সবুজ নৈসর্গিক প্রকৃতি, সুবিস্তীর্ণ নদীর সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শন—বৈচিত্র এবং ঐতিহ্যে ভরপুর এই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে এ-সবকিছুই একসঙ্গে পাওয়া যায়। তেমনই এক অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যে সপ্তাহান্তে অবসর যাপন করতে হলে দেউলটি উপযুক্ত গন্তব্য হতে পারে। সবুজ ধানক্ষেত, গাছগাছালির ফাঁকে পাখিদের বিচিত্র কুজন, রূপনারায়ণ নদীর জলতরঙ্গ তো আছেই, সেইসঙ্গে দেউলটির প্রধান আকর্ষণ হল এখানকার সামতাবেড় নামক গ্রামে বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত লেখক কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আবাসস্থল। এছাড়াও টেরাকোটার মন্দিরও সেখানে প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। বাংলার গ্রামীণ জনপদ এবং সেই সঙ্গে পুরাতন ইতিহাসের স্বাদ এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগ করে দেবে পর্যটকদের। অল্প সময়ের মধ্যেও উৎকৃষ্ট এবং স্মরণীয় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা যদি পেতে হয়, একবার দেউলটি থেকে ঘুরে আসাই যায়।

দেউলটি হাওড়া জেলার অন্তর্গত একটি গ্রাম। হাওড়া থেকে প্রায় ৫১ কিলোমিটার দূরে দেউলটি অবস্থিত। আরও ভাল করে বলতে হলে হাওড়া জেলার বাগনানের পশ্চিমাঞ্চলের দিকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে রূপনারায়ণ নদীর তীরে দেউলটির অবস্থান।
দেবতার দেউল থেকে দেউলটি স্থানের নামকরণ হয়েছিল বলে জনশ্রুতি থাকলেও সেটাই সত্যি কিনা তা অবশ্য অজানা।দেউলটির সামতা গ্রামের ইতিহাস বহু প্রাচীন। ব্রিটিশ শাসনামলে এই সামতা ছিল রায়দের শাসনাধীন, তাঁরা মূলত ছিলেন গ্রামের জমিদার। এমনিতে তাঁদের পদবি ছিল ব্যানার্জি, রায় আসলে তাঁদের উপাধি। এই জমিদাররা আবার ব্রিটিশ রাজের অধীনস্থ বর্ধমান রাজ এস্টেটের অধীনে ছিলেন। রায় পরিবারের সদস্য ঈশান চন্দ্র রায়ের স্মরণে একটি স্মৃতিসৌধ গ্রামে বিদ্যমান ছিল কিন্তু এখন তা জলের নীচে রয়েছে এবং পুকুরের জলের উপরিভাগে এর একটি অংশ আজও দৃশ্যমান। এরপর দেউলটির ইতিহাস বলতেই আসে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি কিংবা মদনগোপাল জিউ-এর মন্দিরের কথা। এই দেউলটির সামতাবেড়ের বাড়িতে প্রায় ১২ বছর অবস্থান করেছিলেন শরৎচন্দ্র এবং ‘রামের সুমতি’ কিংবা ‘মহেশ’-এর মতো বহু জনপ্রিয় সাহিত্য রচনা করেছিলেন। অন্যদিকে সপ্তদশ শতাব্দীতে, ১৬৫১ সালে এক জমিদার এখানে নির্মাণ করেছিলেন মদনগোপাল জিউ-এর মন্দির। টেরাকোটার অপূর্ব কাজ সেই মন্দিরের গায়ে দেখা যায়। দেউলটি যে বাংলার পূর্বতন সমৃদ্ধি এবং জ্ঞানের ধারার একটি অংশ ছিল, উক্ত দুই উদাহরণ থেকে তা কিছুটা আন্দাজ করা যেতে পারে।
শহরের কোলাহল, দূষিত বাতাস, ঘিঞ্জি পরিবেশ থেকে ক্ষণিকের জন্য মুক্তি পেতে সবুজ প্রকৃতির মাঝে দুদন্ড অবসর যাপনের আনন্দ পেতে হাওড়া জেলার ছোট্ট এই গ্রাম দেউলটি এক আদর্শ জায়গা। বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতির স্বাদ বুক ভরে নেওয়া যায় এখানে। বিশুদ্ধ মাটির সোঁদা গন্ধ, ঘন গাছগাছালির আড়ালে বিচিত্র সব পাখপাখালির কুজনে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। সেই সঙ্গেই রয়েছে রূপনারায়ণ নদী। বিস্তীর্ণ এই রূপনারায়ণের তীর ধরে, নদীর সুশীতল বাতাস গায়ে মেখে সবুজ ঘাসে পা ফেলে বহুদূরে হেঁটে যাওয়ার অনুভূতি লিখে বোঝানো সত্যিই দুঃসাধ্য ব্যাপার। নৌকোতে চাইলে নৌকোবিহারের আনন্দও উপভোগ করা যেতে পারে। ছোট ছোট জলতরঙ্গের ওপর দিয়ে দুলতে-দুলতে সেই জলযাত্রা এক অমূল্য সঞ্চয় হয়ে থাকবে স্মৃতির ভান্ডারে। তবে রূপনারায়ণের বুকে সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্তের দৃশ্যটি বাস্তবিকই এক নৈসর্গিক সৌন্দর্যের প্রতীক যেন। রাঙা আকাশের প্রতিচ্ছবি যখন রূপনারায়ণের স্বচ্ছ জলে প্রতিবিম্বিত হয়ে শুরু হয় প্রকৃতির চোখধাঁধানো খেলা, তখন এক লহমায় যেন হারিয়ে যায় মন, এই পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ, হতাশা, গ্লানি থেকে দূরে, অন্য কোনো এক জগতের মধ্যে। এই সবকিছু ছাড়াও দেউলটির সামতাবেড়েতে কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাসভূমিটি পর্যটকদের জন্য অন্যতম একটি আকর্ষণ। দীর্ঘ বারোবছর এই বাড়িতে বাস করে তিনি বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সব রচনা সৃষ্টি করেছিলেন। সাহিত্যের পাঠক যখন এই বাড়িতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শরৎচন্দ্রের ব্যবহৃত জিনিসপত্র স্বচক্ষে দেখবেন, রোমকূপ দাঁড়িয়ে যেতে বাধ্য। সব মিলিয়ে সপ্তাহান্তে ছুটি কাটাতে যাওয়ার জন্য দেউলটি নিঃসন্দেহে এক উপযুক্ত স্থান।
ট্রেনে করে দেউলটি যেতে হলে হাওড়া থেকে খড়গপুর লাইনের অনেকগুলি ট্রেন রয়েছে, যেগুলি দেউলটি স্টেশন হয়ে যায়। সেই ট্রেনগুলিতে উঠলে দেউলটি পৌঁছতে এক থেকে দেড়ঘন্টা সময় লাগতে পারে। সড়কপথে বাসে করে যেতে হলে ধর্মতলার শহীদ মিনার বাস টার্মিনাস থেকে দেউলটি যাওয়ার বাস পাওয়া যাবে। এছাড়াও, প্রাইভেট গাড়িতে যেতে হলে দ্বিতীয় হুগলী সেতু পেরিয়ে কোনা হাইওয়ে ধরে কিছুদূর গিয়ে ন্যাশানাল হাইওয়ে ৬ ধরে উলুবেড়িয়া, বাগনান ইত্যাদি পেরিয়ে চলে যাওয়া যাবে দেউলটিতে। সড়কপথে যাওয়ার অসুবিধা হলে ট্রেনে করে দেউলটি যাওয়াই সবচেয়ে সুবিধার, কারণ দেউলটি স্টেশন থেকে দেউলটি গ্রামটির দূরত্ব খুব বেশি নয়।
পূর্বে এখানে হোটেল সংখ্যা খুব কম ছিল। তবে দেউলটি ইতিমধ্যেই পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, ফলে বর্তমানে এখানে থাকবার জন্য হোটেল পেতে অসুবিধা হয় না। রেল স্টেশনের কাছাকাছি সস্তা থেকে দামি বিভিন্নরকম ভাড়ার হোটেল পাওয়া যাবে। এছাড়াও শরৎচন্দ্রের আবাসস্থলের কাছাকাছি কিংবা নদী তীরবর্তী অঞ্চলে থাকতে চাইলেও সুন্দর হোটেল পাওয়া যাবে সহজেই।
এবারে দেউলটির মূল আকর্ষণগুলি সম্পর্কে নীচে বিশদে আলোচনা করা হল।

রূপনারায়ণ নদী – দেউলটি রূপনারায়ণ নদীর তীরে অবস্থিত একটি গ্রাম। ফলত, রূপনারায়ণের একটি সুবিস্তীর্ণ চেহারা এখানে দেখতে পাওয়া যাবে। অপরূপ সুন্দর সেই নদী, দূরে সবুজ চর, ছোট ছোট ঢেউয়ের বুকে নৌকোর দুলুনি—সহজেই মুগ্ধ করে দেবে এইসব দৃশ্য। নদীর বুকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখাও এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা হয়ে থেকে যাবে। সূর্যাস্তের লাল আভা কিংবা উষাকালের আকাশের প্রতিচ্ছবি নদীর জলে প্রতিফলিত হয়ে এক অপরূপ শোভা তৈরি করে। চাইলে নদীর বুকে নৌকোবিহারও করা যাবে। মাঝনদীতে নৌকোয় বসে তীরে দেউলটি গ্রামের দিকে তাকিয়ে দেখলে চোখ জুড়িয়ে যেতে বাধ্য।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি – দেউলটির প্রধান আকর্ষণই হল সামতাবেড়ে অবস্থিত কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িটি। সরকার কর্তৃক এই ঐতিহ্যমন্ডিত মূল্যবান বাড়িটিকে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং পর্যটকদের বাড়িটি ঘুরে দেখবারও সুযোগ করে দেওয়া হয়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এখানে ১২ বছর অবস্থান করেছিলেন এবং এখানে বসেই রচনা করেছিলেন ‘দেবদাস’, ‘বৈকুণ্ঠর উইল’, ‘দেনা পাওনা’, ‘মহেশ’, ‘রামের সুমতি’-র মত কালজয়ী সব সাহিত্য। শরৎচন্দ্রের দ্বিতীয় স্ত্রী এবং শরৎচন্দ্রের ভাই বেলুড় মঠের শিষ্য স্বামী বেদানন্দও এখানেই থাকতেন। বাড়ির বাগানে তাঁদের সমাধি দেখতে পাওয়া যায়। দোতলা এই বাড়িটি ১৯২৩ সালে গোপাল দাস নামের এক স্থানীয় শ্রমিক তৈরি করেছিলেন। দুটি তলাতেই প্রশস্ত করিডোর দেখা যায় এবং ঘরগুলি তুলনায় ছোটো। বাড়িটিকে ২০০১ সালে পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশন দ্বারা একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল এবং অবশেষে ২০০৯ সালে মেরামত ও সংস্কার করা হয়েছিল। এই বাসভবনের পাশেই আবার অবসর যাপনের জন্য একটি সুদৃশ্য পার্কও রয়েছে।
মদনগোপাল জিউ-এর মন্দির – দেউলটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান হল মদনগোপাল জিউ-এর মন্দির। আটচালা স্টাইলের এই মন্দিরটি ১৬৫১ সালে মন্ডলঘাট পরগণার জমিদার মুকুন্দ প্রসাদ রায় চৌধুরী দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এটির সংস্কার করে। পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম আটচালা মন্দিরগুলির মধ্যে এটি একটি। মন্দিরের খিলানগুলিতে পৌরাণিক বিভিন্ন প্রাণীর চিত্র খোদাই করা রয়েছে। এমনকি মন্দিরের ভিতরে পোড়ামাটির সূক্ষ্ম কারুকাজও দেখতে পাওয়া যায়। মন্দিরে মদনগোপাল ও রাধার বিগ্রহ দেখতে পাওয়া যায়।
এছাড়াও দেউলটির আশেপাশে আরও যেসমস্ত দর্শনীয় স্থান রয়েছে, সেগুলি হল, রাধে শ্যাম জিউ মন্দির, নবরত্ন লক্ষ্মী জনার্দন মন্দির, বান্টুলে দাস পরিবারের নবরত্ন দধিবামন জিউ মন্দির, খালোরে মহাকালীর দালান মন্দির ইত্যাদি।
বছরের বিভিন্ন সময়তেই দেউলটিতে পর্যটকদের ভিড় হয়। তবে গ্রীষ্মকালে আবহাওয়া অত্যন্ত গরম থাকে। বর্ষাকালে গ্রামের পথে ঘোরা অসুবিধাজনক হতে পারে, এমনকি রূপনারায়ণ প্লাবিত হয়ে গ্রামে জল ঢোকার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। তাই শীতকালে অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি দেউলটি ঘোরার জন্য উপযুক্ত সময়।
ট্রিপ টিপস
- কীভাবে যাবেন – ট্রেনে যেতে হলে হাওড়া-খড়গপুর লাইনের অনেকগুলি ট্রেন রয়েছে যেগুলি দেউলটি স্টেশনে দাঁড়ায়। অন্যদিকে বাসে যেতে হলে শহীদ মিনার বাস টার্মিনাস থেকেও বাস পাওয়া যাবে এবং প্রাইভেট গাড়িতে যেতে হলে হুগলি সেতু পেরিয়ে কোনা হাইওয়ে ধরে এগিয়ে এনএইচ ৬ ধরে উলুবেড়িয়া, বাগনান ইত্যাদি পেরিয়ে চলে যাওয়া যাবে দেউলটি।
- কোথায় থাকবেন – দেউলটি স্টেশনের কাছে সস্তার এবং বিলাসবহুল সবরকমেরই হোটেল পাওয়া যাবে। তাছাড়া শরৎচন্দ্রের বাড়ির কাছে কিংবা নদী তীরবর্তী অঞ্চলে থাকতে চাইলেও সহজেই নানারকম হোটেল পাওয়া যাবে সেখানে।
- কী দেখবেন – দেউলটি গ্রামটি তো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর বটেই, এছাড়াও সেখানকার রূপনারায়ণ নদী, সামতাবেড়ে কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আবাসন এবং ঐতিহাসিক মদনগোপাল জিউ-এর মন্দির দেউলটির প্রধান দ্রষ্টব্য স্থান।
- কখন যাবেন – অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে অর্থাৎ শীতকাল দেউলটি ঘুরে দেখার জন্য উপযুক্ত।
- সতর্কতা –
- বর্ষাকালে দেউলটি যাওয়া উচিত নয়। কিন্তু তাও যদি কেউ যায় এবং বর্ষার ভরা রূপনারায়ণ নদীতে নৌকাবিহার করতে চায় তাহলে উপযুক্ত সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।
- শরৎচন্দ্রের বাড়ি কিংবা ঐতিহাসিক মদনগোপাল জিউ-এর মন্দির পরিদর্শনকালে সেইসব চত্বরে কোনো আবর্জনা ফেলে জায়গাগুলিকে অপরিচ্ছন্ন করবেন না। যেহেতু স্থানগুলি সরকারের অধীনস্থ, তাই উক্ত জায়গাগুলিতে সরকারী বিধিনিষেধ মেনে চলুন, নইলে জরিমানা হতে পারে।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৩
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান