সববাংলায়

শিশুপাল

বিভাগঃ ,

মহাভারতের আদিপর্বের ৬৭তম অধ্যায়ে দেখা যায়, পৃথিবীতে অধর্ম ও অনাচারের নাশ এবং ধর্মের পুন্ঃসংস্থাপনের উদ্দেশ্যে দেবতা ও দানবগণ ভিন্ন ভিন্ন রাজা ও রাজপুত্র রূপে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন। দানবগণের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মহামুনি কশ্যপ ও দিতির পুত্র হিরণ্যকশিপু, যিনি চেদীরাজ দমঘোষের ঔরসে রাজমহিষী শ্রুতস্রবার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। মানবরূপে তাঁর নাম হয় ‘শিশুপাল’।

শিশুপালের জন্ম হয়েছিল তিনটি চোখ ও চারটি হাত নিয়ে ও জন্মের পর প্রথমে গাধার মতো এবং পরে মানুষের মতো চিৎকার করেছিল। এই অদ্ভুত শিশুকে দেখে তাঁর বাবা-মা খুব ভয় পেয়ে গেছিলেন এবং শিশুটিকে ত্যাগ করার কথা ভাবছিলেন। কিন্তু সেই সময়েই, শোনা গেল এক আশ্চর্য আকাশবাণী, “হে রাজন, এই শিশু সুখী এবং মহাবল। আপনি এই শিশুর মৃত্যুর কারণ নন এবং এই শিশুর মৃত্যুর সময় এখনো আসেনি। তবে যাঁর হাতে ভবিষ্যতে এই শিশুর মৃত্যু হবে তিনি জন্ম নিয়েছেন। অতএব, আপনার পুত্রকে ত্যাগ করবেন না। তাকে লালন-পালন করুন।“ এই বাণী শুনে রাজমহিষী নতজানু হয়ে জানতে চাইলেন, “হে দেব, কোন ব্যক্তি আমার পুত্রের মৃত্যুর কারণ হবে তা দয়া করে আমাকে জানান।” তখন সেই দৈববাণী বললেন, “আপনার পুত্র যে ব্যক্তির কোলে বসে তার অতিরিক্ত দুটি হস্ত ও তৃতীয় চক্ষু হারাবে, জানবেন সেই ব্যক্তির হাতেই মৃত্যু হবে এই শিশুর।”

এরপর লোকমুখে এই আশ্চর্য শিশুর কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। শিশু শিশুপালকে দেখতে দলে দলে রাজা ও রাজপুত্ররা চেদী নগরে আসতে লাগলেন। রাজা দমঘোষ একে একে সকলের কোলে শিশুপুত্রকে তুলে দিতে লাগলেন। কিন্তু শিশুপালের চেহারায় কোনো পরিবর্তন এল না। একদিন দ্বারকা থেকে শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম এলেন শিশুপালকে দেখতে। চেদীরাজের মহিষী ছিলেন সম্পর্কে কৃষ্ণ ও বলরামের পিসিমা। সেই সূত্রে শিশুপাল হলেন কৃষ্ণের ভাই। চেদীরাজ সসম্মানে কৃষ্ণ ও বলরামকে অভ্যর্থনা জানিয়ে কৃষ্ণের কোলে শিশুপালকে তুলে দিলেন। দিতেই শিশুপালের অতিরিক্ত একটি চোখ ও দুটি হাত লুপ্ত হল। এই দেখে রাজা ও রাণী বুঝতে পারলেন ভবিষ্যতে কৃষ্ণের হাতেই শিশুপালের মৃত্যু হবে। তখন রাজমহিষী কৃষ্ণকে সভয়ে অনুরোধ জানালেন, “হে বাসুদেব, আমার পুত্র সম্পর্কে তোমার ভ্রাতা। আমি তোমাকে মিনতি জানাচ্ছি, ভবিষ্যতে তোমার ভ্রাতার সকল অপরাধ তুমি ক্ষমা করো। তাকে কোনো কঠিন শাস্তি তুমি দিও না!” কৃষ্ণ উত্তর দিলেন, “দেবী, নিয়তির বিধান খণ্ডন করা আমার সাধ্য নয়। তবুও আপনার অনুরোধের মান রাখতে আমি আপনাকে কথা দিলাম, ভাই শিশুপালের একশোটি অপরাধ আমি অবশ্যই ক্ষমা করবো।” এই বলে কৃষ্ণ ও বলরাম দ্বারকায় ফিরে গেলেন।

দিনে দিনে শিশুপাল বড় হতে লাগলেন। দানবের অংশে জন্ম হওয়ার কারণে ছোট থেকেই তিনি অত্যন্ত দুরাত্মা ও পাপাচারী ছিলেন। কৃষ্ণের হাতে তাঁর মৃত্যু হবে জানতে পেরে তিনি সর্বতোভাবে কৃষ্ণ ও দ্বারকার ক্ষতিসাধন করার চেষ্টা করতে লাগলেন। দ্বারকাবাসীদের প্রাগজ্যোতিষপুরে যাওয়ার খবর পেয়ে তিনি দ্বারকা নগরীতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। কৃষ্ণের বাবা বসুদেব অশ্বমেধ যজ্ঞ করার উদ্দ্যেশে একটি অশ্বকে দেশভ্রমণে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু শিশুপাল সেই অশ্বটিকে অপহরণ করেন। তিনি অনেক নারীদের অপহরণ করে তাঁদের অসম্মানও করেছিলেন। কিন্তু পিসিমাকে দেওয়া কথা রাখার জন্য শ্রীকৃষ্ণ শিশুপালের কোনো ক্ষতি করেননি।

বিদর্ভ রাজ্যের রাজকুমার রুক্মী ছিলেন শিশুপালের একান্ত অনুগত। তাই তিনি নিজের বোন বিদর্ভনন্দিনী রুক্মিণীর সঙ্গে শিশুপালের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সাক্ষাৎ লক্ষ্মীস্বরূপা দেবী রুক্মিণী বাল্যকাল থেকেই কৃষ্ণকে নিজের স্বামীরূপে পেতে চাইতেন। শিশুপালের সঙ্গে বিয়ের কথা শুনে তিনি গোপনে শ্রীকৃষ্ণকে একটি চিঠি পাঠিয়ে অনুরোধ করেন রাজপ্রাসাদ থেকে তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে যেতে। সেইমত, বিবাহের অল্পদিন আগে কৃষ্ণ কৌশলে রাজপ্রাসাদ থেকে রাজকুমারী রুক্মিণীকে অপহরণ করলেন। এই ঘটনায় অত্যন্ত অপমানিত হলেন রাজকুমার রুক্মী ও চেদীরাজ শিশুপাল। ফলে শিশুপালের সঙ্গে কৃষ্ণের শত্রুতা বেড়েই চলল।

ময়দানব খান্ডবপ্রস্থে মহারাজ যুধিষ্ঠিরের সভাগৃহ নির্মাণ করার পর যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞ করার সিদ্ধান্ত নেন। যজ্ঞ উপলক্ষ্যে সকল রাজার সঙ্গে শিশুপালও আমন্ত্রিত হন। যজ্ঞের পূজা-অর্চনা শেষ হওয়ার পর ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বললেন যে, সকল রাজাদের এবং যাঁরা যাঁরা সম্মান পাওয়ার যোগ্য তাঁদের সকলকে এক-একটি করে অর্ঘ্য (সম্মান দেখাবার জন্য উপহার) এনে দিতে। তারপর যিনি সকলের চেয়ে সম্মানে বড় তাঁকে আর একটি আলাদা অর্ঘ্য দেওয়া হবে। যুধিষ্ঠির জানতে চাইলেন, “হে পিতামহ, সকলের থেকে বেশি সম্মান এখানে কার প্রাপ্য?” ভীষ্ম উত্তর দিলেন, “যুধিষ্ঠির, এই সম্মান একমাত্র শ্রীকৃষ্ণের প্রাপ্য। কারণ শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান।” এই কথা শুনে সহদেব কৃষ্ণকে অর্ঘ্য এনে দিলেন।

কিন্তু সর্বসমক্ষে কৃষ্ণের এই সম্মান প্রাপ্তি শিশুপালের সহ্য হল না। তিনি তীব্র কণ্ঠে প্রতিবাদ জানালেন এবং বললেন যে, কৃষ্ণ যজ্ঞের পুরোহিত নন, আচার্য নন এমনকী তিনি রাজাও নন। তাহলে কী কারণে কৃষ্ণকে অর্ঘ্য দেওয়া হল। যুধিষ্ঠির ধর্মপালন করার জন্য যজ্ঞ করছেন, তাই সমস্ত রাজারা তাঁকে কর দিয়েছেন। কিন্তু যুধিষ্ঠির সকল রাজাকে বঞ্চিত করে কৃষ্ণকে সম্মান দেখিয়ে তাঁদের অপমান করেছেন। এই কথা বলে শিশুপাল তাঁর অনুগামী সকল রাজাকে নিয়ে সভা ত্যাগ করতে উদ্যত হলেন। যুধিষ্ঠির হাত জোড় করে তাঁকে শান্ত করতে চেষ্টা করলেও তিনি শুনলেন না। তখন ভীষ্ম কৃষ্ণকে পূজা করার স্বপক্ষে বললেন যে, কৃষ্ণকে পূজা করবার দুটি প্রধান কারণ হল, বেদ ও বেদাঙ্গের জ্ঞান এবং অপরিমিত বল। দান, কার্যদক্ষতা, শাস্ত্রজ্ঞান, বীরত্ব, লজ্জা, কীর্তি, বুদ্ধি, বিনয়, লক্ষ্মী, ধৈর্য, পুষ্টি ও তুষ্টি — এ সকল গুণই কৃষ্ণের আছে। কৃষ্ণই প্রকৃতি, কৃষ্ণই সনাতন কর্তা এবং কৃষ্ণই সর্বভূতে বিরাজিত। বালক শিশুপাল একথা জানে না বলেই সে কৃষ্ণকে অপমান করার সাহস দেখাচ্ছে।

এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। কিন্তু যখন শিশুপাল কৃষ্ণের বিরুদ্ধে শিশুপালের বাগদত্তা রুক্মিণীকে জোর করে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ তুললেন এবং সেই সূত্রে রুক্মিণীর চরিত্র নিয়ে অশ্লীল কথা বলতে লাগলেন, তখন আর থাকতে পারলেন না বাসুদেব। সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, “হে চেদীরাজ, তোমার মাতার অনুরোধে আমি তোমার একশোটি অপরাধ ক্ষমা করেছি। কিন্তু তুমি আজ সেই সীমারেখা পেরিয়ে গেলে। এতগুলি রাজার সম্মুখে এমন অপমান আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারবো না। সুতরাং আজ তোমাকে শাস্তি পেতেই হবে।” এই কথা বলে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে শিশুপালের মাথা কেটে ফেললেন। সভার সকলে অবাক হয়ে দেখলেন, শিশুপালের মুণ্ডহীন ধড় থেকে সূর্যের মতো উজ্জ্বল এক জ্যোতিঃপুঞ্জ বেরিয়ে এসে কৃষ্ণের দেহে মিলিয়ে গেল। রাজারা কেউ কোনো কথা বলতে পারলেন না। তখন কৃষ্ণ ভীমকে শিশুপালের দেহ সৎকার করার আদেশ দিলেন এবং শিশুপালের পুত্রকে চেদীরাজপদে অভিষিক্ত করলেন।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. ‘মহাভারত’, শ্রী কালীপ্রসন্ন সিংহ, আদিপর্ব, অধ্যায়- ৬৭, পৃষ্ঠা-৯৪, সভাপর্ব, অধ্যায় ৩৫-৪৪, পৃষ্ঠা ৩৪৭-৩৫৪
  2. ‘উপেন্দ্রকিশোর রচনাসমগ্র’,উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, ‘ছেলেদের মহাভারত’, বসাক বুক স্টোর প্রাইভেট লিমিটেড, তৃতীয় সংস্করণ, তৃতীয় মুদ্রণ, পৃষ্ঠা ৬৫–৬৬
  3. ‘মহাভারতের একশোটি দুর্লভ মুহূর্ত’, ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য, নিউ এজ পাবলিকেশন্স, দ্বিতীয় মুদ্রণ, শিশুপাল বধ, পৃষ্ঠা ১৬২–১৭২

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading