এবং তাঁর হাত ধরেই সমরেশ কমিউনিস্ট ভাবধারায় প্রভাবিত হন এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৪ সালে তিনি ও তাঁর স্ত্রী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করে চেনা গন্ডীর বাইরে গিয়ে নানা মানুষের সাথে তাঁর পরিচিতির বিস্তার ঘটান যা পরবর্তীকালে তাঁকে লেখক হিসেবে সমৃদ্ধ করে তুলতে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল। সমরেশের রাজনৈতিক জীবন তাঁকে খুব কাছ থেকে সাধারণ মেহনতী মানুষের লড়াইকে চিনতে জানতে সাহায্য করেছিল যে কারণে তাঁর বেশীরভাগ গল্পে এই শ্রমিক মেহনতী মানুষদের সংগ্রামের কাহিনী দেখতে পাওয়া যায়। ১৯৪৯  সালে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হলে সমরেশের জেল হয়। পরবর্তীকালে আকস্মিক বোমা বিস্ফোরণে সত্যপ্রসন্ন দাসগুপ্তের মৃত্যু তাঁকে ভীষণ মর্মাহত করে। পরবর্তীতে পার্টির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল ঠিকই কিন্তু অন্তরঙ্গতা কমে এসেছিল। জেলে বসেই তাঁর চারপাশের মানুষজনকে নিয়ে তিনি লেখেন ‘উত্তরঙ্গ’ উপন্যাসটি।

১৯৫১ সালে জেল থেকে বেরিয়ে ইছাপুরের ইছাপুর বন্দুক কারখানার চাকরিটি হারান তিনি। চাকরি হারিয়ে এই সময়ে স্ত্রী গৌরী বসুর অণুপ্রেরণায় লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। নৈহাটির আধাবস্তির টিনের ঘরে বসে তিনি একের পর এক কালজয়ী সৃষ্টি করে গেছেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘নয়নপুরের মাটি’। তিনি এই উপন্যাসটি মাত্র একুশ বছর বয়সে লেখেন। এই উপন্যাসটি ‘পরিচয়’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। কিন্তু  সমরেশের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘উত্তরঙ্গ’। ১৯৪৬ সালে তাঁর প্রথম সামাজিক  ছোটগল্প ‘আদাব’ প্রকাশিত হয় ‘পরিচয়’ পত্রিকায়। দেশভাগের সময় হিন্দু মুসলমানের দাঙ্গা সাধারণ মেহনতী মানুষের মধ্যে কি প্রভাব ফেলেছিল, তাই এই গল্পের বিষয়বস্তু। এই গল্পে মানবিক দিকটি বেশী করে উম্মোচিত হয়েছে। এরপর থেকেই একের পর এক তাঁর উপন্যাসগুলি প্রকাশিত হতে শুরু করে। ১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয় ‘বিটি রোডের ধারে’, ১৯৫৩ সালে ‘শ্রীমতি ক্যাফে’, ১৯৫৭ সালে ‘গঙ্গা’, ১৯৫৭ সালে ‘ত্রিধারা’, ১৯৬০ সালে ‘বাঘিনী’ ১৯৬৬ সালে ‘তিন ভুবনের পাড়ে’, ১৯৭৭ সালে ‘মহাকালের রথের ঘোড়া’ ইত্যাদি। তাঁর উপন্যাসগুলিতে শ্রমিক ও মেহনতী মানুষের কথা, গ্রামীণ জীবনের কথা সামাজিক প্রেক্ষাপটে পরিবেশিত হয়েছে। সামাজিক গল্প ছাড়াও রাজনৈতিক গল্প এবং যৌনতা তাঁর গল্পে সুনিপুণভাবে স্হান পেয়েছে। ১৯৬৭ সালে  সমরেশের উপন্যাস ‘প্রজাপতি’কে অশ্লীলতার দায়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এই সময়ে বিখ্যাত সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু তাঁর পাশে দাঁড়ান। ১৯৮৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে উপন্যাসটি সমস্ত দায় থেকে মুক্ত হয়। বড়দের পাশাপাশি তিনি খুদে পাঠকদের  জন্যও রচনা করেছেন। ছোটদের জন্য  তাঁর অন্যতম সৃষ্টি ‘গোয়েন্দা গোগোল’ চরিত্রটিকে তিনি প্রথমবার প্রকাশ করেন ‘শুকতারা’ পত্রিকায় যা পরবর্তীকালে ধারাবাহিক হিসেবে শুকতারায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে এই খুদে গোয়েন্দার উনিশটি গল্প নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘গোগোল অমনিবাস’। এই গল্পগুলি মধ্যে অন্যতম ‘আয়না নিয়ে খেলতে খেলতে’, ‘অদৃশ্য মানুষের হাতছানি’, ‘গোগোল কোথায়?’, ‘গোগোলের কেরামতি’ ‘রত্নরহস্য ও গোগোল’, ‘ইঁদুরের খুটখাঁট’,  ‘মহিষমর্দিনী উদ্ধার’, ‘পশ্চিমের বারান্দা থেকে ‘, ‘টেলিফোনে আড়িপাতার বিপদ’ ইত্যাদি।  পৌরাণিক চরিত্র ‘শ্বাম্ব’  সমরেশের অমর সৃষ্টি কাহিনী। এই উপন্যাসটি তিনি কালকূট ছদ্মনামে লিখেছিলেন। ‘কালকূট’ কথাটির অর্থ বিষ। প্রতিনিয়ত সমস্যার সাথে লড়াই করতে গিয়ে মানুষের জীবন বিষতুল্য দুর্বিষহ  হয়ে ওঠে। এই দুর্বিষহ জীবন থেকে মুক্তি খুঁজে অমৃতের সন্ধানের জন্য তিনি কালকূট ছদ্মনামে লিখতে শুরু করেন।  মূলত পৌরাণিক চরিত্র হলেও বাস্তবে নিজের চোখের সামনে দেখা রোগজর্জরিত শিশুর যন্ত্র‌ণাকে এই উপন্যাসের মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন তিনি। এরই সঙ্গে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানসিকভাবে দুর্বল ও অবসাদগ্রস্ত  ব্যক্তিদের মনের জোর বাড়ানোর পথও তিনি দেখিয়েছেন এই উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে। এই উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায়। এর ঠিক দুবছর পরে ১৯৮০ সালে  উপন্যাসটি সাহিত্য আকাদেমি পুরষ্কারে সম্মানিত হয়। কালকূট ছদ্মনামে প্রকাশিত সমরেশ বসুর  উপন্যাস গুলি হল ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’ (১৯৫৪), ‘কোথায় পাব তারে’ (১৯৬৮), ‘ঘরের কাছে আরশিনগর’ (১৯৮০), ‘চল মন রূপনগরে’ (১৯৮২), ‘অমৃত বিষের পাত্র’ (১৯৮৬), ‘জ্যোর্তিময় শ্রীচৈতন্য’ (১৯৮৭) ইত্যাদি। ‘ভ্রমর’ ছদ্মনামে সমরেশ  তিনটি উপন্যাস রচনা করেছিলেন। এইগুলি হল ‘যুদ্ধের শেষ সেনাপতি’, ‘প্রভু কার হাতে তোমার রক্তে’, ‘প্রেম কাব্য রক্ত’। এই তিনটি উপন্যাসই শারদীয়া ‘প্রসাদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।   তিনি শেষ জীবনে রাম কিঙ্কর বেইজের জীবন নিয়ে  ‘দেখি নাই ফিরে’ উপন্যাস লেখার কাজ শুরু করেছিলেন। তাঁর মাত্র কয়েকটি কিস্তিই ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বাকীগুলি থেকে যায় অসমাপ্ত।

সমসাময়িক বিশিষ্ট চিত্র পরিচালক এবং রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বদের সাথে ছিল তাঁর সুসম্পর্ক। সমরেশ বসুর বিভিন্ন উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র হয়েছে। টেলিভিশনেও বিভিন্ন ধারাবাহিক হয়েছে তাঁর উপন্যাসগুলিকে কেন্দ্র করে। ১৯৬৩ সালে চিত্রপরিচালক তপন সিনহা নির্মাণ করেন সমরেশ বসুর উপন্যাস অবলম্বনে ‘নির্জন সৈকতে।’ ১৯৬৯ সালে  আশুতোষ বন্দ্যোপাধায় পরিচালিত ও সৌমিত্র চট্ট্যোপাধ্যায়, তনুজা এবং রবি ঘোষ অভিনীত’তিন ভুবনের পাড়ে’ চলচ্চিত্রটি একটি জনপ্রিয়  সিনেমা।  ১৯৭২ সালে বিশ্ববিখ্যাত পরিচালক মৃণাল সেন ‘কলকাতা ৭১’ এবং ১৯৮৬ সালে ‘জিনিয়াস’ উপন্যাসটিদুটিকে  পর্দায় নিয়ে আসেন। ১৯৭৪ সালে অরবিন্দ মুখ্যোপাধায় সমরেশ বসুর উপন্যাস ‘মৌচাক’ উপন্যাসটিকে ছবি করেছিলেন যা সেই সময়ে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বিখ্যাত পরিচালক গুলজার তাঁর দুটি গল্প নিয়ে ছবি করেছিলেন। ‘পথিক’ গল্পটির অনুকরণে করেন ‘কিতাব’ ১৯৭৬ সালে এবং ‘অকাল বসন্ত’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরী করেন ১৯৭৭ সালে ‘নমকিন।’ গুলজার সমরেশের প্রথম গল্প ‘আদাব’ নিয়েও একটি টেলিসিরিয়াল করেছিলেন যার নাম দিয়েছিলেন ‘কিরদার।’ ১৯৮৪ সালে গৌতম ঘোষ করেন ‘পাড়’ উপন্যাসটি নিয়ে ছবি। ২০০৬ সালে পরিচালক সুব্রত সেন ছবি করেছিলেন  ‘বিবর’ উপন্যাসটি নিয়ে। ২০১৩ সালে পরিচালক অরিন্দম দে  ‘গোগোল অমনিবাস’ থেকে ‘সোনালি পাহাড়ের  রহস্য’ গল্পটি নিয়ে ‘গোয়েন্দা গোগোল’ নামে সিনেমা করেছিলেন  যেখানে গোগোলের নাম ভূমিকায় দেখা যায় অভিনেতা অভিজিৎ ঘোষকে। গোগোল সিরিজের আরও একটি ছবি হয় ২০১৪ সালে ‘গোগোলের কীর্তি।’ এটি পরিচালনা করেন পম্পি ঘোষ মুর্খার্জী।

শাম্ব’ উপন্যাসটির জন্য ১৯৮০ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পান সমরেশ বসু। ১৯৮৩ সালে গুলজারের তৈরী সিনেমা ‘নমকিন’ এর জন্য সেরা গল্পকার হিসেবে ‘ফিল্ম ফেয়ার’ পুরস্কার পান তিনি।

১৯৮৮ সালের ১২ মার্চ ৬৭ বছর বয়সে সমরেশ বসু র মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন