বিজ্ঞান

বিজ্ঞান গবেষণায় সূর্যগ্রহণের গুরুত্ব

রাহু বা কেতু গ্রাস করে নিলে গ্রহণ হয় না সেই সত্যিটা বিজ্ঞান আমাদের অনেক দিন আগেই জানিয়েছে। পাশাপাশি এও জানিয়েছে যে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্য এক সরলরেখায় এলেই এই গ্রহণ দেখা যায়। গ্রহণ সম্পর্কিত এই বিজ্ঞানগুলো আমাদের সকলেরই জানা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এতেই থেমে থাকেননি এবং বছরের পর পর গ্রহণের সময় বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন।এখানে বিজ্ঞান গবেষণায় সূর্যগ্রহণের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করব, এবং অতীতে এই বিশেষ প্রাকৃতিক মুহূর্তের পর্যবেক্ষণের ফলে কি কি আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে তাও জানাবো।

সাধারণ মানুষ যেমন প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার জন্য গ্রহণের অপেক্ষা করেন, বিজ্ঞানীরা তেমন সূর্যকে ভাল করে পর্যবেক্ষণ করার জন্য সূর্যগ্রহণের অপেক্ষা করেন কারণ সূর্যের তেজের কারণে তাকে অন্যান্য সময়ে ঠিক করে পর্যবেক্ষণ করাই যায় না। সাধারণত ১৮ মাস পর পর পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ হয় কিন্তু তা একই জায়গায় দৃশ্যমান হয় না। তাই পূর্ণগ্রাস গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করার জন্য বিজ্ঞানীরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ান। পূর্ণগ্রাস গ্রহণের সময় খুব কম সময়ের জন্য সূর্যের করোনা (corona) সৌরমুকুট দেখা যায় যা আসলে সূর্যের মূল অংশের থেকে কয়েক লক্ষ গুণ কম উজ্জ্বল এবং শুধুমাত্র পূর্ণগ্রাস গ্রহণের সময় যখন চাঁদ সূর্যের উজ্জ্বল অংশ ঢেকে ফেলে তখনই একমাত্র দেখা যায়। করোনা পর্যবেক্ষণ করার জন্য ১৯৩০ এর দশকে বার্নার্ড লয়েট ( Bernard Lyot ) করোনাগ্রাফ আবিষ্কার করলেও তা সূর্যগ্রহণের মত পরিষ্কার দেখায় না। পরবর্তীকালে ১৯৭০ এর দশকে যখন উপগ্রহ মারফত মহাকাশ পর্যবেক্ষণ শুরু হল তখন করোনা পর্যবেক্ষণ সহজতর হয়। তবু এখনও বিজ্ঞানীরা অন্যান্য নানান বিষয় যেমন সানস্পট দেখে সোলার মিনিমাম, সোলার ম্যাক্সিমামের সঠিক নিরূপন, করোনাল মাস ইজেকশন (coronal mass ejection) নির্ণয় ইত্যা্দি বিষয়ে গবেষণা করার জন্য পূর্ণগ্রাস গ্রহণের জন্য অপেক্ষা করেন। এছাড়াও সূর্যগ্রহণের সময় দিনের বেলায় দেখতে পাওয়া নক্ষত্রদের নিয়েও পরীক্ষা করা হয়, এই সময়ে আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন হয় এবং জীবমন্ডলে তার প্রভাব নিয়েও অনেকে পরীক্ষা করেন।

বিজ্ঞানীদের এই পর্যবেক্ষণ প্রাচীনকাল থেকেই শুরু হয়েছে, এবং প্রাচীনকালে অনেক সভ্যতাতেই সূর্যগ্রহণ কবে হবে সেসব হিসেব নিকেশের প্রমাণও পাওয়া গেছে। তবে এখানে আধুনিক বিজ্ঞানের বেশ কিছু যুগান্তকারী আবিষ্কার তুলে ধরা হলঃ

হিলিয়াম আবিষ্কার : ১৮৬৮ সালে ভারতে হওয়া পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় ফরাসি জ্যোতির্বিদ পিয়েরি জ্যানসেন (Pierre Janssen) করোনা পর্যবেক্ষণ এর সময় সৌর বর্ণালীতে একটি উজ্জ্বল হলুদ বর্ণের আলো দেখেন যার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য সোডিয়ামের থেকে একটু কম। তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণ ব্রিটিশ জ্যোতির্বিদ যোসেফ নরম্যান লকিয়ারকে ( Joseph Norman Lockyer) জানান। লকিয়ার সূর্যগ্রহণটি দেখতে পাননি। পরবর্তীকালে তিনি শক্তিশালী বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে এই বর্ণালীটিকে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। এই নতুন বর্ণালীটির সাথে পরিচিত কোন পদার্থের মিল পাননি তাই এর নাম তিনি রাখেন হিলিয়াম, গ্রীক ভাষায় যার অর্থ সূর্য। পৃথিবীতে ১৮৯৫ সালের আগে পর্যন্ত হিলিয়াম পাওয়া যায়নি।

সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ সূত্রের প্রমাণ : আইনস্টাইনের বিখ্যাত সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ সূত্রটি ১৯১৫ সালে প্রকাশিত হয় যা পদার্থবিদ্যার নিউটনীয় ধ্যান ধারণাকে আমূল বদলে দেয়। কিন্তু এই সূত্রটি পুরোপুরি তাত্ত্বিক ছিল। ১৯১৬ সাল থেকেই বিজ্ঞানীরা এই সূত্রের থেকে প্রাপ্ত ভবিষ্যৎবাণীগুলি ঠিক বা ভুল প্রমাণ করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন কিন্তু কোন সাফল্য পাচ্ছিলেন না। আইনস্টাইনের সূত্র অনুযায়ী পূর্ণগ্রাস গ্রহণের সময় সূর্যের পাশ দিয়ে যাওয়া দূরের কোন নক্ষত্রের আলোকে যদি অন্য সময় যখন সূর্য থাকবে না তার সাথে তুলনা করা হয় তাহলে সেই আলোর গতিপথ বিচ্যুত হবে এবং কতটা হবে তাও বলেছিলেন – ১.৭৫ আর্ক সেকেন্ড (arc seconds)। ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন (Arthur Eddington) এর পরিচালনায় ১৯১৯ সালের ২৯ মে সুদূর আফ্রিকায় সংঘটিত সূর্যগ্রহণের ফটো তোলার ব্যবস্থা করা হয়। বলাবাহুল্য, এই অভিযান নিয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা দ্বিধান্বিত ছিলেন – কারণ নিউটন ইংল্যান্ডের মানুষ ছিলেন আর আইনস্টাইন জার্মানির। আইনস্টাইন ঠিক প্রমাণ হলে নিউটনীয় পদার্থবিদ্যার প্রভাব কমতে বাধ্য আর সেসময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। যাই হোক, আফ্রিকার দুটি স্থান থেকে সূর্যগ্রহণের সময় কয়েকটি নক্ষত্রের ছবি তোলা হয় এবং সেই পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত ফল প্রমান করে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্ব ঠিক। এই পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানী হিসেবে আইনস্টাইনকে ব্রিটিশ তথা ইউরোপীয় বিজ্ঞানসমাজে স্থায়ী আসন দান করে।

এ ছাড়াও করোনার উষ্ণতা ও অন্যান্য নানান বিষয়ে গবেষণায় সূর্য সম্পর্কিত বহু তথ্য জানা গেছে এই সূর্যগ্রহণের ফলে। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে সূর্য সম্পর্কিত অনেক তথ্যের জন্য হয়ত সূর্যগ্রহণের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না কিন্তু এর পরেও কৃত্রিমভাবে এই ঘটনা যেহেতু ঘটনা ঘটানো সম্ভব নয় তাই বিজ্ঞান গবেষণায় সূর্যগ্রহণের গুরুত্ব আজও অপরিসীম এবং এই ঘটনা চাক্ষুষ করতে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন দেশে দেশে ঘুরে বেড়ান।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।