বিবিধ

বে-আইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন

১৯৬৭ সালে ভারতীয় দণ্ডবিধিতে বে-আইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন টি (UAPA) সংযুক্ত হয় যা আসলে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইন। সেই সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। ভারতের কোনো নাগরিক বা নাগরিকের সমষ্টি কোনো আইনবিরোধী তথা সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলে তা এই বিশেষ আইনের সহায়তায় প্রতিরোধ করতে পারে ভারত সরকার।

১৯৬৭ সালের বে-আইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইনে যা বলা আছে তা হল –

“এই আইনের দ্বারা অত্যন্ত কার্যকারিতার সঙ্গে যে কোনো প্রকার অবৈধ কার্যকলাপ এবং সন্ত্রাসবাদমূলক কর্মকাণ্ড (ব্যক্তিগত হোক বা দলগত) তা প্রতিরোধ করা হইবে। এতদ্বারা এই আইন বে-আইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন, ১৯৬৭ নামে অভিহিত হইল। সমগ্র ভারতে এই আইন বলবৎ হইবে। ভারতের মধ্যে এই আইনের পরিপন্থী যে কোনো কাজে কোনো ব্যক্তি অভিযুক্ত হইলে তিনি শাস্তিযোগ্য বলে গণ্য হইবেন। একইভাবে ভারতের বাইরেও কোনো ভারতীয় ব্যক্তি যদি এই আইনের আওতায় অভিযুক্ত হন, তবে তিনিও সমানভাবে শাস্তিযোগ্য হইবেন। ভারতের বাইরে বসবাসকারী ভারতীয়, সরকারি সংস্থায় কর্মরত ব্যক্তি এবং জাহাজে কিংবা বিমানে কর্মরত ভারতীয় ব্যক্তি যে স্থানেই থাকুন না কেন এই আইনের আওতায় তিনি শাস্তিযোগ্যভাবে অভিযুক্ত হইবেন।”

সমগ্র আইনটিতে মোট ৭টি অধ্যায় রয়েছে যার মধ্যে ১ম অধ্যায়ে আইনের বিবরণ ও সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ, ২য় অধ্যায়ে কোনো সংগঠন ও তার কাজকে বে-আইনি বলার ধারা, ৩য় অধ্যায়ে অবৈধ কার্যকলাপের জন্য নির্দিষ্ট জরিমানা সম্পর্কে বিস্তৃত উল্লেখ রয়েছে। এর ৪র্থ অধ্যায়টি প্রধানত সন্ত্রাসবাদ বিরোধী ধারা। আইনের ৫ম অধ্যায়ে সন্ত্রাসমূলক কাজের জন্য অভিযুক্তের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ, ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা সংগঠনের অভিযোগ-মুক্তির আবেদন এবং শেষ অধ্যায়ে রয়েছে সন্দেহ, অভিযোগ, গ্রেপ্তার ও বাজেয়াপ্তকরণের ক্ষমতা বিষয়ে বিশদে উল্লেখ।

১৯৬৩ সালে জওহরলাল নেহেরুর প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন জাতীয় সংহতি পরিষদ (NIC) এর একটি সুপারিশের উপর সাংবিধানিক সংশোধনীর ফলেই বে-আইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইনের জন্ম হয়। ভারতের মধ্যে সৌভ্রাতৃত্ববোধ ও সংহতি রক্ষায় কোনো প্রকার ব্যক্তিগত বা দলগত অস্ত্র সংগ্রহ বা হানিকর জেহাদকে রুখতে এই আইনের সংশোধন করা হয় এবং ১৯৬৭ সালে পাস হওয়া এই বিশেষ আইনের রূপটির সাহায্যে ভারত সরকার অনায়াসে যে কোনো অবৈধ কর্মকান্ডের উপর হস্তক্ষেপ করতে পারে। ১৯৬৭ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সন্ত্রাসবাদকে এই আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কিন্তু ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের উপদেষ্টায় সংশোধনীর ফলে এই আইনের ৪র্থ অধ্যায়ে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী একটি ধারাকে সংযুক্ত করে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট। ২৬/১১-এর মুম্বাই হামলার পরে পরপর ২০০৮, ২০০৯, ২০১২ সালে এই আইনে আরো সংশোধনী হয়। সবশেষে ইউএপিএ অ্যাক্টের সর্বশেষ সংশোধনী হয় ২০১৯ সালে যাতে মূল আইনের সঙ্গে ব্যক্তিগত বা দলগতভাবে সন্ত্রাসবাদ, সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থ পাচার ইত্যাদিও যুক্ত করা হয়েছে। তাছাড়া ২০১৯ সালের সংশোধনীর ষষ্ঠ অধ্যায়ের ৩৫ ও ৩৬ নং সেকশনে সন্ত্রাসবাদী হিসেবে কারা অভিযুক্ত হতে পারেন সে ব্যাপারে বিশদে বর্ণনা করা হয়েছে যা আগে এই আইনে সংলগ্ন ছিল না। এই সংশোধনীর ২৫ নং সেকশনের অধীনে জাতীয় তদন্ত দপ্তরের (NIA) ডি.জি (DG) সন্ত্রাসবাদে যুক্ত ব্যক্তির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারেন এবং এর ৪৩ নং সেকশনের অধীনে পুলিশ ইন্সপেক্টর পদাধিকারীরা সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় তদন্ত করতে পারেন।

