সববাংলায়

ঠাকুরগাঁও জেলা

বাংলাদেশ ৬৪টি জেলাতে বিভক্ত। বেশিরভাগ জেলাই স্বাধীনতার আগে থেকে ছিল, কিছু জেলা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গঠিত, আবার কিছু জেলা একটি মূল জেলাকে দুই ভাগে ভাগ করে তৈরি হয়েছে মূলত প্রশাসনিক সুবিধের কারণে। প্রতিটি জেলাই একে অন্যের থেকে যেমন ভূমিরূপে আলাদা, তেমনই ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও স্বতন্ত্র। প্রতিটি জেলার এই নিজস্বতাই আজ বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে। সেইরকমই একটি জেলা ঠাকুরগাঁও জেলা (Thakurgaon) ।

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রংপুর বিভাগের অন্তর্গত একটি জেলা হল এই ঠাকুরগাঁও জেলা । বাংলাদেশের একেবারে উত্তরদিকে এই জেলাটি অবস্থিত। এই জেলা মূলত বিখ্যাত সূর্যপুরী আমের জন্য। এশিয়ার বৃহত্তম সূর্যপুরী আমগাছ এই জেলাতেই অবস্থিত।  

এই জেলার পূর্বদিকে রয়েছে পঞ্চগড় ও দিনাজপুর জেলা, দক্ষিণে ও পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তরে পঞ্চগড় জেলা। ঠাকুরগাঁও জেলার মধ্যে দিয়ে যেসব নদী প্রবাহিত হয়েছে সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: টাঙ্গন, কুলিক, তীরনই, নাগর প্রভৃতি। এই জেলার আয়তন ১৮০৯.৫২ বর্গ কিলোমিটার। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুসারে, এই জেলার জনসংখ্যা ১৫,৩৩,৮৯৪ জন।

ঠাকুরগাঁও জেলার নামকরণের উৎস প্রসঙ্গে মনে করা হয় এই জেলার নাম শুরু থেকেই ঠাকুরগাঁও ছিল না। ঐতিহাসিকদের মতে এর আদি নাম ছিল নিশ্চিন্তপুর। সপ্তদশ শতাব্দীর কোচবিহারের মানচিত্রে কোচবিহার সংলগ্ন এলাকায় নিশ্চিন্তপুর ও ঠাকুরগাঁও নামে দু’টি ভিন্ন ভিন্ন জায়গা চিহ্নিত করা রয়েছে। টাঙ্গন নদীর পূর্ব দিকে নিশ্চিন্তপুর এবং টাঙ্গন নদীর পশ্চিম প্রান্তে ঠাকুরগাঁওয়ের অবস্থান। ঐতিহাসিকদের অনুমান এই নিশ্চিন্তপুরকেই পরবর্তী সময়ে  ঠাকুরগাঁও নাম দিয়ে সদরের নামকরণ করা হয়। প্রথমে সমগ্র মহকুমার নাম ও পরে সমগ্র জেলার নাম হয়  ঠাকুরগাঁও।

উপরিউক্ত ধারণা ছাড়াও ঠাকুরগাঁওয়ের নামকরণের ইতিহাস সম্পর্কে একটি প্রচলিত জনমত হল একসময় এই অঞ্চলে নারায়ণ চক্রবর্তী ও সতীশ চক্রবর্তী নামে অত্যন্ত সম্পদশালী ও প্রভাবশালী দুই ভাই বসবাস করতেন। স্থানীয় মানুষ তাঁদের বাড়িকে ঠাকুরবাড়ি বলতেন। এই ঠাকুরবাড়ি কালক্রমে ঠাকুরগাঁওয়ে পরিণত হয়। এই দুই ভাই এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের প্রয়োজন অনুভব করে জলপাইগুড়ির জমিদারকে আবেদন করলে জমিদার তাঁদের আবেদনে সাড়া দিয়ে থানা স্থাপনের জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারকে আবেদন করেন। অবশেষে ১৮০০ সাল  নাগাদ এই অঞ্চলে একটি থানা তৈরী হয় যার নাম দেওয়া হয় ঠাকুরগাঁও থানা। এই থানাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি থানা সহ ঠাকুরগাঁও মহকুমা গঠিত হয়। এই মহকুমা থেকেই একসময় ঠাকুরগাঁও জেলা গঠিত হয়। 

ঠাকুরগাঁও জেলার ইতিহাসও বেশ প্রাচীন। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ আবিষ্কৃত হয়েছে এই জেলার  কাছাকাছি নেপালের রাজদরবার থেকে। ঐতিহাসিকগণ মনে করেন নেপালের পার্শ্ববর্তী কোন বাংলাভাষী জনপদের মানুষ এই চর্যাপদের পদ রচনা করেছেন এবং এই প্রসঙ্গে নেপালের পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও জেলার নাম উঠে আসে। ঠাকুরগাঁও জেলা ও তৎসংলগ্ন এলাকার মানুষের মুখের ভাষার সঙ্গে চর্যাপদের ভাষার বেশ সাদৃশ্য আছে। 

ইতিহাস বিজড়িত এই জেলায় প্রাচীন সভ্যতার বহু মূল্যবান সম্পদ ছড়িয়ে আছে। হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম সভ্যতার অসংখ্য প্রাচীন নিদর্শনে পরিপূর্ণ ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন অঞ্চল। এখানে বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে আছে অজস্র প্রত্নসম্পদ। এই জেলার বিভিন্ন স্থানে পুকুর-দিঘি খননের সময় অসংখ্য প্রাচীন মূর্তি পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে পাথরের বুদ্ধ মূর্তি ও বিষ্ণু মূর্তির সংখ্যাই বেশি। এ থেকে সহজেই অনুমান করা যেতে পারে এই জেলার প্রাচীনত্ব সম্পর্কে। 

এই জেলার মানুষের কথ্যভাষা এবং লিখিতভাষার উভয় ক্ষেত্রেই বাংলা ভাষার সাধু রীতি ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। বিবিধ ধর্মের মানুষ এই জেলায় বাস করলেও ইসলাম ধর্মের মানুষের সংখ্যাই বেশি এখানে।  

১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জেলা হিসেবে ঠাকুরগাঁও জেলার আত্মপ্রকাশ ঘটে। মোট পাঁচটি উপজেলা নিয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা গঠিত যথা – ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা, পীরগঞ্জ উপজেলা, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা, রানীশংকৈল উপজেলা ও হরিপুর উপজেলা।

কৃষিকাজ এই জেলার আয়ের মূল ভিত্তি।  সারা দেশের মধ্যে এই জেলাতেই সবচেয়ে বেশি গম উৎপন্ন হয়। এই জেলার কৃষি অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ  বাণিজ্যিক ভাবে ফল উৎপাদন।  আম এবং লিচুর বাণিজ্যিক উৎপাদনের মাধ্যমে এই জেলা কৃষি উৎপাদনের ধারাকে আরও বৈচিত্র্যমুখী করে তুলেছে। ধান, গম ছাড়াও আখের চাষ এই এলাকার মানুষের অন্যতম জীবিকা হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। 

ঠাকুরগাঁও জেলার ভ্রমণস্থানের তালিকা অপূর্ণই রয়ে যায় যদি তালিকার প্রথমেই রাণীশংকৈল (রাজা টংকনাথের) জমিদার বাড়ির উল্লেখ না থাকে। এছাড়াও আরও কয়েকটি দ্রষ্টব্য ভ্রমণস্থান হল: শালবাড়ি মসজিদ ও ইমামবাড়া, হরিণমারী শিব মন্দির, জগদল রাজবাড়ি,জামালপুর জমিদার বাড়ি জামে মসজিদ,লোকায়ন জীবন বৈচিত্র্য জাদুঘর, মহালবাড়ি মসজিদ, খুনিয়া দিঘী স্মৃতি সৌধ প্রভৃতি। সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানাতে একাত্তর ফুট উচ্চতা সম্পন্ন মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ ‘অপরাজেয় ৭১’ নির্মিত হয়েছে এই জেলায়। 

বেশ কিছু কৃতী মানুষের জন্ম হয়েছে এই ঠাকুরগাঁও  জেলায়। তেমন কয়েকজন জনপ্রিয় এবং বিখ্যাত মানুষ হলেন: সুবেদার আহমেদ হোসেন (মুক্তিযোদ্ধা), হাজী কমরুল হুদা চৌধুরী (সমাজসেবক), রমেশ চন্দ্র সেন (বাংলাদেশের সাংসদ), মুসা ইব্রাহিম (প্রথম বাংলাদেশী এভারেস্ট বিজয়ী), মোঃ রেজওয়ানুল হক (ইদু) চৌধুরী (বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক) প্রমুখ।

লোকসংস্কৃতির একটি ধারা আজও এই ঠাকুরগাঁওয়ে বহমান। এই জেলার স্বতন্ত্র লোকসংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে বাহা পরব বা বাহা উৎসব, করম উৎসব, ভাওয়াইয়া গান, পল্লী গীতি, মুর্শিদি, মারফতি, বাউল গান, বিয়ের গান, চাটকা গান, ভান্না কুশানের গান প্রভৃতি। এই জেলা মূলত বিখ্যাত সূর্যপুরী আমের জন্য। এশিয়ার বৃহত্তম সূর্যপুরী আমগাছ এই জেলাতেই অবস্থিত।  এছাড়াও পাটশাক ও লাফা শাকের ঝোল, সিদলের ভর্তা, চেং বা শাটি (টাকি) মাছের পোড়া বা সিদ্ধ ভর্তা এখানকার অন্যতম জনপ্রিয় খাবার।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading