সববাংলায়

মোৎসার্ট

বিভাগঃ , ,

মোৎসার্ট বা মোজার্ট (Mozart) একজন অস্ট্রীয় সুরকার। তাঁকে বিস্ময় বালক বলা হত কারণ মাত্র পাঁচ বছর বয়স থেকেই তিনি কীবোর্ড ও বেহালায় সুর তোলার দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। মাত্র আট বছর বয়সে একটা গোটা সিম্ফনি লিখে বিশ্বের সুরবোদ্ধাদের অবাক করে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর সৃষ্টি করা ৬০০ এর বেশি সুর রয়েছে যার মধ্যে বেশিরভাগ সুর-ই সিম্ফোনি (symphonic), চেম্বার (chamber), কনসার্টেন্ট (concertante), গীতিনাট্যধর্মী (operatic) ও কোরাল সঙ্গীত বলে বিবেচিত হয়। 

১৭৫৬ সালের ২৭ জানুয়ারি জার্মানির জালৎসবুর্গ শহরে মোৎসার্টের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম ভোল্‌ফগাংক্‌ আমাডেয়ুস মোৎসার্ট (Wolfgang Amadeus Mozart)। তাঁর মায়ের নাম আন্না মারিয়া মোৎসার্ট। তাঁর বাবা লেওপোল্ড মোৎসার্ট ছিলেন একজন সুরকার ও অভিজ্ঞ শিক্ষক। মোৎসার্ট তাঁর বাবা মায়ের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন। মোৎসার্টের স্ত্রীর নাম কন্সটানৎস। তাঁদের দাম্পত্য জীবনে ছয় সন্তানের চারজন শিশু অবস্থাতেই মারা গিয়েছিল।

শৈশবে মোৎসার্টের বাবা তাঁর সন্তানদের ভাষা এবং পাঠ্যসূচির অন্তর্গত বিষয়গুলি পড়াতেন। পাশাপাশি একজন সুরকার হিসেবে সঙ্গীতের শিক্ষাও দিতেন। কিন্তু বাবার দেওয়া শিক্ষার চেয়ে বিস্ময়কারভাবে মোৎসার্ট একটু বেশিই জানতেন। তিনি খুব ছোট থেকেই সঙ্গীতের সুর তৈরি করতে পারতেন। মোৎসার্টের কীবোর্ডের ‍সুর ও বেহালার কাজ এতটাই নিখুঁত ছিল যে, তাঁর বাবা অবাক হয়ে যেতেন।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মোৎসার্ট তাঁর প্রথম সুর সৃষ্টি করেছিলেন। এবং সেই সুর ইউরোপীয় অভিজাতদের সামনে পরিবেশন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। মাত্র সাত বছর বয়সেই তিনি বিখ্যাত কম্পোজিশন ‘সোনাটা’ লেখেন। আট বছর বয়সে তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ সিম্ফোনি প্রকাশিত হয়। ‘মিট্রিডেইট রে ডি পন্টো’ (Mitridate, re di Ponto) নামক অপেরা লেখেন ১৪ বছর বয়সে। এবং এই অপেরার মাধ্যমেই সাড়া জাগান পুরো ইউরোপে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে জালৎসবুর্গের দরবারী সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে নিযুক্ত হন।তাঁর জীবনে লেখা সব সিম্ফোনির মধ্যে অর্ধেকের বেশি লিখেছিলেন ১৯ বছর বয়সের মধ্যেই।

১৭৭৭ সালে জালৎসবুর্গের দরবার পদ থেকে অব্যহতি নিয়ে নতুন কাজ খোঁজার উদ্দেশ্যে আউগসবুর্গ, মানহাইম, প্যারিস ও মিউনিখ সফরে যান। পরে ভার্সাইয়ে অরগান বাদক পদে কিছুদিন কাজ করেছেন। কিন্তু এই কাজে সন্তুষ্ট ছিলেন না তিনি। ভাল কাজ না থাকায়, অর্থ সংকটেও পড়েছিলেন। এমনকি তাঁর মা অসুস্থ হয়ে পড়লে সময়মত ডাক্তার ডাকতে পারেননি এবং ১৭৭৮ সালের ৩ জুলাই তাঁর মা মারা যান। এরপর তিনি বিভিন্ন প্রয়োজনে ধার করা ও মূল্যবান জিনিসপত্র বন্ধক রাখা শুরু করেছিলেন।

মোৎসার্ট তাঁর বেহিসাবী জীবনযাপনের জন্য জীবনের শেষ মুহূর্তে গিয়ে নিজের ও পরিবারের জন্য তেমন কোনো সঞ্চয় রেখে যেতে পারেননি। এমনকি তিনি মারা যাওয়ার পরও তাঁর স্ত্রী কন্সটানৎসের কাছে কোনো টাকা পয়সাই ছিল না।

১৭৭৮ সালে স্থানীয় অভিজাতদের সহায়তায় মোৎসার্টকে রাজদরবারে অরগান বাদক ও কনসার্ট প্রধানের পদে ৪৫০ ফ্লোরিনে (মুদ্রায়) যোগদানের জন্য প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। মোৎসার্টের বাবা জালৎসবুর্গে তাঁর জন্য একটি চাকরি জোগাড় করেছিলেন। কিন্তু সেখানেও যোগ দেননি মোৎসার্ট। মোৎসার্ট চেয়েছিলেন জালৎসবুর্গের বাইরে কোথাও চাকরি করবেন। মায়ের মৃত্যুর পর ১৭৭৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জালৎসবুর্গের উদ্দেশ্যে প্যারিস ছাড়ার পরও তিনি মানহাইম ও মিউনিখে কিছুদিন সময় কাটান। কিন্তু কোথাও চাকরি না পেয়ে অবশেষে ১৭৭৯ সালের ১৫ জানুয়ারি তিনি জালৎসবুর্গে ফিরে আসেন এবং নতুন চাকরিতে যোগ দেন। কিন্তু এই কাজেও তাঁর মন বসছিল না। তিনি এই কাজ করার সময় উদাসীন থাকতেন।

পরে ১৭৮১ সালে ভিয়েনায় যান মোৎসার্ট। ভিয়েনায়তেই মোৎসার্ট তাঁর শেষ জীবন কাটিয়েছিলেন। এইসময় কাজের জন্য তিনি বার্লিন, সেলঝবুর্গে গিয়েছেন।

ভিয়েনায় যাওয়ার পর প্রথম একজন পিয়ানোবাদক হিসেবে তাঁর জীবন শুরু করেন। এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই নিজেকে ভিয়েনার শ্রেষ্ঠ পিয়ানোবাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে তুলেন। ১৭৮২ সালে ‘‘ডাই এন্টফুরুং ডেম সেরাইল’’ অপেরায় কাজের মাধ্যমে সফল হন তিনি। এর মাধ্যমেই মোৎসার্ট নিজেকে একজন সুরকার হিসেবে ভিয়েনায় প্রতিষ্ঠিত করেন। এ সময়ই কন্সটানৎসের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

১৭৮৫ সালে কীবোর্ড এ সুর সম্পাদনার কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন তিনি। কাজ শুরু করেন ‘লরেঞ্জো দা পন্টে’ (Lorenzo Da Ponte)-এর সাথে। সেখানে অপেরায় সহযোগিতার কাজ করে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন মোৎসার্ট।

ভিয়েনায় ১৭৮৬ সালে তাঁর বিখ্যাত সৃষ্টি ‘দ্য ম্যারিজ অব ফিগারো’-এর প্রিমিয়ার করা হয় এবং তা ভীষণ প্রশংসিত হয়। ১৭৮৭ সালে, সম্রাট জোসেফ দ্বিতীয়, তাঁর দরবারী সুরকার গ্লুক এর মৃত্যুর পর মোৎসার্টকে ঐ পদে নিযুক্ত হবার প্রস্তাব দেন। ওই সালের ডিসেম্বরে মোৎসার্ট সেই কাজ করা শুরু করেন। এটি সম্পূর্ণ সময়ের কাজ ছিল না তাই মোৎসার্ট পেতেন প্রতি বছরে মাত্র আটশো ফ্লৌরিন্স (মুদ্রা)। এখানে তাঁকে নাচের জন্য সুর তৈরি করতে হত।

১৭৮৮ সালে মোৎসার্ট তাঁর পরিবার নিয়ে সেন্ট্রাল ভিয়েনা ছেড়ে আলসেরগ্রান্দ-এর শহরতলীতে চলে যান। সেখানে তিনি বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। এর মধ্যে তাঁর শেষ তিনটি সুর উল্লেখযোগ্য। যা সিম্ফোনি থারটি নাইন [39], সিম্ফোনি ফোরটি [40] এবং সিম্ফোনি ফোরটি ওয়ান [41] নামে বিখ্যাত। প্রতিটি সুরই সৃষ্টি করেছিলেন ১৭৮৮ সালে।

১৭৮৯ থেকে ১৭৯০ সালের দিকে মোৎসার্ট নিজের ভাগ্য বদল করতে বার্লিন, লিইপৎসিশ, ড্রেসডেন, ফ্রাংকফুর্ট, মানহাইম ও জার্মানির অন্যান্য শহরগুলিতে সফর করতে থাকেন। এই সফরের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে বিচ্ছিন্ন কিছু সাফল্য এবং অর্থ উপার্জন হয়। এতে তাঁর আর্থিক অবস্থার কিছুটা উন্নত হলেও, স্থায়ীভাবে আর্থিক সমস্যা দূর হচ্ছিল না।

মোৎসার্ট, তাঁর জীবনের শেষ বছরে (১৭৯১ সালে) বেশ কিছু অসাধারণ সুর সৃষ্টি করেছিলেন। যার জন্য তিনি এখনও সারা বিশ্বে বেশ সমাদৃত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে অপেরা দ্যা ম্যাজিক ফ্লুট (The Magic Flute), শেষ পিয়ানো কন্সার্টো (K.595 in B-flat), তাঁর string quintets সিরিজের শেষ খন্ড, প্রার্থনাসঙ্গীত (Motet) Ave verum corpus K. 618, এবং অসমাপ্ত সুর Requiem K. 626 । মোৎসার্টের শেষ সিম্ফোনির নাম ‘জুপিটার’। যা ১৭৮৮ সালে লেখেন তিনি।

জীবনের শেষ সময়ে ১৭৯০ সালে মোৎসার্টের আর্থিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। সে সময় তিনি হাঙ্গেরি এবং আস্টারডাম এর ধনী পৃষ্ঠপোষকদের জন্য বার্ষিক বৃত্তির বিনিময়ে সুর রচনা করতেন। ইম্পেরিয়াল সভাগৃহে সুরকার হিসেবে কাজ করে আর্থিকভাবে কিছুটা সফল হন তিনি। তখন তিনি তাঁর ধার দেনা সব শোধ করে দেন।

১৭৯১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অপেরা ‘লা ক্লেমেঞ্জা ডি টিট’ (La clemenza di Tito)-এর উন্মোচন করতে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন মোৎসার্ট। এরপর রিউমেটিক ফিভারে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। তখন তাঁর স্ত্রী, তাঁর ছোটো বোন এবং পরিবারের ডাক্তার টমাস ফ্রান্তজ ক্লসেত মোৎসার্টের দেখাশোনা করতেন। তাঁর মৃত্যুকালীণ বর্ণনাগুলি মোৎসার্টের মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর পত্রিকায় তুলে ধরা হয়েছিল। যেখানে বলা হয়েছিল যে, মোৎসার্টের বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয়েছিল। সে সময়কার কয়েকটি গ্রন্থে তাঁর জীবনীতেও একথা লেখা হয়েছিল যে, তাঁকে বিষ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কে বিষ দিয়েছিল সেটা জানা যায়নি। এখনও পর্যন্ত মোৎসার্ট মৃত্যু রহস্য -এর কিনারা করা যায়নি।

১৭৯১ সালের ৫ ডিসেম্বর রাত ১টায় ৩৫ বছর বয়সী মোৎসার্টের মৃত্যু হয়।

মোৎসার্টের জীবনী ও সুর নিয়ে অসংখ্য বই, নাটক ও চলচ্চিত্র সৃষ্টি হয়েছে। অস্ট্রেলীয় চকলেট বল মোৎসার্ট বুলেট তাঁর নামেই নামকরণ করা হয়। ১৯৮৪ সালে মোৎসার্টকে নিয়ে নির্মিত হয় বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘‘আমাডেয়ুস’’। মিলো ফরমান পরিচালিত এই ছবিতে মোৎসার্টের ভূমিকায় অভিনয় করেন টম হালচ। চলচ্চিত্রটি সেরা চলচ্চিত্র ক্যাটাগরিতে অস্কার পায়। শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ও শ্রেষ্ঠ পরিচালনার পুরস্কারসহ মোট ৮টি বিভাগে একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিল ছবিটি।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading