সববাংলায়

ভারতীয় নির্বাচন কমিশন

ভারতীয় নির্বাচন কমিশন (The Election Commission of India) একটি স্থায়ী সাংবিধানিক এবং স্বশাসিত সংস্থা যার প্রধান কাজ দেশ তথা রাজ্যের নির্বাচন জনিত সমস্ত প্রক্রিয়া পরিচালনা করা। লোকসভা, রাজ্যসভা এবং সব রাজ্যের বিধান সভা নির্বাচনের পরিচালক তথা নিয়ামক সংস্থা হল নির্বাচন কমিশন। স্বাধীনতার পরে ১৯৫০ সালে ২৫শে জানুয়ারি ভারতীয় নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়। ২৫ জানুয়ারি দিনটি সারা ভারতে জাতীয় ভোটাধিকার দিবস হিসেবে পালিত হয়।

দুশো বছর ব্রিটিশ শাসনের পর ভারতবর্ষ স্বাধীন হয় ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট। বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করার জন্যই প্রতিষ্ঠা হয় নির্বাচন কমিশন। ভারতীয় সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে দেশের সাধারণ নির্বাচন থেকে শুরু করে সমস্ত রাজ্যের নির্বাচন, এমনকি রাষ্ট্রপতি এবং উপরাষ্ট্রপতি দপ্তরের নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রক হল নির্বাচন কমিশন। প্রথম যখন নির্বাচন কমিশন গঠন হয় তখন মাত্র একটি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদ তৈরী করা হয়েছিল। ভারতের প্রথম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ছিলেন সুকুমার সেন। ১৯৮৯ সালের ১৬ই অক্টোবর আরো দুজন নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত করা হয়। তবে তাঁদের মেয়াদ ছিল ১লা জানুয়ারী, ১৯৯০ পর্যন্ত। ১৯৯৩ সালের পর স্থায়ীভাবে একজন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং দুজন নির্বাচন কমিশনার নিয়ে কমিশন গঠিত হয়। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং বাকী দুই নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত করেন রাষ্ট্রপতি। এঁদের কার্যকালের মেয়াদ ৬ বছর অথবা ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত। নির্বাচন কমিশনার এবং সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি সমগোত্রীয় সরকারী পদপ্রাপ্ত। সাধারণত আইনসভার উল্লঙ্ঘন না করলে সময়ের আগে কেউ অপসারিত হন না।

নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তর দিল্লীতে অবস্থিত। প্রায় তিনশো আধিকারিক তাঁদের পদমর্যাদা অনুযায়ী কমিশনের সদর দপ্তরে কর্মরত। কমিশনারদের সহায়তার জন্য দুই বা তিনজন ডেপুটি কমিশনার থাকেন এবং সাধারণ নির্দেশক থাকেন। এঁরা সবাই উচ্চবর্গীয় আই.এ.এস অফিসার। প্রত্যেক আধিকারিকের মেয়াদকাল নির্দিষ্ট করে কমিশন। এই আধিকারিকদের প্রশাসনিক সহায়তার জন্য থাকেন নির্দেশক, উপনির্দেশক, মুখ্য সচিব, সচিব এবং উপসচিব। নির্বাচন কমিশনের কাজের অঞ্চলভিত্তিক এবং কার্যভিত্তিক শ্রেণীবিভাগ করা আছে। একজন সেকশান অফিসার তাঁর অন্তর্গত বিভাগ এবং শাখাগুলির প্রধান কর্মকর্তা। কমিশনের কার্যভিত্তিক বিভাগ গুলি হল যথাক্রমে যোজনা, বিচারবিভাগীয়, প্রশাসনিক, ভোটদাতাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, তথ্যব্যবস্থা, এবং সংবাদমাধ্যম ও কমিশনের মধ্যে সংযোগ।

নির্বাচন কমিশনের কাজের অঞ্চল ভিত্তিক ভাগ করা হয়েছে কয়েকটি জোন (Zone) হিসেবে। ৩৫টি রাজ্য এবং ৬টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে নিয়ে জোনগুলি করা হয়েছে।প্রত্যেকটি রাজ্যে রাজ্যসরকার প্রস্তাবিত একজন আই.এ.এস অফিসারকে নির্বাচন কমিশন মুখ্য নির্বাচনী অফিসার হিসেবে নিয়োগ করে। তাঁর তত্ত্বাবধানেই সে রাজ্যের যাবতীয় নির্বাচনী কর্মসূচী পালিত হয়। প্রত্যেক জেলায় থাকেন জেলা নির্বাচনী অফিসার, তাঁর অধীনে কাজ করেন বহু সংখ্যক বিভিন্ন পদের আধিকারিক। এছাড়াও থাকেন নির্বাচনী পঞ্জীকরণ অফিসার এবং রিটার্নিং অফিসার। জেলা নির্বাচনী অফিসারের অধীনস্থ আধিকারিকরাই প্রধানত নির্বাচনের বাহ্যিক কাজগুলি করেন। ইলেক্টোরাল রোল এবং ভোটার তালিকা তৈরী ও তার সংশোধন করাও কমিশনের কাজ। নির্বাচনী প্রচারে বেআইনি টাকার লেনদেন আটকানোর জন্য কমিশন আয়করবিভাগের আধিকারিদের বিশেষভাবে নিযুক্ত করেন। প্রার্থীদের প্রচার সংক্রান্ত খরচে নজরদারির জন্য ইন্ডিয়ান রেভিনিউ সার্ভিসের অফিসাররা থাকেন পর্যবেক্ষক হিসেবে।

নির্বাচন কমিশন যেহেতু একটি স্বশাসিত সংস্থা, তাই সংবিধান অনুযায়ী কমিশনের কিছু স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আছে। সংসদ বা বিধানসভার নির্বাচিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে যদি নির্বাচনী বিধিভঙ্গের অভিযোগ ওঠে, সেক্ষেত্রে সেই প্রার্থীকে নাকচ করতে গেলে কমিশনের মতামত অত্যন্ত জরুরী। কোন দুর্নীতিগ্রস্ত প্রার্থীর বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্ট বা হাইকোর্টে বিচার চলাকালীন বিচারপতি কমিশনের সুপারিশেই সেই প্রার্থীর শাস্তির বিধান দেয়। যদি কোন প্রার্থী তাঁর নির্বাচন সংক্রান্ত খরচের সঠিক হিসাব দিতে অপারগ হন, সেক্ষেত্রে কমিশন সেই প্রার্থীকে বাতিল করার সম্পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী। যদিও কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে প্রার্থী হাইকোর্ট বা সুপ্রীম কোর্টে পিটিশন দাখিল করতেই পারেন, কিন্তু ভোটের ফল ঘোষণা না হওয়া অব্দি আদালত কোন আইনি প্রক্রিয়া চালু করেনা।

ভারতের প্রতেকটি রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন কমিশনে নথিভুক্ত করাতে হয়। যদি কোন দল সাধারণ নির্বাচনে প্রস্তাবিত নির্দেশিকানুযায়ী ফল করে, তবেই কমিশন তাকে মান্যতা দেয়। কমিশনের নিয়মানুসারে প্রত্যেকটি দলের গণতান্ত্রিক কর্মপদ্ধতি বজায় রাখার জন্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর দলের অন্তর্বর্তী পদ্গুলির নির্বাচন আবশ্যক। দলের আভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটানোর জন্য হস্তক্ষেপ করাও কমিশনের অধিকারের মধ্যে পড়ে। ভোট ঘোষণা হবার সাথেই কমিশন রাজনৈতিক দলগুলির উপর আদর্শ নির্বাচন বিধি লাগু করে। ১৯৭১ সালে পঞ্চম সাধারণ নির্বাচনের সময় কমিশন প্রথম আদর্শ নির্বাচন বিধি চালু করে। পরবর্তীকালে এই নিয়মে বদল এলেও কমিশনের ভোট ঘোষণার দিন থেকে ভোটের ফলপ্রকাশের দিন অব্দি এই বিধি বলবৎ থাকে। আদর্শ নির্বাচন বিধি অনুযায়ী বিদায়ী সরকারের কোন মন্ত্রী বা আধিকারিক  ভোটের আগে কোন আর্থিক সহায়তা এবং রাস্তা নির্মাণের ঘোষণা করতে পারেনা। এই সময়ে কোন সরকারী বা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় নতুন নিয়োগ করা নিষেধ। যদিও আদর্শ নির্বাচন বিধি মেনে নেওয়ার পরেও রাজনৈতিক দলগুলির বিরুদ্ধে প্রায়শই বিধিভঙ্গের অভিযোগ ওঠে। মূলত শাসক দলের বিরুদ্ধেই কমিশনের সম্পত্তি অপব্যবহার , জনগণের করের টাকায় নির্বাচনী প্রচার ইত্যাদি বিষয়ে বিধিভঙ্গের অভিযোগ পাওয়া যায়। সংবাদমাধ্যমে আংশিক সত্য  প্রচার বা পক্ষপাতিত্ব ও নির্বাচনী বিধিভঙ্গের আওতায় পড়ে।

ভারতে ভোটদান হয় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (EVM) এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেমন বিশেষ ভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য পোস্টাল ব্যালট ব্যবহার করে। ভারতই প্রথম দেশ, যেখানে ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থা বহুল ব্যবহৃত হয়। ২০১৩ সালে প্রথম সরকারী ভাবে নাগাল্যান্ডে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং শুরু হবার পর সব নির্বাচনেই তা ব্যবহার হতে থাকে। ভোটদানে জালিয়াতি বন্ধ করার জন্য ১৯৯৩ সালে কমিশন ভোটারদের সচিত্র পরিচয়পত্র বা ভোটার কার্ড চালু করে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তা বাধ্যতামূলক করা হয়। যেকোন গণতান্ত্রিক দেশে সাধারণ মানুষের স্বতস্ফূর্ত ভোটদান স্বচ্ছ নির্বাচনের চাবিকাঠি, তার গুরুত্ব উপলব্ধি করেই নির্বাচন কমিশন নিয়মিত ভাবে ভোটার প্রশিক্ষণ শিবির আয়োজন করে থাকে।

নির্বাচন কমিশনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ মন্ত্রক আলাদা একটি বাজেট দেয়। কমিশনের সুপারিশ মেনেই এই বাজেট তৈরী করা হয়। যেহেতু নির্বাচন প্রক্রিয়ায় একটি বিশাল অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন তাই লোকসভা নির্বাচনের যাবতীয় খরচ বহন করে কেন্দ্রীয় সরকার। অপরদিকে বিধানসভা নির্বাচনের খরচের দায়িত্ব থাকে রাজ্য সরকারের উপর। নির্বাচন কমিশন কোন বাহ্যিক কার্যনির্বাহী হস্তক্ষেপের আওতায় আসেনা। নির্বাচন ঘোষণা থেকে ফল প্রকাশ, প্রত্যেকটি ভোটকেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা বরাদ্দ করা সব কিছুই কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়। নির্বাচন সংক্রান্ত খুঁটিনাটি তথ্য কমিশন সাংবাদিক বৈঠকের মাধ্যামে প্রকাশ করে। ভোটকেন্দ্র ও গণনা কেন্দ্রগুলিতে সংবাদ মাধ্যমের প্রবেশাধিকার আছে। বহু বছর ধরে কমিশন দূরদর্শন এবং প্রসারভারতীর মাধ্যমে মানুষকে ভোটদানের ব্যপারে সচেতন করে আসছে।

ভারতের মতো সুবিশাল গণতান্ত্রিক দেশে স্বচ্ছ নির্বাচন করানো কমিশনের দায়িত্ব। লোকসভা নির্বাচনের জন্য প্রায় ৫০ লাখ কর্মচারী কমিশনের আওতায় কাজ করেন। ভোটিং এ স্বচ্ছতা আনার জন্য কমিশন কম্পিউটারাইজড ইলেক্টোরাল রোল ব্যবহার করা শুরু করেছে সম্প্রতি।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading