পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই বিভিন্ন ধরনের সমুদ্র সৈকত রয়েছে। তাদের একেকটির সৌন্দর্য একেকরকম। কোন সৈকত জনকোলাহলপূর্ণ, কোনটা আবার নির্জন। এমনই একটি নিস্তব্ধ ও নির্জন সমুদ্র সৈকত হল সুন্দরবন অঞ্চলের ফ্রেজারগঞ্জ সৈকত। সাদা বালির বিস্তীর্ণ সৈকতের ওপর শতাব্দী প্রাচীন বাড়ির ধ্বংসাবশেষ এবং সমুদ্র তীরবর্তী বেশ কয়েকটি উইন্ড টারবাইনের উপস্থিতি এই সৈকতকে বাকিদের থেকে আলাদা করেছে।
ফ্রেজারগঞ্জ হল পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলার অন্তর্ভুক্ত কাকদ্বীপ মহকুমার নামখানা ব্লকের একটি গ্রাম। বকখালি সমুদ্র সৈকত থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে ফ্রেজারগঞ্জ সৈকত অবস্থিত।
প্রায় একশো বছর আগে স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর অ্যান্ড্রু ফ্রেজার সুন্দরবনের প্রান্তে নারায়ণীতলার নিকটবর্তী এই নির্জন সাদা বালির সৈকতটির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এই সমুদ্র সৈকতের ওপরেই তিনি একটি সুদৃশ্য বাংলো তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়। বাংলোটি সৈকতের অনেকটা জায়গা জুড়ে বিস্তৃত ছিল এবং নারকেল গাছের সারি দিয়ে ঘেরা ছিল। বর্তমানে এই বাংলোর ধ্বংসাবশেষ সৈকতের চারপাশে দেখতে পাওয়া যায়। অ্যান্ড্রু ফ্রেজারের নাম থেকেই জায়গাটির নাম হয় ফ্রেজারগঞ্জ। সমুদ্রের অগ্রসরমান জলরাশি অ্যান্ড্রু ফ্রেজারের সেই বাংলোকে ক্রমশ গ্রাস করে চলেছে।

সমুদ্র সৈকতটি বেশ নির্জন। বহুদূর বিস্তৃত এই সৈকতের সাদা বালির ওপর দিয়ে ভোরবেলা কিংবা বিকেলবেলা হেঁটে যাওয়া যায়। নিমেষে উদাস হয়ে যায় মন। শহুরে সব ক্লান্তি আর গ্লানি যেন সমুদ্রের বিশুদ্ধ হাওয়ায়, ধূসর স্রোতে ভেসে চলে যায়। সৈকতের কাছে উইন্ড টারবাইনগুলো এই সৈকতের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গাঢ় লাল রঙে ছেয়ে যাওয়া আকাশের প্রেক্ষাপটে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা উইন্ড টারবাইন গুলো পর্যটকদের হয়ত কোনো কল্পনার দেশে নিয়ে যেতে পারে। আর সৈকতের ওপরে প্রাচীন বাংলোর উপস্থিতি মনকে নিতে চলে যেতে পারে একশো বছর আগে।
এছাড়াও এখানের সমুদ্র সৈকতে কখনও কখনও কাঁকড়ার দেখা পাওয়া যায়। বালির নীচে গর্ত করে থাকে ওরা। মানুষের পায়ের শব্দ পেলেই সেঁধিয়ে যায় নিজের বাসায়। মূলত ভোরের দিকে, যখন সৈকত নির্জন থাকে তখন মাঝেমধ্যে দেখা যায় এই কাঁকড়ার দলকে৷ এছাড়াও মাঝে মাঝে এখানে রঙবেরঙের পরিযায়ী পাখিও দেখা যায়।
ট্রেনে যেতে হলে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে নামখানা যাওয়ার ট্রেন ধরে কাকদ্বীপ পেরিয়ে চলে যেতে হবে নামখানা এবং স্টেশনের কাছ থেকেই টোটো বা ম্যাজিক গাড়ি ইত্যাদি পাওয়া যাবে। আগে নামখানা স্টেশনে নেমে ভেসেলে করে হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদী পেরিয়ে যেতে হত। কিন্তু ২০১৯ সাল থেকে এই নদীর ওপর নামখানা ব্রিজ চালু হওয়ার পর থেকে নৌকোয় পারাপারের প্রয়োজন নেই। স্টেশন থেকেই সরাসরি ফ্রেজারগঞ্জ যাওয়ার গাড়ি পাওয়া যাবে। ভাড়া পড়বে মাথাপিছু ৬০ থেকে ৮০ টাকা। পুরো গাড়ি রিজার্ভ করে গেলে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পড়বে।
বাসে গেলে বকখালি হয়ে যেতে হবে কারণ ফ্রেজারগঞ্জে কোন বাস স্ট্যান্ড নেই। কলকাতার ধর্মতলা থেকে সকালবেলা বকখালি যাওয়ার বাসে যেতে হবে বকখালি। তারপর সেখান থেকে টোটো করে যেতে হবে ফ্রেজারগঞ্জ। গাড়িতে যেতে হলে ১১৭ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে যেতে হবে। কলকাতা থেকে ফ্রেজারগঞ্জের দূরত্ব প্রায় ১৩০ কিলোমিটার।
বকখালি যেহেতু ফ্রেজারগঞ্জের চেয়ে বেশি জনপ্রিয় সে কারণে বকখালিতে থাকবার হোটেলের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। অনেকে বকখালি বেড়াতে গিয়ে নিকটবর্তী এই ফ্রেজারগঞ্জে একদিনের জন্য বেড়াতে যান। ফ্রেজারগঞ্জ সৈকত থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে কিছু হোটেল রয়েছে। সেই হোটেলগুলোতে থাকতে হলে আগে থেকে বুক করে যাওয়া উচিত।
ফ্রেজারগঞ্জ সৈকতের দ্রষ্টব্য বলতে যে জায়গাগুলোকে বোঝায় সেগুলো নীচে উল্লেখ করা হল।

সমুদ্র সৈকত – একপাশে অগাধ সমুদ্র এবং তাকে ঘিরে বিস্তীর্ণ সৈকত অপূর্ব এক সৌন্দর্যের নিদর্শন। ভোরবেলা এই জনকোলাহলশূন্য সৈকত ধরে বহুদূর হেঁটে গেলে অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা যায়। তবে অ্যান্ড্রু ফ্রেজারের বাড়ির ধ্বংসাবশেষের টুকরো বিপজ্জনকভাবে সৈকতে ছড়িয়ে রয়েছে। কোথাও রড সৈকত থেকে মাথা উঁচিয়ে রয়েছে তো কোথাও ইতস্ততভাবে লোহা বা ইটের টুকরো ছড়িয়ে রয়েছে। সেই কারণে সৈকতে সাবধানে চলাফেরা করতে হবে। একই কারণে এখানকার সৈকতে স্নান করাও অত্যন্ত বিপদজনক।
এই সৈকতের ধার বরাবর বিদুৎ উৎপাদনকারী বেশ কয়েকটি উইন্ড টারবাইন দেখা যায়। এই দৃশ্য এই সৈকতকে পশ্চিমবঙ্গের বাকি সৈকতের থেকে আলাদা করেছে। ভোরবেলায় সেই উইন্ড টারবাইনের পিছন থেকে সূর্যোদয় দেখা এক আলাদা অভিজ্ঞতা। এই সৈকতে কখনও কখনও কাঁকড়ার দেখাও মিলতে পারে, যারা বালির নীচে গর্ত করে বসবাস করে। তবে বালি খুঁড়ে সেই কাঁকড়াদেরকে বিব্রত করা, ছবি তোলা এই ধরনের আচরণ কখনোই কাম্য নয়।

অ্যান্ড্রু ফ্রেজারের বাংলো – এই সমুদ্র সৈকতের আরেকটি মূল আকর্ষণ হল সৈকতের ওপর অ্যান্ড্রু ফ্রেজারের বাংলোর ধ্বংসাবশেষ। শতাব্দীপ্রাচীন সেই বাংলোর কিছুটা এখনও মাথা উঁচিয়ে সৈকতের ওপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই বাংলোকে চারপাশ থেকে জড়িয়ে রয়েছে বটগাছ। সৈকতের ওপর এই দৃশ্য বেশ অন্যরকম। বাংলোর অবশিষ্ট যেটুকু দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেটুকু ছাড়াও এটি আরও বিস্তৃত ছিল। বাংলোর অন্য একটি অংশ কিছু বছর আগে অবধিও সৈকতের ওপরে ছিল যাকে ঘিরে ছিল কয়েকটি নারকেল গাছ। এখন বাংলোর সেই অংশটি জলের মধ্যে চলে গেছে যা দূর থেকে দেখা যায়।
সমুদ্র এগিয়ে এসে একটু একটু করে গ্রাস করছে একে। অবশিষ্ট বাংলো যেটা সৈকতের ওপরে রয়েছে, তার চারিপাশটা ঘুরে দেখা যেতে পারে কিন্তু বাংলোতে ঢোকার চেষ্টা করবেন না। যেহেতু এটি অনেক পুরোনো এবং ভাঙাচোরা তাই যে-কোনো মুহূর্তেই যে কোন অংশ ধ্বসে যেতে পারে। তাছাড়াও এর ভিতরে সাপখোপের উৎপাতের সম্ভাবনা প্রবল। গোটা সৈকতে বালির উপর যত্রতত্র ভাঙা রড বা লোহা বিপজ্জনকভাবে বেরিয়ে রয়েছে, অতএব খুবই সাবধানে এই বাংলোটি দেখা দরকার।

গঙ্গামাতার মন্দির – সৈকতে ঢোকার মুখে রাস্তার ওপরেই রয়েছে গঙ্গামাতার মন্দির। মন্দিরের মধ্যে বিভিন্ন দেবদেবীর বিগ্রহ রয়েছে।
এগুলি ছাড়াও এখান থেকে আরও কয়েকটি জায়গা সাইটসিইং করতে যাওয়া যায়। যেমন, ফ্রেজারগঞ্জ ফিশিং হারবার, বকখালি সমুদ্র সৈকত, হেনরি আইল্যান্ড, কার্গিল সৈকত, নৌকা করে জম্বুদ্বীপ দেখা ইত্যাদি। ফ্রেজারগঞ্জের আশে পাশে কী কী জায়গা দেখা যায় সেগুলোর বিস্তারিত জানতে পড়ুন এখানে।
এখানে সারা বছর ধরেই পর্যটকেরা ভিড় করে, তবে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে শীতের আবহাওয়ায় এখানকার পরিবেশ খুব মনোরম থাকে।
ট্রিপ টিপস
- কীভাবে যাবেন – ট্রেনে যেতে হলে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে নামখানা যাওয়ার ট্রেন ধরে কাকদ্বীপ পেরিয়ে চলে যেতে হবে নামখানা এবং স্টেশনের কাছ থেকেই টোটো, ম্যাজিক গাড়ি ইত্যাদি পাওয়া যাবে। বাসে গেলে কলকাতার ধর্মতলা থেকে সকালবেলা বকখালি যাওয়ার বাসে যেতে হবে বকখালি। তারপর সেখান থেকে টোটো করে যেতে হবে ফ্রেজারগঞ্জ। গাড়িতে যেতে হলে ১১৭ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে যেতে হবে।
- কোথায় থাকবেন – ফ্রেজারগঞ্জ সৈকত থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে কিছু হোটেল রয়েছে। তবে বকখালি যেহেতু ফ্রেজারগঞ্জের চেয়ে বেশি জনপ্রিয় সেকারণে সেখানেই থাকবার হোটেলের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। অনেকে বকখালি বেড়াতে গিয়ে নিকটবর্তী এই ফ্রেজারগঞ্জে একদিনের জন্য বেড়াতে যান।
- কী দেখবেন – ফ্রেজারগঞ্জের সৈকতের ওপর অ্যান্ড্রু ফ্রেজারের বাংলো ছাড়াও সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যে বড়-বড় উইন্ড টারবাইন রয়েছে তা দেখার মত। এছাড়াও সৈকতে যাবার রাস্তার ওপরেই গঙ্গামাতার মন্দির রয়েছে। তাছাড়া সাইটসিইং হিসেবে ফ্রেজারগঞ্জ থেকে বকখালি সমুদ্র সৈকত, হেনরি আইল্যান্ড ইত্যাদি অসাধারণ সুন্দর সব জায়গায় ঘুরতে যাওয়া যায়।
- কখন যাবেন – অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি শীতের মরশুমে গেলে ফ্রেজারগঞ্জে এক মনোরম আবহাওয়া পাওয়া যেতে পারে।
- সতর্কতা –
- ফ্রেজারগঞ্জ সমুদ্র সৈকতের অনেকটা জুড়ে ফ্রেজার সাহেবের বাড়ির ধ্বংসাবশেষের টুকরো বিপজ্জনকভাবে সৈকতে ছড়িয়ে রয়েছে। সেই কারণে এখানকার সৈকতে স্নান করা অত্যন্ত বিপদজনক।
- সন্ধের পর একা এখানে ঘুরতে যাবেন না।
- ফ্রেজার সাহেবের বাড়ির যেটুকু অবশিষ্ট আছে তা বহু পুরনো হওয়ার ফলে অত্যন্ত বিপদজনক। এই বাড়িতে প্রবেশ করবেন না।
- বালি খুঁড়ে কাঁকড়াদেরকে বিব্রত করা, ছবি তোলা, এই ধরনের আচরণ কখনোই কাম্য নয়।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৩
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- নিজস্ব প্রতিনিধি
- https://www.telegraphindia.com/
- https://www.journeymart.com/
- http://www.bharatonline.com/


আপনার মতামত জানান