ভ্রমণ

খাদানডুংরি পাহাড় ভ্রমণ

খাদানডুংরি পাহাড় ভ্রমণ

পাহাড়ের গায়েই যেন রামধনু এঁকে দিয়েছে কেউ – কোথাও লাল, কোথাও কালচে নীল, কোথাও আবার হলদে সবুজ। ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ির এই রঙিন পাহাড় বাঙালির পর্যটন স্থানের তালিকায় নতুন সংযোজন। বিশ্বের মানচিত্রে অস্ট্রেলিয়াতে দেখা যায় এমন রঙিন পাহাড়, ঠিক সেরকমই এবার খোদ বাংলার মধ্যেই অস্ট্রেলিয়াকে খুঁজে পেতে হাতছানি দিচ্ছে বেলপাহাড়ির রঙিন পাহাড়। স্থানীয়দের ভাষায় এরই নাম খাদানডুংরি পাহাড়। সপ্তাহান্তের এক-দু’দিনের ছুটিতে অনায়াসেই সেরে ফেলা যায় এই খাদানডুংরি পাহাড় ভ্রমণ।

ঝাড়গ্রাম থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরেই আদিবাসী অধ্যুষিত বেলপাহাড়ি গ্রাম। সেখানেই বেলপাহাড়ি ইন্দিরা চক থেকে সামান্য এগোলেই দেখা যাবে এই খাদানডুংরি পাহাড়। কলকাতা থেকে এর দূরত্ব কমবেশি ২২২ কিলোমিটার।

রঙিন পাথর দিয়ে গড়ে উঠেছে এই খাদানডুংরি পাহাড়। বিশ্বে একমাত্র অস্ট্রেলিয়াতেই এইরকম রঙিন পাহাড় রয়েছে। সেই পাহাড়ে আবার সূর্যের আলো পড়লে রঙ বদলে যায়। খাদানডুংরি পাহাড়ে রঙ বদলায় না ঠিকই, কিন্তু সূর্যের আলোয় তার ঔজ্জ্বল্য আরও বেড়ে যায়। ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ি ব্লকের ওদলচুয়া গ্রামের মধ্য দিয়ে জঙ্গলের পথ পেরিয়ে কিছুদূর গেলেই এই রঙিন পাহাড় দেখা যায়। সমগ্র পাহাড়টি কোথাও লাল, কোথাও কালচে নীল আবার কোথাও বা হলদে পাথর যেন রামধনুর মত সাজানো। দেখে মনে হয় যেন কোনও শিল্পী তাঁর হাতের জাদুতে রঙ দিয়ে সাজিয়ে তুলেছে এই পাহাড়। বেলপাহাড়ি ব্লকের আরও অন্যান্য পাহাড়, ডুংরি, ঝর্নার মাঝে এই রঙিন পাহাড় খাদানডুংরি যেন স্বাতন্ত্র্যে সমুজ্জ্বল।

ট্রেনে করে খাদানডুংরি আসতে চাইলে নামতে হবে ঝাড়গ্রাম স্টেশনে। সব ট্রেনই ছাড়ে হাওড়া থেকে। এক দিনের ট্যুরে আসতে চাইলে হাওড়া থেকে ভোর ৬টা ৩৫ মিনিটের হাওড়া-টিটাগড় ইস্পাত এক্সপ্রেস অথবা হাওরা-কান্তাবাঞ্জি ইস্পাত এক্সপ্রেস ধরতে হবে যা কিনা ঝাড়গ্রামে পৌঁছে দেবে সকাল ৮টা ৪৭ মিনিটে। ফলে পুরো দিনটাই হাতে পাওয়া যাবে ঘোরার জন্য। এছাড়াও হাওড়া-ঘাটশিলা মেমু এক্সপ্রেস, স্টিল এক্সপ্রেস ইত্যাদিতেও ঝাড়গ্রাম স্টেশনে আসা যায়। স্টেশনে নেমে গাড়ি ভাড়া করে শিলদা হয়ে বেলপাহাড়ি ব্লকে পৌঁছানো যায়। গাড়ি করে প্রথমে বেলপাহাড়ি ইন্দিরা চকে পৌঁছে সেখান থেকে বাঁদিকে ঢঙিকুসুম এবং কাঁকড়াঝোড়ের দিকে ৫ নং রাজ্য সড়ক ধরে কিছুদূর গেলেই চোখে পড়বে খাদানডুংরি রঙিন পাহাড়। এছাড়া কলকাতা থেকে সরাসরি গাড়ি নিয়েও চলে আসা যায় এখানে। সেক্ষেত্রে ১৬ নং জাতীয় সড়ক ধরে সাড়ে চার ঘন্টার মধ্যেই এখানে চলে আসা যায়।

খাদানডুংরির আশেপাশে কোনও হোটেল বা লজ কিছু নেই। ফলে এখানে ঘুরতে এসে থাকার পরিকল্পনা থাকলে বেলপাহাড়ির অন্যত্র বা ঝাড়গ্রাম সদরে হোটেলে উঠতে হবে। বেলপাহাড়ি গেস্ট হাউস বা বেলপাহাড়ি ফরেস্ট বাংলো ইত্যাদি ভাড়া পাওয়া যায় পর্যটকদের জন্য। তবে আগে থেকে হোটেল বুক করে আসাই উচিত।

খাদানডুংরি পাহাড় ভ্রমণ বলতে এখানকার অত্যাশ্চর্য রঙিন পাহাড়টিই একমাত্র বিশেষ দ্রষ্টব্যের মধ্যে পড়বে। পাহাড় ঘুরে দেখতে দেখতে খানিকটা ট্রেকিংও করে নেওয়া যায়। শাল, মহুয়া, পিয়াল, সোনাঝুরি, ইউক্যালিপটাস ইত্যাদি গাছে ঘেরা জঙ্গলের প্রশান্তির মধ্যে রঙিন পাহাড় যেন এক স্বপ্নের দুনিয়া। এখনও পর্যন্ত পর্যটকদের কাছে খুব বেশি পরিচিত না হওয়ায় ভিড়ের চাপ একেবারেই নেই, ফলে শান্তিতে নির্জনে এক-দুদিন এখানে নিশ্চিন্তে কাটাতে পারেন। রঙিন পাহাড় দেখার পাশাপাশি বেলপাহাড়ির অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কিছু দর্শনীয় জায়গা দেখে নেওয়াই যায় সাইটসিইং হিসেবে। খাণ্ডারনি হ্রদ, ঘাগরা জলপ্রপাত, গাদারসিনি পাহাড়, কানাইসোর পাহাড়, তারাফেনী বাঁধ, লালজল গুহা, কাঁকড়াঝোড় জঙ্গল, ঢঙিকুসুম ও ডুংরি জলপ্রপাত ইত্যাদিও একসঙ্গেই ঘুরে নেওয়া যায়। সবথেকে ভাল হয়, বেলপাহাড়ির কোনও হোটেলে থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে দুদিনের মধ্যেই এক এক করে সবকটি জায়গা ঘুরে দেখা। তবে এর জন্য ন্যূনতম এক রাত দু দিন কাটাতেই হবে বেলপাহাড়িতে।

বছরের যে কোনও সময় খাদানডুংরি পাহাড় আসা যায়। তবে বর্ষাকাল এড়িয়ে চলাই ভাল। শীতকাল আদর্শ সময়। তবে শীত পড়ার আগ দিয়ে অক্টোবর মাস নাগাদ এলে সূর্যের আলোর ছটায় রঙিন পাহাড়ের ঔজ্জ্বল্য আরও ভালভাবে উপভোগ করা যায়।


ট্রিপ টিপস

  • কীভাবে যাবেন – ট্রেনে করে আসতে চাইলে প্রথমে হাওড়া থেকে ট্রেন ধরে নামতে হবে ঝাড়গ্রাম স্টেশনে। তারপর সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে বেলপাহাড়ি ব্লকের এই খাদানডুংরি চলে আসা যায়। কলকাতা থেকে সরাসরি নিজের গাড়ি করেও এখানে চলে আসা যায় ১৬ নং জাতীয় সড়ক ধরে। সময় লাগে কমবেশি সাড়ে চার ঘন্টা।
  • কোথায় থাকবেন – খাদানডুংরিতে কোনও হোটেল বা লজ নেই। ফলে থাকতে হলে বেলপাহাড়ি বা ঝাড়গ্রাম সদরে কোনও হোটেলে থাকা যেতে পারে।
  • কী দেখবেন – বিশেষ দ্রষ্টব্য হিসেবে খাদানডুংরির রঙিন পাহাড় অবশ্যই দেখবেন। তার পাশাপাশি সাইটসিইং-এর মধ্যে বেলপাহাড়ির খাণ্ডারনি হ্রদ, ঘাগরা জলপ্রপাত, গাদারসিনি পাহাড়, কানাইসোর পাহাড়, তারাফেনী বাঁধ, লালজল গুহা, কাঁকড়াঝোড় জঙ্গল, ঢঙিকুসুম ও ডুংরি জলপ্রপাত ইত্যাদিও একসঙ্গেই ঘুরে নেওয়া যায়।
  • কখন যাবেন – বছরের যে কোনও সময় খাদানডুংরি পাহাড় আসা যায়। তবে বর্ষাকাল এড়িয়ে চলাই ভাল। শীতকাল আদর্শ সময়।
  • সতর্কতা –
    • পাহাড়ে চড়ার সময় সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার।
    • বয়স্ক ব্যক্তিদের চড়াইতে সমস্যা থাকলে না ওঠাই ভাল।
    • পাহাড় দেখতে গিয়ে সেখানে পিকনিকের নামে জায়গাটা নোংরা করা একেবারেই উচিত নয়।
    • জঙ্গলের শান্ত পরিবেশকে গান বাজিয়ে বা অযথা হল্লা করে বন্যপ্রাণীদের শান্তি বিঘ্নিত করা যাবে না।
    • ঝর্না দেখতে যাওয়ার সময় জলে দুঃসাহসবশত বেশি দূর না যাওয়াই উচিত।
    • জঙ্গলে ঘোরার সময় হাতে লাঠি জাতীয় কিছু থাকলে ভাল।   


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়