উত্তরবঙ্গের চতুর্দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য বৌদ্ধ বিহার। পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত সেই শান্ত, নির্জন মঠগুলি পর্যটকদের কাছে স্বভাবতই খুবই আকর্ষণীয়। তবে এমন অনেক মনাস্ট্রিও রয়েছে যেগুলির খুব বেশি জনপ্রিয়তা নেই। তেমনই একটি মনাস্ট্রি হল ওল্ড ঘুম মনাস্ট্রি (Old Ghoom Monastery), যেটি ইগা চোয়েলিং মঠ (Yiga Choeling Monestery) নামেও পরিচিত। এই মঠটির প্রধান ঐতিহাসিক গুরুত্ব হল যে, এটি দার্জিলিং অঞ্চলে নির্মিত প্রথম তিব্বতি বৌদ্ধ বিহার।
সাম্প্রতিক পোস্ট
দার্জিলিং শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে ঘুম অঞ্চলে ওল্ড ঘুম মনাস্ট্রির অবস্থান। উনিশ শতকের মধ্যভাগে নির্মিত এই প্রাচীন বৌদ্ধবিহার অনেককালের অনেক ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে স্বমহিমায়। অনেক বেশি মানুষের কাছে এই বৌদ্ধ বিহারটির খবর পৌঁছে দিতে এবং পর্যটকদের এটির প্রতি আকর্ষণ তৈরি করতে মঠ কর্তৃপক্ষ নানারকম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। দার্জিলিং ভ্রমণে এই পুরনো ঘুম মনাস্ট্রি পর্যটকদের কাছে এক মনোরম ভ্রমণ স্থল হিসেবে পরিগণিত হয়।
ইগা চোয়েলিং মঠ বা ওল্ড ঘুম মনাস্ট্রিটি গেলুকপা বা হলুদ হ্যাট (টুপি) নামক তিব্বতী বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। এই সম্প্রদায়ের বৌদ্ধরা মাথায় হলুদ রঙের বিশেষ এক ধরনের টুপি পরিধান করেন বলেই তাঁদের এমন নামকরণ। বর্তমানে মঠের যে কাঠামোটি প্রত্যক্ষ করা যায় সেটি, ১৮৫০ সালে একজন বিখ্যাত মঙ্গোলিয়ান জ্যোতিষী এবং সন্ন্যাসী সোকপো শেরাব গিয়াতসো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
গিয়াতসো নিজে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত মঠের প্রধান হিসেবে পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি তিব্বতে চলে যান এবং নিজের জন্মভূমিতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। এরপর ১৯০৯ সালে কিবজে ডোমো গেশে রিনপোচে নগওয়াং কালসাং যিনি মূলত লামা ডোমো গেশে রিনপোচে নামেই খ্যাত, তিনি গিয়াতসোর স্থলাভিষিক্ত হন। এই মঠের প্রধান আকর্ষণ ১৫ ফুট উচ্চতার মৈত্রেয় বুদ্ধের মূর্তি, যা মূলত এই রিনপোচের আমলেই অনুমোদিত হয়েছিল। ১৯১০ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি মঠের প্রধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
১৯৫৯ সালে তিব্বতে চীনা অধিগ্রহণের সময়ে সেখানকার মঠগুলি থেকে অনেক উচ্চপদস্থ মঠাধ্যক্ষ ভারতে পালিয়ে এসে এই ইগা চোয়েলিং মঠে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৫১ সালে এইচ. এইচ. দলাই লামা বৌদ্ধগয়ার তিব্বতী মঠের প্রধান সন্ন্যাসী হিসেবে পাঠিয়েছিলেন ধরদো রিনপোচেকে। ১৯৬১ সালে ধরদো রিনপোচে এই ওল্ড ঘুম মনাস্ট্রির প্রধান হয়ে আসেন৷ ১৯৯০ সালে তিনি মারা যান এবং তার ঠিক তিন বছর পর তেনজিন লেগশাদ ওয়াংদি নামে একটি ছেলে ধরদো রিনপোচের পুনর্জন্মের রূপ হিসেবে স্বীকৃত হয়। ১৯৯৬ সালে তিনি কালিম্পং টিবেটান আইটিবিসিআই স্কুলে নির্দিষ্ট সন্ন্যাস প্রথা-সহ অধ্যয়নের জন্য প্রবেশ করেন। বর্তমানে এই তেনজিন লেগশাদ ওয়াংদি দক্ষিণ ভারতের ড্রেপুং লোসেলিং বিশ্ববিদ্যালয়ে তিব্বতি দর্শন অধ্যয়ন করছেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, মহামতি ধরদো রিনপোচের তত্ত্বাবধানে, মঠটিকে উন্নত করার জন্য ম্যানেজিং কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তারপর থেকে বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নও করা হয়েছে। তবে গত দুই দশক ধরে পর্যাপ্ত পরিমাণ সন্ন্যাসী ও অর্থের অভাবে ঘোরতর সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। পর্যটকদের এই মঠটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যও নানা ব্যবস্থা, প্রকল্প ইত্যাদি গ্রহণ করা হয়েছে।
ইগা চোয়েলিং মঠ বা ওল্ড ঘুম মনাস্ট্রিটি একটি সুদৃশ্য তিব্বতী স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। চতুর্দিকে নয়নাভিরাম পাহাড়ি দৃশ্য এবং তার মধ্যিখানে অবস্থিত এই মনাস্ট্রিটি সহজেই মনকে আকৃষ্ট করে নেয়। সাদা দেওয়াল, মাঝে মাঝে সোনালি রঙের অবস্থান এবং অদ্ভুত সুন্দর কাঠখোদাইয়ের জটিল, সূক্ষ্ম নকশা মঠটিকে সুদৃশ্য করে তুলেছে। মঠের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে ১৫ ফুট উচ্চতার এক মৈত্রেয় বুদ্ধমূর্তি যা ভবিষ্যৎ বুদ্ধ নামেও পরিচিত। মূর্তিটি যেহেতু একেবারেই কেন্দ্রে অবস্থান করছে, তাই মঠে প্রবেশ করলেই প্রথমে মূর্তিটির দিকেই নজর পড়ে এবং তার বিশালতা ও প্রশান্ত রূপ মুহূর্তে আকৃষ্ট করে নেয় সমস্ত ইন্দ্রিয়। এছাড়াও মঠের ভিতরে অনেক দেবতা ও লামার মূর্তি দেখা যায়। অবলোকিতেশ্বর, করুণার বুদ্ধ মূর্তি যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে জেলুকপা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠতা জেসোংখাপার মূর্তিও সেখানে দেখা যায়।
মঠের অভ্যন্তরের দেয়ালেও যত্নসহকারে নির্মিত জটিল সব হস্তশিল্পের নমুনা প্রত্যক্ষ করা যায়। মনাস্ট্রির অভ্যন্তরের দেওয়ালে খোদাই করা রয়েছে বুদ্ধের জীবনের নানা পর্বের চিত্র এছাড়াও বৌদ্ধ শিক্ষামূলক নানা গল্পেরও চিত্ররূপ সেখানে দেখতে পাওয়া যাবে। এছাড়াও ভিতরে বৌদ্ধ পান্ডুলিপির একটি বৃহৎ সংগ্রহ রয়েছে, যার মধ্যে ১০৮ খন্ডের কাঙ্গিউর-তিব্বতীয় বৌদ্ধ গসপেলও চোখে পড়ে।
এছাড়াও মঠটিকে ঘিরে তিব্বতী মন্ত্র লেখা সারি সারি প্রার্থনার চাকাগুলিও বিশেষভাবে চোখে পড়ে। তার আশেপাশে কিছু প্রাচীন চর্টেন অর্থাৎ বৌদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভও লক্ষ করা যায়। এছাড়াও ঘন্টা এবং বিশাল একটি ড্রামও রয়েছে। মঠের এইসব জটিল নকশা, ম্যুরালগুলি থেকে তিব্বতী বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসের একরকম আভাস পাওয়া যায়।
এই মঠটিতে বছরের বিভিন্ন সময়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিশেষ কিছু উৎসব পালিত হয় রীতিনিয়ম মেনেই। প্রথমেই বলতে হয় তিব্বতী নববর্ষ বা লোসারের কথা, যেটি প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি বা শেষের দিকে পড়ে। এই সময় চারদিন ধরে মঠে নানারকম আচার ও প্রার্থনার মাধ্যমে পৃথিবীর অশুভ শক্তিদের বিনাশ সাধনের জন্য তোরমা নিক্ষেপ করে জীবকূলের জন্য সুখসমৃদ্ধিতে ভরা নতুন দিনের সূচনাকে স্বাগত জানানো হয়।
সাকা দাওয়া বৌদ্ধদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান যেটি তিব্বতী ক্যালেন্ডারের চতুর্থ মাসে পড়ে, এবং গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে এটি জুন-জুলাই মাস নাগাদ পড়ে। মূলত বুদ্ধের জন্ম, জ্ঞান ও পরিনির্বাণ হল এই অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু। এই সময় মঠে চেনরেজিগ বা অবলোকিতেশ্বরের নামে ১৬ দিনের একটি ধ্যান অনুষ্ঠান হয়। এই আয়োজনে যোগ দিতে অনেক ভক্ত আসেন বিভিন্ন জায়গা থেকে। এই ধ্যানের সময় মৌন হয়ে থাকা, নৈশভোজ গ্রহণ না করা, চিরুনি না রাখা, অলঙ্কার না পরা, স্নান না করা ইত্যাদি নানারকম নিয়ম মেনে চলতে হয়।
প্রতিবছর ৬ জুলাই দলাই লামার জন্মবার্ষিকীও এই মঠ পালন করে। সেইদিন নানারকম অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই জন্মদিন উদযাপন করা হয়৷
লভভ ধুচেন নামের আরেকটি অনুষ্ঠান এই মঠে পালিত হয়। এটি মূলত বুদ্ধের তুষিতা স্বর্গ থেকে অবতরণের বার্ষিকী। এই সময় পৃথিবীকে শুদ্ধ করতে এবং বুদ্ধকে স্বাগত জানাতে তিনদিনের বিশেষ ও বিরাট অগ্নিপূজার আয়োজন করা হয়ে থাকে।
জেলুকপা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা মহান কবি ও দার্শনিক জেসোংখাপার মৃত্যুবার্ষিকীও স্মরণ করে এই মঠ। সেইদিন তাঁকে মনে রেখে মঠে মাটির প্রদীপ নিবেদন করা হয় এবং তাঁর স্মরণে প্রার্থনা করা হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- নিজস্ব প্রতিনিধি
- https://en.m.wikipedia.org/
- https://yigachoeling.com/
- https://1001things.org//
- https://www.travel-video.info/


আপনার মতামত জানান