ভারতবর্ষের ইতিহাসে নানাসময় অনেক বড় বড় যুদ্ধ, আন্দোলন, বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছে। তার মধ্যে কিছু অচিরেই মিটে গেছে বা প্রভাব সুদূরবিস্তারী হয়নি, কিছু আবার খুব গুরুত্বপূর্ণ ছাপ রেখে গেছে। ইংরেজদের পদানত ভারতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রথম যে বিদ্রোহ ব্রিটিশ রাজশক্তির ভিত নড়িয়ে দিয়েছিল সেটি হল ১৮৫৭ সালে সংঘটিত সিপাহী বিদ্রোহ (Sepoy Mutiny) যা ইতিহাসে মহাবিদ্রোহ (The Great Rebellion of 1857) নামেও পরিচিত। প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ব্রিটিশ বিরোধী এই বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাঈ, তাঁতিয়া টোপি, নানা সাহেবের মতো ঐতিহাসিক সব ব্যক্তিত্বের নাম। প্রধানত মধ্য ভারত থেকে ক্রমে ক্রমে এই বিদ্রোহের আগুন উত্তর ও পূর্ব ভারতেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ব্রিটিশদের অনৈতিক আচরণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে যেমন রুখে দাঁড়িয়েছিল ভারতীয়দের একাংশ, তেমনই ব্রিটিশদের পক্ষেও লড়েছিল কিছু ভারতীয়৷ তবুও এই বিদ্রোহেই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম এতবড় এক প্রতিবাদ সংঘটিত হয়েছিল, যা পরবর্তীকালের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেছিল।
১৮৫৭ সালে বড়লাট ক্যানিং-এর শাসনামলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনস্থ ভারতীয় সেনারা এই বিদ্রোহের সূচনা করেছিলেন বলে ঐতিহাসিকেরা একে সিপাহী বিদ্রোহ নামে অভিহিত করেছেন৷ তবে কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে, নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর মধ্যে কিন্তু এই বিদ্রোহ সীমাবদ্ধ ছিল না। ভারতের বিভিন্ন অংশে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিল। কেবলমাত্র সিপাহিরাই নয়, রাজা, প্রজা, সাধারণ মানুষেরাও অংশ নিয়েছিল এই বিদ্রোহতে, এমনকি কোথাও কোথাও সেনাদের জন্য অপেক্ষা না করেই জনসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল। ফলত, এটি কেবলমাত্র আর সেনাদের বিদ্রোহ থাকেনি, তাই একে সিপাহি বিদ্রোহ না বলে মহাবিদ্রোহ বলাই অধিক যুক্তিসঙ্গত। ঐতিহাসিক হিসেব মতো, ১৮৫৭ সালের ১০ মে থেকে ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর, মোট এক বছর ছয় মাস ধরে এই যুদ্ধ চলেছিল। বিদ্রোহীরা ব্রিটিশদের আতঙ্কের কারণ হলেও সফল হতে পারেননি। ব্রিটিশরাজ বিদ্রোহ দমনে সক্ষম হয়েছিল।
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের পর থেকে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের ভিত শক্ত হতে শুরু করেছিল। ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭—এই একশো বছরের মধ্যে ইংরেজ আধিপত্যের বিস্তার ঘটেছিল ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে। প্রথমে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ করে তারা, তারপর ক্রমে ক্রমে বোম্বে এবং মাদ্রাজের ঘাঁটির আশেপাশে কোম্পানি তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করে। পরে অ্যাংলো-মহীশূর ও অ্যাংলো-মারাঠা যুদ্ধে জয়লাভের ফলে ইংরেজদের হাতে ভারতের নিয়ন্ত্রণ আরও বেশি চলে যায়। এভাবে আরও ইতস্তত কিছু জোট, চুক্তি, সন্ধির পথ পেরিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তৃত হতে থাকে।
তবে ইংরেজদের সামরিক শক্তির কাছে পরাস্ত হলেও ভারতীয় রাজন্যবর্গ কোনদিনই কিন্তু ব্রিটিশ রাজশক্তিকে মেনে নিতে পারেনি। লর্ড ডালহৌসির নগ্ন সাম্রাজ্যবাদী নীতির ফলে অনেক ভারতীয় শাসক ও প্রধান পদচ্যুত হয়েছিল। ১৮৪০ সালে ডালহৌসি কর্তৃক উদ্ভাবিত স্বত্ববিলোপ নীতি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম সহায়ক হয়েছিল। এই নীতি অনুযায়ী কোন উত্তরাধিকারীহীন হিন্দু শাসকের মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তি কোম্পানির হস্তগত হয়ে যাবে। এই নীতি ও কুশাসনের অজুহাতে ডালহৌসি সাতারা, সম্বলপুর, নাগপুর, ঝাঁসি, তাঞ্জোর, কর্নাটক, অযোধ্যা ইত্যাদি রাজ্যগুলি গ্রাস করে ফেলে। লক্ষ্মীবাইয়ের দত্তকপুত্রকে সিংহাসনে বসতে দেওয়া হয় না, পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও-এর দত্তকপুত্র নানাসাহেবের বাৎসরিক ভাতা ও পেশোয়া পদ লুপ্ত করে দেওয়া হয়। দিল্লির বাদশাহকে তাঁর উপাধি লুপ্ত করে প্রাসাদ থেকে বহিষ্কার করা হয়৷ এমনকি অযোধ্যা ও নাগপুরের প্রাসাদ ডালহৌসির নেতৃত্বে নির্লজ্জভাবে লুন্ঠন করা হয়। ব্রিটিশদের এইসব কার্যকলাপ ভারতীয় রাজন্যবর্গ ও প্রজাবর্গের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করে। ব্রিটিশ অধিকৃত রাজপরিবারের কর্মচারীরা জীবিকাহীন হয়ে পড়লে তাঁদের মধ্যেও অসন্তোষ জমা হতে থাকে।
মহাবিদ্রোহের সূচনার নেপথ্যে রয়েছে বেশ কিছু অর্থনৈতিক কারণ। আসলে দীর্ঘদিনের নানা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এই বিদ্রোহে ঘৃতাহুতি দিয়েছিল৷ ১৭৫৭ সালের পর থেকে এদেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার দেশীয় বণিকদের দুর্দশার কারণ হয়েছিল। তাছাড়াও শুল্কহীন ইংল্যান্ড-জাত পণ্যসামগ্রীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ত দেশীয় পণ্য৷ ফলত, ভারতীয় কুটির শিল্পের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে।
১৭৫৭ থেকে মহাবিদ্রোহ পর্যন্ত এই একশো বছরের মধ্যে বহু সোনা-রূপা লুঠ করে ইংরেজরা নিজেদের দেশে নিয়ে গিয়েছে। ম্যাঞ্চেস্টারের কাঁচামাল সরবরাহের উৎস হয়ে ওঠে ভারত। অন্যদিকে দেশীয় শিল্পের পতনের ফলে বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়। আবার অন্যদিকে ইংরেজদের ভূমিসংস্কার ও ভূমি-রাজস্ব নীতির ফলে বহু জমিদার বংশ অবলুপ্ত হয়। ডালহৌসির ‘ইনাম-কমিশন’ বোম্বাই প্রেসিডেন্সির ২০,০০০ জমিদারি বাজেয়াপ্ত করে। শুধু তাই নয়, দরিদ্র কৃষকের ওপর নানারকম করের বোঝা চাপানো হয়।
লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কারণে প্রাচীন জমিদার ও সাধারণ গ্রামবাসীর জীবনে সর্বনাশ ঘনিয়ে আসে। মাদ্রাজে ‘রায়তওয়ারি ব্যবস্থা’র ফলে ভূমিরাজস্ব ত্রিশ-চল্লিশ গুণ বৃদ্ধি পায়৷ তালুকদার এবং কৃষকদের দুর্দশার আর অন্ত ছিল না৷ তার ওপর চৌকিদারি কর, পথকর, যানবাহনের কর-সহ ইত্যাদি আরও নানারকম কর প্রজাদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। কর্মচ্যুত সেনাদল, রাজকর্মচারীরা এবং জীবিকা বন্ধ হয়ে যাওয়া অভিজাত পরিবারগুলি বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল সহজেই।
ভারতবাসীদের প্রতি ইংরেজরা কখনই শ্রদ্ধাশীল ছিল না, বরং ভারতীয়দেরকে বর্বর বলেই তারা মনে করেছে চিরকাল। একের পর এক ভারতীয় প্রদেশ অধিকার করেই ক্ষান্ত হয়নি ব্রিটিশেরা, ভারতবাসীর ধর্ম, সভ্যতা, সংস্কৃতিকে পদে পদে হেয় করেছে তারা। এমনকি ইংরেজ শাসক ও পাদ্রীরা নানারকম প্রলোভন দেখিয়ে ভারতীয়দের খৃষ্টান করবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে শুরু করেছিলেন৷ সেই কারণেই ভারতীয়রা ইংরেজদের শ্রদ্ধার চোখে তো দেখেইনি, বরং সর্বদাই সন্দেহের চোখে দেখত। বিশেষত রক্ষণশীল হিন্দু-মুসলিম ভারতীয়রা তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির ওপর বিজাতীয় আঘাতের আশঙ্কা করত সবসময়।
এবারে বিদ্রোহের প্রাক্কালের সামরিক অবস্থার দিকটি নিয়ে আলোচনা করা যাক। ব্রিটিশদের যে সেনাবাহিনী ছিল, তার মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠই ছিল ভারতীয় সেনা। সেই সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনা তিনটি প্রেসিডেন্সিতে বিভক্ত ছিল, যথা, বাংলা, বোম্বে এবং মাদ্রাজ। বাংলার সেনাবাহিনীতে উচ্চবর্ণীয়দেরই নিয়োগ হত, অন্যদিকে মাদ্রাজ এবং বোম্বের সেনাবাহিনী ছিল স্থানীয় এবং বর্ণনিরপেক্ষ। যেহেতু বাংলার সেনারা একসময় পলাশী ও বক্সারের যুদ্ধে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল, তাই ব্রিটিশরা তাদের সন্দেহের চোখে দেখত। সেই কারণেই, মূলত আওধ ও বিহার থেকে ভূমিহার, রাজপুতদের নিয়োগ করা হত বাংলার সেনাতে। সেই দলে ছিল ব্রাহ্মণরাও। বেঙ্গল আর্মিতে এই উচ্চবর্ণের আধিপত্য এবং জাত বিষয়ে সচেতনতাকেই অনেকে বিদ্রোহের কারণ বলে মনে করেন।
১৮৫৬ সালের আইন পাশের পর থেকে দেশীয় সেপাইদের অনেক সময়েই দূরদেশে যুদ্ধ করতে যেতে হত এবং এর জন্যে তারা অতিরিক্ত ভাতা দাবি করেও পেত না, ফলে তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিতে থাকে।
এছাড়াও বেতন, পদমর্যাদা ইত্যাদি ব্যাপারে ইংরেজ ও ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে সরকারের একরকম বৈষম্যমূলক নীতি এদেশীয় সেনাদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল।
সেসময় সমুদ্রযাত্রা ভারতবাসীর জন্য বিশেষত বাঙালি হিন্দুদের কাছে জাতিচ্যুত হওয়ার সামিল ছিল। তা সত্বেও তাদের সমুদ্র অতিক্রম করে ব্রহ্মদেশে যুদ্ধের জন্য পাঠানো হলে তাদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে।
এতকিছুর পরেও আগুনে সরাসরি ঘৃতাহুতি দিয়েছিল যে ঘটনাটি, যার ফলে বিদ্রোহের আগুন মুহূর্তে জ্বলে উঠেছিল তা হল, এনফিল্ড রাইফেলের প্রবর্তন। হিন্দু-মুসলিম সেনাদের মধ্যে রটে গিয়েছিল যে, এই রাইফেলের টোটার আবরণ গরু ও শুকরের চর্বি দ্বারা নির্মিত, যা দাঁতে কেটে রাইফেলে ভরতে হত। গরু ও শুকরের মাংস যথাক্রমে হিন্দু ও মুসলমানদের কাছে নিষিদ্ধ, তাদের চর্বি দাঁতে কাটা মানে ধর্মনাশ হওয়া। এই আশঙ্কায় ভারতীয় সেনারা তা ব্যবহার করতে অস্বীকার করে। যদিও হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন এই টোটা বিদ্রোহীদের চোখের সামনে ধ্বংস করে ফেললেও সিপাহী বিদ্রোহ হতই, কারণ জনগণের প্রবল অসন্তোষই এই বিদ্রোহের মূল কারণ। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য কেবল সেনারাই নয়, মুজঃফরনগর, সাহারানপুর, বান্দা, করনাল, ফারাক্কা প্রভৃতি স্থানে কিন্তু জনসাধারণই প্রথম বিদ্রোহের পতাকা তুলে ধরেছিল।
১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ কলকাতার কাছে ব্যারাকপুর প্যারেড গ্রাউন্ডে ২৯ বছর বয়সী মঙ্গল পান্ডে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়ে ঘোষণা করেন যে তিনি তাঁর কমান্ডারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবেন। এই মঙ্গল পান্ডেকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল কিন্তু বিদ্রোহের আগুন তিনি জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। এপ্রিল মাসে আগ্রা, এলাহাবাদ এবং আম্বালায় অশান্তির সূত্রপাত হয়৷ মিরাট সেনানিবাসে ১০ মে প্রকৃতপক্ষে বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল। ব্রিটিশ জুনিয়র অফিসাররা বিদ্রোহের এই প্রথম প্রাদুর্ভাবকে দমন করতে গিয়ে বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হয়েছিল। ব্রিটিশ অফিসারদের এবং বেসামরিক লোকদের কোয়ার্টারে আক্রমণ করা হয়৷
মিরাট থেকে সিপাহী বিদ্রোহ ক্রমে দিল্লি, অযোধ্যা, কানপুর, লক্ষ্ণৌ, বেরিলি, ঝাঁসি, বিহার ইত্যাদি জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। সিপাহীরা দিল্লির গদিচ্যুত বাদশাহ দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে বিদ্রোহের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। যদিও বাহাদুর শাহ নামমাত্র নেতা ছিলেন। দিল্লির বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন গোলন্দাজ বাহিনীর সুবেদার বখত খান। অন্যদিকে কানপুরে বিদ্রোহের নেতা ছিলেন নানাসাহেব, তাঁর পক্ষে সেনাপতি তাতিয়া টোপি ও মন্ত্রী হাকিক আজিমুল্লা বিদ্রোহ পরিচালনা করেছিলেন৷ অযোধ্যায় বেগম হজরৎমহল, ঝাঁসিতে রাণী লক্ষ্মীবাই, বিহারে কুনওয়ার সিং ফৈজাবাদে মৌলবি আহম্মদুল্লা, বেরিলিতে খাঁ বাহাদুর খাঁ বিদ্রোহের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন।
মহাবিদ্রোহের সময়ে কানপুরে একটি ভয়ঙ্কর গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। বিদ্রোহীরা ব্রিটিশ অফিসার এবং বেসামরিক ব্যক্তিদের ওপর আক্রমণ করে। অনেক ব্রিটিশ পুরুষকে হত্যা করা হয় এবং ২১০ জন ব্রিটিশ নারী ও শিশুকে বন্দী করা হয়। নানাসাহেব তাদের মৃত্যুর নির্দেশ দিলে সিপাহীরা তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ মেনে বন্দীদের হত্যা করতে অস্বীকার করেছিল। তখন স্থানীয় বাজার থেকে কিছু কসাইকে নিয়োগ করা হয় বন্দীদের হত্যা করবার জন্য। নারী ও শিশুদের হত্যা করে তাদের লাশ একটি কূপে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ব্রিটিশদের সঙ্গে ক্রমাগত যুদ্ধে অবশ্য বিদ্রোহীরা পরাজিত হয়েছিল। বন্দী বিদ্রোহীদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয়, কোন কোন বিদ্রোহীকে কামানের সামনে উড়িয়ে দিয়ে দেহ খন্ডবিখন্ডও করে দেওয়া হয়েছিল। এরপর লক্ষ্ণৌ, অযোধ্যা, ঝাঁসিতেও ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়েছিলেন বিদ্রোহীরা। তবে ব্রিটিশদের রণনীতির সামনে বিদ্রোহীরা পরাস্ত হতে থাকে। ১৮৫৮ সালে ঝাঁসি অবরোধ করে স্যার হিউ রোজের সেনাবাহিনী। এরপর হিউ রোজ কাল্পির যুদ্ধে জয়লাভ করেন। ১৭ জুন কোটা-কে-সেরাইতে বিদ্রোহীদের পরাজিত করেন এবং এই যুদ্ধে রাণী লক্ষ্মীবাই নিহত হন। ১৯ জুন ব্রিটিশরা গোয়ালিয়র পুনরুদ্ধার করে। এইসময় বেশিরভাগ বিদ্রোহী আত্মসমর্পণ করেছিল। তাতিয়া টোপি অনেকদিন পর্যন্ত পালিয়ে থেকেও অবশেষে ধরা পড়লে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
এইভাবে বিদ্রোহের আঁচ কমে আসতে থাকে। আসলে সংগঠিত নেতৃত্বের অভাবে, ইংরেজদের বেশ কিছু ভারতীয়ের সমর্থন ও সহায়তা, হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের অভাব, নির্দিষ্ট লক্ষ্যের অভাব ইত্যাদি কারণে সিপাহী বিদ্রোহ সফলতা লাভ করতে পারেনি।
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ বা মহাবিদ্রোহের ফলে ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক মহলে এই ধারণা দৃঢ় হয় যে, একটি বাণিজ্যিক সংগঠনের হাতে ভারতের শাসনভার তুলে দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। ১৮৫৮ সালের ২ অগাস্ট ‘ভারত শাসন আইন’ প্রবর্তিত হয়। এই আইনের মাধ্যমে ভারতে কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার ব্রিটিশ সরকার বা মহারাণী ভিক্টোরিয়ার হস্তে অর্পণ করা হয়৷ রাণীর প্রতিনিধি হিসেবে গভর্নর জেনারেল শাসন পরিচালনা করতে থাকেন এবং ‘ভাইসরয়’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর মহারাণী ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী ভারতীয়দের ব্রিটিশদের মতোই অধিকার দেওয়া হবে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি, যেসব সিপাহী এই বিদ্রোহে অংশ নেয়নি তাদের অস্ত্র ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বাহাদুর শাহকে রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে বার্মায় নির্বাসন দেওয়া হয়। ১৮৬২ সালে সেখানে তিনি মারা গেলে মুঘল রাজবংশের অবসান ঘটে। ১৮৭৭ সালে রাণী ভিক্টোরিয়া ভারতের সম্রাজ্ঞীর মুকুট লাভ করেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- ‘স্বদেশ, সভ্যতা ও বিশ্ব’ (পুনর্মুদ্রণ), জীবন মুখোপাধ্যায়, শ্রীধর পাবলিশার্স, কলকাতা, জানুয়ারি, ২০২১
- ‘ভারতীয় মহাবিদ্রোহ ১৮৫৭’, প্রমোদ সেনগুপ্ত, বিদ্যোদয় লাইব্রেরী প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, আগস্ট, ১৯৫৭
- https://en.m.wikipedia.org/
- https://www.nam.ac.uk/
- https://www.thoughtco.com/
- https://www.drishtiias.com/
- https://www.royalhampshireregiment.org/


আপনার মতামত জানান