ইতিহাস

স্ট্যান স্বামী

ভারতের একজন বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী এবং জনজাতি অধিকার রক্ষা লড়াইয়ের অন্যতম নেতা হলেন ফাদার স্ট্যান স্বামী (Stan Swamy)। মহারাষ্ট্রের ভীমা কোরেগাঁওতে হিন্দুত্ববাদীদের দ্বারা এক দলিত খুনের এক মিথ্যে মামলায় প্রবীণ অভিযুক্ত হিসেবে প্রথম পুলিশের খাতায় নাম ওঠে তাঁর। ঝাড়খণ্ডের আদিবাসীদের নিয়ে মানবাধিকারের কাজ করে চলা স্ট্যান স্বামী ‘বাগাইচা’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতীয় রোমান-ক্যাথলিক জেসুইট ধর্মপ্রচারক, মানবাধিকার কর্মী স্ট্যান স্বামী আজীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন।

১৯৩৭ সালের ২৬ এপ্রিল তামিলনাড়ুর তিরুচিরাপল্লীতে স্ট্যান স্বামীর জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম স্ট্যানিস্লাস লর্ডুস্বামী।

তিরুচিরাপল্লীর সেন্ট. জোসেফ স্কুলে স্ট্যান স্বামীর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়। ১৯৭০-এর দশকে তিনি ফিলিপাইন্সের ম্যানিলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধর্মতত্ত্ব এবং সমাজতত্ত্বে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হন। এরপরে ব্রাসেলসে পড়াশোনা করার সময় তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় আরেক ধর্মযাজক ব্রাজিলের হেল্ডার চামারার (Hélder Câmara) যিনি ব্রাজিলের গরীব, আদিবাসীদের উন্নতিকল্পে নানা কল্যাণকর কাজে যুক্ত ছিলেন। চামারা-র সঙ্গে বন্ধুত্বই তাঁকে মানবাধিকারের কল্যাণকর কর্মযজ্ঞে নিয়োজিত করেছে।

স্ট্যান স্বামীর কর্মজীবনের পুরোটা জুড়েই রয়েছে ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানবাধিকার আন্দোলন। কিন্তু এ ছাড়াও তিনি ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ব্যাঙ্গালোরের জেসুইট-পরিচালিত ইণ্ডিয়ান সোশ্যাল ইন্সটিটিউটের পরিচালক পদে আসীন ছিলেন। বলা ভালো পেশাগত কর্মজীবন হিসেবে এটাই তাঁর দৃষ্টান্তমূলক কাজ ছিল। এর মধ্যেই তিনি লক্ষ করেন যে, আদিবাসী সম্প্রদায় থেকে সদস্য নিয়ে ‘উপজাতি উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠনের যে ইঙ্গিত ভারতীয় সংবিধানের পঞ্চম সময়সূচিতে রয়েছে তা কোথাও বলবৎ হয়নি। এর বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলেন তিনি। এই উপজাতি উপদেষ্টা পরিষদ সর্বদাই যে কোনো রাজ্যের আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভালো-মন্দ এবং উন্নয়নের বিষয়ে কাজ করবে, এমনটাই সংবিধানে বলা থাকলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকে তাদের ভালো-মন্দের এবং সমস্যার খবর নিয়ে তা সমাধানের জন্য চেষ্টা করতেন তিনি।

ঝাড়খণ্ডের সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলের পরামর্শে, শিক্ষানবিশ জেসুইট হিসেবে ১৯৫৬ সালে তিনি প্রথম ঝাড়খণ্ডে কাজ শুরু করেন আদিবাসীদের নিয়ে। ১৯৯১ সালে স্ট্যান স্বামী জামসেদপুরে চলে আসেন এবং ঐ সময় থেকেই ‘ঝাড়খণ্ড অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস’ সংস্থায় কাজ করা শুরু করেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, সদ্য গড়ে ওঠা রাজধানী হিসেবে রাঁচিতে ভারতের খনিজ সম্পদের প্রায় ৪০ শতাংশ মজুত রয়েছে, কিন্তু তার পরেও সেখানে ৩৯.১ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে অবস্থান করেন এবং ১৯.৬ শতাংশ শিশুর অপুষ্টিজনিত সমস্যা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তাঁর মনে আশঙ্কা দেখা দেয় দ্রুত শিল্পায়নের ফলে এখানকার সমস্ত খনিজ সম্পদ অন্যের হাতে চলে যাবে, বঞ্চিত হবে ভূমির মালিক স্থানীয় আদিবাসীরা। তিনি তখন প্রচার শুরু করেন, জমি থাকলে জমির খনিজ সম্পদের অধিকারও জমির মালিকেরই হওয়া উচিত। ১৯৯৬ সালে ভারতের ইউরেনিয়াম কর্পোরেশন ইণ্ডিয়া লিমিটেডের বিরুদ্ধে ‘ঝাড়খণ্ড অর্গানাইজেশন এগেনস্ট ইউরেনিয়াম রেডিয়েশন’ (JOAR) নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলেন স্ট্যান স্বামী। এই সংস্থার পক্ষ থেকে চাইবাসা এলাকায় একটি বাঁধ নির্মাণ কার্য বন্ধ করতে সমর্থ হন তিনি যার ফলে বহু আদিবাসী ঘরছাড়া হওয়া থেকে মুক্তি পায়। এর পর বোকারো, সাঁওতাল পরগণা, কোডার্মা জেলায় তিনি গৃহহীন আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করেন। ২০১০ সালে প্রকাশিত তাঁর লেখা বই ‘জেল মে বন্ধ কয়েদিও কা সচ্‌’-এ তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে নকশাল আন্দোলনের নাম করে বহু আদিবাসী যুবককে জেলবন্দি করা হয়েছে যাদের ৯৪ শতাংশের পারিবারিক আয় পাঁচ হাজার টাকারও কম হওয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থনে সামান্য উকিল নিয়োগের ক্ষমতাই তাদের নেই। পরে ২০১৪ সালের একটি সমীক্ষায় স্ট্যানের বিশ্লেষণ প্রমাণিত হয় এবং জানা যায় যে, আদিবাসী যুবকদের উপর চলা মামলাগুলির অধিকাংশই মিথ্যা ও বানানো, কিন্তু শুধু নিরক্ষর বলে তাঁরা দিনের পর দিন জেলবন্দী হয়ে থেকেছে। ১৯৯৬ সালের পঞ্চায়েত আইন (Pachayat Extension to Scheduled Areas Act) ভারতের মোট নয়টি রাজ্যে চালুই করা হয়নি। এই আইন অনুযায়ী সমস্ত আদিবাসী সম্প্রদায় গ্রাম সভার মাধ্যমে নিজস্ব সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে পারবে। আদিবাসীদের মধ্যে জনসচেতনতা জাগিয়ে তুলে এই অধিকার আদায় লড়াইয়ে সামিল করেন স্ট্যান স্বামী। ধীরে ধীরে ২০১৭ সালে এটি ‘পাথালগাড়ি আন্দোলন’-এর চেহারা নেয়।

দুটি বিষয় লক্ষ করেছিলেন স্ট্যান স্বামী – ১) ১৯৯৭ সালে পাস হওয়া ‘সম্‌থা বিচার’ (samatha judgement 1997)-এ বলা হয়েছিল আদিবাসীদের নিজস্ব এলাকায় খননকার্যের ফলে খনিজসম্পদের হস্তান্তর নিয়ন্ত্রণ করবে সরকার এবং তা তাদের উন্নতিকল্পেই কাজে লাগানো হবে। কিন্তু এই আইন কখনোই মানা হয়নি, এমনকি জনসমক্ষেও আনা হয়নি।

২) ২০০৬ সালের ‘ফরেস্ট রাইট অ্যাক্ট’ও বলবৎ হয়নি এবং ২০১১ সাল পর্যন্ত এর বিরুদ্ধে প্রায় তিরিশ হাজার আবেদনপত্র সরকারের দপ্তরে জমা পড়লেও কোনোরূপ সরকারি উদ্যোগ লক্ষ করা যায়নি। এই আইন অনুযায়ী স্থানীয় বাসিন্দাদের অনুমতি ছাড়া এলাকার খনিজ সম্পদ, প্রাণীজ সম্পদ বা অন্যান্য যে কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ বহিরাগত কেউ সংগ্রহ করতে পারবে না। কিন্তু স্ট্যান দেখেছেন দিনের পর দিন বাইরে থেকে পুঁজিপতি, শিল্প-উদ্যোগপতিরা এসে আদিবাসীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে খনিজ সম্পদ উত্তোলন করে চলেছে।

স্ট্যান স্বামী ২০১৩ সালের ‘জমি অধিগ্রহণ আইন’কে আদিবাসীদের মৃত্যু-ঘন্টা বলে ঘোষণা করেন। তবে তাঁর জীবনের সবথেকে বিতর্কিত ঘটনা হল ‘ভীমা-কোরেগাঁও হিংসা মামলা’-য় কারাবাস। ২০১৮ সালে এই ভীমা-কোরেগাঁও অঞ্চলে একটি দলিত সমাবেশের উপর হিন্দুত্ববাদী ব্যক্তিদের আক্রমণের ফলে একজন দলিত আদিবাসীর মৃত্যু হয়েছিল যার জন্য দায়ী করা হয় স্ট্যান স্বামীকে এবং এই ঘটনার ছয় মাস পর থেকেই ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে শুরু করে সরকার। প্রকৃত অর্থে এ মামলা ছিল সর্বৈব সাজানো। ২০২০ সালের ৮ অক্টোবর এন.আই.এ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। উগ্র বামপন্থার অভিযোগে তালোজা কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে বন্দি স্ট্যান স্বামীর কাঁধে চাপানো হয়েছিল ইউপিএ ধারা। মনে করা হয়েছিল, স্ট্যান স্বামীর সঙ্গে মাওবাদী আন্দোলনের আঁতাত রয়েছে। সেইজন্য দীর্ঘ আটমাস প্রবীণ ৮৪ বছর বয়স্ক স্ট্যান স্বামীকে আটক করে রাখা হয়েছিল।

ভীমা-কোরেগাঁও মামলার প্রবীণতম অভিযুক্ত স্ট্যানের বহুবিধ শারীরিক সমস্যা থাকলেও আদালত তাঁর কোনো চিকিৎসার ভার নেয়নি। জেলে থাকাকালীন তাঁর শরীরের অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে ক্রমশ। তাঁর পার্কিনসন রোগ ক্রমশ বাড়ছিল। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে জামিনের আবেদন করলেও তাঁর আবেদন খারিজ হয়ে যায়। কিন্তু পরে ২০২১ সালের ২৮ মে মহারাষ্ট্র সরকার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তির অনুমতি দিলে হোলি ফ্যামিলি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন স্ট্যান স্বামী।

ঝাড়খণ্ডের আদিবাসীদের নিয়ে মানবাধিকার রক্ষার কাজ করার জন্য তিনি ‘বাগাইচা’ (Bagaicha) নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে মানবাধিকারের জন্য লড়াই করার সুবাদে তিনি মুকুন্দন. সি. মেনন পুরস্কারে ভূষিত হন।

২০২১ এর মে মাসে তিনি করোনা আক্রান্ত হন। জুলাই মাসের শুরুতে তাঁর শারীরিক অবস্থার ক্রমশ অবনতি হলে ৪ জুলাই তাঁকে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে দেওয়া হয়। অবশেষে ৫ জুলাই আদিবাসী অধিকার রক্ষা আন্দোলনের অন্যতম মুখ স্ট্যান স্বামীর বেলা দেড়টা নাগাদ মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।