এর আগে ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুকালীন সময়ে একটি সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ আইন পাস হয়েছিল ১৯৮৭ সালে যাকে ‘টেররিস্ট অ্যাণ্ড ডিসরাপ্টিভ অ্যাক্টিভিটিস প্রিভেনশন অ্যাক্ট’ (TADA) বলা হয়। পরে ১৯৯৫ সালে এই আইনও বানচাল হয়ে যায় এবং অটল বিহারী বাজপেয়ীর আমলে পুনরায় ২০০২ সালে সন্ত্রাসবাদের বিরোধিতায় পাস হয় ‘প্রিভেনশন অফ টেররিস্ট অ্যাক্ট’ (POTA)। এই আইনটিই আসলে ১৯৬৭ সালের বে-আইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইনের বিস্তৃত রূপ এবং ২০০৪ সালে POTA-কেই ভারতের প্রধানতম সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ আইন হিসেবে গণ্য করে সুপ্রিম কোর্ট।

এই আইনের দ্বারা ভারতে যে কোনো রকম সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের বিচার করা হবে বলে সরকার জানালেও লোকসভার বিরোধীপক্ষ জানিয়েছে যে এই আইনের অপব্যবহার হতে পারে যথেচ্ছভাবে এবং তা প্রতিরোধের কোনো রাস্তাই আইনে উল্লিখিত নেই। কোনো একজন ব্যক্তি বা কোনো একটি গোষ্ঠীকে কোনো রকম আইনি প্রমাণ ছাড়াই, বিচার ছাড়াই এই আইনবলে সন্ত্রাসবাদী হিসেবে অভিযুক্ত করার চেষ্টাকে ধিক্কার জানিয়েছে বিরোধীপক্ষ। ২০১৯ সালের সংশোধনীর ফলে এই আইনবলে অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো স্থান নেই এবং এই সংশোধনী জামিন প্রক্রিয়াকে প্রায় অসম্ভব করে দিয়েছে। তবে অভিযোগ দায়ের করার আগে পুলিশি হেফাজতে রাখার সময় ৯০ দিন থেকে ১৮০ দিন পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে নতুন সংশোধনীতে। সন্ত্রাসবাদী হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিবের নিকট আবেদন করতে পারেন বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। নতুন সংশোধনীতে সন্ত্রাসবাদী হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ভ্রমণ বানচাল করতে পারে ভারত সরকার এবং প্রয়োজনে তাদের সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করতে পারে। এই আইনের বিরোধিতা করে একটি পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন (Public Interest Litigation, PIL) সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করেছেন সজল অবস্তী নামের জনৈক ব্যক্তি। তাঁর মতে এই আইন ভারতীয় সংবিধানের ১৪, ১৯ এবং ২১ নং ধারার পরিপন্থী যা নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে খর্ব করছে। শুধুমাত্র সন্দেহের বশে কোনো নাগরিককে বিচারপূর্বক প্রমাণের আগেই সন্ত্রাসবাদী বলে দেগে দেওয়ার হীন অপচেষ্টা ব্যক্তির সম্মান খর্ব করে বলে জানান সজল অবস্তী। স্বাভাবিকভাবে কোনো ব্যক্তিকেই অভিযোগ বিচারপূর্বক আদালতে প্রমাণ হবার পূর্বে সন্ত্রাসবাদী তকমা দেওয়া যেতে পারে না।

এই আইনের ভিত্তিতে ২০০৭ সালে মানবাধিকার কর্মী অরুণ ফেরেরাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে ২০১২ সালে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। ২০০৯ সালে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)-র পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির মুখপাত্র গৌর চক্রবর্তীকেও একইভাবে এই আইনবলে গ্রেপ্তার করা হয় এবং অযৌক্তিকভাবে বিচার না করে টানা সাত বছর কারাবন্দি করে রাখা হয়। অথচ ২০১৮ সালে তাঁকে মুক্তি দেওয়ার সময়েও কোনো অপরাধ ঘোষিত হয়নি তাঁর বিরুদ্ধে। ফলে বিনা অপরাধে সাত বছর কারাবন্দি থাকাটাই একপ্রকার শাস্তি বলে ধরে নিয়ে বিরোধীপক্ষ এই আইনের বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠেছে। সক্রিয় মানিবাধিকার কর্মী স্ট্যান স্বামীকেও ভীমা-কোরেগাঁও মামলায় এই আইনেই অভিযুক্ত করা হয়েছিল। ২০১৮ সালের এই ভীমা-কোরেগাঁও মামলায় একইসঙ্গে অভিযুক্ত হয়েছিলেন দলিত মানবাধিকার কর্মী সুধীর ধাওয়ালে, আদিবাসী মানবাধিকার কর্মী মহেশ রাউত, রোনা উইলসন, সোমা সেন এবং কবি ভারভারা রাও। যদিও এদের মধ্যে একমাত্র ভারভারা রাওই চিকিৎসার খাতিরে জামিন পান। সিএএ-এনআরসি আইনের বিরোধিতা করার জন্য ইউএপিএ আইনে অখিল গগৈকে গ্রেপ্তার করা হয় ২০১৯ সালে এবং ২০২১ সালে তাঁকে ছাড়া হয়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে এই আইনের অধীনে ৩০০৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ৩৯৭৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে একই আইনে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উমর খালিদকেও অভিযুক্ত করা হয়। ফলে যথেচ্ছ প্রমাণ ছাড়া এবং বিনা বিচারে আটক করে রাখার অছিলায় এই আইনের বিরুদ্ধে বিরোধীমহলে যথেষ্ট সমালোচনার ঝড় বইছে।

নতুন সংশোধনীর ফলে অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারের বিলোপসাধন নিয়ে নানা মহলে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। এই আইন ব্যক্তি স্বাধীনতার পরিপন্থী কিনা তা নিয়ে বিতর্ক চলছে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।