সববাংলায়

ক্রিস্টোফার মারলো মৃত্যুরহস্য

বিভাগঃ ,

এলিজাবেথীয় যুগের সুবিখ্যাত ইংরেজ নাট্যকার এবং কবি ক্রিস্টোফার মারলোর মৃত্যু হয়েছিল মাত্র ২৯ বছর বয়সে। এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল না বলেই একে ঘিরে ঘনীভূত হয়ে ওঠে ক্রিস্টোফার মারলো মৃত্যুরহস্য। প্রাথমিকভাবে মনে করা হয় এক সরাইখানায় খাবারের বিল মেটানো নিয়ে ঝামেলার কারণে ইনগ্রাম ফ্রিজার নামের এক ব্যক্তির ছুরিকাঘাতে তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হয় মারলোর। কোন কোন গবেষক মনে করেন যে এলিজাবেথীয় সরকারের উচ্চপদস্থ কিছু সদস্যকে রক্ষার জন্য এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকান্ড ছিল। আবার মনে করা হয়, মারলোর নাস্তিকতা প্রচার এবং সে বিষয়ে অন্যকে প্রভাবিত করা, এটি এলিজাবেথীয় ইংল্যান্ডের প্রেক্ষাপটে যেহেতু একটি বড় অপরাধ ছিল, সেকারণে বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ এলিজাবেথই নাকি তাঁকে সরিয়ে ফেলার আদেশ দিয়েছিলেন। আবার অনেকের দাবী মারলো নিজের মৃত্যুর মিথ্যে খবর ছড়িয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন অন্যত্র। আসলে ঠিক কোন কারণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয়েছিল ব্রিটিশ এই নাট্যকারকে, তা আজও রহস্যের অন্তরালেই রয়ে গেছে।

১৫৯৩ সালের ৩০ মে এলেনর বুলের মালিকানাধীন ডেপ্টফোর্ডের একটি বাড়িতে ক্রিস্টোফার মারলোর মৃত্যু হয়েছিল। এরপর এই মৃত্যু নিয়ে দীর্ঘকাল নানা রকম জল্পনাকল্পনা হয়। কিন্তু মারলোর মৃত্যু নিয়ে আজও এক ধোঁয়াশা থেকে গেছে গবেষকদের মনে। উল্লেখ্য যে, মারলোর মৃত্যু সংক্রান্ত বিশদ বিবরণ ১৯২৫ সাল পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত ছিল।

ক্রিস্টোফার মারলো মৃত্যুরহস্য ঘনীভূত হয়েছে মূলত বেশ কিছু আঙ্গিককে ভিত্তি করে। হত্যাকাণ্ডের দিনটিতে এলেনর বুলের বাড়িতে মারলোর সাথে ছিলেন মারলোর বন্ধু ইনগ্রাম ফ্রিজার, নিকোলাস স্কেরেস এবং রবার্ট পলি। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, যে বাড়িটার কথা এখানে বলা হচ্ছে সেটি মূলত সরাইখানা ছিল বলে মনে করা হয়, ফলে খুব সম্ভবত মারলোরা সেখানে খাবার দাবার এবং পানীয়ে যাবতীয় খরচ করেছিলেন। একটি মত অনুযায়ী খাওয়া দাওয়া সংক্রান্ত খরচের বিষয়ে মারলো এবং ফ্রিজারের মধ্যে তর্কাতর্কি শুরু হয়েছিল এমনকি অশ্লীল বাক্যবিনিময়ও চলছিল তাঁদের মধ্যে। প্রতক্ষ্যদর্শীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী সেই কথা-কাটাকাটির সময়ে ফ্রিজার টেবিলে বসে থাকলেও মারলো পিছনে সোফায় শুয়ে ছিলেন। প্রথমে নাকি মারলো ফ্রিজারের ছুরি ছিনিয়ে নিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করে৷ রাজ পরিবারের পারিবারিক চিকিৎসক উইলিয়াম ড্যানবির রিপোর্ট অনুযায়ী মারলোর ডানচোখের উপর ছুরিকাঘাত করার ফলে মৃত্যু হয়েছিল মারলোর। ১৫৯৩ সালের ১ জুন তদন্তের পরপরই ডেপ্টফোর্ডের সেন্ট নিকোলাসের গির্জায় মারলোকে একটি অচিহ্নিত কবরে সমাধিস্থ করা হয়েছিল।

উইলিয়াম ড্যানবির তদন্তের রিপোর্ট নিয়েও সন্দেহের অনেক অবকাশ তৈরি হয়েছিল পরবর্তীকালে। লেসলি হটসন মারলোর মৃত্যুরহস্য নিয়ে লিখিত বইতে দাবী করেন যে, প্রত্যক্ষদর্শীরা আদতে মিথ্যে এবং তৈরি করা বয়ান দিয়েছিলেন। এছাড়াও স্যামুয়েল এ. ট্যানেনবাউম জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, এই ধরনের ক্ষততে তাৎক্ষণিক মৃত্যু হতে পারে না, অথচ প্রত্যক্ষদর্শীরা তেমনটাই বলেছিলেন। সেই বাড়িতে উপস্থিত এবং সাক্ষীদের একজন রবার্ট পলি তো মিথ্যেবাদী হিসেবেই কুখ্যাত। অপরজন অর্থাৎ নিকোলাস স্কেরেসও ছিলেন নিতান্তই জালিয়াত চালবাজ একজন লোক।  যদিও ঐ চিকিৎসকের তদন্তে সাক্ষীদের ভদ্রলোক বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

এই হত্যাকান্ডের রহস্যে আরেকটি পরত যুক্ত হয়ে যাবে এর পূর্ববর্তী কিছু ঘটনার দিকে মনোনিবেশ করলে। ১৫৯৩ সালে মারলোর প্রাক্তন রুমমেট নাট্যকার থমাস কিডকে রাষ্ট্রদ্রোহের জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিন্তু থমাস কিড একটি চিঠিতে স্যার জন পাকারিংকে লিখেছিলেন যে, তাঁদের বাসস্থানে তল্লাশি চালিয়ে যে ধর্মবিরোধী নথির তিনটি পৃষ্ঠা পাওয়া গেছে তা আসলে মারলোর। এছাড়াও মারলো রচিত ‘ট্যাম্বুরলেইন দ্য গ্রেট’- এর মতো নাটকগুলিতে নাস্তিকতা, চার্চের গলদ, ধর্মবিরোধিতা, আঁচ পাওয়া যায়। এরই মধ্যে মারলোর এক পুরাতন শত্রু রিচার্ড বেইনস প্রিভি কাউন্সিলের কাছে ধর্মগ্রন্থ ও চার্চকে তিরস্কার করার অপরাধে অভিযুক্ত করেন মারলোকে। ১৮ মে মারলোর নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয় এবং ২০ তারিখ গ্রেপ্তার হন তিনি। তাঁকে আদালতের বারো মাইল ব্যসার্ধের মধ্যেই থাকতে বলা হয়। প্রতিদিন থানায় এসে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। এর দশদিন পরেই মারলোকে হত্যা করা হয়।

অনেকে মনে করে থাকেন যে, মারলো তাঁর সোচ্চার নাস্তিকতা দিয়ে অনেককে প্রভাবিত করতেন। ফলে রাণী এলিজাবেথ বিষয়টিকে ভালো চোখে তো নেননি বটেই বরং চেয়েছিলেন ক্রিস্টোফার মারলোকে সরিয়ে দিতে এবং রাণী নিজেই নাকি উক্ত হত্যাকান্ডের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই তত্ত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য আরও বলা হয় যে, চার সপ্তাহ পরে এলিজাবেথ মারলোর খুনিকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। গবেষকদের মতে, মারলোর হত্যা পরিকল্পনাকে সমর্থন করেছিলেন যাঁরা তাঁরা হলেন স্যার ওয়াল্টার রেলি, স্যার রবার্ট সেসিল এবং অড্রে ওয়ালসিংহাম যাঁর স্বামী টমাস ওয়ালসিংহামের সঙ্গে নিবিড় ঘনিষ্ঠতা ছিল মারলোর। টমাস ওয়ালসিংহাম নিজে গুপ্তচরবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং মারলোর লেখার একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। কিন্তু মারলো আবার টমাসের অধীনে কিছু সময় গুপ্তচরবৃত্তির কাজও করেছিলেন। মারলোর এই গুপ্তচরবৃত্তিই তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ালো কিনা তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ থেকেই যায়। কেউ কেউ মনে করে থাকেন রাষ্ট্রের এমন কোন বিপজ্জনক গোপনীয় তথ্য মারলো জেনে গেছিলেন যা প্রকাশ করা থেকে মারলোকে প্রতিহত করতেই এই হত্যাকান্ড। 

আবারও হত্যাকান্ডের দিনটির দিকে তাকানো যেতে পারে। সূত্র থেকে জানা যায় যে সেদিন যে তিনজন মারলোর সঙ্গে সেই বাড়িতে ছিলেন তাঁরাও তলে তলে গুপ্তচরবৃত্তি করতেন। এই তথ্য থেকে একথা মনে হওয়া অসঙ্গত নয় যে মারলোর হত্যার পিছনে সরকারী মদত ছিল। যেহেতু গুপ্তচরবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মারলো, তাই প্রিভি কাউন্সিলের ভিতরকার অনেক খবরও তিনি জানতেন। প্রিভি কাউন্সিলের হয়ত ভয় ছিল, তাঁরা যে নাস্তিক সেকথা হয়তো মারলো ফাঁস করে দিতে পারেন। এছাড়াও স্যার ওয়াল্টার রেলির  ‘দ্য স্কুল অব নাইট’ -এর গোপন খবর সম্পর্কেও সচেতন ছিলেন তিনি। সেগুলি ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয় হয়ত মারলোকে  হত্যা করবার পরিকল্পনার মত চরম পদক্ষেপের জন্ম দিয়েছে। 

সরকারী ষড়যন্ত্রের তত্ত্বটিকে মারলোর মৃত্যুর বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দিতে চান কোন কোন গবেষক। এ ছাড়াও যে তত্ত্বগুলি উঠে আসে ক্রিস্টোফার মারলো মৃত্যুরহস্য থেকে, সেগুলি হল, মারলোর সাথে টমাস ওয়ালসিংহামের সম্পর্ক তাঁর স্ত্রী অড্রে ওয়ালসিংহামকে হয়ত ভেতরে ভেতরে ভীত করেছিল মারলোর দ্বারা তাঁর স্বামীও প্রভাবিত হয়ে যেতে পারে নাস্তিকতার প্রতি। সেই সন্দেহ থেকেই নাট্যকারকে খুন করার ব্যবস্থা করে থাকতে পারেন শ্রীমতি অড্রে।

কেউ বলেন, যে, সরাইখানায় ওই দিন খাওয়ার খরচ মেটানো সংক্রান্ত ঝামেলা নয়, ফ্রিজার মারলোকে হত্যা করেছিলেন কারণ তিনি তাঁর প্রভু টমাস ওয়ালসিংহামের সাথে মারলোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে ঈর্ষা করতেন এবং ভয় পেয়েছিলেন যে মারলোর আচরণ ওয়ালসিংহামের খ্যাতির উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি এও বলা হয় যে, স্কেরেস এবং ফ্রিজার মারলোকে পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিলেন।

আরেকটি তত্ত্বে বলা হয় লর্ড বার্গলে এবং রবার্ট সেসিল তাঁকে হত্যা করার বন্দোবস্ত করেছিল কারণ মারলোর নাটকে ক্যথলিক প্রচার ছিল।

কেউ আবার বলে থাকেন, আসলে মৃত্যুর ঘটনাটিকে প্রচার করে মারলো দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। বিদেশে নিরাপদ অনুভব করতে শুরু করলে মারলো তাঁর কাজগুলি সম্পাদনের জন্য ইংল্যান্ডে পাঠাতেন বলে মনে করেন গবেষকেরা। কিন্তু মৃত মারলোর নামে তো সাম্প্রতিক কাজগুলি চলতে পারে না, নতুবা সন্দেহ তৈরি হবে, তাই উইলিয়াম শেক্সপীয়ারের নামেই মারলোর কাজগুলি ইংল্যান্ডে চলত বলে মনে করেন পন্ডিতেরা।

কিন্তু বহু অনুসন্ধানের পরেও সরকারী মদত বা স্রেফ অর্থসংক্রান্ত ঝামেলা কিংবা বিদেশে পলায়নের তত্ত্ব, কোনোটির দিকেই নিশ্চিতভাবে নির্দেশ করে মারলোর মৃত্যুর কারণকে ব্যাখা করা যায়নি আজও। অন্ধকার যবনিকার আড়ালেই রয়ে গেছে এই কিংবদন্তি কবি ও নাট্যকার ক্রিস্টোফার মারলো মৃত্যুরহস্য।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading